📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
ক. (বায়): ক্রয়-বিক্রয়
বায় (بيع) হলো নিজে মালিক হওয়ার কিংবা অন্য কাউকে মালিক বানানোর উদ্দেশ্যে পরস্পরের মাঝে সম্পদের বিনিময়। তিজারাহ বা ব্যবসায় হলো লাভের ভিত্তিতে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে কোনো বস্তু ক্রয় করা। বায় (بيع) এবং তিজারাহ (التِّجَارَةُ)-এর মাঝে পার্থক্য হলো, ব্যবসায়ে লাভ অর্জন করার ইচ্ছা থাকে, সে ইচ্ছা বাস্তবায়িত হতেও পারে, নাও হতে পারে। (অর্থাৎ ব্যবসায়ে লাভ অর্জিত হতেও পারে, নাও হতে পারে, বায় এর ব্যতিক্রম।)
খ. السَّمْسَرَةُ (সামসারাহ): দালালি
সামসারাহ (السَّمْسَرَةُ) শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো তিজারাহ বা ব্যবসায়। আল-খাত্তাবী বলেন: আস-সিমসার (السَّمْسَارُ) শব্দটি অনারব শব্দ। পূর্বকালে যারা ক্রয়-বিক্রয় করত তাদের অনেকেই ছিল অনারব। আরবরা তাদের নিকট থেকে শব্দটি আত্মিকরণ করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. সে শব্দটির পরিবর্তে 'তিজারাহ' (تجارة) শব্দটি গ্রহণ করেন, যা আরবী নামসমূহের অন্যতম।
সামসারাহ (السمسرة)-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা: বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝে মধ্যস্থতা করাকে আস-সামসারাহ বা দালালি বলে। আর আস-সিমসার (السَّمْسَارُ) বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে, যে ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদনে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। তাকে দালালও বলা হয়। কারণ, সে ক্রেতার জন্যে পণ্যের এবং বিক্রেতার জন্যে মূল্যের দালালি করে।
টিকাঃ
৫. আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬০
৬. হাদীস: 'ব্যবসায়ের নাম ছিল সামসিরাহ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. পরিভাষাটি পরিবর্তন করেন।' ইমাম তিরমিযী তার সুনান গ্রন্থে, খ. ৩, পৃ. ৫০৫; আল-হালাবী প্রকাশনা) এবং হাকিম তার আল-মুসতাদরাক গ্রন্থে, (খ. ২, পৃ. ৭; দায়িরাতুল মাআরিফ আল উসমানিয়া প্রকাশনা) হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন
৭. তুহফাতুল আহওয়াযী, খ. ৪, পৃ. ৩৯৮
৮. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩৯
📄 শরীয়তের বিধান
মানুষ উপার্জনের উদ্দেশ্যে যে সকল পেশা চর্চা করে জীবনযাপনের তেমন এক পেশা হচ্ছে ব্যবসায়; এভাবে উপার্জন করা শরীয়তসম্মত। কারণ, এর মাধ্যমেই ব্যক্তি তার সমাজের প্রয়োজন পূর্ণ করে। তাই ব্যবসায় মৌলিকভাবে বৈধ। তবে স্থান-কাল-পাত্রভেদে ব্যবসায়ে ওয়াজিব, হারাম, মাকরুহ ইত্যাদি বিভিন্ন বিধান আরোপিত হতে পারে।
ফকীহগণ ব্যবসায়ের সাথে সম্পর্কিত বিধি-বিধান বলে বুঝিয়েছেন মৌলিক ফিকহগ্রন্থসমূহ ছাড়াও শরয়ী শিষ্টাচার (الأداب الشرعية) ও ফাতাওয়ার গ্রন্থাবলিতে যা কিছু তারা উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ এ বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। যেমন: আস সারাখসী প্রণীত আল-ইকতিসাব ফির-রিযকিল মুসতাতাব (الاكتساب في الرزق المستطاب), আবু বকর আল-খাল্লাল প্রণীত কিতাবুত তিজারাহ (كتاب التجارة) ইত্যাদি।
বর্তমানে নানা ধরনের নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হচ্ছে। ফকীহগণ ব্যবসায়-বাণিজ্য সংক্রান্ত যে সকল সাধারণ নীতি এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির আলোকে বিভিন্ন বিধান নির্ধারণ করেছেন সে সবই এ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর হবে। যেমন, পণ্যদ্রব্যের যাকাতের আলোচনায় পণ্যের সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিধান ফকীহগণ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যথা, এমন পণ্যে যাকাত ফরয হওয়া, ব্যবসার জন্যে না হলে যেগুলোতে যাকাত ফরয হয় না। যেমন: কাপড়, জমি ইত্যাদি। এমনিভাবে মৌলিকভাবে যা যাকাতের পণ্য, তা ব্যবসার জন্যে নির্ধারণ করা হলে তাতে যাকাত হিসাবে প্রদেয় সম্পদের ধরনে ও পরিমাণে পার্থক্য হওয়া। যেমন চতুষ্পদ জন্তু ও উশরী পণ্য। মুদারাবা এবং কতক অংশীদারী কারবারে ব্যবসার কিছু বিধানও কার্যকর হয়।
