📄 দুই : দেউলিয়া হওয়ার দরুন মেয়াদ বিয়োজন
কেউ দেউলিয়া হওয়ার প্রেক্ষিতে তার সম্পদে তার যথেচ্ছ হস্তক্ষেপে বিচারক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, তার মেয়াদী ঋণগুলো কি তখন মেয়াদহীন হয়ে যায়? হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, এটি শাফেয়ীদের অধিক প্রকাশ্য মত, মালেকী আলেমদের এটি একটি মত, তার মেয়াদী ঋণগুলো নগদপ্রদায়ী হয়ে যায় না। যেহেতু মেয়াদ থাকা দেউলিয়া ব্যক্তির অন্যতম অধিকার। তাই দেউলিয়া হওয়ার কারণে তার এ অধিকার বিনষ্ট হবে না, যেমন অন্য অধিকারগুলো বিনষ্ট হয় না। তা ছাড়া দেউলিয়া হওয়ার কারণে তার মেয়াদী পাওনাগুলো নগদ হয়ে যায় না। তেমনি তার কাছে যাদের পাওনা রয়েছে সেগুলোও নগদ হবে না।
মালেকী মাযহাবের আলেমদের নিকট যা মশহুর, শাফেয়ীদের এটি একটি মত, বিচারক যদি কাউকে দেউলিয়া ঘোষণা করার পর তার পাওনাদারদের জন্যে তার সম্পদ তার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাহলে এই দেউলিয়ার মেয়াদী ঋণগুলো নগদ হয়ে যাবে। যেহেতু এ অবস্থায় দেউলিয়া ব্যক্তি মৃতব্যক্তির মত দায়িত্বশূন্য হয়ে গেছে। তবে যদি ঋণগ্রহীতা নগদ না করার শর্ত করে অথবা সকল পাওনাদার তার ঋণ মেয়াদী থাকাতে একমত হয় তবে তার ঋণ মেয়াদীই থাকবে। দেউলিয়া ব্যক্তি যাদের কাছে মেয়াদী ঋণ পাবে সেগুলো যেমন ছিল তেমনি মেয়াদীই থাকবে, সকল ফকীহ এ কথায় একমত।
টিকাঃ
১৮৬. রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৩১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৩৮
১৮৭. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৬৫; খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ১৭৬
১৮৮. শাফেয়ী আলেমদের পক্ষ থেকে দু'টি মত বর্ণিত হয়েছে। এক. অধিক প্রকাশ্য দেউলিয়া হওয়ার দরুন তার কোনো মেয়াদী ঋণ নগদ পরিশোধযোগ্য হয়ে যাবে না। দুই. অপ্রকাশ্য প্রথমটির বিপরীত, মেয়াদী ঋণ নগদ পরিশোধযোগ্য হয়ে যাবে। মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭
📄 তিন : পাগলামীর দরুন মেয়াদ বাতিল হওয়া
দেনাদার বা পাওনাদার যদি পাগল হয়ে যায় তবে তার ঋণ ও দেনা কি মেয়াদী থাকবে না মেয়াদ বিলুপ্ত হবে? এ প্রশ্নে ফকীহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ঋণী ব্যক্তির পাগল হয়ে যাওয়ার দরুন তার ঋণ নগদ হয়ে যাবে না, যেহেতু মেয়াদ শেষে তার অভিভাবকের নিকট থেকে তা আদায় করা যাবে। তাই মেয়াদ যথারীতি বহাল থাকবে এবং মেয়াদ শেষে অভিভাবকের নিকট চাওয়ার সুযোগও বহাল থাকবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি দেউলিয়া হয়ে গেলে বা মারা গেলে মেয়াদী ঋণ নগদপ্রদায়ী হয়ে যাবে। তবে যদি ঋণীব্যক্তি এ শর্তারোপ করে, মারা গেলে বা দেউলিয়া হলেও তার মেয়াদী ঋণগুলো নগদ হবে না, মেয়াদীই থাকবে, তাহলে তার শর্ত অনুযায়ী সে অবস্থাগুলোতেও ঋণ মেয়াদীই থাকবে। তবে এ মাযহাবের আলেমগণ তাদের এ আলোচনায় ঋণী বা ঋণদাতা পাগল হওয়ার কোনো আলোচনা করেননি। তাতে একথাই বোঝা যায়, পাগল হওয়ার দরুন মেয়াদ বাতিল হয় না, যেমন ছিল তেমনই থাকবে।
টিকাঃ
১৮৯. ইবনে নুজাইম কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৫৭
১৯০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭
১৯১. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৩৮; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫
১৯২. হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২৬৫
📄 চার : বন্দি হওয়া বা লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার দরুন মেয়াদ বাতিল হওয়া
