📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 আজাল (الأَجَلُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

📄 আজাল (الأَجَلُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ


আজাল (أجل) শব্দটি بَاب سَمع -এর মাসদার। বলা হয় : أجل الشيء أجلا "বিষয়টি বিলম্বিত হলো, মুলতবি ও স্থগিত হলো।" أسئلة تأجيلاً "আমি তাকে সময় নির্ধারণ করে দিলাম।" أجل الشيء "কোনো কিছুর নির্ধারিত সময়, মেয়াদ।" ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আজাল-এর অর্থ জীবনের শেষ সময় বা মৃত্যুও হয়ে থাকে। বহুবচন آجাল (আ-জাল) যখন فعل ওযনে الأجل গঠন করা হয় তার অর্থ হয়: বিলম্বিত, স্থগিত, পরে আগত; যা الجল -এর বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে।

কুরআন কারীমে বিভিন্ন অর্থে আজাল শব্দের ব্যবহারঃ
কুরআনে কারীমে أجل শব্দটি বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে:
১. জীবনের শেষ মুহূর্ত বা মৃত্যু অর্থে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ “প্রত্যেক জাতির রয়েছে মৃত্যুর নির্ধারিত সময়। যখন তাদের সে সময় আসবে তারা মুহূর্তকাল বিলম্বও করতে পারবে না, তাড়াতাড়িও করতে পারবে না।”
২. কোনো কাজ সম্পাদন বা কোনো চুক্তির বাধ্যকতা নিরূপণে বেঁধে দেওয়া সময়। আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنٍ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتুবোহু “হে মুমিনরা! তোমরা যখন একে অন্যের সাথে নির্ধারিত সময়ের জন্যে ঋণের চুক্তি করো তা লিখে রেখো।”
৩. মেয়াদ, সময়। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاء إِلَى أَجَلٍ مُّসَمًّى “আমি যা ইচ্ছা করি তা মাতৃগর্ভে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্থির রাখি।”

শরীয়তের পরিভাষায় আজাল (أجل) হচ্ছে কোনো বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত ভবিষ্যৎ মেয়াদ। হয়তো তা কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের মেয়াদ অথবা কোনো প্রয়োজন পূরণের মেয়াদ। এই মেয়াদ হয়তো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত অথবা বিচার-বিভাগ কর্তৃক/বিচারক কর্তৃক নির্ধারিত অথবা দায়িত্ব পালনকারী এক বা একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত হতে পারে।

টিকাঃ
১. আল-কামূস ও আল-মিসবাহুল মুনীর, اجল - মادة - اجল
২. সূরা আরাফ, আয়াত ৩৪
৩. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮২
৪. সূরা হজ্জ, আয়াত ৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 আজাল বা মেয়াদের বৈশিষ্ট্য

📄 আজাল বা মেয়াদের বৈশিষ্ট্য


ক. মেয়াদ হবে ভবিষ্যৎকাল, তাই তাতে সর্বদা ভবিষ্যৎকালের উল্লেখ থাকবে।
খ. মেয়াদ হচ্ছে এমন বিষয় যা অবশ্যই ঘটবে। এটি সময়ের এক বৈশিষ্ট্য বটে। এ বিষয়টি প্রমাণিত করতে কামাল ইবনে হুমাম বলেন: কোনো বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকার ভিত্তিতে তার বিধান (যেমন: মূল্য বা পণ্য হস্তান্তর করা), নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করা যাবে। সময় হচ্ছে বাস্তব অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত এক আবশ্যক বিষয়। তাই কোনো বিষয়কে সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করা হলে তাকে তার বাস্তব অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত করা হবে।
গ. মেয়াদ হচ্ছে লেনদেনের মূল বিষয় থেকে অতিরিক্ত বিষয়। এ কথাটি সাব্যস্ত হয় এভাবে, কখনো চুক্তির সকল কাজ তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয় এবং লেনদেন পরবর্তী বিধানগুলো তাতে আপতিত হয় কাজটি সম্পন্ন হওয়ামাত্রই, তাতে কোনো বিলম্বিত মেয়াদ থাকে না। কখনো আবার মেয়াদ থাকেও। যেমন ঋণের মেয়াদ, সালাম পদ্ধতির বিক্রিতে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার মেয়াদ বা চুক্তি পরবর্তী কাজগুলো যেখানে বিলম্বিত করার অনুমতি রয়েছে সেখানে থাকা মেয়াদ। সারাখসী ও কাসানী যা বলেছেন, তার মর্ম হচ্ছে: মেয়াদ এমন একটি বিষয় যা বিক্রয়চুক্তির কোনো আবশ্যক চাহিদা নয়। এটি কিয়াসের বিপরীত হলেও শুধু ঋণগ্রস্তের উপকার বিবেচনা করে শরীয়ত এর অনুমোদন দিয়েছে।

