📄 মেয়াদে বিয়োজন হওয়া
ফকীহগণ বিভিন্ন কারণ নিয়ে আলোচনা করেছেন, এ কারণ গুলোর কোনো একটি প্রতিপন্ন হলেই মেয়াদে বিয়োজন ঘটবে, মেয়াদ আর থাকবে না। যেমন মৃত্যু, নিঃস্ব ও দেওলিয়া হওয়া, পাগল হওয়া ইত্যাদি। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।
📄 এক : মৃত্যুর দরুন মেয়াদ বিলুপ্তি
ফকীহগণ এ মাসআলায় মতপার্থক্য করেছেন, ঋণী বা ঋণগ্রস্তের মৃত্যুর দরুন মেয়াদ বিলুপ্ত হবে কি না। হানাফী ও শাফেয়ী আলেমদের অভিমত হচ্ছে, ঋণী ব্যক্তি মারা গেলে তার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বর্জিত হবে। কিন্তু ঋণদাতা মারা যাওয়ার দরুন মেয়াদে কোনো তারতম্য হবে না। ঋণী ব্যক্তির যেহেতু ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব বিলুপ্ত হয়েছে, তাই মেয়াদেরও অবলুপ্তি ঘটবে। মৃত্যুর আলোচনায় ফকীহগণ মৃত্যুকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন। এক. স্বাভাবিক মৃত্যু এবং দুই. বিধানগত মৃত্যু। অর্থাৎ জীবিত থাকলেও মৃত ব্যক্তির সমতুল্য হওয়া। যেমন মুরতাদ হয়ে দারুল হরবে চলে যাওয়া, এটি হানাফী আলেমদের মতে। মুরতাদ হওয়ার পরপর মারা যাওয়া বা হারবী লোকের গোলাম হওয়া, এগুলো শাফেয়ী আলেমদের মতে।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি মারা যাওয়ার সাথে সাথে ঋণের মেয়াদ লুপ্ত হওয়ার কারণ বর্ণনা করে উলামায়ে কেরাম বলেন, মেয়াদ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করার অন্যতম উদ্দেশ্য, মাল যা কেনা হয়েছে তা নিয়ে ব্যবসা করে লাভ অর্জন করা এবং তার দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা। ঋণী ব্যক্তি মারা গেলে তার যেহেতু আর সে মাল নিয়ে ব্যবসা করা হবে না, সুতরাং তাতে আর মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বরং নিয়ম হচ্ছে, কেউ মারা গেলে তার সম্পদ থেকে বণ্টনের পূর্বে ঋণ আদায় করতে হয়। তাই তার সম্পদ থেকে নগদ ঋণ পরিশোধ করা হবে, মেয়াদের কোনো প্রয়োজন হবে না।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ হানাফী আযহাবের আলেমদের অনুরূপ বক্তব্য প্রদান করেছেন। তবে তারা তিনটি ক্ষেত্র তার ব্যতিক্রম বলে গণ্য করেন। একটি মাসআলা প্রসিদ্ধ হয়ে প্রচলিত। তা হলো: যদি কতক পাওনাদার তাদের ঋণ মেয়াদী থাকার কথা জানায় তা কবুল করা হবে না। কিন্তু যদি সকল পাওনাদারই এ কথা বলে তবে তাদের কথা মত ঋণ মেয়াদীই থাকবে। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে তার মেয়াদী ঋণ মেয়াদীই থাকবে। এবং যদি ঋণদাতা এই মর্মে শর্ত প্রদান করে, তার মৃত্যু হলে ঋণ আর মেয়াদী থাকবে না, তাহলে তার এ শর্ত অনুযায়ী ফয়সালা হবে কি-না, এ প্রশ্নে অধিকাংশ আলেম বলেছেন, বাহ্যিকভাবে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, তার শর্ত অনুযায়ী ফয়সালা হবে, যদি শর্তটি মূল লেনদেনের অংশ না হয়।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ঋণদাতা মারা যাওয়ার দরুন মেয়াদী ঋণ বা দেনার মেয়াদ বিনষ্ট হবে না। ঋণগ্রহীতার মৃত্যু হলে কী ফয়সালা তা নিয়ে ফকীহগণ দুটো মত বর্ণনা করেছেন: এক. ঋণী ব্যক্তির মৃত্যু হলে মেয়াদী ঋণ আর মেয়াদী থাকবে না। দুই. ঋণী ব্যক্তি মারা গেলেই তার ঋণের মেয়াদ বাতিল হবে না, যদি তার উত্তরাধিকারীরা তা আদায়ে দৃঢ় অঙ্গীকার প্রদান করে। অথবা উত্তরাধিকারী ভিন্ন অন্য কেউ বন্ধক রাখার ভিত্তিতে বা পূর্ণ জিম্মাদার হওয়ার প্রেক্ষিতে ঋণ আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এটি ইবনে সীরীন, উবায়দুল্লাহ ইবনে হাসান, ইসহাক ও আবু উবায়দ-এর অভিমত। তাঁরা এই অভিমত প্রদান করেন, যেহেতু মেয়াদ থাকাটা মৃতের অধিকার। তার অন্য সকল অধিকারে যেমন উত্তরাধিকারীদের উত্তরাধিকার কার্যকর হয়েছে, এ মেয়াদী ঋণের মেয়াদেও তা কার্যকর হবে।
টিকাঃ
১৭৪. ইবনে নুজাইম কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৫৭
১৭৫. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩২৭; সুয়ূতী প্রণীত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭ ও ২০৮
১৭৬. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২১৩
১৭৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ২১৩
১৭৮. খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ১৭৬; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৬৫
