📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
ক. التعليق (আত-তা'লীক): ঝুলিয়ে রাখা, সম্পৃক্ত বা শর্তযুক্ত করা
এর শাব্দিক অর্থ: এক বিষয়ের সাথে অপর বিষয়ের সম্পৃক্তি। শরীয়তের পরিভাষায়: কোনো অস্তিত্বহীন বিষয় ( শর্ত) অস্তিত্ব লাভ করার সাথে কোনো কাজের ফলাফল (জাষা) সম্পৃক্ত করা।
তালীক ও আজাল-এ দুয়ে পার্থক্যঃ তা'লীক বা শর্তারোপ শর্তযুক্ত বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক শরয়ী কোনো বিধানের কারণ ও নিমিত্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে। অপরদিকে আজাল বা মেয়াদ আসে কোনো কাজের বিলম্বিত সময়সীমা বোঝাতে, কোনো কাজের কারণ বা উদ্দেশ্যের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
খ. الإضافة (আল-ইযাফাহ): সংযুক্তি, মিলানো, সম্পর্কযুক্ত করা
এর শাব্দিক অর্থ: এক বস্তুর সাথে অপর বস্তুর যে কোনো সম্পর্ক ও সংযুক্তি। শরীয়তের পরিভাষায় কোনো কাজের পরবর্তী বিধানে বিলম্বিত মেয়াদ নির্ধারণ করা, কথা বলার সময় থেকে ভবিষ্যৎকালের সে সময় পর্যন্ত, যা কর্ম সম্পাদনকারী শর্তের শব্দ ব্যবহার না করে নির্ধারণ করে।
ইযাফাহ ও আজাল-এ দুটোতে পার্থক্যঃ ইযাফতে দুটো বিষয় একত্রে বিদ্যমান: ১. কোনো কাজ এবং ২. তার সময়। আজাল হচ্ছে নির্ধারিত সময় বা মেয়াদ।
গ. التوقيت (আত-তাওকীত): সময় নির্ধারণ, সময় বেঁধে দেওয়া
এর শাব্দিক অর্থ: কোনো কাজের জন্যে সময় নির্ধারণ। শরীয়তের পরিভাষায়: শরীয়তের কোনো বিধান বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার ব্যাপ্তি ভবিষ্যৎ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা।
তাওকীত ও আজাল এ দুটিতে পার্থক্য: আজাল হচ্ছে ভবিষ্যৎ সময় যা কোনো কাজের বিলম্বিত মেয়াদ বর্ণনা করে। তাওকীত হচ্ছে কোনো কাজের সময় নির্ধারণ করা।
ঘ. المدة (আল-মুদ্দাত): মেয়াদ, সময়
ইসলামী ফিকহগ্রন্থ অধ্যয়নে চার প্রকার মুদ্দত বা মেয়াদের উল্লেখ পাওয়া যায়: ১. মুদ্দাতুল ইযাফাহ, ২. মুদ্দাতুত তাওকীত, ৩. মুদ্দাতুত তানজীম ও ৪. মুদ্দাতুল ইসতি'জাল।
১. মুদ্দাতুল ইযাফাহ (মুদ্দাতুল ইদাফাহ): সম্পর্কিত বস্তুর মেয়াদ ভবিষ্যৎ যে মেয়াদের সাথে কোনো চুক্তির পরবর্তী কর্ম বাস্তবায়নের সূচনা সম্পর্কিত থাকে অথবা সালাম বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর মূল বস্তু বুঝিয়ে দেওয়া বা ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে তার বদল বুঝিয়ে দেওয়া সম্পর্কিত থাকে তা মুদ্দাতুল ইযাফাহ বলে অভিহিত হয়।
টিকাঃ
৯. ফাতহুল কাদীর, খ. ৩, পৃ. ৬১
১০. আল্লামা থানভী কৃত কাশশাফু ইসতিলাহাতিল ফুনূন, খ. ১, পৃ. ৮৩; আল-কুল্লিয়্যাত, খ. ২, পৃ. ১০৩; আল-মিসবাহুল মুনীর, وقت ماده
১১. বিভিন্ন ফিকহগ্রন্থের সম্পর্কিত আলোচনা।
১২. এটি যথাযথ ও জায়েয হওয়ার মত ব্যক্তিব করেছেন একযোগে হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহবৃন্দ।
১৩. বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ সহ মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। আল ফাতহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৬০
📄 যে সকল ক্ষেত্রে কিস্তির প্রয়োগ রয়েছে
১. দাইনুল কিতাবাহ (দাইনুল কিতাবাত): কিতাবাতের টাকা পরিশোধ: কিতাবাতের টাকা কিস্তি আকারে আদায় করা যাবে, এ কথায় সকল ফকীহ একমত। কিতাবাত-এর অর্থ: মনিব ও ক্রীতদাস এ কথায় একমত হওয়া, কিস্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ক্রীতদাস তার মনিবের হাতে তুলে দেওয়ার বিনিময়ে এখন থেকেই সে আর্থিক কাজকর্মে স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রকাশ করতে পারবে এবং সবগুলো কিস্তি পরিশোধ করলে পরিপূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে যাবে।
