📄 আল-আজালুল ইত্তিফাকী বা সমঝোতামূলক মেয়াদ
الأجل الاتفاقي (আল-আজালুল ইত্তিফাকী) বলার দ্বারা উদ্দেশ্য সে স্বতন্ত্র মেয়াদ যা দায়িত্ব পালনকারী তার দায়িত্ব পালনের জন্যে নির্ধারণ করে। এর বিপরীতে অন্যের পক্ষ থেকে কোনো মেয়াদ নির্ধারিত হতে পারে, নাও হতে পারে। অথবা দায়িত্ব পালন ও প্রয়োজন পূরণের সমাপ্তি বোঝাতে মেয়াদ নির্ধারিত হতে পারে। এভাবে আলোচনার দ্বারা প্রতিভাত হলো, পারস্পরিক সমঝোতামূলক মেয়াদ দু প্রকার: এক. দায়িত্ব পালনকারী তার দায়িত্ব পালনের জন্যে যা নির্ধারণ করে। একে আজালুল ইযাফাহ (আজালুল ইদাফাহ) বলে। দুই. দায়িত্ব পালন ও প্রয়োজন পূরণের সমাপ্তি বোঝাতে নির্ধারিত মেয়াদ। একে আজালুত তাওকীত বলে।
📄 পণ্য হস্তান্তরে মেয়াদের শর্ত
যে সকল চুক্তি ও লেনদেনে বস্তুর মালিকানা পরিবর্তিত হয়, সেগুলোতে পণ্য হস্তান্তরে মেয়াদ নির্ধারণ করার বিষয়টি শর্ত হিসাবে উল্লেখ করা যাবে কি না, তা নিয়ে ফকীহদের মাঝে দুটি মতের উদ্ভব হয়েছে।
মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, বিক্রীত পণ্য ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে সময় নির্ধারণ করার শর্তারোপ করা যাবে। ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ে মিলেই সে সময় নির্ধারণ করবে। এভাবে বিলম্বিত করার দরুন বিক্রেতা-যে পণ্যের মালিকানা নিজের নিকট থেকে ক্রেতার নিকট নকল করছে-তার সে পণ্য দ্বারা লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।
হানাফী ও শাফেয়ী আলেমদের নিকট গ্রহণযোগ্য মত হলো, পণ্য হস্তান্তরে বিলম্ব করার শর্ত করা সঠিক ও জায়েয নয়। তারা এক্ষেত্রে দলিল হিসাবে উল্লেখ করেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস : “নবী স. একইসাথে বিক্রি ও শর্তারোপ করতে নিষেধ করেছেন।”
টিকাঃ
৩২. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৬৫; আল-মাওয়াক, খ. ৩, পৃ. ৩৭২; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৯০
৩৩. সূরা মায়েদা, আয়াত ১
৩৪. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৩৪
৩৫. ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনার পর হাদীসটিকে সহীহ মানের বলে উল্লেখ করেছেন।
৩৬. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৯০, মুদ্রণ: রিয়াদ
৩৭. ইবনে হাজার আসকালানী র. বলেছেন, রাফেঈ এ হাদীসটি তার তাযনীব নামক গ্রন্থে পরিষ্কার করে লিখেছেন। আত-তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ১২
৩৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২১৫-২১৮; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১২৬
৩৯. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৯১; মুদ্রণ: রিয়াদ
📄 তাজীলুদ দায়ন বা ঋণ ও পাওনায় মেয়াদ নির্ধারণ
দায়ন (الدিন) হলো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্বে ন্যস্ত অপরের প্রাপ্য। এটি ব্যবসার দরুন, ঋণগ্রহণের দরুন, বা কোনোভাবে কারো সম্পদ বিনষ্ট করার দরুন ইত্যাকার কারণে দায়িত্বে অর্পিত হতে পারে। বাংলায় এ শব্দটি দেনা, ঋণ, পাওনা, দাবি, প্রাপ্য ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ঋণ ও পাওনা ইত্যাদির মেয়াদ নির্ধারণ শরীয়তসম্মত। কিতাবুল্লাহ (কুরআন), হাদীস ও ইজমা (সকলের ঐকমত্য) দ্বারা তার জায়েয হওয়া প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : “হে ঈমানদার লোকেরা! যখন তোমরা নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণ আদান প্রদান করো তা লিখে রাখো।” এ সম্পর্কে হাদীসের বর্ণনা হচ্ছে, আয়েশা রা. বলেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইয়াহুদী ব্যক্তির নিকট থেকে কিছু খাদ্যদ্রব্য কিনেন বাকিতে, মূল্য পরিশোধের সময় পর্যন্ত লোহার এক বর্ম তার কাছে তিনি বন্ধক রাখেন।”
টিকাঃ
৪০. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮২; কুরতুবী কৃত আল-জামে' লি আহকামিল কুরআন, খ. ৩, পৃ. ৩৭৭
৪১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৭৪
৪২. মুসলিম
৪৩. ‘বায় সালাম' অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
📄 বস্তুতে না রেখে প্রাপ্যে মেয়াদ নির্ধারণের রহস্য
ফকীহগণ লেনদেনের মূল বস্তু ও প্রাপ্য ফেরত প্রদানে মেয়াদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পার্থক্য করেছেন। তারা মূল বস্তু ফেরত প্রদানে মেয়াদ নির্ধারণ অবৈধ এবং প্রাপ্য ও পাওনা ফেরতে মেয়াদ নির্ধারণ বৈধ বলে মত প্রকাশ করেছেন। তাদের এ পার্থক্যের কারণ: লেনদেনের মূল বস্তু থাকে নির্ধারিত এবং সামনে উপস্থিত। যা সামনে উপস্থিত থাকে তা তো বিদ্যমান, তাতে মেয়াদ নির্ধারণ এবং তা জায়েয বলার প্রয়োজনই তো নেই।
এর বিপরীতে যা প্রাপ্য বা পাওনা, তা তো শরীয়তের বিধান হিসেবে সম্পদ, তা দায়িত্বে ন্যস্ত হলেও তা তো এখনো উপস্থিতও নেই, বিদ্যমানও নয়; তাই তাতে মেয়াদ নির্ধারণের অবকাশ রয়েছে। তাতে যে ঋণগ্রস্ত বা দেনাদার তার প্রতি কোমল আচরণ করা হবে। প্রয়োজনে সে নির্ধারিত সময়ে সে ঋণের টাকা উপার্জন বা আহরণ করতে পারবে। এ নমনীয় আচরণের বিপরীতে ক্রেতা নিজেই যদি নির্ধারিত কিছু অর্থ দ্বারা কেনার উল্লেখ করে, তাহলে যেহেতু তার বিলম্বিত করার কোনো প্রয়োজন নাই, তাই মেয়াদ নির্ধারণের কোনো আলোচনাও বৈধ হবে না।