📄 ইবদা’-এর শরয়ী দর্শন
ইবদা' একটি ব্যবসায়িক কর্ম। ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কেননা অনেক সময় সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির সম্পদ থাকলেও হয়তো সে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো বুঝে না। কিংবা তার পক্ষে প্রচলিত বাজারের গতিবিধি বোঝা মুশকিল। কোনো ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে, সে ব্যবসা-বাণিজ্য বুঝে ঠিকই, কিন্তু তার পক্ষে বাজারে যাওয়ার সুযোগ নেই। কখনো এমন হতে পারে যে, বাজারে গিয়ে অন্যদের মতো কেনাবেচা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়- নারী কিংবা অধিকতর মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হওয়ার কারণে; এসব কারণে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ তাদের প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারে। আর কোনো প্রতিদান ছাড়া প্রতিনিধি নিয়োগই হলো ইবদা'। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইবদা' হলো পারস্পরিক সৌহার্দ, সম্প্রীতি, পরোপকার ও ভ্রাতৃত্ববোধ শক্তিশালীকরণের একটি উপায়।
ইবদা' চুক্তি যেমন সম্পদশালী ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধির উপায় হতে পারে, তেমনই তা স্বেচ্ছায় ইবদা' কর্ম সম্পাদনকারীর সম্পদ বৃদ্ধিরও উপায় হতে পারে। যেমন সম্পদ বিনিয়োগকারী স্বেচ্ছাসেবী ইবদা' কারীর সম্পদের সাথে তারও সম্পদ একত্রিত করে একটা ব্যবসায়িক লেনদেন করল। যেমন পুঁজিদাতার এক হাজারের সাথে সেও এক হাজার দিল, লাভ নিল অর্ধেক করে। তাতে পুঁজি বাড়ল, তাতে লাভও বাড়ল। তাতে কর্মীর বিশেষ উপকার সাধিত হলো। এক্ষেত্রে অর্ধেক বিনিয়োগকারী হিসেবে পুঁজিদাতাকে সে যেমন মুনাফা করে দিয়েছে, তদ্রূপ সে নিজেও অর্ধেক বিনিয়োগ করার কারণে পুঁজি বৃদ্ধি করতে পেরেছে, ফলে লাভেও বৃদ্ধি ঘটেছে।
টিকাঃ
৫. আল-মুগনী ওয়াশ শারহুল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ২০৩
৬. মুদারাবা ক্রয়-বিক্রয়ে ধোঁকা ও প্রতারণার অবকাশ তখন তৈরি হয় যখন কর্ম ও পারিশ্রমিক উভয়টি অজ্ঞাত বা অনির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু এই প্রতারণার অবকাশকে এ জন্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যে, মুদারাবা বৈধ হওয়ার পক্ষে সুন্নাহ ও ইজমার আলোকে মজবুত প্রমাণ রয়েছে।
📄 ইবদা’ সংঘটনের শব্দাবলি
ফকীহগণ এ কথায় একমত, যে কোনো লেনদেন ও মু'আমালার ক্ষেত্রে প্রস্তাব ও সম্মতি তথা ঈজাব ও কবুল থাকা অপরিহার্য। বিস্তারিত আলোচনা জানতে দ্রষ্টব্য عقد।
