📄 মেয়াদের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক
যদি মেয়াদের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক হয়, যেমন বিক্রেতা বলল, আমি তোমার নিকট এটি বিক্রি করেছি এক মাস সময়ে মূল্য পরিশোধ করার শর্তে। ক্রেতা দাবি করল আরো বেশি সময়ের, তাহলে ফয়সালা কী হবে, তা নিয়ে ফকীহগণ বিভিন্ন মত বর্ণনা করেছেন:
হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, যে কম সময় দাবি করবে তার কথা গ্রহণ করা হবে, যেহেতু সে আধিক্য অস্বীকার করছে। আধিক্য অস্বীকারকারী হচ্ছে বিক্রেতা। তার অস্বীকৃতি প্রদানের পর ক্রেতাকে তার দাবির পক্ষে দলিল দিতে বলা হবে। যদি সে তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিক্রেতার কসম খাওয়ার পালা।
মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলীদের এক বর্ণনায় উভয়ে শপথ করবে। উভয়ে কসম খাওয়ার পর মালেকী মাযহাবের আলেমদের মতে, বিক্রয়চুক্তি ভেঙ্গে যাবে, যদি পণ্যটি এখনো উপস্থিত থাকে। শাফেয়ী আলেমদের অভিমত হচ্ছে, যদি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে কসম খায়, তাহলে শুধু উভয়ের কসম খাওয়ার দরুন বিক্রয় চুক্তিটি ভেঙ্গে যাবে না; এটিই তাদের বিশুদ্ধ মত। বরং তাদের একের কথা অন্যে মেনে নিলে ঝগড়া নিষ্পত্তি হয়ে গেলে বিক্রি বহাল থাকবে। আর যদি কারো কথা কেউ না মানে, ঝগড়া যথারীতি বহাল থাকে তাহলে হয় উভয়েই বিক্রি বাতিল করে দেবে অথবা দুজনের কোনো একজন অথবা বিচারক বিক্রি বাতিলের ফয়সালা দেবেন।
টিকাঃ
১৬৫. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৩৮
১৬৬. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ১৮৯
১৬৭. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৯৬
📄 মেয়াদের শেষ সময় এবং তা অতিক্রান্ত হওয়া নিয়ে বিতর্ক
যদি ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ে বিক্রি মেয়াদী হওয়ায় একমত হলেও, সে মেয়াদ কি এখনো রয়েছে না অতিক্রান্ত হয়েছে তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে, যেমন বিক্রেতা বলল, আমি এটি তোমার কাছে বিক্রি করেছি, তার মূল্য নগদ না হয়ে বাকী ছিল, সময় নেওয়া হয়েছিল এক মাস, তার শুরু হলো রমযানের শুরু এবং রমাজান অতিক্রান্ত হয়েছে। ক্রেতা বলল, মেয়াদের শুরু হচ্ছে রমযানের মাঝামাঝি সময়, সুতরাং শেষ হবে শাওয়ালের মাঝামাঝি সময়ে।
হানাফী আলেমদের মত হচ্ছে, এখানে ক্রেতার দাবি গৃহীত হবে, তাই তাকে তার দাবির সপক্ষে দলিল প্রদান করতে বলা হবে। যেহেতু ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে বেচাকেনা নগদ না হয়ে বাকীতে হওয়ার কথায় একমত হয়েছে, এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে ধর্তব্য হবে যে, মেয়াদ এখনো বাকী রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ক্রেতা যখন মেয়াদ বাকী থাকার কথাই বলবে, তার কথাই শোনা হবে। যদি উভয়ে দলিল উপস্থাপন করে তবে সেক্ষেত্রেও ক্রেতার দলিলটিকেই অগ্রগণ্য বিবেচনা করা হবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার কথা যে অস্বীকার করবে তার কথা শপথসহ গ্রহণ করা হবে। যেহেতু মেয়াদ এখনো বহাল থাকাই হচ্ছে স্বাভাবিক অবস্থা। আর তাই যে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা অস্বীকার করে মেয়াদ থাকার কথা বলবে, তার কথা গ্রহণ করা হবে। এটি তখন যখন কেউ কোনো দলিল আনতে না পারবে। যদি কেউ দলিল আনতে পারে তবে অবশ্যই দলিল অনুযায়ী ফয়সালা করা হবে।
