📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মেয়াদের বিপরীতে মূল্য নির্ধারণ

📄 মেয়াদের বিপরীতে মূল্য নির্ধারণ


মেয়াদের বিপরীতে মূল্য নির্ধারণের বেশ কতক অবস্থা রয়েছে, যেগুলো ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে:

প্রথম অবস্থা : বিক্রির প্রস্তাব (ঈজাব) করার সময় একই সাথে দুটো লেনদেনের প্রস্তাব করা হবে। বলা হবে, এটি নগদ নিলে দশ দিরহাম, বাকিতে নিলে পনের দিরহাম। এভাবে একই প্রস্তাবনায় দুটো লেনদেনের প্রস্তাব করা হলো, একটি নগদ এবং অপরটি বাকিতে।

অধিকাংশ ফকীহ ও আলেমের মতে, এভাবে যখন বলা হবে তখন এ বিক্রি সহীহ হবে না। যেহেতু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বিক্রির আওতায় দুই বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।

আশ-শারহুল কাবীর নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে, বিক্রেতার এ কথাটির এ ব্যাখ্যাই করেছেন ইমাম মালেক, সুফিয়ান ছাওরী ও ইসহাক। অধিকাংশ ফকীহ ও আলেম এ কথাই বলেছেন। বিক্রেতার এভাবে বলার দ্বারা এটা সুস্পষ্ট, কোনো এক বিক্রি ও লেনদেনে সে অটল নয়, সে দ্বিধাগ্রস্ত। তার এ প্রস্তাব যেন এরূপ বলা, আমি তোমার নিকট এ দুটোর একটি বিক্রি করছি। তাতে যেমন পণ্য সুনির্দিষ্ট নয়, ফলে বিক্রি সংঘটিত হবে না, আলোচিত মাসআলাতেও বিক্রি সম্পন্ন হবে না। সেই সাথে এটিও লক্ষণীয়, মূল্য স্থির নয়, তাই এটি হলো অজানা চিহ্নের ভিত্তিতে বিক্রির ন্যায়।

তাউস, হাকাম ও হাম্মাদ বলেছেন, বিক্রেতার এভাবে বলা, আমি তোমার নিকট নগদ এত মূল্যে বিক্রি করছি, বাকি হলে এত মূল্যে বিক্রি করছি। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। ক্রেতা এ দুটোর কোনো একটি গ্রহণ করবে, সে হিসাবে বিক্রেতাও সেটি বাস্তবায়ন করবে। বিক্রেতা যখন প্রস্তাব দেবে তা হতে হবে নিশ্চিত ভাষায় ও ভঙ্গিতে। সে যখন বলবে, নগদ হলে দশ টাকা এবং বাকিতে নিলে পনের টাকা, তাতে বোঝা যাচ্ছে, সে নিশ্চিত হয়ে বলছে না। এভাবে প্রস্তাব হতে পারে না, তাই এভাবে বিক্রি সম্পন্ন হবে না।

দ্বিতীয় অবস্থা: কোনো বস্তু বাকিতে বিক্রি করার দরুন, বর্তমানে বাজারে যে মূল্য রয়েছে তা থেকে অধিক মূল্যে বিক্রি করা। অধিকাংশ ফকীহ তা জায়েয হওয়ার মত প্রদান করেছেন। তারা দলিল হিসাবে বিক্রি জায়েয হওয়ার ব্যাপক আয়াতটি গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন।”

তৃতীয় অবস্থা: বর্তমান ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ অধিক প্রদানের শর্তে। এ প্রকারটি সুদের অন্তর্ভুক্ত, তা প্রকাশ্য। শরীয়ত ঘোষিত সুদ দু প্রকার : এক. বিলম্বে প্রদানে সুদ এবং দুই. প্রদেয় বস্তুতে আধিক্যের মাধ্যমে সুদ। জাহেলী যুগে আরবের লোকেরা প্রায়শ যা করত তা হলো, ঋণী ব্যক্তিকে বলত, তুমি কি ঋণ আদায় করবে, না টাকা বাড়িয়ে দেবে? ঋণী ব্যক্তি সে সময় ঋণ পরিশোধ না করে টাকা বাড়িয়ে দিতে রাজি হতো। এভাবে পরিশোধে যত বিলম্ব করত ঋণের পরিমাণ বাড়তে বাড়াতে থাকত। ইসলাম এসে তা বন্ধ করে।