ইবদা' চুক্তি সম্পাদনে যে সকল শব্দ ব্যবহৃত হয় সে সব দুধরনের। কখনো দ্ব্যর্থহীন ভাবে ইবদা' বা বিযা'আহ বলা হতে পারে, আবার কখনো তা ইঙ্গিতপূর্ণ হতে পারে। যেমন কোনো পুঁজির অধিকারী ব্যক্তি বলল: خُذْ هَذَا الْمَالِ مُضَارَبَةً عَلَى أَنْ يَكُونَ الرِّبْحُ كُلُّهُ لِي “আমার এই পরিমাণ পুঁজি তুমি মুদারাবার ভিত্তিতে ব্যবসায়িক কাজে লাগাতে পারো, তবে লাভ যা হবে তা হবে একান্তই আমার।" এটি শুদ্ধ হবে কি না, তা নিয়ে ফকীহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, এ ধরনের চুক্তি বৈধ হবে না। কারণ এই চুক্তির মধ্যে পারস্পরিক বৈপরীত্য আছে। কেননা, পুঁজিদাতার মুদারাবা শব্দ উচ্চারণ এক্ষেত্রে মুনাফা ভাগাভাগি হওয়ার দাবি করে, অথচ 'লাভ সবটুকু আমার থাকবে' কথা বলার দ্বারা লভ্যাংশে কোনো প্রকার ভাগাভাগির অবকাশ থাকল না। ফলে পুঁজিদাতার প্রস্তাব ত্রুটিপূর্ণ ও স্ববিরোধী হয়েছে; ফলে মুদারাবা শুদ্ধ হবে না। পুঁজিদাতা মুনাফাকে মুদারাবার এক পক্ষের জন্য নির্দিষ্ট করার শর্ত করার কারণে তার এই বক্তব্য মুদারাবা ভেঙ্গে দেবে। কেননা মুদারাবা-চুক্তিতে এমন শর্তারোপের অবকাশ নেই।
তাছাড়া কোনো শব্দ যদি মৌলক্ষেত্রে সুস্পষ্ট হয়ে থাকে তা অন্যক্ষেত্রে দ্ব্যর্থবোধক বা ইঙ্গিতপূর্ণ হয় না। ফলে মুদারাবা অর্থে সুস্পষ্ট শব্দ যেমন ইবদা' বোঝায় না, তদ্রূপ তা ঋণেও রূপান্তরিত হয় না। উল্লিখিত কারণে হাম্বলীগণ এই চুক্তিকে ফাসিদ মুদারাবা বলে অভিহিত করেন।
হানাফী ফকীহগণ বলেন, এক্ষেত্রে ইবদা'-এর অর্থ পাওয়ার দরুন তা সহীহ হবে। যেমন কেউ যদি কাউকে বলে, 'আমার এই পুঁজি বা সম্পদ দিয়ে তুমি ব্যবসা করো, তবে সম্পূর্ণ মুনাফা আমার হবে।' কেননা, চুক্তির বেলায় শব্দের অর্থই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।
ইমাম মালেক রহ.-এর অধিক গ্রহণযোগ্য মতের ভিত্তিতে মালেকী ফকীহগণ মুদারাবা ব্যবসায়ে পুঁজিদাতা ও পুঁজি ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীর মধ্যে কোনো একজনকে পুরো মুনাফা গ্রহণের শর্তারোপকে বৈধ মনে করেন। মুদাউওয়ানা গ্রন্থে এ দুজন ছাড়া অন্য কারো জন্যে মুনাফা দেওয়ার শর্তকেও বৈধ বলা হয়েছে। কেননা ইবদা' হচ্ছে একটি সৌজন্যমূলক কাজ। কিন্তু হানাফীদের মতো মালেকীগণ এ ধরনের লেনদেনকে ইবদা' হিসেবে অভিহিত করেন নাই। তারা বলেন, এখানে মুদারাবার প্রয়োগ রূপকভাবে হয়ে থাকে। এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, এক্ষেত্রে হানাফী ও মালেকীগণ একই মত পোষণ করেন- যদিও তারা এটিকে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করেন।
উপরের বর্ণনা মতে যারা এটিকে সহীহ মনে করেন, তাদের মতে পুঁজি ব্যবহারকারী কোনো প্রতিদানের অধিকারী হবে না। বরং তার শ্রম স্বেচ্ছাশ্রম হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যারা এ ধরনের লেনদেনকে ফাসেদ মনে করেন, তাদের মতে এমন লেনদেন করলে পুঁজি ব্যবহারকারীর প্রচলিত নিয়মানুযায়ী পারিশ্রমিক প্রাপ্য হবে।