১৭৯. তাদের অপ্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, দেউলিয়া হওয়ায় বা ঋণী ব্যক্তি মারা যাওয়ার দরুন তার মেয়াদী দেনা নগদ হয়ে যাবে না।
১৮০. সূরা নিসা, আয়াত ১২
১৮১. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৩৮; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫
১৮২. বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযী যে ভাষায় বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন তা হলো مَنْ تَرَكَ مَالًا فَلَوَرَثَته وَمَنْ تَرَكَ كَلَّا فَإِلَيْنَا
১৮৩. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৬
১৮৪. প্রাগুক্ত; মালেকী মাযহাবের আলেমদের অপর একটি মত হানাফী আলেমদের মতের অনুরূপ।
📄 দুই : দেউলিয়া হওয়ার দরুন মেয়াদ বিয়োজন
কেউ দেউলিয়া হওয়ার প্রেক্ষিতে তার সম্পদে তার যথেচ্ছ হস্তক্ষেপে বিচারক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, তার মেয়াদী ঋণগুলো কি তখন মেয়াদহীন হয়ে যায়? হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, এটি শাফেয়ীদের অধিক প্রকাশ্য মত, মালেকী আলেমদের এটি একটি মত, তার মেয়াদী ঋণগুলো নগদপ্রদায়ী হয়ে যায় না। যেহেতু মেয়াদ থাকা দেউলিয়া ব্যক্তির অন্যতম অধিকার। তাই দেউলিয়া হওয়ার কারণে তার এ অধিকার বিনষ্ট হবে না, যেমন অন্য অধিকারগুলো বিনষ্ট হয় না। তা ছাড়া দেউলিয়া হওয়ার কারণে তার মেয়াদী পাওনাগুলো নগদ হয়ে যায় না। তেমনি তার কাছে যাদের পাওনা রয়েছে সেগুলোও নগদ হবে না।
মালেকী মাযহাবের আলেমদের নিকট যা মশহুর, শাফেয়ীদের এটি একটি মত, বিচারক যদি কাউকে দেউলিয়া ঘোষণা করার পর তার পাওনাদারদের জন্যে তার সম্পদ তার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাহলে এই দেউলিয়ার মেয়াদী ঋণগুলো নগদ হয়ে যাবে। যেহেতু এ অবস্থায় দেউলিয়া ব্যক্তি মৃতব্যক্তির মত দায়িত্বশূন্য হয়ে গেছে। তবে যদি ঋণগ্রহীতা নগদ না করার শর্ত করে অথবা সকল পাওনাদার তার ঋণ মেয়াদী থাকাতে একমত হয় তবে তার ঋণ মেয়াদীই থাকবে। দেউলিয়া ব্যক্তি যাদের কাছে মেয়াদী ঋণ পাবে সেগুলো যেমন ছিল তেমনি মেয়াদীই থাকবে, সকল ফকীহ এ কথায় একমত।
টিকাঃ
১৮৬. রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৩১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৩৮
১৮৭. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৬৫; খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ১৭৬
১৮৮. শাফেয়ী আলেমদের পক্ষ থেকে দু'টি মত বর্ণিত হয়েছে। এক. অধিক প্রকাশ্য দেউলিয়া হওয়ার দরুন তার কোনো মেয়াদী ঋণ নগদ পরিশোধযোগ্য হয়ে যাবে না। দুই. অপ্রকাশ্য প্রথমটির বিপরীত, মেয়াদী ঋণ নগদ পরিশোধযোগ্য হয়ে যাবে। মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭
📄 তিন : পাগলামীর দরুন মেয়াদ বাতিল হওয়া
দেনাদার বা পাওনাদার যদি পাগল হয়ে যায় তবে তার ঋণ ও দেনা কি মেয়াদী থাকবে না মেয়াদ বিলুপ্ত হবে? এ প্রশ্নে ফকীহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ঋণী ব্যক্তির পাগল হয়ে যাওয়ার দরুন তার ঋণ নগদ হয়ে যাবে না, যেহেতু মেয়াদ শেষে তার অভিভাবকের নিকট থেকে তা আদায় করা যাবে। তাই মেয়াদ যথারীতি বহাল থাকবে এবং মেয়াদ শেষে অভিভাবকের নিকট চাওয়ার সুযোগও বহাল থাকবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি দেউলিয়া হয়ে গেলে বা মারা গেলে মেয়াদী ঋণ নগদপ্রদায়ী হয়ে যাবে। তবে যদি ঋণীব্যক্তি এ শর্তারোপ করে, মারা গেলে বা দেউলিয়া হলেও তার মেয়াদী ঋণগুলো নগদ হবে না, মেয়াদীই থাকবে, তাহলে তার শর্ত অনুযায়ী সে অবস্থাগুলোতেও ঋণ মেয়াদীই থাকবে। তবে এ মাযহাবের আলেমগণ তাদের এ আলোচনায় ঋণী বা ঋণদাতা পাগল হওয়ার কোনো আলোচনা করেননি। তাতে একথাই বোঝা যায়, পাগল হওয়ার দরুন মেয়াদ বাতিল হয় না, যেমন ছিল তেমনই থাকবে।
টিকাঃ
১৮৯. ইবনে নুজাইম কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৫৭
১৯০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭
১৯১. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৩৮; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫
১৯২. হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২৬৫