📄 কোন্ ধরনের ব্যক্তি ইবদা’ প্রক্রিয়ায় পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারে?
নিম্ন লিখিত ব্যক্তিবর্গ ইবদা' প্রক্রিয়ায় পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারে:
ক. মালিক (مالك) পুঁজি বা সম্পদের অধিকারী: যে কোনো ব্যক্তি তার পুঁজি বা সম্পদ ইবদা' প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করতে পারে। এটি প্রকৃত অবস্থা।
খ. মুদারিব (الْمُضَارِبُ): অন্যের পুঁজিতে যে শ্রম বিনিয়োগ করে সে ইচ্ছা করলে তার নিয়ন্ত্রিত পুঁজি অন্যকে বিযা'আহ প্রক্রিয়ায় দিতে পারে। কেননা, মুদারিবের লক্ষ্য থাকে ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জন। আর বিযা'আহ মুনাফা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। মুদারিব ইচ্ছা করলে তার অধীনস্থ পুঁজি অন্যকে ইজারার ভিত্তিতে দিতে পারে; তাই বিযা'আহ প্রক্রিয়ায় সে স্বভাবতই বিনিয়োগ করার অধিকার পাবে। কেননা, ইজারা হলো সুনির্দিষ্ট বিনিময়ের বিপরীতে সম্পদ হস্তান্তর; আর বিযা'আহ কোনো বিনিময়হীন বিনিয়োগ। তাই এটি অবশ্যই বৈধ হবে।
তা ছাড়া মুদারিবের ইবদা'-এর অধিকার এ জন্য রয়েছে যে, ইবদা' মুদারাবার অন্তর্ভুক্ত। ফলে কোনো কোনো ফকীহ-এর কাছে ইবদা' প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগের জন্য পুঁজিমালিকের অনুমতি নেওয়াও আবশ্যিক নয়। মুদারিবের জন্য ইবদা' বৈধ হওয়ার ব্যাপারটি ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতিনিধি নিয়োগ, বন্ধক রাখা কিংবা বন্ধক দেওয়া, ইজারা দেওয়া কিংবা আমানত রাখা ইত্যাদি লেনদেনের চেয়ে আরো অধিক বৈধ একটি প্রক্রিয়া।
গ. শারীক (الشريك) : অংশীদার : অংশীদারিমূলক ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত কোনো শরীকের ব্যবসায়ের পুঁজি ইবদা' প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করা জায়েয। হানাফী ও মালেকী ফকীহগণ এবং বিশুদ্ধ বর্ণনামতে হাম্বলী ফকীহগণ এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য শাফেয়ীগণ অন্য অংশীদারদের অনুমতি সাপেক্ষে বিনিয়োগে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।
টিকাঃ
১৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৮৭; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৫, পৃ. ৩৬২, প্রকাশ: মাকতাবাতুন নাজাহ, লিবিয়া; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৭, পৃ. ২৬৪-২৬৭; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৭৪২-৭৪৯
📄 ইবদা’ প্রক্রিয়ায় পুঁজিগ্রহণকারী এবং তার লেনদেনের শরয়ী অবস্থা
বিযা'আহ প্রক্রিয়ায় সম্পদ গ্রহণকারী হচ্ছে পুঁজিদাতার পুঁজির আমানতদার। কেননা ইবদা'-এর লেনদেন আমানতের লেনদেন। ফলে পুঁজিগ্রহণকারীর অবহেলা কিংবা সীমালঙ্ঘন ছাড়া যদি পুঁজি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে তার ওপর কোনো জরিমানা বা দায় বর্তাবে না। এক্ষেত্রে সে পুঁজিদাতার প্রতিনিধি। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রয় বিক্রয়ে সে পুঁজিদাতার স্থলাভিস্থিক্ত বিবেচিত হবে, যেমনটি ব্যবসা বাণিজ্যে প্রচলিত আছে। তাই পুঁজি ব্যবহারে পুঁজিদাতার বিশেষ কোনো অনুমতিরও প্রয়োজন হবে না। কিন্তু ইবদা' প্রক্রিয়ায় পুঁজিগ্রহণকারী যদি অন্য কাউকে সেই পুঁজি ইবদা' আকারে বিনিয়োগ করতে দিতে চায়, তাহলে মুদারাবা-এর ওপর তুলনা করে তাকে পুঁজিদাতার অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। সে সকল কাজেও পুঁজিদাতার অনুমতি নিতে হবে যে সকল কাজ ব্যবসায়ীদের নৈমিত্তিক কাজ বহির্ভূত। যেমন মূল পুঁজি, যা বাড়ানোর লক্ষ্যে ভিন্ন করা হয়েছে তা থেকে ধার, সাদকা, হাদিয়া ইত্যাদি প্রদানে মালিকের অনুমতি নিতে হবে।
📄 পুঁজি ব্যবহারকারী নিজের জন্যে ইবদা’-এর পুঁজি দিয়ে কিছু ক্রয় করা
বিযা'আহ প্রক্রিয়ায় যদি কেউ কাউকে ব্যবসা করার জন্য পুঁজি দেয় তবে তা দিয়ে পুঁজি ব্যবহারকারী নিজের ব্যবসা করতে পারবে না। যেহেতু পুঁজি ব্যবহারকারী এক্ষেত্রে মুদারিবায় শ্রম বিনিয়োগকারীর অনুরূপ। কেননা মুদারাবার ক্ষেত্রে যেমন লাভের জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়, ইবদা'-এর ক্ষেত্রেও মুনাফা অর্জনই উদ্দেশ্য থাকে। তাই সে পুঁজিদাতাকে বাদ দিয়ে নিজের স্বার্থে পুঁজি ব্যবহারের অধিকার পায় না।
