📄 কোন্ দেনার মেয়াদ নির্ধারণ বৈধ, কোন্টিতে নয়
ফকীহগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, দেনা বা ঋণ নগদ পরিশোধযোগ্য। তবে তাতে পাওনাদার সুযোগ দিলে বিলম্ব করা ও মেয়াদ নির্ধারণ করার অবকাশ রয়েছে। অবশ্য কতক দেনা তার ব্যতিক্রম বলে সাব্যস্ত হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ:
এক. সালাম বিক্রয়ে মূল্য: এটিটিতে বিলম্বিত করার অবকাশ নেই, যেহেতু এটি হচ্ছে এমন বিক্রয় যার মূল্য প্রদান হবে নগদ এবং পণ্য প্রদান হবে বিলম্বিত। তাই যদি মূল্য আদায়ও বিলম্বিত হয়, তাহলে তো তা সালাম বিক্রি বলেই অভিহিত হবে না। তাই হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমদের সম্মিলিত মত এটাই, সালাম বিক্রিতে মূল্য আদায়ে কোনো মেয়াদ নির্ধারিত হবে না। এ ধরনের বিক্রিতে শর্ত হচ্ছে : বেচাকেনার মজলিসেই মূল্য পরিশোধ করা হবে এবং তা বিক্রেতা কজা করবে।
যদি মূল্য আদায়ও বিলম্বিত হয় তাহলে এটি সালাম বিক্রি না হয়ে, হয়ে যাবে দেনার বদলে দেনা বিক্রি, যা মোটেও জায়েয নয়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলম্বিত-এর বিপরীতে বিলম্বিত যে কোনো লেনদেন নিষিদ্ধ করেছেন। তা ছাড়া সালাম বিক্রিতে পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি মূল্যও বাকী থাকে, তবে তাতেও প্রতারণার সম্ভাবনা থাকে যথেষ্ট। তাই তাতে মূল্য নগদ আদায় করা জরুরি বলে বিবেচিত হয়েছে, যেমন সারাফ বিক্রিতে। যেহেতু মূল্য কজা করা শর্ত, তাই মূল্য কজা করার পূর্বে যদি ক্রেতা বিক্রেতা মজলিস থেকে উঠে পড়ে তাহলে সালাম বিক্রিই বাতিল হয়ে যায়।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এক্ষেত্রে বলেন, যদিও সালাম বিক্রি যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, আলোচনার মজলিসেই পূর্ণ মূল্য প্রদান করা, কিন্তু বিক্রয় সম্পন্ন করার পর তা অনধিক তিন দিন পর্যন্ত বিলম্ব করার অবকাশ রয়েছে। তারা এ সম্পর্কে বলেন: এটি শর্ত করা হলেও সালাম বিক্রি সম্পন্নে কোনো ক্ষতি হবে না, যেহেতু কাছাকাছি সময়ে হলে সে সময়েই হয়েছে বলে ধরা হয়। তারা বলেন, তাই মেয়াদ এক বা দু দিনের হতে পারবে এবং তাতে এই শর্তও থাকবে যে, মূল্য লেনদেনস্থলে না এনে অন্য এলাকায় বিক্রেতার হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তা না হলে উপরিউক্ত হাদীসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে, দেনার বদলে দেনা বিক্রি করা হবে। তাই দুদিনের অধিক সময় দেওয়া তারাও বৈধ বলেন না। যদি তিন দিনের থেকেও অনেক বেশি বিলম্বে মূল্য পরিশোধ করার শর্ত করা হয় তাহলে সালাম বিক্রি সম্পন্ন হবে না, বাতিল হবে- তা নিয়ে ইমাম মালেক রহ. দু ধরনের মতই ব্যক্ত করেছেন।
দুই. সারাফ বিক্রির মূল্য: সারাফ পদ্ধতির বিক্রিতে শর্ত হচ্ছে যেহেতু লেনদেনের উভয় দিকে রয়েছে ছামান বা স্বর্ণ রৌপ্য, তাই ক্রেতা বিক্রেতা মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার পূর্বেই তাদের বদল ও বিনিময় হস্তান্তর করতে হবে এবং অপরকে তা কব্জা করতে হবে। যদি সারাফ বিক্রিতে কোনো এক বদল বা উভয়টিতে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় তবে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে। যেহেতু বদল কজা করা শর্ত, মেয়াদ নির্ধারণ করা হলে কজা করা বিলম্বিত হবে। ফলে নগদ কব্জা সংঘটিত না হওয়ায় সারাফ সহীহ হওয়ার প্রয়োজনীয় শর্ত বাস্তবায়িত হবে না, ফলে বিক্রি সম্পন্ন হবে না। উপরিউক্ত মত প্রকাশ করেছেন হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ।