চতুর্থ অবস্থা : মেয়াদী ঋণ তাড়াতাড়ি পরিশোধ করানোর লক্ষ্যে ঋণ থেকে কিছু অংশ ছেড়ে দেওয়া। একে সংক্ষেপে 'দাও ওয়া তা'আজ্জাল' (ضَعْ وَتَعَجَّل) বলে। যদি কারো নিকট অপর কারো দীর্ঘমেয়াদী ঋণ থাকে, যদি ঋণী ব্যক্তি পাওনাদারকে বলে, আপনি যদি ঋণ থেকে কিছু ছেড়ে দেন তাহলে আমি অবশিষ্ট ঋণ শীঘ্রই আদায় করে দেব। এভাবে শীঘ্র আদায়ের শর্তে ঋণ থেকে কিছু কমানো জায়েয নয়। হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী সকল মাযহাবের সকল আলেম এ কথায় একমত।

টিকাঃ
১৪০. আল-মুগনীসহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৫; নায়লুল আওতার, খ. ৫, পৃ. ১৫২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১
১৪১. হাদীসটি নাসাঈ ও তিরমিযী আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
১৪৪. সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৫
১৪৫. নায়লুল আওতার, খ. ৫, পৃ. ১৫৩
১৪৭. সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৯ ও ২৭৮
১৪৮. কুরতুবী প্রণীত আহকামুল কুরআন, খ. ৩, পৃ. ৩৪৮; জাসসাস প্রণীত আহকামুল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৫৫২ ও ৫৫৪
১৪৯. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১৭৪
১৫০. আল-ইনায়া, তাকমীলা ফাতহুল কাদীর-এর টীকা, খ. ৭, পৃ. ৩৯৬
১৫১. জাসসাস প্রণীত আহকামুল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৫৫৪; আল-মুদাওয়ানা, খ. ৯, পৃ. ১৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২৯; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩৪২
১৫২. সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৯
১৫৩. সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৮
১৫৪. জাসসাস কৃত আহকামুল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৫৫৪
১৫৫. আল-ইনায়া তাকমীলা ফাতহুল কাদীর-এর টীকা, খ. ৭, পৃ. ৩৯৬
১৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯৭
১৫৭. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৭৪
১৫৮. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭৯
১৫৯. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০০; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১৭৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩৯২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক

📄 মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক


ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে মেয়াদ নিয়ে মতান্তর বিভিন্ন ধাপে হতে পাবে। মেয়াদ নির্ধারণ করা, কবে পর্যন্ত নির্ধারণ করা, মেয়াদ ঘোষিত সময় হয়ে যাওয়া, মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ মতপার্থক্যের উদ্ভব হয়েছে।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মেয়াদ নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক

📄 মেয়াদ নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক


যদি মেয়াদ নির্ধারণ নিয়েই ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে মতান্তর ঘটে, যেমন ক্রেতা বলল, আমি জিনিসটি বাকীতে এক দীনার-এর বিনিময়ে কিনেছি। শুনে বিক্রেতা অস্বীকার করে বলল, বিক্রি নগদ মূল্যে হয়েছে, বিলম্বিত মেয়াদে নয়। এক্ষেত্রে ফকীহদের মতামত বিভিন্ন।

হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, যে মেয়াদী হওয়াকে অস্বীকার করছে-বিক্রেতা-তার কথা শপথসহ গৃহীত হবে। যেহেতু লেনদেনের স্বাভাবিক অবস্থা হচ্ছে, নগদ বিনিময়। পণ্যও নগদ এবং তার মূল্যও নগদ হস্তান্তর করা হবে। স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীত বক্তব্য যে প্রদান করবে তাকে দলিল সহ তা বলতে হবে। এক্ষেত্রে এটি ক্রেতার কাঁধে নেমে আসবে, তাকে দলিল আনতে হবে। যদি সে দলিল উপস্থাপনে ব্যর্থ হয় তাহলে বিক্রেতা ক্রেতার কথা অস্বীকার করবে কসমের সাথে।

মালেকী আলেমদের মত হচ্ছে, যে এলাকায় এ বিতর্ক হচ্ছে সেখানে যদি কসম খাওয়ার প্রচলন থাকে তাহলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে কসম খাবে, পণ্য এখানে উপস্থিত থাকুক বা না থাকুক। যদি সে এলাকায় কসমের প্রচলন না থাকে তাহলে পণ্য থাকাবস্থায় বিতর্ক হলে উভয়ে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে অপরের কথা প্রত্যাখ্যান করে কসম খাবে এবং বিক্রি বাতিল করে দেবে। যদি পণ্য এখন আর না থাকে, তাহলে ক্রেতার কথা গ্রহণ করা হবে যদি সে এমন নিকটবর্তী মেয়াদের কথা শপথের সাথে উল্লেখ করে যা নিয়ে কারো সন্দেহ না জাগে।

শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, যা হাম্বলী আলেমদের একটি মত, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই শপথ করবে। আলোচিত মাসআলায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই যেমন দাবিদার, তেমনি তারা উভয়ে বিবাদীও। যেহেতু তারা বিক্রিচুক্তির বৈশিষ্ট্য নিয়ে মতভেদ করেছে, তাই তাদের উভয়ের শপথ করতে হবে।

টিকাঃ
১৬০. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৩৮; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২৬৯
১৬১. হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ১৯১
১৬২. মুসলিম
১৬৪. আল-মুগনী সহ আ- শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২৬৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মেয়াদের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক

📄 মেয়াদের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক


যদি মেয়াদের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক হয়, যেমন বিক্রেতা বলল, আমি তোমার নিকট এটি বিক্রি করেছি এক মাস সময়ে মূল্য পরিশোধ করার শর্তে। ক্রেতা দাবি করল আরো বেশি সময়ের, তাহলে ফয়সালা কী হবে, তা নিয়ে ফকীহগণ বিভিন্ন মত বর্ণনা করেছেন:

হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, যে কম সময় দাবি করবে তার কথা গ্রহণ করা হবে, যেহেতু সে আধিক্য অস্বীকার করছে। আধিক্য অস্বীকারকারী হচ্ছে বিক্রেতা। তার অস্বীকৃতি প্রদানের পর ক্রেতাকে তার দাবির পক্ষে দলিল দিতে বলা হবে। যদি সে তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিক্রেতার কসম খাওয়ার পালা।

মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলীদের এক বর্ণনায় উভয়ে শপথ করবে। উভয়ে কসম খাওয়ার পর মালেকী মাযহাবের আলেমদের মতে, বিক্রয়চুক্তি ভেঙ্গে যাবে, যদি পণ্যটি এখনো উপস্থিত থাকে। শাফেয়ী আলেমদের অভিমত হচ্ছে, যদি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে কসম খায়, তাহলে শুধু উভয়ের কসম খাওয়ার দরুন বিক্রয় চুক্তিটি ভেঙ্গে যাবে না; এটিই তাদের বিশুদ্ধ মত। বরং তাদের একের কথা অন্যে মেনে নিলে ঝগড়া নিষ্পত্তি হয়ে গেলে বিক্রি বহাল থাকবে। আর যদি কারো কথা কেউ না মানে, ঝগড়া যথারীতি বহাল থাকে তাহলে হয় উভয়েই বিক্রি বাতিল করে দেবে অথবা দুজনের কোনো একজন অথবা বিচারক বিক্রি বাতিলের ফয়সালা দেবেন।

টিকাঃ
১৬৫. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৩৮
১৬৬. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ১৮৯
১৬৭. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৯৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00