📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দুই : ঋণদাতার পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজন

📄 দুই : ঋণদাতার পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজন


পূর্ববর্তী আলোচনায় এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ঋণী ও দেনাদার ব্যক্তির স্বার্থে, তার এটি এক অধিকার। যেহেতু এটি তার অধিকার, তাই এককভাবে এই মেয়াদ বিয়োজনের অধিকার ও ক্ষমতাও তার, যদি তা ঋণদাতা ও পাওনাদারের কোনো ক্ষতি না করে। কিন্তু ঋণদাতা যদি মেয়াদ বাদ দিতে চায়, সেক্ষেত্রে দেখতে হবে মেয়াদটি কোন্ প্রকার? যদি মেয়াদটি চুক্তি সম্পাদনকালেই সংযুক্ত হয়, যেমন বিক্রি করার সময়ই মূল্য পরে পরিশোধ করার আলোচনা হয়, তাহলে এ অবস্থায় ঋণদাতা ও বিক্রেতার জন্যে এ মেয়াদ বহাল রাখা অপরিহার্য। এ কথায় সকল আলেম ও ফকীহ একমত।

মেয়াদের অন্য একটি প্রকার হচ্ছে নগদ লেনদেনের চুক্তি সম্পাদনের পর দেনাদার ও পাওনাদার উভয়ে মিলে সমঝোতা করে মেয়াদ নির্ধারণ করা। এ প্রকারটির বিধান নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতান্তর রয়েছে।

যুফার রহ. ব্যতীত হানাফী মাযহাবের সকল আলেম এবং মালেকী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, কেউ যদি নগদ মূল্যে বিক্রয় করার পর এটিকে জানা মেয়াদের দ্বারা মেয়াদী বানিয়ে দেয় তাহলে মূল্যটি (সর্বশেষ এ ইচ্ছার দরুন) মেয়াদী হয়ে যায় এবং তা বিক্রি কালেই পণ্যের মূল্য বিলম্বিত রাখার তুল্য হয়ে যায়। ফলে এই মেয়াদ বহাল রাখা বিক্রেতার জন্যে আবশ্যক হয়ে যায়। তাই ক্রেতা ও দেনাদারের সন্তুষ্টি ব্যতীত সে একা এ মেয়াদ প্রত্যাহার করতে পারবে না।

যুফার রহ. এবং শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এ বিষয়ে বক্তব্য হচ্ছে, যে পাওনা থাকে নগদ তাতে পরে মেয়াদ নির্ধারণ করা হলে তা মেয়াদী হয়ে যাবে না। যেহেতু এটি নগদ দেনা, একথা স্থির হওয়ার পর তাতে মেয়াদ নির্ধারণ করার অর্থ হচ্ছে, নগদ আদায় না করে তা বিলম্ব করে আদায় করার অঙ্গীকার করা। যেহেতু এটি নিছক অঙ্গীকার, শর্ত নয়; তাই তা থেকে সরে যাওয়ার অবকাশ রয়েছে। ঋণের ক্ষেত্রেও মেয়াদ পালন করা জরুরি নয়—এটি অধিকাংশ ফকীহের মত। তবে মালেকী মাযহাবের আলেমগণ ও লায়ছ এক্ষেত্রে মেয়াদ মেনে চলা জরুরি বলে মতপ্রদান করেছেন।

টিকাঃ
১৭১. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১৪৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪
১৭২. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৫; আল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ২৬২; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৬০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তিন : ঋণদাতা ও ঋণগ্রস্ত উভয়ের সম্মতিতে মেয়াদ প্রত্যাহার

📄 তিন : ঋণদাতা ও ঋণগ্রস্ত উভয়ের সম্মতিতে মেয়াদ প্রত্যাহার


এ বিষয়ে সকল ফকীহ একমত, ঋণদাতা ও ঋণী ব্যক্তি উভয়ের সম্মতিতে মেয়াদ প্রত্যাহার করা হলে তা জায়েয ও বৈধ হবে।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মেয়াদে বিয়োজন হওয়া

📄 মেয়াদে বিয়োজন হওয়া


ফকীহগণ বিভিন্ন কারণ নিয়ে আলোচনা করেছেন, এ কারণ গুলোর কোনো একটি প্রতিপন্ন হলেই মেয়াদে বিয়োজন ঘটবে, মেয়াদ আর থাকবে না। যেমন মৃত্যু, নিঃস্ব ও দেওলিয়া হওয়া, পাগল হওয়া ইত্যাদি। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 এক : মৃত্যুর দরুন মেয়াদ বিলুপ্তি