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি শত্রুর দেশে কোনো মুসলিম বন্দি হয়, তার খবরাখবর ও অবস্থান ইত্যাদি যদি জানা যায়, তাহলে তার বিধান হবে অনুপস্থিত লোকের বিধানের অনুরূপ। অনুপস্থিত লোকের যাবতীয় দেনা পাওনা বহাল থাকে, মেয়াদীগুলো থাকে মেয়াদী এবং নগদগুলো নগদ। যদি বন্দির খবরাখবর ও অবস্থান ইত্যাদি জানা না যায়, তাহলে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণের মতে তার বিধান হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির বিধানের অনুরূপ। হারিয়ে যাওয়া লোকের বিধান হচ্ছে, নিজের অধিকারগুলোর ক্ষেত্রে সে জীবিত এবং অন্যের অধিকারের ক্ষেত্রে সে মৃত বলে গণ্য হবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, তার যাবতীয় ঋণ যথাপূর্ব অবস্থায় বহাল থাকবে। যা মেয়াদী তা মেয়াদী, যা নগদ তা নগদই থাকবে। অর্থাৎ বন্দি অবস্থায় অনুপস্থিত লোকের বিধান তার জন্যে কার্যকর হবে, হারিয়ে যাওয়া লোকের বিধান কার্যকর হবে না। যেহেতু বিস্তারিত জানা না থাকলেও সে যে বন্দি হয়ে আছে এতটুকু তো জানাই আছে। যদি বন্দি অবস্থায় কারো মৃত্যুর সংবাদ জানা যায় তাহলে মৃতের বিধান কার্যকর হবে। যদি মুরতাদ হওয়ার খবর পাওয়া যায় তবে মুরতাদের বিধান কার্যকর হবে।
টিকাঃ
১৯৩. আল আসীর
১৯৪. আল মাফকুদ
১৯৫. আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ১০০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ২৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ৪৬৪
১৯৬. ইমাম মালেক রহ. প্রণীত আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা, খ. ১৫, পৃ. ১৩৮; হাত্তাব প্রণীত মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ১৫৬
📄 মেয়াদ শেষ হওয়ায় নগদে অবতরণ
যে কোনো চুক্তিতে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়, তার মেয়াদ যখন শেষ হয় তা আর মেয়াদী থাকে না, নগদ প্রদায়ী হয়ে যায়। মেয়াদ নির্ধারণ না করা হলে যেমনটা হতো এখন তা-ই হবে, যাকে যা বুঝিয়ে দেওয়ার কালক্ষেপণ না করে তা বুঝিয়ে দিতে হবে। ঋণের ক্ষেত্রে তার বদল, সালাম বিক্রির ক্ষেত্রে পণ্য ইত্যাদি। মেয়াদ থাকাকালে কাউকে যে কর্তৃত্ব ও হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হয় তাও এখন আর থাকবে না, সব ধরনের হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো চুক্তিতে মেয়াদ যদি সংযুক্ত থাকে তাহলে চুক্তিটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। কোনো চুক্তিতে যদি শর্ত যুক্ত করা হয়, চুক্তিটি যদি সে ধরনের হয় যেগুলোতে শর্ত যুক্ত হতে পারে, তাহলে তাতে যে শর্ত করা হয়েছে সে শর্ত যখন পাওয়া যাবে তখন থেকে তার মেয়াদের সূচনা ধরা হবে।
টিকাঃ
১৯৭. মেয়াদের বিপরীতে মূল্য নির্ধারণ দ্রষ্টব্য
১৯৮. মাওসিলী প্রণীত আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ২২৪; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫২৮; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ২১৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৬৭ ও খ. ৪, পৃ. ২২৩; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ৬৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৫৬; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ২১০; খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ২৮৯
১৯৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৪, পৃ. ২২৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২০৭; শিরাযী প্রণীত আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৪১; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ৯৮; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৪, পৃ. ৭৯