📄 যে সকল কারণে মেয়াদ বর্জিত হয়
মেয়াদ কখনো হয় সম্বন্ধিত, যার বাস্তবায়নের সাথে বিভিন্ন কাজের বিধি-বিধান বিন্যস্ত থাকে। মেয়াদের বাস্তব অস্তিত্বের সাথে সাথে সে সকল বিধান বাস্তবায়িত হয়। মেয়াদ যে সব কারণে বাদ পড়ে সেগুলো ব্যাপক দৃষ্টিতে দু প্রকার: এক. কখনো মেয়াদ বিয়োজন করা হয়, দুই. কখনো মেয়াদে বিয়োজন ঘটে।
📄 মেয়াদ বিয়োজন করা
এক. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজনঃ
যেহেতু মেয়াদ ও সময় প্রদান শরীয়তসম্মত করা হয়েছে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করতে, তাই ঋণী ব্যক্তি যদি এখন পরিশোধে সক্ষম হয় তবে তার জন্যে যা করণীয় তা হচ্ছে, মেয়াদ বিয়োজন করে ঋণ বা দেনাটা নগদ পরিশোধ করা এবং ঋণদাতার কর্তব্য হচ্ছে তা কজা করা। উপরিউক্ত রায় সকল ফকীহ ও আলেমের। তবে তারা বলেন, এক্ষেত্রে দেখতে হবে তাতে ঋণদাতার কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা। যেমন, ঋণী ব্যক্তি কোনো ভীতিকর স্থানে ঋণটা পরিশোধ করছে অথবা এমন জায়গায় যেখান থেকে ঋণদাতাকে কষ্ট করে তা নিয়ে আসতে হবে।
দুই, ঋণদাতার পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজনঃ
মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ঋণী ও দেনাদার ব্যক্তির স্বার্থে, তার এটি এক অধিকার। যেহেতু এটি তার অধিকার, তাই এককভাবে এই মেয়াদ বিয়োজনের অধিকার ও ক্ষমতাও তার। কিন্তু ঋণদাতা যদি মেয়াদ বাদ দিতে চায়, সেক্ষেত্রে দেখতে হবে মেয়াদটি কোন্ প্রকার? যদি মেয়াদটি চুক্তি সম্পাদনকালেই সংযুক্ত হয়, তবে এ অবস্থায় ঋণদাতা ও বিক্রেতার জন্যে এ মেয়াদ বহাল রাখা অপরিহার্য। হানাফী ও মালেকী আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, কেউ যদি নগদ মূল্যে বিক্রয় করার পর এটিকে জানা মেয়াদের দ্বারা মেয়াদী বানিয়ে দেয় তাহলে মূল্যটি মেয়াদী হয়ে যায়। ফলে এই মেয়াদ বহাল রাখা বিক্রেতার জন্যে আবশ্যক হয়ে যায়। তাই ক্রেতা ও দেনাদারের সন্তুষ্টি ব্যতীত সে একা এ মেয়াদ প্রত্যাহার করতে পারবে না।
তিন, ঋণদাতা ও ঋণগ্রস্ত উভয়ের সম্মতিতে মেয়াদ প্রত্যাহারঃ
এ বিষয়ে সকল ফকীহ একমত, ঋণদাতা ও ঋণী ব্যক্তি উভয়ের সম্মতিতে মেয়াদ প্রত্যাহার করা হলে তা জায়েয ও বৈধ হবে।
টিকাঃ
১৭০. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২২৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৭; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০১; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৪৬
১৭১. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১৪৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪
১৭২. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৫; আল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ২৬২; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৬০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬
📄 এক : ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজন
যেহেতু মেয়াদ ও সময় প্রদান শরীয়তসম্মত করা হয়েছে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করতে, তাকে সময় ও সুযোগমত কোনো ধরনের কষ্ট ও ঝামেলার শিকার না হয়ে দেনা পরিশোধের ক্ষমতা প্রদানের উদ্দেশ্যে, এই মুহূর্তে তার যে অসচ্ছলতা বিদ্যমান তা বিবেচনা করে। তাই ঋণী ব্যক্তি যদি এখন পরিশোধে সক্ষম হয় তবে তার জন্যে যা করণীয় তা হচ্ছে, মেয়াদ বিয়োজন করে ঋণ বা দেনাটা নগদ পরিশোধ করা এবং ঋণদাতার কর্তব্য হচ্ছে তা কজা করা।