তিন: ইকালার (বিক্রি বাতিলকরণের) পর মূল্য ফেরত প্রদান: যে কোনো কারণে বিক্রি বাতিল করা এবং যে মূল্য ধার্য করে বিক্রয় করা হয়েছিল সেই মূল্যই ফেরত দেওয়া জায়েয, এ কথায় সকল ফকীহ ও আলেম একমত। অধিকাংশ ফকীহের মতে ইকালা হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতা যে বেচাকেনা করেছে তার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়া, বিক্রেতা তার পণ্য ফিরিয়ে নেওয়া, ক্রেতা তার প্রদত্ত অর্থ ফেরত নেওয়া। তা যেহেতু নতুন কোনো বিক্রি নয়, তাই নতুন কোনো শর্ত বা নতুন কোনো কথাই এখানে গ্রহণযোগ্য হবে না। মূল্য যা দেওয়া হয়েছিল তা হুবহু ফেরত দেওয়া হবে, তার অধিকও নয়, তার পরিবর্তে সমমূল্যের অন্য কোনো জিনিসও নয়। তাতে কোনো মেয়াদও নির্ধারণ করা যাবে না। যদি মূল্য প্রদান করা হয়েছিল নগদ, ইকালা করার সময় বিক্রেতা তাতে মেয়াদ নির্ধারণ করে, তাহলে ইকালা বহাল থাকলেও মেয়াদ নির্ধারণ বাতিল হয়ে যাবে। ফলে নগদই মূল্য ফিরিয়ে দিতে হবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ কেবল বলেন, ইকালা হচ্ছে যেন নতুন এক বিক্রি। তাতে পূর্বে যে ক্রেতা ছিল সে হয়েছে বিক্রেতা এবং পূর্বে যে বিক্রেতা ছিল সে হয়েছে ক্রেতা। যেহেতু তারা এটিকে নতুন বিক্রি বলে গণ্য করেন, তাই বিক্রয়ের সাথে সম্পর্কিত সকল বিধানই তাতে কার্যকর হবে। মূল্য পূর্বের অধিক বা কম, অন্য কোনো সমমূল্যের বস্তু তাতে মূল্য নির্ধারিত হতে পারে। সে হিসেবে পূর্বে মূল্য নগদ থাকলেও তা এখন মেয়াদ যুক্ত হয়ে বিলম্বিত হতে পারে।
টিকাঃ
৪৪. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২১৭; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ২০২
৪৫. হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাকেম এবং ইমাম দারাকুতনী। ইবনে হাজার রহ. শাফেয়ী রহ.-এর উদ্ধৃতিতে বলেন, হাদীসবিশারদগণ এই হাদীসটিকে দুর্বল সাব্যস্ত করেন।
৪৬. আর-রাওযুল মুরবি', খ. ২, পৃ. ১৮৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০৪
৪৭. খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ১১২; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ১৯৫
৪৮. আরবী ফিকহী বিশ্বকোষে তার শিরোনাম বিয়ুছ ছামান বিাছ ছামান।
৪৯. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪৪
৫০. হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২৯
৫১. ইমাম মুসলিম, আবু দাউদ, আহমদ ও ইবনে মাজা নিজ নিজ হাদীসগ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
৫২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৪
৫৩. বুখারী, মুসলিম, ইমাম মালেক, নাসাঈ, আবুদাউদ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
৫৪. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১৬৫; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৬৬
৫৫. আল-ইকালাহ
৫৬. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১১৩; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২২৫
৫৭. আবু দাউদ ও ইবনে মাজা আ'মাশ, আবু সালেহ ও আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন।
৫৮. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৫২; আর-রাওযা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৫
📄 বাদলুল করয (بَدَلُ الْقَرْضِ) : ঋণের বদল
