📄 পণ্য হস্তান্তরে মেয়াদের শর্ত
যে সকল চুক্তি ও লেনদেনে বস্তুর মালিকানা পরিবর্তিত হয়, সেগুলোতে পণ্য হস্তান্তরে মেয়াদ নির্ধারণ করার বিষয়টি শর্ত হিসাবে উল্লেখ করা যাবে কি না, তা নিয়ে ফকীহদের মাঝে দুটি মতের উদ্ভব হয়েছে।
মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, বিক্রীত পণ্য ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে সময় নির্ধারণ করার শর্তারোপ করা যাবে। ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ে মিলেই সে সময় নির্ধারণ করবে। এভাবে বিলম্বিত করার দরুন বিক্রেতা-যে পণ্যের মালিকানা নিজের নিকট থেকে ক্রেতার নিকট নকল করছে-তার সে পণ্য দ্বারা লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।
হানাফী ও শাফেয়ী আলেমদের নিকট গ্রহণযোগ্য মত হলো, পণ্য হস্তান্তরে বিলম্ব করার শর্ত করা সঠিক ও জায়েয নয়। তারা এক্ষেত্রে দলিল হিসাবে উল্লেখ করেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস : “নবী স. একইসাথে বিক্রি ও শর্তারোপ করতে নিষেধ করেছেন।”
টিকাঃ
৩২. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৬৫; আল-মাওয়াক, খ. ৩, পৃ. ৩৭২; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৯০
৩৩. সূরা মায়েদা, আয়াত ১
৩৪. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৩৪
৩৫. ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনার পর হাদীসটিকে সহীহ মানের বলে উল্লেখ করেছেন।
৩৬. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৯০, মুদ্রণ: রিয়াদ
৩৭. ইবনে হাজার আসকালানী র. বলেছেন, রাফেঈ এ হাদীসটি তার তাযনীব নামক গ্রন্থে পরিষ্কার করে লিখেছেন। আত-তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ১২
৩৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২১৫-২১৮; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১২৬
৩৯. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৯১; মুদ্রণ: রিয়াদ
📄 তাজীলুদ দায়ন বা ঋণ ও পাওনায় মেয়াদ নির্ধারণ
দায়ন (الدিন) হলো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্বে ন্যস্ত অপরের প্রাপ্য। এটি ব্যবসার দরুন, ঋণগ্রহণের দরুন, বা কোনোভাবে কারো সম্পদ বিনষ্ট করার দরুন ইত্যাকার কারণে দায়িত্বে অর্পিত হতে পারে। বাংলায় এ শব্দটি দেনা, ঋণ, পাওনা, দাবি, প্রাপ্য ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ঋণ ও পাওনা ইত্যাদির মেয়াদ নির্ধারণ শরীয়তসম্মত। কিতাবুল্লাহ (কুরআন), হাদীস ও ইজমা (সকলের ঐকমত্য) দ্বারা তার জায়েয হওয়া প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : “হে ঈমানদার লোকেরা! যখন তোমরা নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণ আদান প্রদান করো তা লিখে রাখো।” এ সম্পর্কে হাদীসের বর্ণনা হচ্ছে, আয়েশা রা. বলেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইয়াহুদী ব্যক্তির নিকট থেকে কিছু খাদ্যদ্রব্য কিনেন বাকিতে, মূল্য পরিশোধের সময় পর্যন্ত লোহার এক বর্ম তার কাছে তিনি বন্ধক রাখেন।”
টিকাঃ
৪০. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮২; কুরতুবী কৃত আল-জামে' লি আহকামিল কুরআন, খ. ৩, পৃ. ৩৭৭
৪১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৭৪
৪২. মুসলিম
৪৩. ‘বায় সালাম' অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
📄 বস্তুতে না রেখে প্রাপ্যে মেয়াদ নির্ধারণের রহস্য
ফকীহগণ লেনদেনের মূল বস্তু ও প্রাপ্য ফেরত প্রদানে মেয়াদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পার্থক্য করেছেন। তারা মূল বস্তু ফেরত প্রদানে মেয়াদ নির্ধারণ অবৈধ এবং প্রাপ্য ও পাওনা ফেরতে মেয়াদ নির্ধারণ বৈধ বলে মত প্রকাশ করেছেন। তাদের এ পার্থক্যের কারণ: লেনদেনের মূল বস্তু থাকে নির্ধারিত এবং সামনে উপস্থিত। যা সামনে উপস্থিত থাকে তা তো বিদ্যমান, তাতে মেয়াদ নির্ধারণ এবং তা জায়েয বলার প্রয়োজনই তো নেই।
