📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বাদলুল করয (بَدَلُ الْقَرْضِ) : ঋণের বদল

📄 বাদলুল করয (بَدَلُ الْقَرْضِ) : ঋণের বদল


আলেম ও ফকীহগণ ঋণ দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে মেয়াদ নির্ধারণ করা নিয়ে মতপার্থক্য করেছেন। অধিকাংশ আলেম বলেছেন: ঋণদাতা ঋণ প্রদানের পরেই তা ফেরত চাইতে পারে। যদি সে মেয়াদ নির্ধারণ করে থাকে তবু তার এ অধিকার থাকবে। অতএব, বোঝা গেল তাতে মেয়াদ নির্ধারণ করা হলেও তা মেয়াদী হয় না, নগদ প্রদেয়-ই থেকে যায়। হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের সকল আলেম এবং হারেছ উকালী, আওযায়ী ও ইবনুল মুনজির-এর এটিই মত।

তারা এর কারণ হিসাবে বলেন: ঋণ ফেরত দেওয়া কারো কোনো বস্তু বিনষ্ট করার পর তার ক্ষতিপূরণ প্রদান করার মতো। ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে মূল বস্তুটি মিছলী হলে তার ক্ষতিপূরণও মিছলী হওয়া বাঞ্ছনীয়। ঋণের বেলায়ও মাসআলা এরূপ। কেউ কোনো মিছলী বস্তু ঋণ নিলে ঋণের বদল হিসাবে মিছলী বস্তুই ফেরত দেবে- যদি তা সহজলভ্য হয়ে থাকে। এ ধরনের সামঞ্জস্যের প্রেক্ষিতেই বলা হয়, ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি মেয়াদী হয় না, নগদ প্রদেয় হয়ে থাকে। তেমনি ঋণের বদলও মেয়াদী না হয়ে নগদ প্রদেয় হয়।

যদি কেউ তার টাকা অপর কাউকে দেওয়ার পরই তাতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে সে টাকা ফেরত চাইতে পারে। তা না করে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাকে সময় দেওয়া নিছক মেহেরবানী; তা পূরণ করা তার জন্যে জরুরি নয়। এভাবে সাব্যস্ত হলো, ঋণের বেলায় মেয়াদ নির্ধারণ করা কোনো শর্ত বলে গণ্য হবে না। যদি এটাকে শর্ত বলাও হয় তাহলেও তা নবী স.-এর এ হাদীসের আওতায় আসবে না। নবী স. বলেছেন: “মুমিনদের কর্তব্য শর্ত পালন করা এবং তারা তাদের শর্তের ওপর অটুট থাকবে।”

টিকাঃ
৫৯. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৫৪; আর-রাওযুল মুরবি', খ. ২, পৃ. ১৯০; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম কৃত, পৃ. ৩৫৭; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৭
৬০. হাদীসটির মূল সূত্র অনুসন্ধানে ইজারা দ্রষ্টব্য।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শুক্তআর বিনিময় (ثَمَنُ الْمَشْفُوعِ فيه)

📄 শুক্তআর বিনিময় (ثَمَنُ الْمَشْفُوعِ فيه)


ফকীহগণ এ মাসআলায় মতপার্থক্য করেছেন: কারো পার্শ্ববর্তী জমি বিক্রিকালে তার অধিক হকদার বিবেচনায় যদি সে নিজে তা কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে, উপযুক্ত মূল্যে যদি তা কারো নিকট বিক্রি করা হয় তবে বিক্রয় মূল্যে পার্শ্বের জমিওয়ালার এই জমি কেনার অধিকার থাকবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এ বিধান ইসলামী শরীয়তেও স্বীকৃত। সেক্ষেত্রে এই দাবিদারকে শফী (আল-শাফী) এবং তার দাবিকে শুফআ বলা হয়।

শফীকে সে জমিটা কিনে নিতে হবে নগদ মূল্যে। যদি ক্রেতার সাথে দীর্ঘমেয়াদের চুক্তি হয়ে থাকে তবুও শফী সে বিলম্বিত হওয়ার সুবিধা পাবে না, এটি হানাফী ও শাফেয়ী আলেমদের অভিমত। এর বিপরীতে মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের অভিমত হচ্ছে, মূল বিক্রেতা যদি মেয়াদের শর্তে বিক্রি করে থাকে তাহলে শফীকেও সে সেই সুযোগ দিবে। শফী এক্ষেত্রে মূল্য বিলম্বিত করার সুবিধা পাবে।

টিকাঃ
৬১. আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ২২০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩০০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৪৭৮; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ১৬০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শরীয়ত অনুমোদিত মেয়াদী দেনা বা প্রাপ্য