আলেম ও ফকীহগণ ঋণ দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে মেয়াদ নির্ধারণ করা নিয়ে মতপার্থক্য করেছেন। অধিকাংশ আলেম বলেছেন: ঋণদাতা ঋণ প্রদানের পরেই তা ফেরত চাইতে পারে। যদি সে মেয়াদ নির্ধারণ করে থাকে তবু তার এ অধিকার থাকবে। অতএব, বোঝা গেল তাতে মেয়াদ নির্ধারণ করা হলেও তা মেয়াদী হয় না, নগদ প্রদেয়-ই থেকে যায়। হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের সকল আলেম এবং হারেছ উকালী, আওযায়ী ও ইবনুল মুনজির-এর এটিই মত।
তারা এর কারণ হিসাবে বলেন: ঋণ ফেরত দেওয়া কারো কোনো বস্তু বিনষ্ট করার পর তার ক্ষতিপূরণ প্রদান করার মতো। ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে মূল বস্তুটি মিছলী হলে তার ক্ষতিপূরণও মিছলী হওয়া বাঞ্ছনীয়। ঋণের বেলায়ও মাসআলা এরূপ। কেউ কোনো মিছলী বস্তু ঋণ নিলে ঋণের বদল হিসাবে মিছলী বস্তুই ফেরত দেবে- যদি তা সহজলভ্য হয়ে থাকে। এ ধরনের সামঞ্জস্যের প্রেক্ষিতেই বলা হয়, ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি মেয়াদী হয় না, নগদ প্রদেয় হয়ে থাকে। তেমনি ঋণের বদলও মেয়াদী না হয়ে নগদ প্রদেয় হয়।
যদি কেউ তার টাকা অপর কাউকে দেওয়ার পরই তাতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে সে টাকা ফেরত চাইতে পারে। তা না করে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাকে সময় দেওয়া নিছক মেহেরবানী; তা পূরণ করা তার জন্যে জরুরি নয়। এভাবে সাব্যস্ত হলো, ঋণের বেলায় মেয়াদ নির্ধারণ করা কোনো শর্ত বলে গণ্য হবে না। যদি এটাকে শর্ত বলাও হয় তাহলেও তা নবী স.-এর এ হাদীসের আওতায় আসবে না। নবী স. বলেছেন: “মুমিনদের কর্তব্য শর্ত পালন করা এবং তারা তাদের শর্তের ওপর অটুট থাকবে।”
টিকাঃ
৫৯. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৫৪; আর-রাওযুল মুরবি', খ. ২, পৃ. ১৯০; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম কৃত, পৃ. ৩৫৭; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৭
৬০. হাদীসটির মূল সূত্র অনুসন্ধানে ইজারা দ্রষ্টব্য।
📄 শুক্তআর বিনিময় (ثَمَنُ الْمَشْفُوعِ فيه)
ফকীহগণ এ মাসআলায় মতপার্থক্য করেছেন: কারো পার্শ্ববর্তী জমি বিক্রিকালে তার অধিক হকদার বিবেচনায় যদি সে নিজে তা কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে, উপযুক্ত মূল্যে যদি তা কারো নিকট বিক্রি করা হয় তবে বিক্রয় মূল্যে পার্শ্বের জমিওয়ালার এই জমি কেনার অধিকার থাকবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এ বিধান ইসলামী শরীয়তেও স্বীকৃত। সেক্ষেত্রে এই দাবিদারকে শফী (আল-শাফী) এবং তার দাবিকে শুফআ বলা হয়।
শফীকে সে জমিটা কিনে নিতে হবে নগদ মূল্যে। যদি ক্রেতার সাথে দীর্ঘমেয়াদের চুক্তি হয়ে থাকে তবুও শফী সে বিলম্বিত হওয়ার সুবিধা পাবে না, এটি হানাফী ও শাফেয়ী আলেমদের অভিমত। এর বিপরীতে মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের অভিমত হচ্ছে, মূল বিক্রেতা যদি মেয়াদের শর্তে বিক্রি করে থাকে তাহলে শফীকেও সে সেই সুযোগ দিবে। শফী এক্ষেত্রে মূল্য বিলম্বিত করার সুবিধা পাবে।
টিকাঃ
৬১. আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ২২০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩০০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৪৭৮; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ১৬০
📄 শরীয়ত অনুমোদিত মেয়াদী দেনা বা প্রাপ্য
শরীয়ত অনুমোদিত মেয়াদী দেনা বা প্রাপ্যসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে দিয়াত বা রক্তমূল্য, সালাম বিক্রির পণ্য এবং ক্রীতদাসের মুক্তিপণ।