এর বিপরীতে যা প্রাপ্য বা পাওনা, তা তো শরীয়তের বিধান হিসেবে সম্পদ, তা দায়িত্বে ন্যস্ত হলেও তা তো এখনো উপস্থিতও নেই, বিদ্যমানও নয়; তাই তাতে মেয়াদ নির্ধারণের অবকাশ রয়েছে। তাতে যে ঋণগ্রস্ত বা দেনাদার তার প্রতি কোমল আচরণ করা হবে। প্রয়োজনে সে নির্ধারিত সময়ে সে ঋণের টাকা উপার্জন বা আহরণ করতে পারবে। এ নমনীয় আচরণের বিপরীতে ক্রেতা নিজেই যদি নির্ধারিত কিছু অর্থ দ্বারা কেনার উল্লেখ করে, তাহলে যেহেতু তার বিলম্বিত করার কোনো প্রয়োজন নাই, তাই মেয়াদ নির্ধারণের কোনো আলোচনাও বৈধ হবে না।
📄 কোন্ দেনার মেয়াদ নির্ধারণ বৈধ, কোন্টিতে নয়
ফকীহগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, দেনা বা ঋণ নগদ পরিশোধযোগ্য। তবে তাতে পাওনাদার সুযোগ দিলে বিলম্ব করা ও মেয়াদ নির্ধারণ করার অবকাশ রয়েছে। অবশ্য কতক দেনা তার ব্যতিক্রম বলে সাব্যস্ত হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ:
এক. সালাম বিক্রয়ে মূল্য: এটিটিতে বিলম্বিত করার অবকাশ নেই, যেহেতু এটি হচ্ছে এমন বিক্রয় যার মূল্য প্রদান হবে নগদ এবং পণ্য প্রদান হবে বিলম্বিত। তাই যদি মূল্য আদায়ও বিলম্বিত হয়, তাহলে তো তা সালাম বিক্রি বলেই অভিহিত হবে না। তাই হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমদের সম্মিলিত মত এটাই, সালাম বিক্রিতে মূল্য আদায়ে কোনো মেয়াদ নির্ধারিত হবে না। এ ধরনের বিক্রিতে শর্ত হচ্ছে : বেচাকেনার মজলিসেই মূল্য পরিশোধ করা হবে এবং তা বিক্রেতা কজা করবে।
যদি মূল্য আদায়ও বিলম্বিত হয় তাহলে এটি সালাম বিক্রি না হয়ে, হয়ে যাবে দেনার বদলে দেনা বিক্রি, যা মোটেও জায়েয নয়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলম্বিত-এর বিপরীতে বিলম্বিত যে কোনো লেনদেন নিষিদ্ধ করেছেন। তা ছাড়া সালাম বিক্রিতে পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি মূল্যও বাকী থাকে, তবে তাতেও প্রতারণার সম্ভাবনা থাকে যথেষ্ট। তাই তাতে মূল্য নগদ আদায় করা জরুরি বলে বিবেচিত হয়েছে, যেমন সারাফ বিক্রিতে। যেহেতু মূল্য কজা করা শর্ত, তাই মূল্য কজা করার পূর্বে যদি ক্রেতা বিক্রেতা মজলিস থেকে উঠে পড়ে তাহলে সালাম বিক্রিই বাতিল হয়ে যায়।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এক্ষেত্রে বলেন, যদিও সালাম বিক্রি যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, আলোচনার মজলিসেই পূর্ণ মূল্য প্রদান করা, কিন্তু বিক্রয় সম্পন্ন করার পর তা অনধিক তিন দিন পর্যন্ত বিলম্ব করার অবকাশ রয়েছে। তারা এ সম্পর্কে বলেন: এটি শর্ত করা হলেও সালাম বিক্রি সম্পন্নে কোনো ক্ষতি হবে না, যেহেতু কাছাকাছি সময়ে হলে সে সময়েই হয়েছে বলে ধরা হয়। তারা বলেন, তাই মেয়াদ এক বা দু দিনের হতে পারবে এবং তাতে এই শর্তও থাকবে যে, মূল্য লেনদেনস্থলে না এনে অন্য এলাকায় বিক্রেতার হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তা না হলে উপরিউক্ত হাদীসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে, দেনার বদলে দেনা বিক্রি করা হবে। তাই দুদিনের অধিক সময় দেওয়া তারাও বৈধ বলেন না। যদি তিন দিনের থেকেও অনেক বেশি বিলম্বে মূল্য পরিশোধ করার শর্ত করা হয় তাহলে সালাম বিক্রি সম্পন্ন হবে না, বাতিল হবে- তা নিয়ে ইমাম মালেক রহ. দু ধরনের মতই ব্যক্ত করেছেন।
