📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 পুঁজি ব্যবহারকারী ও পুঁজিদাতার মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ

📄 পুঁজি ব্যবহারকারী ও পুঁজিদাতার মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ


পুঁজিদাতা ও পুঁজি ব্যবহারকারীর মধ্যে যদি বিবাদ দেখা দেয়, পুঁজিগ্রহণকারী যদি দাবি করে, সে মুদারাবার ভিত্তিতে পুঁজি গ্রহণ করেছিল, আর পুঁজিদাতা দাবি করে, সে বিযা'আহ-এর ভিত্তিতে পুঁজি বিনিয়োগ করেছে, এ ক্ষেত্রে হানাফী, শাফেয়ী ও মালেকী ফকীহগণ বলেন, কসম করার শর্তে মালিকের দাবি গ্রহণ করা হবে। কেননা সে অস্বীকারকারী। বিষয়টি মালেকীগণ এভাবে ফয়সালা করেন, বিরোধের ক্ষেত্রে পুঁজিদাতার কর্তব্য, পুঁজিপ্রয়োগকারীকে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পারিশ্রমিক পরিশোধ করা। কিন্তু তার পারিশ্রমিকের পরিমাণ যদি গোটা পুঁজির মুনাফার অর্ধেকের চেয়ে বেশি হয়, তবে তাকে তার দাবির চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না। অপর তিন মাযহাবের ফকীহগণই বলেন, মালিকের কথা গ্রহণযোগ্য হওয়ার অর্থ হলো, পুঁজি ব্যবহারকারী যে অংশ দাবি করছে সে অংশের জিম্মাদার পুঁজিদাতা হবে না।

বিয়য়টির ব্যাখ্যা হলো, পুঁজিদাতা দাবি করছে, পুঁজি ব্যবহারকারী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পুঁজিদাতার পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ী তা এখন অস্বীকার করছে, বলছে সে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে করেনি, তাকে বাজারের রীতি অনুযায়ী পারিশ্রমিক দিতে হবে।

পুঁজিদাতা যদি কসম করতে অস্বীকার করে তবে পুঁজি ব্যবহারকারীর বক্তব্য কসমের মাধ্যমে গ্রহণ করা হবে- যদি এমন পুঁজি বা সম্পদ মুদারাবা হিসেবে ব্যবহারের অবকাশ থাকে। কোনো কোনো কারাভী ফকীহ সূত্রে বর্ণিত, সেই সমাজে যদি ইবদা'-এর ক্ষেত্রেও পারিশ্রমিক দেওয়ার রীতি থাকে, তবে সবচেয়ে উত্তম সমাধান হলো পুঁজি ব্যবহারকারীর কথাই গ্রহণ করা হবে।

হাম্বলীদের মতে এক্ষেত্রে দুটি সমাধানের পথ আছে। প্রথমত: পুঁজি ব্যবহারকারীর কথা গ্রহণ করা হবে। কেননা সে তার নিজের জন্য কাজ করেছে। অতএব নিজের স্বার্থের ক্ষেত্রে তার কথাই ধর্তব্য হওয়া উচিত। দ্বিতীয় সমাধানের পথ হলো, উভয়ের কাছ থেকে কসম নেওয়া হবে। এবং পুঁজি ব্যবহারকারীকে মুনাফার অংশ কিংবা প্রচলিত রীতিতে পারিশ্রমিকের মধ্যে যেটির পরিমাণ কম তা দেওয়া হবে। কেননা মুনাফার অংশের চেয়ে বেশি সে প্রত্যাশা করতে পারে না। তাই এর বেশি সে পাবে না। প্রচলিত পারিশ্রমিক যদি মুনাফার অংশ থেকে কম হয় তবে প্রমাণিত হবে এটি মুদারাবা নয়। ফলে তার জন্যে বাজারের রীতি অনুযায়ী পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে। আর অবশিষ্ট মুনাফার মালিক হবে পুঁজিদাতা। কারণ, লাভ পুঁজির অনুগামী।