টিকাঃ
৬. এ জন্যে এটি শর্ত থেকে ভিন্ন, যেহেতু শর্ত হচ্ছে এমন বিষয় যা ঘটতেও পারে, নাও ঘটতে পারে।
৭. আল্লামা সুয়ূতী কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২৭; ইবনে নুজাইম কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৫৬; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ১, পৃ. ১৮১; কামাল ইবনে হুমাম-এর কিতাবুত তাহরীর-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ মুহাম্মদ আমীন কৃত তাইসীরুত তাহরীর, খ. ১, পৃ. ১২৯, প্রকাশক: হালাবী, ১৩৫০ হিঃ
৮. আল-মাবসূত, খ. ১৩, পৃ. ২৪; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ১৭৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা

📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা


ক. التعليق (আত-তা'লীক): ঝুলিয়ে রাখা, সম্পৃক্ত বা শর্তযুক্ত করা
এর শাব্দিক অর্থ: এক বিষয়ের সাথে অপর বিষয়ের সম্পৃক্তি। শরীয়তের পরিভাষায়: কোনো অস্তিত্বহীন বিষয় ( শর্ত) অস্তিত্ব লাভ করার সাথে কোনো কাজের ফলাফল (জাষা) সম্পৃক্ত করা।
তালীক ও আজাল-এ দুয়ে পার্থক্যঃ তা'লীক বা শর্তারোপ শর্তযুক্ত বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক শরয়ী কোনো বিধানের কারণ ও নিমিত্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে। অপরদিকে আজাল বা মেয়াদ আসে কোনো কাজের বিলম্বিত সময়সীমা বোঝাতে, কোনো কাজের কারণ বা উদ্দেশ্যের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

খ. الإضافة (আল-ইযাফাহ): সংযুক্তি, মিলানো, সম্পর্কযুক্ত করা
এর শাব্দিক অর্থ: এক বস্তুর সাথে অপর বস্তুর যে কোনো সম্পর্ক ও সংযুক্তি। শরীয়তের পরিভাষায় কোনো কাজের পরবর্তী বিধানে বিলম্বিত মেয়াদ নির্ধারণ করা, কথা বলার সময় থেকে ভবিষ্যৎকালের সে সময় পর্যন্ত, যা কর্ম সম্পাদনকারী শর্তের শব্দ ব্যবহার না করে নির্ধারণ করে।
ইযাফাহ ও আজাল-এ দুটোতে পার্থক্যঃ ইযাফতে দুটো বিষয় একত্রে বিদ্যমান: ১. কোনো কাজ এবং ২. তার সময়। আজাল হচ্ছে নির্ধারিত সময় বা মেয়াদ।

গ. التوقيت (আত-তাওকীত): সময় নির্ধারণ, সময় বেঁধে দেওয়া
এর শাব্দিক অর্থ: কোনো কাজের জন্যে সময় নির্ধারণ। শরীয়তের পরিভাষায়: শরীয়তের কোনো বিধান বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার ব্যাপ্তি ভবিষ্যৎ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা।
তাওকীত ও আজাল এ দুটিতে পার্থক্য: আজাল হচ্ছে ভবিষ্যৎ সময় যা কোনো কাজের বিলম্বিত মেয়াদ বর্ণনা করে। তাওকীত হচ্ছে কোনো কাজের সময় নির্ধারণ করা।