দুই. সারাফ বিক্রির মূল্য: সারাফ পদ্ধতির বিক্রিতে শর্ত হচ্ছে যেহেতু লেনদেনের উভয় দিকে রয়েছে ছামান বা স্বর্ণ রৌপ্য, তাই ক্রেতা বিক্রেতা মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার পূর্বেই তাদের বদল ও বিনিময় হস্তান্তর করতে হবে এবং অপরকে তা কব্জা করতে হবে। যদি সারাফ বিক্রিতে কোনো এক বদল বা উভয়টিতে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় তবে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে। যেহেতু বদল কজা করা শর্ত, মেয়াদ নির্ধারণ করা হলে কজা করা বিলম্বিত হবে। ফলে নগদ কব্জা সংঘটিত না হওয়ায় সারাফ সহীহ হওয়ার প্রয়োজনীয় শর্ত বাস্তবায়িত হবে না, ফলে বিক্রি সম্পন্ন হবে না। উপরিউক্ত মত প্রকাশ করেছেন হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ।
তিন: ইকালার (বিক্রি বাতিলকরণের) পর মূল্য ফেরত প্রদান: যে কোনো কারণে বিক্রি বাতিল করা এবং যে মূল্য ধার্য করে বিক্রয় করা হয়েছিল সেই মূল্যই ফেরত দেওয়া জায়েয, এ কথায় সকল ফকীহ ও আলেম একমত। অধিকাংশ ফকীহের মতে ইকালা হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতা যে বেচাকেনা করেছে তার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়া, বিক্রেতা তার পণ্য ফিরিয়ে নেওয়া, ক্রেতা তার প্রদত্ত অর্থ ফেরত নেওয়া। তা যেহেতু নতুন কোনো বিক্রি নয়, তাই নতুন কোনো শর্ত বা নতুন কোনো কথাই এখানে গ্রহণযোগ্য হবে না। মূল্য যা দেওয়া হয়েছিল তা হুবহু ফেরত দেওয়া হবে, তার অধিকও নয়, তার পরিবর্তে সমমূল্যের অন্য কোনো জিনিসও নয়। তাতে কোনো মেয়াদও নির্ধারণ করা যাবে না। যদি মূল্য প্রদান করা হয়েছিল নগদ, ইকালা করার সময় বিক্রেতা তাতে মেয়াদ নির্ধারণ করে, তাহলে ইকালা বহাল থাকলেও মেয়াদ নির্ধারণ বাতিল হয়ে যাবে। ফলে নগদই মূল্য ফিরিয়ে দিতে হবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ কেবল বলেন, ইকালা হচ্ছে যেন নতুন এক বিক্রি। তাতে পূর্বে যে ক্রেতা ছিল সে হয়েছে বিক্রেতা এবং পূর্বে যে বিক্রেতা ছিল সে হয়েছে ক্রেতা। যেহেতু তারা এটিকে নতুন বিক্রি বলে গণ্য করেন, তাই বিক্রয়ের সাথে সম্পর্কিত সকল বিধানই তাতে কার্যকর হবে। মূল্য পূর্বের অধিক বা কম, অন্য কোনো সমমূল্যের বস্তু তাতে মূল্য নির্ধারিত হতে পারে। সে হিসেবে পূর্বে মূল্য নগদ থাকলেও তা এখন মেয়াদ যুক্ত হয়ে বিলম্বিত হতে পারে।
টিকাঃ
৪৪. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২১৭; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ২০২
৪৫. হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাকেম এবং ইমাম দারাকুতনী। ইবনে হাজার রহ. শাফেয়ী রহ.-এর উদ্ধৃতিতে বলেন, হাদীসবিশারদগণ এই হাদীসটিকে দুর্বল সাব্যস্ত করেন।
৪৬. আর-রাওযুল মুরবি', খ. ২, পৃ. ১৮৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০৪
৪৭. খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ১১২; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ১৯৫
৪৮. আরবী ফিকহী বিশ্বকোষে তার শিরোনাম বিয়ুছ ছামান বিাছ ছামান।
৪৯. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৪৪
৫০. হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২৯
৫১. ইমাম মুসলিম, আবু দাউদ, আহমদ ও ইবনে মাজা নিজ নিজ হাদীসগ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
৫২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৪
৫৩. বুখারী, মুসলিম, ইমাম মালেক, নাসাঈ, আবুদাউদ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
৫৪. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১৬৫; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৬৬
৫৫. আল-ইকালাহ
৫৬. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১১৩; আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২২৫
৫৭. আবু দাউদ ও ইবনে মাজা আ'মাশ, আবু সালেহ ও আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন।
৫৮. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৫২; আর-রাওযা, খ. ৩, পৃ. ৪৯৫