কোনো কোনো ফকীহ এই অবস্থাকে প্রমাণের বৈপরীত্য আখ্যা দিয়ে বলেন, বিবদমান পক্ষের উভয়ই যদি নিজের পক্ষে দাবি ও প্রমাণ পেশ করে, তাহলে একজনের উপস্থাপিত প্রমাণ অন্যটির সাথে সাংঘর্ষিক বলে সাব্যস্ত হবে, এ অবস্থায় মুনাফা উভয়ের মধ্যে সমভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে। হাম্বলীদের বিশুদ্ধ অভিমত হলো, বস্তুত এটি দু'টি প্রমাণের বিরোধ নয়। ফলে উভয় পক্ষকে প্রতিপক্ষের দাবির বিপরীতে কসম করতে হবে এবং পুঁজি ব্যবহারকারীকে রীতি অনুযায়ী পারিশ্রমিক দেওয়া হবে।

পক্ষান্তরে এমনটি হওয়া সম্ভব নয় যে, পুঁজি ব্যবহারকারী ইবদা'-এর দাবি করবে আর পুঁজিদাতা মুদারাবা-এর দাবি করবে। কেননা এমন স্বার্থবিরোধী দাবি রীতি বিরুদ্ধ। অবশ্য কোনো ব্যক্তি যদি পুঁজিদাতার প্রতি অনুগ্রহ করে এমন দাবি করে তাহলে তা ভিন্ন কথা। এক্ষেত্রে বিরোধের কোনোই অবকাশ থাকবে না।

অবস্থা যদি এমন হয় যে, পুঁজি ব্যবহারকারী মুদারাবা চুক্তির দাবি করল, আর পুঁজিদাতা নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ইবদা' চুক্তির দাবি করল, (মালেকীগণ যেটি ইবদা' গণ্য করেন আর অন্যান্য ফকীহগণ এটিকে ইজারা সাব্যস্ত করেন), এ অবস্থায় পুঁজি ব্যবহারকারীর কথা কসম করার শর্তে গ্রহণ করা হবে। আর সে মুনাফার একটি অংশের অধিকারী হবে। কেননা এখানে লাভের সে অংশ নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে যা কর্মীর জন্যে শর্ত করা হয়েছে। আর এ বিষয় নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে কর্মীকে সত্যবাদী গণ্য করা হবে। উল্লিখিত বিরোধ যদি এমন হয় যে, মুদারাবার যে অংশ দাবি করা হয়েছে পারিশ্রমিক ঠিক সেটির সমান হয়, তাহলে এ অবস্থায় কোনো কসমের প্রয়োজন নেই। এর কারণ, এক্ষেত্রে মূলত উভয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, শুধু শব্দের পার্থক্য, যা কারো জন্যে ক্ষতির কারণ হবে না।

উল্লিখিত মাসআলা সমাধানে মালেকীগণ পাঁচটি শর্ত উল্লেখ করেছেন:
ক. মুদারাবা চুক্তি আবশ্যিক হওয়ার ক্ষেত্রে যে কাজগুলো জরুরি সেগুলো সম্পাদিত হওয়ার পর বিরোধ দেখা দেবে।
খ. যে ব্যক্তি পুঁজি ব্যবহার করেছে সে মুদারিবা চুক্তিতে ব্যবসা করতে অভ্যস্ত এবং যে পুঁজি দেওয়া হয়েছে মুদারাবা চুক্তিতে সচরাচর এ পরিমাণ পুঁজি দেওয়া হয়, এমন হতে হবে।
গ. মুদারাবার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার দাবিতে লাভের যে দাবি করা হয়েছে তার পরিমাণ উভয় পক্ষের সম্মত পারিশ্রমিকের চেয়ে বেশি হবে।
ঘ. মুদারাবার মুনাফা অংশ দুজনের মধ্যে সমান বা যে কোনো ভাগে বিভক্ত হবে তা যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। এমন মনে হবে, পুঁজি ব্যবহারকারী যে পারিশ্রমিকের দাবি করছে তা বাজারমূল্য অনুযায়ী সঠিক এবং এ ধরনের লোক এই পরিমাণই দাবি করে থাকে।
ঙ. আর পুঁজিদাতার দাবি যদি প্রচলনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়; তাহলে এ অবস্থায় সমাধানের পথ হলো: পুঁজি ব্যবহারকারী যদি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ইবদা' চুক্তির দাবি করে আর পুঁজিদাতা সুনির্দিষ্ট লভ্যাংশের ভিত্তিতে মুদারাবা চুক্তির দাবি করে, এ অবস্থায় সমাধানে মালেকী ফকীহগণ বলেন, পুঁজি ব্যবহারকারীর দাবি গ্রহণ করা হবে। এবং উপরে যেসব শর্ত বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