📄 ব্যবসায়ের ফজীলত
সম্পদ উপার্জনের সবচেয়ে উত্তম এবং সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম হলো ব্যবসায়। তবে একজন ব্যবসায়ী এই মর্যাদা তখনই পাবেন যখন তিনি ব্যবসায়ের সকল হারাম (নিষিদ্ধ) পদ্ধতি বর্জন করবেন এবং ব্যবসায়ের সকল শিষ্টাচার মেনে চলবেন। হাদীসে এসেছে: سُئِلِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَيُّ الْكَسْبِ أَطْيَبُ ؟ فَقَالَ : عَمَلَ الرَّجُلِ بِيَدِهِ وَكُل بَيْعِ مَبْرُورٍ "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, পবিত্রতম উপার্জন কোন্টি? তিনি উত্তরে বললেন, ব্যক্তির নিজ হাতের উপার্জন এবং প্রত্যেক স্বীকৃত ক্রয়বিক্রয়ের মাধ্যমে উপার্জন।"
আশ-শারকাভী তার হাশিয়াতে বলেন: নবী সা.-এর বাণী (وَكُلِّ بَيْعٍ مَبْرُور) অর্থাৎ 'এবং প্রত্যেক স্বীকৃত ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে উপার্জন' বলে তিনি ব্যবসায়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
টিকাঃ
৯. হাদীস: উপার্জন হলো ব্যক্তির নিজের হাতের উপার্জন..... ইমাম আহমাদ হাদীসটি তার মুসনাদ গ্রন্থে (খ. ৪, পৃ. ১৪১; আল-মাইমানিয়্যা প্রকাশনা) উল্লেখ করেছেন। হাফিয ইবনে হাজার বলেছেন, এই হাদীসের বর্ণনাকারীগণের বর্ণনা গ্রহণে কোন অসুবিধা নেই। (رجاله لا بأس بهم) ফায়যুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ৫৪৭, আল-মাকতাবাতুত তিজারিয়্যা প্রকাশনা।
১০. হাশিয়াতুশ শারকাভী আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ৩, ঈসা আল-হালবী প্রকাশনা
📄 ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বর্জনীয়
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সকল প্রকারের প্রতারণা, ধোঁকা, মিথ্যা শপথ দ্বারা পণ্যের প্রচার বা দ্রুত কাটতি বাড়ানো ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ)। এ বিষয়ে হাদীস লক্ষণীয়: عَنْ رِفَاعَةَ بْنِ رَافِعٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ : خَرَجْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْمُصَلَّى ، فَرَأَى النَّاسَ يَتَبَايِعُونَ فَقَالَ : يَا مَعْشَرَ التَّجَّارِ فَاسْتَجَابُوا لِرَسُول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَفَعُوا أَعْنَاقَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ إِلَيْهِ ، فَقَالَ : إِنَّ التَّجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فُجَّارًا ، إِلَّا مَنِ اتَّقَى اللَّهَ وَبَرٌ وَصَدَقَ রিফাআ ইবনে রাফি রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি নবী সা.-এর সাথে ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে তিনি দেখলেন, লোকেরা কেনাবেচা করছে। তিনি তাদের ডাক দিলেন, 'হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়!' রাসূলুল্লাহ স.-এর ডাকে সাড়া দিয়ে তারা তাদের ঘাড় উঠিয়ে তাঁর দিকে তাকাল। তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন: 'ব্যবসায়ীগণ কিয়ামতের দিন পাপাচারী হিসেবে উত্থিত হবে। তবে সেই সব ব্যবসায়ী এদের ব্যতিক্রম, যারা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করে এবং ন্যায়পরায়ণতা ও সততার পথে চলে।'
অন্য এক হাদীসে বিধৃত হয়েছে: عَنْ أَبِي ذَرِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ : ثَلاثَةٌ لا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ، قُلْتُ : مَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ فَقَدْ خَسِرُوا وَخَابُوا : قَالَ : الْمَنَّانُ ، وَالْمُسْبَل إِزَارَهُ ، وَالْمُنْفِقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ . আবু যার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সা. থেকে বর্ণনা করেন, নবী স. বলেছেন : "আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তিন প্রকার লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে (গুনাহ থেকে) পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করবেন না, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” আমি (আবু যর) জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা? (এই যখন তাদের অবস্থা তখন) তারা তো খুবই ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ। এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন (তারা হলো): ১. দান করে খোটা প্রদানকারী; ২. টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধানকারী পুরুষ; ৩. মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রয়কারী।