📄 এক : মৃত্যুর দরুন মেয়াদ বিলুপ্তি


ফকীহগণ এ মাসআলায় মতপার্থক্য করেছেন, ঋণী বা ঋণগ্রস্তের মৃত্যুর দরুন মেয়াদ বিলুপ্ত হবে কি না। হানাফী ও শাফেয়ী আলেমদের অভিমত হচ্ছে, ঋণী ব্যক্তি মারা গেলে তার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বর্জিত হবে। কিন্তু ঋণদাতা মারা যাওয়ার দরুন মেয়াদে কোনো তারতম্য হবে না। ঋণী ব্যক্তির যেহেতু ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব বিলুপ্ত হয়েছে, তাই মেয়াদেরও অবলুপ্তি ঘটবে। মৃত্যুর আলোচনায় ফকীহগণ মৃত্যুকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন। এক. স্বাভাবিক মৃত্যু এবং দুই. বিধানগত মৃত্যু। অর্থাৎ জীবিত থাকলেও মৃত ব্যক্তির সমতুল্য হওয়া। যেমন মুরতাদ হয়ে দারুল হরবে চলে যাওয়া, এটি হানাফী আলেমদের মতে। মুরতাদ হওয়ার পরপর মারা যাওয়া বা হারবী লোকের গোলাম হওয়া, এগুলো শাফেয়ী আলেমদের মতে।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি মারা যাওয়ার সাথে সাথে ঋণের মেয়াদ লুপ্ত হওয়ার কারণ বর্ণনা করে উলামায়ে কেরাম বলেন, মেয়াদ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করার অন্যতম উদ্দেশ্য, মাল যা কেনা হয়েছে তা নিয়ে ব্যবসা করে লাভ অর্জন করা এবং তার দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা। ঋণী ব্যক্তি মারা গেলে তার যেহেতু আর সে মাল নিয়ে ব্যবসা করা হবে না, সুতরাং তাতে আর মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বরং নিয়ম হচ্ছে, কেউ মারা গেলে তার সম্পদ থেকে বণ্টনের পূর্বে ঋণ আদায় করতে হয়। তাই তার সম্পদ থেকে নগদ ঋণ পরিশোধ করা হবে, মেয়াদের কোনো প্রয়োজন হবে না।

মালেকী মাযহাবের আলেমগণ হানাফী আযহাবের আলেমদের অনুরূপ বক্তব্য প্রদান করেছেন। তবে তারা তিনটি ক্ষেত্র তার ব্যতিক্রম বলে গণ্য করেন। একটি মাসআলা প্রসিদ্ধ হয়ে প্রচলিত। তা হলো: যদি কতক পাওনাদার তাদের ঋণ মেয়াদী থাকার কথা জানায় তা কবুল করা হবে না। কিন্তু যদি সকল পাওনাদারই এ কথা বলে তবে তাদের কথা মত ঋণ মেয়াদীই থাকবে। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে তার মেয়াদী ঋণ মেয়াদীই থাকবে। এবং যদি ঋণদাতা এই মর্মে শর্ত প্রদান করে, তার মৃত্যু হলে ঋণ আর মেয়াদী থাকবে না, তাহলে তার এ শর্ত অনুযায়ী ফয়সালা হবে কি-না, এ প্রশ্নে অধিকাংশ আলেম বলেছেন, বাহ্যিকভাবে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, তার শর্ত অনুযায়ী ফয়সালা হবে, যদি শর্তটি মূল লেনদেনের অংশ না হয়।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ঋণদাতা মারা যাওয়ার দরুন মেয়াদী ঋণ বা দেনার মেয়াদ বিনষ্ট হবে না। ঋণগ্রহীতার মৃত্যু হলে কী ফয়সালা তা নিয়ে ফকীহগণ দুটো মত বর্ণনা করেছেন: এক. ঋণী ব্যক্তির মৃত্যু হলে মেয়াদী ঋণ আর মেয়াদী থাকবে না। দুই. ঋণী ব্যক্তি মারা গেলেই তার ঋণের মেয়াদ বাতিল হবে না, যদি তার উত্তরাধিকারীরা তা আদায়ে দৃঢ় অঙ্গীকার প্রদান করে। অথবা উত্তরাধিকারী ভিন্ন অন্য কেউ বন্ধক রাখার ভিত্তিতে বা পূর্ণ জিম্মাদার হওয়ার প্রেক্ষিতে ঋণ আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এটি ইবনে সীরীন, উবায়দুল্লাহ ইবনে হাসান, ইসহাক ও আবু উবায়দ-এর অভিমত। তাঁরা এই অভিমত প্রদান করেন, যেহেতু মেয়াদ থাকাটা মৃতের অধিকার। তার অন্য সকল অধিকারে যেমন উত্তরাধিকারীদের উত্তরাধিকার কার্যকর হয়েছে, এ মেয়াদী ঋণের মেয়াদেও তা কার্যকর হবে।

টিকাঃ
১৭৪. ইবনে নুজাইম কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৫৭
১৭৫. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩২৭; সুয়ূতী প্রণীত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৪৭ ও ২০৮
১৭৬. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২১৩
১৭৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ২১৩
১৭৮. খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ১৭৬; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৬৫
১৭৯. তাদের অপ্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, দেউলিয়া হওয়ায় বা ঋণী ব্যক্তি মারা যাওয়ার দরুন তার মেয়াদী দেনা নগদ হয়ে যাবে না।
১৮০. সূরা নিসা, আয়াত ১২
১৮১. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪৩৮; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৫
১৮২. বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযী যে ভাষায় বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন তা হলো مَنْ تَرَكَ مَالًا فَلَوَرَثَته وَمَنْ تَرَكَ كَلَّا فَإِلَيْنَا
১৮৩. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৮৬
১৮৪. প্রাগুক্ত; মালেকী মাযহাবের আলেমদের অপর একটি মত হানাফী আলেমদের মতের অনুরূপ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00