পুঁজি ব্যবহারকারী মুদারাবা চুক্তির দাবি করে আর পুঁজিদাতা ইবদা' চুক্তি দাবি করে এবং তাদের উভয়েই একান্তে নিজের স্বার্থে অটল থাকে, তবে হাম্বলীদের মতে প্রতিপক্ষের দাবিকে অস্বীকার করার কারণে প্রত্যেকের কাছ থেকেই কসম নেওয়া হবে। কেননা প্রতিপক্ষের দাবি অস্বীকারকারীর কথা কসমের সাথে গ্রহণ করা হয়। চূড়ান্ত বিচারে পুঁজি ব্যবহারকারীকে পরিশ্রমের বিনিময়স্বরূপ পারিশ্রমিক দেওয়া হবে, আর অবশিষ্ট পুরোটাই পাবে পুঁজিদাতা। কেননা তার সম্পদে বৃদ্ধি মূল সম্পদের অনুবর্তী।

হানাফীদের মত, এমনি ভাবে মালেকীগণ মুদারাবার অধ্যায়ে যা বলেছেন তার চাহিদা অনুসারে সমাধান হলো, কসমের শর্তে পুঁজিদাতার বক্তব্য গ্রহণ করা হবে এবং পুঁজিব্যবহারকারীর প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হবে। কেননা সে পুঁজিদাতার বিপক্ষে সম্পদের মালিকানা দাবি করছে, আর মালিক তা অস্বীকার করছে।

টিকাঃ
১৯. আল-মুদাওয়ানা, খ. ১১, পৃ. ১২৭, প্রকাশ: আস-সাআদাহ; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৫, পৃ. ৩৭০; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৭৫৩; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ১৫৭, প্রকাশক: মুস্তাফা আল হালাবী
২০. আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৪৪০; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৫, পৃ. ৩৭০
২১. আল-মুগনী ওয়াশ শারহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ১৯৫; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৪২; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩৩৮
২২. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৪১
২৩. আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৪৪০; আত-তাজ ওয়াল ইকলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৭০; আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৫৩৬
২৪. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৪২; আল-মুগনী ওয়াশ শারহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ১৯৬
২৫. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৭৫৩; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ১৫৭

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ইবদা’ চুক্তির সমাপ্তি

📄 ইবদা’ চুক্তির সমাপ্তি


মুদারাবা চুক্তির সমাপ্তি যেভাবে ঘটে, ইবদা' চুক্তির সমাপ্তিও সেই একই ভাবে ঘটবে। নিম্নে সংক্ষিপ্তাকারে ইবদা' চুক্তি পরিসমাপ্তির কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলো :

ক. মূল ইবদা-চুক্তি অথবা এর অনুগামী চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণের কারণে পরিসমাপ্তি ঘটা। ইবদা' যদি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা হয় তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটবে। ইবদা' যদি মুদারাবা চুক্তির অনুচুক্তি হয়ে থাকে তাহলে মুদারাবা চুক্তির সমাপ্তি ঘটলে ইবদারও সমাপ্তি ঘটবে।

খ. দুপক্ষের কেউ যদি চুক্তি রহিত করে। পুঁজিদাতা যদি পুঁজি ব্যবহারকারীকে অব্যাহতি প্রদান করে কিংবা পুঁজি ব্যবহারকারী নিজেই যদি নিজেকে ইবদা' চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেয়, তাহলে চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটবে। কেননা এই চুক্তি দুপক্ষের কারো জন্যেই অপরিহার্য ছিল না, তাই যে কোনো সময় প্রত্যাহার কিংবা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার উভয়ের থাকবে।

গ. দুপক্ষের কারো হস্তক্ষেপ কিংবা ইচ্ছা ছাড়া অন্যভাবে যদি বিষয়টির সমাপ্তি ঘটে; যেমন, দুপক্ষের কারো মৃত্যু কিংবা চুক্তি বহাল রাখার অক্ষমতা কিংবা চুক্তিক্ষেত্রের বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণে চুক্তি কার্যকরের সম্ভাবনা না থাকে, তবে এমনিতেই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটবে।

টিকাঃ
২৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১০৯; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫১১; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৪৩৯; আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৫৩৫; তুহফাতুল ফুকাহা, খ. ৩, পৃ. ৩১; জামেয়া দামেশক; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩১৯; আল-মুগনী ওয়াশ শারহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ১৮৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫৩৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00