কোনো কোনো শাফেয়ী ফকীহ পুঁজি ব্যবহারকারীর অবস্থা বিবেচনা করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। পুঁজি ব্যবহারকারী যদি ইবদা'-এর বিধান সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞাত থাকে যে, ইবদা'-এর লেনদেনে পুঁজি ব্যবহারকারী পারিশ্রমিক ও মুনাফার অংশ কিছুই পায় না, এ অবস্থায় পুঁজি ব্যবহারকারী প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। তারা এ মতটির সূত্র হিসেবে হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর উদ্ধৃতি দেন। এবং এই অজ্ঞতাকে তারা একপ্রকার অক্ষমতা হিসেবে গণ্য করেন।
মুদারাবা (المضاربة) শব্দের দ্বারা ইবদা' (الإبضاع) সংঘটনের বিধানাবলিঃ
হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, কোনো পুঁজির অধিকারী যদি কাউকে বলে, মুদারাবার ভিত্তিতে তুমি এই পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করো, কিন্তু সম্পূর্ণ মুনাফা হবে আমার। এ অবস্থায় এই মুদারাবা চুক্তি সহীহ হবে না। আর বিশুদ্ধ তথ্য মতে পুঁজি ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীর কোনো প্রকার প্রতিদানও প্রাপ্য হবে না। কেননা পুঁজি ব্যবহারকারী কোনো প্রতিদান ছাড়াই কাজ করতে সম্মত হয়েছে। ব্যাপারটি এমন যে, সে যেন কাউকে ব্যবসায়িক কাজে সহযোগিতা করল এবং প্রতিদান ছাড়াই তার প্রতিনিধিত্ব করল।
অন্য শব্দ দ্বারা ইবদা'ঃ
ইবদা' শব্দ যদি স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ নাও করা হয় তবুও যে সব শব্দ ইবদা'-এর অর্থ প্রদান করে সে সব শব্দ দ্বারাও ইবদা' কার্যকর হবে। সেই সব শব্দের মধ্যে রয়েছে, যেমন কোনো পুঁজির অধিকারী বলে, خُذْ هَذَا الْمَالِ وَأَتَّحِرْ فِيهِ ، أَوْ تَصَرَّفَ فِيهِ "আমার এই পুঁজি নাও এবং ব্যবসা করো কিংবা তা কাজে লাগাও' কিংবা বলল, خُذْهُ وَالرِّبِّহُ كُلُّهُ لِي 'এই নাও পুঁজি, কিন্তু সম্পূর্ণ লাভ হবে আমার'। এসব শব্দ উল্লেখ করলে শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে এই লেনদেন ইবদা' লেনদেন হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, এসব শব্দ দ্বারা লেনদেনটিতে যদিও মুদারাবা, কর্জ কিংবা ইবদা' এই তিনটিরই সম্ভাবনা থাকে, তবে বিশেষভাবে 'সম্পূর্ণ মুনাফা আমার থাকবে' বলার দ্বারা ইবদা'-এর বিধান এক্ষেত্রে কার্যকর হবে। হানাফী ও মালেকীদের মূলনীতির দ্বারাও তা-ই বোঝা যায়।
অনুরূপ কোনো লোক যদি কাউকে এক হাজার টাকা দিয়ে বলে: أَضف إلَيْهِ أَلْمًا من عندكَ ، وَاتَّخِرْ فِيهِ ، وَالرِّبْحُ بَيْنَنَا نِصْفَانِ 'এর সাথে তোমারও এক হাজার টাকা যুক্ত করে ব্যবসা করো, মুনাফা তোমার আর আমার মধ্যে সমান সমান হবে,' তবে এটিও ইবদা' চুক্তি বলে গণ্য হবে।
টিকাঃ
৭. হাশিয়াতুর রাশীদী ওয়া শাবরামাল্লিসী আলা নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২২৪; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৬, পৃ. ৮৯