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অন্যতম বর্জনীয় কাজ হলো, আমদানিকৃত পণ্য ক্রয়ে অগ্রবর্তী হয়ে সাক্ষাৎ করা: এটা এমন যে, বিক্রেতা গ্রাম থেকে পণ্য নিয়ে শহরের বাজারে প্রবেশের পূর্বে শহুরে ক্রেতা পণ্যের মূল্য থেকে নিম্নমূল্যে পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে গ্রাম্য বিক্রেতার সম্মুখে উপস্থিত হয় এবং তার নিকট থেকে তা ক্রয় করে নেয়। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা জানতে تُلقي الرُكْبَانِ পরিভাষা দ্রষ্টব্য।
অপর এক বর্জনীয় কর্ম হলো, মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করা। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে : جَالِبُ مَرْزُوقٌ ، وَالْمُحْتَكِرُ مَلْعُونُ "আমদানীকারক বা সরবরাহকারী জীবিকাপ্রাপ্ত হয় এবং মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মজুদকারী হয় অভিশপ্ত।”
অন্য হাদীসে এসেছে: لَا يَحْتَكِرُ إِلَّا خَاطِى "অপরাধী ব্যতীত কেউ মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করে না" অর্থাৎ যে এরূপ করে সে অপরাধী। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে إحْتِكارُ শিরোনাম দ্রষ্টব্য।
এমনিভাবে অপর এক বর্জনীয় কাজ হচ্ছে, এক ব্যক্তি দরদাম করা কালে অপর একজন দাম বলা: কোনো পণ্যের মূল্য নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা পারস্পরিক আলোচনা করে এমন পর্যায়ে উভয়ে পৌঁছেছে যে, এখনই ক্রয়-বিক্রয় বাস্তবায়িত হবে, এ অবস্থায় এক ব্যক্তি আসল, যে ঐ পণ্যটি ক্রয় করতে চায়। তখন সে 'প্রথম ব্যক্তির হাত থেকে পণ্যটি নিয়ে পূর্বের দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে তা ক্রয় করা।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শত্রুদের শক্তিশালী করে, তাদের সাথে এমন ব্যবসা করাও নিষিদ্ধ। যেমন: অস্ত্র এবং তার মূল উপাদান লোহা ইত্যাদি বিক্রি করা। শত্রুর সাথে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরের পরেও এরূপ ব্যবসা করা যাবে না, যেহেতু নবী সা. এরূপ ব্যবসা করতে নিষেধ করেছেন। তবে এসব পণ্য ছাড়া যে সব পণ্যের প্রয়োজন মুসলিমদের নেই সে সব পণ্যের ব্যবসা শত্রুদের সাথে করা যাবে।
টিকাঃ
১১. হাদীস: ব্যবসায়ীগণ কিয়ামতের দিন পাপাচারী হিসেবে উত্থিত হবে..... হাদীসটি ইমাম তিরমিযী তার সুনান গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন (খ. ৩, পৃ. ৫০৬, আল-হালাবী প্রকাশ) এই হাদীসের সনদে অজ্ঞতা (جهالة) রয়েছে। (যাহাবী প্রণীত মীযানুল ইতিদাল, খ. ১, পৃ. ২৩৮; আল-হালাবী প্রকাশনা)
১২. হাদীস: আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তিন প্রকার লোকের দিকে তাকাবেন না....। হাদীসটি ইমাম মুসলিম (খ. ১, পৃ. ১০৩, আল-হালাবী প্রকাশনা) তাঁর গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন
১৩. ইবনে মাজা, খ. ২, পৃ. ৭২৮; আল-হালবী প্রকাশিত, ফুয়াদ আব্দুল বাকীর টীকাসহ। আল বুসীরী তার যাওয়ায়িদ গ্রন্থে বলেছেন, এই হাদীসটির সনদে আলী ইবনু যায়দ ইবনু জাদআন নামক এক ব্যক্তি রয়েছে, সে একজন যঈফ (দুর্বল) বর্ণনাকারী
১৪. সহীহ মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৮; আল-হালবী প্রকাশনা
১৫. লিসানুল আরব, سمم : ماده; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২৩সি, মাকতাবাতুর রিয়াদ প্রকাশনা
১৬. ইবনে আবিদীন, খ. ৩, পৃ. ২২৬; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৩