মালেকী ফকীহগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, পুঁজি ব্যবহারকারী যদি নিজের স্বার্থে ইবদা'-এর পুঁজি দিয়ে কোনো কিছু ক্রয় করে, তবে পুঁজিদাতা ইচ্ছা করলে ক্রয়কৃত পণ্য নিজেই কব্জা করে নিতে পারবে। অথবা সে এই পুঁজির দায় তার নিজের কাঁধে বর্তাবে। কেননা সে পুঁজি ব্যবহারকারীকে নির্দিষ্ট জিনিস ক্রয় কিংবা ব্যবসার জন্য পুঁজি দিয়েছে। অতএব সেই তো এ পণ্য হস্তগত করার অধিক অধিকারী। তবে এটি তখনই সম্ভব যখন পুঁজি ব্যবহারকারী সে পণ্য বিক্রির আগেই পুঁজিদাতার কজায় তা এসে পড়ে। কিন্তু ক্রয়কৃত পণ্য যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, এবং সে তা বিক্রি করে দেয়, তবে এর সবটুকু মুনাফা পুঁজিদাতা পাবে। এবং এর লোকসানের দায় পুঁজির মালিকের পাশাপাশি পুঁজি ব্যবহারীর কাঁধেও বর্তাবে। পুঁজি ব্যবহারকারীর পক্ষ থেকে অনধিকারচর্চার প্রমাণ পাওয়া গেলে শাফেয়ীগণও একইমত পোষণ করেন।
হাম্বলীগণ বলেন, নিজের জন্য ক্রয়কৃত পণ্যে যদি মুনাফা হয় তবে এই মুনাফা পুঁজির মালিক পাবে; আর যদি লোকসান হয় তবে অনধিকার চর্চার কারণে এর দায় পুঁজি ব্যবহারকারীর কাঁধে বর্তাবে। হানাফী ফকীহগণও একই মত পোষণ করেন।
টিকাঃ
১৬. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৫, পৃ. ২৫৫
১৭. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৫, পৃ. ২৫৫; আল-উম্মু, খ. ৩, পৃ. ২৩৭, প্রকাশ: বুলাক; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৫৯, প্রকাশ রিয়াদ; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৪০৫; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ৩৪৭১; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ৫৭৭
📄 সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা লোকসান হওয়া
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইবদা' লেনদেন আমানতের লেনদেন। তাই ইবদা'র সম্পদ যদি নষ্ট হয়ে যায় কিংবা ব্যবসায়ে লোকসান হয় তবে পুঁজি ব্যবহারকারীর ওপর কোনো জরিমানা ধার্য হয় না- যদি এই ধ্বংস বা ক্ষতির মধ্যে পুঁজিগ্রহীতার কোনো সীমালঙ্ঘন কিংবা অবহেলার কারণ না থাকে। তাই পুঁজি ব্যবহারকারী যদি পুঁজি ধ্বংসের কিংবা লোকসানের দাবি করে, তবে তার কথা গ্রহণ করা হবে। ফকীহগণ এও বলেছেন, পুঁজিদাতা যদি এ কথা বলেও থাকে যে, লোকসান কিংবা পুঁজি ধ্বংস হলে এর দায় তোমার, তবুও তার ওপর কোনো দায় বর্তাবে না, যেহেতু এই লেনদেনটি একটি আমানত হওয়ার দাবি করে।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দুই শীর্ষস্থানীয় শাগরেদ (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.)-এর পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়েছে, সাধারণ শ্রমিক কোনো সম্পদ ধ্বংস হওয়ার দাবি করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। হ্যাঁ, যদি তার দাবির পক্ষে সত্যিকার কোনো সহায়ক ইঙ্গিত পাওয়া যায় তবে জরিমানার দাবি গ্রহণযোগ্য হবে। যেমন কোনো ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড কিংবা সম্পদ ধ্বংসকারী চোর-ডাকাতের আক্রমণ কিংবা প্রতিহিংসা পরায়ণ কোনো শত্রুর নাশকতা। এই দুই ফকীহ বলেন, এই বিধানটি ইসতিহসান হিসেবে। কেননা বর্তমানে মানুষের মনমানসিকতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। পেশাজীবী ও শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে উমর রা. ও আলী রা. এমন বিধানই প্রয়োগ করেছেন। এ পর্যায়ে লক্ষণীয়, শিল্পক্ষেত্রে যন্ত্র ও কাঁচামাল শ্রমিকদের কাছে যেমন মালিকের পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়, তদ্রূপ ইবদা'-এর পুঁজিও ব্যবহারকারীর কাছে আমানত। ফলে বিযা'আহ-কে আমানতের সাথে তুলনা করা অপ্রাসঙ্গিক নয়।
টিকাঃ
১৮. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৫, পৃ. ৩৭৯; আল-মুকনি, খ. ২, পৃ. ১৭২-১৭৫; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৫, পৃ. ৪০; আল কালয়ুবী, খ. ৩, পৃ. ৮১, প্রকাশক: ঈসা আল-হালাবী; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৪০৮