৮. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫১৮, প্রকাশ: আল-মাকতাবুল ইসলামী; আল ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪২৮, প্রকাশক: হামিদ আল-ফক্বী; আল-মুকনি, খ. ২, পৃ. ১৭৮; আল-মুগনী ওয়াশ শারহুল কবীর, খ. ৫, পৃ. ১৩৬; হাশিয়াতুর রাশীদী আলা নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২২৪; হাশিয়াতুশ শিরওয়ানী আলা তুহফাতুল মুহতায, খ. ৬, পৃ. ৮৯; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫
৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৮৬; আল-মুগনী ওয়াশ শারহুল কবীর, খ. ৫, পৃ. ১১২-১৩৭; আসহালুল মাদারিক, খ. ২, পৃ. ৩৫৪; বুলগাতুস সালিক, খ. ২, পৃ. ৩৪৯
১০. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫; নিহায়াতুল মুহতাজ ওয়া হাওয়াশীহি, খ. ৫, পৃ. ২২৪; আল-খিরাশী, খ. ৪, পৃ. ৪২৫; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ২৪৯; ইবনু কাসিম আলাত তুহফা, খ. ৬, পৃ. ৮৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৫১৮; আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ৪২৮; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১২৬
১১. শারহুল মুনতাহা, খ. ২, পৃ. ৩২৮; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬৫
১২. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮৫; নিহায়াতুল মুহতাজ ওয়া হাওয়াশীহি, খ. ৫, পৃ. ২২৪; আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কবীর, খ. ৫, পৃ. ১১২-১৩১; আল-মুকনি, খ. ২, পৃ. ১৭২
📄 ইবদা’ ও মুদারাবা-এর সম্মিলন
কোনো পুঁজিপতি যদি কাউকে অর্ধেক পুঁজি ইবদা' আকারে এবং অর্ধেক পুঁজি মুদারাবা-এর ভিত্তিতে প্রদান করে এবং পুঁজি ব্যবহারকারী পুঁজি কব্জা করে, তবে তা জায়েয হবে এবং চুক্তি অনুযায়ী অর্ধেক মুদারাবা এবং অর্ধেক ইবদা' লেনদেন বলে গণ্য হবে। এ সময় লোকসানের ভাগ পুঁজি বিনিয়োগকারীর ভাগে পড়বে। লাভ হলে অর্ধেক মুনাফা পুঁজিদাতা পাবে, আর অর্ধেক মুনাফা দুজনের মধ্যে ভাগ হবে। কেননা, উভয় ধরনের পুঁজি একত্রিত হওয়া একত্রে মুদারাবা ও ইবদা' ব্যবসায়ে কোনো বাধা প্রদান করে না, ফলে একই সাথে মুদারাবা ও ইবদা' উভয়টি করে যাওয়া সম্ভব।
লোকসানের দায় পুঁজিদাতার কাঁধে বর্তানোর কারণ হলো, ইবদাকারী ও মুদারিব-এর উপর কোনো দায় আসে না এবং ইবদা'তে মুনাফার সবটুকু পুঁজিদাতার জন্য নির্দিষ্ট থাকে বিধায় ব্যবসায় পরিচালনাকারী তাতে লাভের অংশ পায় না।
টিকাঃ
১৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৮৩
📄 ইবদা’ সহীহ হওয়ার শর্তাবলি
মুদারাবা ব্যবসায়ের মধ্যে যে সকল শর্ত রয়েছে ইবদা' ব্যবসায়ের শর্তাবলি সেগুলো থেকে ভিন্ন নয়। তবে এক্ষেত্রে মুনাফা পাওয়ার শর্তগুলো কেবল ব্যতিক্রম। সেই সাথে লক্ষণীয়, যে ব্যক্তি ইবদা' ব্যবসার পুঁজি ব্যবহার করবে সে পুঁজিদাতাকে সৌজন্যমূলক ব্যবসা করে দেওয়ার যোগ্যতা রাখে কি-না সেটি বিচার্য বিষয়। এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে হলে الْمُضَارَبَة ভুক্তি দেখুন।
টিকাঃ
১৪. কানযুদ দাকায়েক, খ. ৭, পৃ. ২৮৭-২৮৮