উপরিউক্ত রায় সকল ফকীহ ও আলেমের। হানাফী মাযহাবের আলেমগণ শর্তহীনভাবে এই মত ব্যক্ত করেছেন। মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ ও এই মত প্রদান করেছেন। তবে তারা বলেন, এক্ষেত্রে দেখতে হবে তাতে ঋণদাতার কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা। যেমন, ঋণী ব্যক্তি কোনো ভীতিকর স্থানে ঋণটা পরিশোধ করছে অথবা এমন জায়গায় যেখান থেকে ঋণদাতাকে কষ্ট করে তা নিয়ে আসতে হবে অথবা দেনা পরিশোধে সে যে বস্তু দিয়েছে তার এখন বাজারে মন্দা চলছে ইত্যাদি। যদি এমন হয় তাহলে মেয়াদ বাতিল করা যথার্থ হবে না।
টিকাঃ
১৭০. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২২৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৭; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০১; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৪৬
📄 দুই : ঋণদাতার পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজন
পূর্ববর্তী আলোচনায় এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ঋণী ও দেনাদার ব্যক্তির স্বার্থে, তার এটি এক অধিকার। যেহেতু এটি তার অধিকার, তাই এককভাবে এই মেয়াদ বিয়োজনের অধিকার ও ক্ষমতাও তার, যদি তা ঋণদাতা ও পাওনাদারের কোনো ক্ষতি না করে। কিন্তু ঋণদাতা যদি মেয়াদ বাদ দিতে চায়, সেক্ষেত্রে দেখতে হবে মেয়াদটি কোন্ প্রকার? যদি মেয়াদটি চুক্তি সম্পাদনকালেই সংযুক্ত হয়, যেমন বিক্রি করার সময়ই মূল্য পরে পরিশোধ করার আলোচনা হয়, তাহলে এ অবস্থায় ঋণদাতা ও বিক্রেতার জন্যে এ মেয়াদ বহাল রাখা অপরিহার্য। এ কথায় সকল আলেম ও ফকীহ একমত।
মেয়াদের অন্য একটি প্রকার হচ্ছে নগদ লেনদেনের চুক্তি সম্পাদনের পর দেনাদার ও পাওনাদার উভয়ে মিলে সমঝোতা করে মেয়াদ নির্ধারণ করা। এ প্রকারটির বিধান নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতান্তর রয়েছে।
যুফার রহ. ব্যতীত হানাফী মাযহাবের সকল আলেম এবং মালেকী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, কেউ যদি নগদ মূল্যে বিক্রয় করার পর এটিকে জানা মেয়াদের দ্বারা মেয়াদী বানিয়ে দেয় তাহলে মূল্যটি (সর্বশেষ এ ইচ্ছার দরুন) মেয়াদী হয়ে যায় এবং তা বিক্রি কালেই পণ্যের মূল্য বিলম্বিত রাখার তুল্য হয়ে যায়। ফলে এই মেয়াদ বহাল রাখা বিক্রেতার জন্যে আবশ্যক হয়ে যায়। তাই ক্রেতা ও দেনাদারের সন্তুষ্টি ব্যতীত সে একা এ মেয়াদ প্রত্যাহার করতে পারবে না।
যুফার রহ. এবং শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এ বিষয়ে বক্তব্য হচ্ছে, যে পাওনা থাকে নগদ তাতে পরে মেয়াদ নির্ধারণ করা হলে তা মেয়াদী হয়ে যাবে না। যেহেতু এটি নগদ দেনা, একথা স্থির হওয়ার পর তাতে মেয়াদ নির্ধারণ করার অর্থ হচ্ছে, নগদ আদায় না করে তা বিলম্ব করে আদায় করার অঙ্গীকার করা। যেহেতু এটি নিছক অঙ্গীকার, শর্ত নয়; তাই তা থেকে সরে যাওয়ার অবকাশ রয়েছে। ঋণের ক্ষেত্রেও মেয়াদ পালন করা জরুরি নয়—এটি অধিকাংশ ফকীহের মত। তবে মালেকী মাযহাবের আলেমগণ ও লায়ছ এক্ষেত্রে মেয়াদ মেনে চলা জরুরি বলে মতপ্রদান করেছেন।
টিকাঃ
১৭১. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১৪৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪
১৭২. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৫; আল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ২৬২; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৬০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