ঘ. المدة (আল-মুদ্দাত): মেয়াদ, সময়
ইসলামী ফিকহগ্রন্থ অধ্যয়নে চার প্রকার মুদ্দত বা মেয়াদের উল্লেখ পাওয়া যায়: ১. মুদ্দাতুল ইযাফাহ, ২. মুদ্দাতুত তাওকীত, ৩. মুদ্দাতুত তানজীম ও ৪. মুদ্দাতুল ইসতি'জাল।
১. মুদ্দাতুল ইযাফাহ (মুদ্দাতুল ইদাফাহ): সম্পর্কিত বস্তুর মেয়াদ ভবিষ্যৎ যে মেয়াদের সাথে কোনো চুক্তির পরবর্তী কর্ম বাস্তবায়নের সূচনা সম্পর্কিত থাকে অথবা সালাম বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর মূল বস্তু বুঝিয়ে দেওয়া বা ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে তার বদল বুঝিয়ে দেওয়া সম্পর্কিত থাকে তা মুদ্দাতুল ইযাফাহ বলে অভিহিত হয়।

টিকাঃ
৯. ফাতহুল কাদীর, খ. ৩, পৃ. ৬১
১০. আল্লামা থানভী কৃত কাশশাফু ইসতিলাহাতিল ফুনূন, খ. ১, পৃ. ৮৩; আল-কুল্লিয়্যাত, খ. ২, পৃ. ১০৩; আল-মিসবাহুল মুনীর, وقت ماده
১১. বিভিন্ন ফিকহগ্রন্থের সম্পর্কিত আলোচনা।
১২. এটি যথাযথ ও জায়েয হওয়ার মত ব্যক্তিব করেছেন একযোগে হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহবৃন্দ।
১৩. বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ সহ মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। আল ফাতহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৬০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যে সকল ক্ষেত্রে কিস্তির প্রয়োগ রয়েছে

📄 যে সকল ক্ষেত্রে কিস্তির প্রয়োগ রয়েছে


১. দাইনুল কিতাবাহ (দাইনুল কিতাবাত): কিতাবাতের টাকা পরিশোধ: কিতাবাতের টাকা কিস্তি আকারে আদায় করা যাবে, এ কথায় সকল ফকীহ একমত। কিতাবাত-এর অর্থ: মনিব ও ক্রীতদাস এ কথায় একমত হওয়া, কিস্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ক্রীতদাস তার মনিবের হাতে তুলে দেওয়ার বিনিময়ে এখন থেকেই সে আর্থিক কাজকর্মে স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রকাশ করতে পারবে এবং সবগুলো কিস্তি পরিশোধ করলে পরিপূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে যাবে।
২. আদ-দিয়াতু ফিল কতাল শিবহিল আসদ ওয়ালা খাতা : দিয়াত বা রক্তমূল্য প্রদান: কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, হত্যাকাণ্ডে সাধারণত যা ব্যবহৃত হয় তা ভিন্ন অন্য কিছুর দ্বারা আঘাত করে অথবা ভুলবশত কাউকে যদি হত্যা করা হয়, তাহলে খুনের বদলা খুন করা হয় না। বরং এক্ষেত্রে যা বিধান তা হলো, হত্যাকারীর আত্মীয়-পরিজন রক্তমূল্য কিস্তি আকারে মোট তিন বছরে প্রদান করবে, প্রতি বছর এক-তৃতীয়াংশ করে পরিশোধ করতে হবে।
৩. উজরাহ্ (আল-উজরাহ): পারিশ্রমিক প্রদান: আল-মুগনী গ্রন্থে লেখা হয়েছে: যদি মজুরের সাথে শর্ত করা হয় তাকে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে, তাহলে সে পর্যন্ত সময় দীর্ঘায়িত হবে। যদি কিস্তি আকারে তা প্রদানের সিদ্ধান্তে উভয়ে একমত হয়, তাহলে তা বৈধ ও জায়েয হবে।

টিকাঃ
২০. কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ৫৩৯
২১. আশ-শারহুল কাবীর ও আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ১৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00