২. আদ-দিয়াতু ফিল কতাল শিবহিল আসদ ওয়ালা খাতা : দিয়াত বা রক্তমূল্য প্রদান: কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, হত্যাকাণ্ডে সাধারণত যা ব্যবহৃত হয় তা ভিন্ন অন্য কিছুর দ্বারা আঘাত করে অথবা ভুলবশত কাউকে যদি হত্যা করা হয়, তাহলে খুনের বদলা খুন করা হয় না। বরং এক্ষেত্রে যা বিধান তা হলো, হত্যাকারীর আত্মীয়-পরিজন রক্তমূল্য কিস্তি আকারে মোট তিন বছরে প্রদান করবে, প্রতি বছর এক-তৃতীয়াংশ করে পরিশোধ করতে হবে।
৩. উজরাহ্ (আল-উজরাহ): পারিশ্রমিক প্রদান: আল-মুগনী গ্রন্থে লেখা হয়েছে: যদি মজুরের সাথে শর্ত করা হয় তাকে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে, তাহলে সে পর্যন্ত সময় দীর্ঘায়িত হবে। যদি কিস্তি আকারে তা প্রদানের সিদ্ধান্তে উভয়ে একমত হয়, তাহলে তা বৈধ ও জায়েয হবে।
টিকাঃ
২০. কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ৫৩৯
২১. আশ-শারহুল কাবীর ও আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ১৬
📄 মেয়াদের বিভিন্ন প্রকার
উৎস হিসাবে মেয়াদ তিন প্রকার:
১. আল-আজালুশ শরয়ী (আজাল শরয়ী)
২. আল-আজালুল কাযায়ী (আজাল কাযায়ী) ও
৩. আল-আজালুল ইত্তিফাকী (আজাল ইতিফাকী)
নিম্নে প্রতিটি প্রকারের বিস্তারিত বিবরণ আলোচনা করা হচ্ছে।
টিকাঃ
২২. ফকীহদের এ শব্দগুলোর ব্যবহার অনুসন্ধান করে এ প্রকারগুলো এবং সেগুলোর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।
📄 আল-আজালুশ শরয়ী বা শরীয়ত নির্ধারিত মেয়াদ
আল্লাহ তাআলা শরীয়তের নিয়মনীতি বর্ণনায় বিভিন্ন বিধানে বিভিন্ন মেয়াদ বর্ণনা করেছেন তাকে আজাল শরয়ী বা শরীয়ত নির্ধারিত মেয়াদ বলে। যেমন: গর্ভের মেয়াদ, দুধ পান করানোর মেয়াদ, ইদ্দতকাল ইত্যাদি।
খিয়ারে শর্ত-এর মেয়াদঃ
ক্রেতা বা বিক্রেতা বেচাকেনার সময় চূড়ান্ত সম্মতি জ্ঞাপন করতে কিছু সময় নিতে পারে, চিন্তাভাবনা করার জন্যে এমন সুযোগ প্রদান করা হবে। একে খিয়ারে শর্ত বলে। খিয়ারে শর্ত জায়েয, এ কথায় সকলেই একমত।
কিন্তু তা কত দিন? এ বিষয়ে ফকীহদের মাঝে মতপার্থক্য হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা, যুফার রহ. এবং শাফেয়ী আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, খিয়ারে শর্ত যেমন বিক্রেতা নিতে পারে, ক্রেতাও নিতে পারে, একইসাথে উভয়েও নিতে পারে। তবে তা হতে হবে তিন দিন বা তার কম সময়। তারা দলিল হিসাবে উল্লেখ করেন, হযরত হিব্বান ইবনে মুনকিয ইবনে আমর আনসারী রা. বেচাকেনায় প্রায়শ ধোঁকা ও ক্ষতির শিকার হতেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন: “যখন তুমি কোনো কিছু বেচাকেনা করো বলবে, কোনো ধোঁকা বা প্রতারণা করা যাবে না; আর আমার তিন দিন খিয়ার থাকবে।”
ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ ও ইবনে মুনযির এবং হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি ক্রেতা বা বিক্রেতা কোনো সময় উল্লেখ করে তবে তা-ই মেয়াদ হিসাবে ধর্তব্য হবে- তা যত দিনই হোক।
টিকাঃ
২৩. খিয়ার শব্দের বিস্তারিত আলোচনা যথাস্থানে দ্রষ্টব্য।
২৪. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৯৮; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৪৭; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪৩; আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৬৫
২৫. ইমাম শাফেয়ী ও হাকেম এ হাদীসটি হিব্বানের সনদে বর্ণনা করেছেন। ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৯৮
২৬. হাদীসটির আলোচনায় ইজারা দ্রষ্টব্য।
২৭. ইবনে কুদামা কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৬৫
২৮. হাশিয়া দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৯১; হাত্তাব কৃত মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩১০
২৯. আল-মুগনী সহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৬৬