টিকাঃ
১৬৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪ ও ৪৪৯; আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ১৫
১৬৯. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ১৯১; খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ১০৮; সাভী প্রণীত বুলগাতুস সালিক লি আকরাবিল মাসালিক, খ. ২, পৃ. ৮১
📄 যে সকল কারণে মেয়াদ বর্জিত হয়
মেয়াদ কখনো হয় সম্বন্ধিত, যার বাস্তবায়নের সাথে বিভিন্ন কাজের বিধি-বিধান বিন্যস্ত থাকে। মেয়াদের বাস্তব অস্তিত্বের সাথে সাথে সে সকল বিধান বাস্তবায়িত হয়। মেয়াদ যে সব কারণে বাদ পড়ে সেগুলো ব্যাপক দৃষ্টিতে দু প্রকার: এক. কখনো মেয়াদ বিয়োজন করা হয়, দুই. কখনো মেয়াদে বিয়োজন ঘটে।
📄 মেয়াদ বিয়োজন করা
এক. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজনঃ
যেহেতু মেয়াদ ও সময় প্রদান শরীয়তসম্মত করা হয়েছে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করতে, তাই ঋণী ব্যক্তি যদি এখন পরিশোধে সক্ষম হয় তবে তার জন্যে যা করণীয় তা হচ্ছে, মেয়াদ বিয়োজন করে ঋণ বা দেনাটা নগদ পরিশোধ করা এবং ঋণদাতার কর্তব্য হচ্ছে তা কজা করা। উপরিউক্ত রায় সকল ফকীহ ও আলেমের। তবে তারা বলেন, এক্ষেত্রে দেখতে হবে তাতে ঋণদাতার কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা। যেমন, ঋণী ব্যক্তি কোনো ভীতিকর স্থানে ঋণটা পরিশোধ করছে অথবা এমন জায়গায় যেখান থেকে ঋণদাতাকে কষ্ট করে তা নিয়ে আসতে হবে।
দুই, ঋণদাতার পক্ষ থেকে মেয়াদ বিয়োজনঃ
মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ঋণী ও দেনাদার ব্যক্তির স্বার্থে, তার এটি এক অধিকার। যেহেতু এটি তার অধিকার, তাই এককভাবে এই মেয়াদ বিয়োজনের অধিকার ও ক্ষমতাও তার। কিন্তু ঋণদাতা যদি মেয়াদ বাদ দিতে চায়, সেক্ষেত্রে দেখতে হবে মেয়াদটি কোন্ প্রকার? যদি মেয়াদটি চুক্তি সম্পাদনকালেই সংযুক্ত হয়, তবে এ অবস্থায় ঋণদাতা ও বিক্রেতার জন্যে এ মেয়াদ বহাল রাখা অপরিহার্য। হানাফী ও মালেকী আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, কেউ যদি নগদ মূল্যে বিক্রয় করার পর এটিকে জানা মেয়াদের দ্বারা মেয়াদী বানিয়ে দেয় তাহলে মূল্যটি মেয়াদী হয়ে যায়। ফলে এই মেয়াদ বহাল রাখা বিক্রেতার জন্যে আবশ্যক হয়ে যায়। তাই ক্রেতা ও দেনাদারের সন্তুষ্টি ব্যতীত সে একা এ মেয়াদ প্রত্যাহার করতে পারবে না।
তিন, ঋণদাতা ও ঋণগ্রস্ত উভয়ের সম্মতিতে মেয়াদ প্রত্যাহারঃ
এ বিষয়ে সকল ফকীহ একমত, ঋণদাতা ও ঋণী ব্যক্তি উভয়ের সম্মতিতে মেয়াদ প্রত্যাহার করা হলে তা জায়েয ও বৈধ হবে।
টিকাঃ
১৭০. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২২৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৭; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০১; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৪৬
১৭১. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১৪৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪
১৭২. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৫; আল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ২৬২; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৬০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৬