📄 শরীয়ত অনুমোদিত মেয়াদী দেনা বা প্রাপ্য


শরীয়ত অনুমোদিত মেয়াদী দেনা বা প্রাপ্যসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে দিয়াত বা রক্তমূল্য, সালাম বিক্রির পণ্য এবং ক্রীতদাসের মুক্তিপণ।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 এক : দিয়াত (الدِّيَةُ) : রক্তমূল্য

📄 এক : দিয়াত (الدِّيَةُ) : রক্তমূল্য


যেহেতু হত্যা শরীয়তের দৃষ্টিতে নানা প্রকার, এগুলোর কোন্টিতে রক্তমূল্য গ্রহণ করা হবে, তা মেয়াদী হবে কি-না ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ফকীহদের মাঝে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে।

ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে প্রদত্ত রক্তমূল্যঃ
মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ খুন করার পর হত্যাকারীকে ধরা হলে তার কাছ থেকে রক্তমূল্য নিলে তা নেওয়া হবে, তৎক্ষণাৎ এবং যথাসম্ভব শীঘ্র। তাতে মেয়াদ নির্ধারণ অথবা কিস্তি নির্ধারণ কোনোটি বৈধ হবে না। এ সম্পর্কে হানাফী ফকীহগণ বলেন, এক্ষেত্রে সকল ইচ্ছাকৃত হত্যার বিধান এক রূপ নয়। যদি কেউ কাউকে হত্যা করার দরুন প্রাণদণ্ডের বিধান হয়, এরপর নিহতের অভিভাবক ও পরিজনের সাথে সমঝোতা করে রক্তমূল্য প্রদানের বিধান গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা হতে হবে তাৎক্ষণিক এবং হত্যাকারীর মাল থেকে প্রদেয়। কিন্তু পিতা যদি তার পুত্রকে হত্যা করে তবে তাতে কিসাস হবে কি না, তাতে সন্দেহ থাকায় এক্ষেত্রে অবশ্যই রক্তমূল্য আদায় করতে হবে।

স্বতঃ ইচ্ছাকৃত হত্যার রক্তমূল্যঃ
এ ধরনের হত্যাকাণ্ড মারণাস্ত্র ব্যবহার না করে অন্য কিছু দ্বারা কাউকে ইচ্ছাকৃত হত্যা। এর প্রতিকারে হত্যাকারীর পুরুষ আত্মীয়বর্গ- যারা হত্যাকারীর উত্তরাধিকারী- তারা রক্তমূল্য আদায় করবে; তাতে তিন বছর মেয়াদ প্রাপ্তির অবকাশ রয়েছে। এটি হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের সম্মিলিত অভিমত। ফকীহগণ এক্ষেত্রে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করেন: উমর ও আলী রা. তাদের খেলাফতকালে হত্যাকারীর আত্মীয় উত্তরাধিকারীদের জন্যে তিন বছর মেয়াদে রক্তমূল্য পরিশোধের রায প্রদান করেছেন।

ভুলবশত হত্যার রক্তমূল্যঃ
ফকীহ ও আলেমদের মত হচ্ছে, ভুলবশত কেউ যদি কাউকে হত্যা করে ফেলে তাহলে তার রক্তমূল্য হবে মেয়াদী; তিন বছর মেয়াদে তা পরিশোধ করতে হবে। তাই প্রতি বছর নির্ধারিত রক্তমূল্যের এক তৃতীয়াংশ গ্রহণ করা হবে। প্রতি বছরের শেষ সময়ে তা পরিশোধ করা জরুরি বলে বিবেচিত হবে। এটি হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী সকল মাযহাবের সকল ফকীহ-এর সম্মিলিত মত।

টিকাঃ
৬২. দিয়াত মানুষের প্রাণের বা অঙ্গের ক্ষতিসাধনের বিপরীতে আরোপিত আর্থিক ক্ষতিপূরণকে দিয়াত বা রক্তমূল্য বলে।
৬৩. ফাতহুল কাদীর, খ. ৯, পৃ. ২০৪; আশ-শারহুল কাবীর-এর হাশিয়া, দুসূকী কৃত, খ. ৪, পৃ. ২৫০ ও ২৫৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৯৫ ও ৯৭; আর-রাওযুল মুরবি', খ. ২, পৃ. ৩৩৭ ও ৩৪৪
৬৪. উমর ও আলী রা. নিজ নিজ খেলাফতকালে হত্যাকারীর পুরুষ উত্তরাধিকারীদের তিন বছর মেয়াদে রক্তমূল্য পরিশোধের ফয়সালা দিয়েছিলেন।
৬৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৯, পৃ. ১৪৪; আল-মুগনীসহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৯, পৃ. ৪৯২
৬৬. নায়লুল আওতার, খ. ৭, পৃ. ৭৬; আল-মুগনীসহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৯, পৃ. ৪৯৭; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৪, পৃ. ২৮৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৭, পৃ. ৩০১; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৫, পৃ. ৪১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00