📄 মুদ্রার মূল্যমান স্থির রাখার ব্যাপারে রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্বশীল
একটি মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান জনসেবামূলক যেসব কর্ম সম্পন্ন করেন; সেসবের মধ্যে এটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি যে, তিনি তার দেশে প্রচলিত মুদ্রার মূল্যমান যাতে নিম্নমুখী না হয়; এ ব্যাপারে নজরদারি করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কেননা, মুদ্রার মূল্য হ্রাসের কারণে খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য পণ্যের দামদর বৃদ্ধি পায় এবং দারিদ্র্য ছড়িয়ে পড়ে। এর বিপরীতে মুদ্রার মূল্যমান স্থির রাখার সুফল হচ্ছে এতে জনগণ তাদের কষ্টার্জিত মুদ্রার মূল্যের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকে। বলাবাহুল্য, মুদ্রার মূল্যমান কমে গেলে জনসমাজে নানা অস্থিরতা ও সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে。
রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক মুদ্রা বাতিলের কারণে মুদ্রাব্যবস্থায় কোনো প্রকার সমস্যার সৃষ্টি হলে তিনি নিজ দায়িত্বে বাতিলকৃত মুদ্রার সমমানের অন্য কোনো মুদ্রা বাজারে চালু করবেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট তাড়াহুড়া করবেন না, বরং প্রচলিত মুদ্রা রদ-বদল করতে জনসাধারণকে এমন দীর্ঘ সময় বেধে দিবেন; যাতে করে ওই সময়ের মধ্যে তারা তাদের দায়িত্বে থাকা মুদ্রাদি রাষ্ট্রীয় ট্রেজারিতে জমা দিয়ে এগুলোর বদল মুদ্রা গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে আরেকটি স্মর্তব্য বিষয় এই যে, বাতিলকৃত মুদ্রার মূল্যমানের চেয়ে নুতন চালুকৃত মুদ্রার মূল্যমান অধিক হবে না। এ-প্রসঙ্গে ইমাম আল-বুহুতী রহ. বলেন, ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন, “সরকার তার জনসাধারণের যথাসম্ভব ন্যায্যভাবে লেনদেনের প্রতি লক্ষ্য রেখে মুদ্রা চালু করবে। মুদ্রা তৈরি ও চালুর ক্ষেত্রে তিনি জনসাধারণের প্রতি কোনো অত্যাচার করবেন না। মুদ্রা তৈরির উপাদান নিয়ে সরকার কোনো প্রকার ব্যবসায়িক লাভ করতে পারবে না। যেমন: তিনি তামা ক্রয় করে সে তামা দিয়ে মুদ্রা বানিয়ে লাভের চিন্তা করবেন। এমনকি তার ব্যক্তিস্বার্থে জনসাধারণের হাতে থাকা মুদ্রা বাতিল করে তদস্থলে তিনি তার খেয়ালখুশি মতো নতুন কোনো মুদ্রা চালু করতে পারবেন না। বরং এক্ষেত্রে তার কর্তব্য হচ্ছে, তিনি বাজারে প্রচলিত মূল্যে তামা ক্রয় করে কোনো প্রকার লাভ ব্যতীত তা টাকশালে সরবরাহ করবেন। এবং টাকশালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাইতুল মাল থেকে প্রদান করবেন। যাতে করে মুদ্রা তৈরিতে অতিরিক্ত খরচ না হয়। মুদ্রা তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকারে ব্যবসা করা জনগণের ওপর বিরাট জুলুম ও অত্যাচারের শামিল। এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করার অনুরূপ গুনাহ। সরকার নিজের কোনো মুদ্রাকে (তার নির্বাহী ক্ষমতা বলে) বাতিল করে তদস্থলে অন্য মুদ্রা চালু করলে মুদ্রার মূল্যমান বাতিল হওয়ার কারণে জনগণের আর্থিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।”
ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন, মহানবী সা. থেকে বর্ণিত: “তিনি বিনা কারণে মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থা ভেঙ্গে বা বদলে দিতে নিষেধ করেছেন।”
ইবনুল কাইয়িম রহ. এ সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন সে বর্ণনার সারমর্ম হচ্ছে: মুদ্রার মূল্যমান স্থায়ী ও উপভোগ্য (আকর্ষণীয়) হতে হবে এবং মুদ্রার মূল্যমান যখন-তখন কোনো কারণ ব্যতীত উঠানামা করবে না। তিনি বলেন, মুদ্রার মূল্যমানের এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করেই স্বর্ণ-রৌপ্যকে নগদে ও বাকীতে কোনোভাবে বাড়িয়ে বিক্রয় করা হারাম করা হয়েছে। কেননা, এগুলোতে এমনটি করা বৈধ হলে এগুলোকে মৌলিকভাবে অন্যসব পণ্যের ন্যায় সাধারণ পণ্য ধারণা করা হবে এবং এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় জনসমাজে সমস্যা বাড়িয়ে দেবে。
ইমাম মাকরিযী রহ. তার গ্রন্থে মুদ্রাব্যবস্থা সম্পর্কে এ অভিমত পেশ করেছেন যে, মুদ্রার মূল্যমানের উঠানামা এবং এগুলোর মূল্যমানের ঊর্ধ্বগতি থেকে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জন্য দীনার-দিরহামের মুদ্রাব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে। মন্দ ব্যবস্থাপনার কারণেই মুদ্রাব্যবস্থায় সংকট নেমে আসে। এসব মন্দব্যবস্থার একটি হচ্ছে দীনার-দিরহামের মুদ্রাব্যবস্থার পরিবর্তে অন্য মুদ্রা চালু করা। দীনার-দিরহামের বদলে অন্য মুদ্রা চালুর কারণে মুদ্রাব্যবস্থায় মুদ্রার মূল্যমান জটিল সংকট ও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে。
এ ব্যাপারে তিনি আরো বলেন, মুদ্রার মূল্যমানের ঊর্ধ্বগতি প্রকৃত প্রস্তাবে তেমন জটিল কোনো সমস্যা নয় বরং এক্ষেত্রে মন্দতর ব্যবস্থাপনাই মুদ্রাব্যবস্থায় অনেক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। তিনি আরো বলেন, জনসাধারণের বিষয়াদি যার দায়িত্বে তাকে আল্লাহ তাওফীক দিলে, জনসাধারণ তাদের রাষ্ট্রে চলমান অন্যসব মুদ্রার পরিবর্তে দীনার দিরহামের মুদ্রাব্যবস্থাতে ফিরে যেতে সক্ষম হলে, পণ্যের মূল্য ও শ্রমের পারিশ্রমিককে দীনার-দিরহামে লেনদেন করতে পারলে মুদ্রাব্যবস্থার নানামুখী সংকট হতে জনসাধারণের উত্তরণ ঘটত এবং আর্থিক ক্ষেত্রে সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হতো। তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যক্তি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে; তিনি নিশ্চিতভাবে বুঝতে সক্ষম হবেন যে, স্বর্ণ-রৌপ্যের অনুপাতে পণ্যের দাম তেমন একটা বৃদ্ধি পায়নি। পণ্যের বাজার ও এর দামের যে পরিমাণ ধস নেমেছে এগুলো দীনার-দিরহাম ব্যতীত অন্যসব মুদ্রা ও অর্থকড়ির কারণেই ঘটেছে এবং এ কারণে আর্থিক লেনদেনের সর্বক্ষেত্রে চরম সমস্যা ও দুরবস্থা ঘনীভূত হচ্ছে।
টিকাঃ
৭৮. কাশশাফুল কিনা, খ. ২, পৃ. ২৩২; আল-হাত্তাব আল মালেকী রচিত মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩৪২
৭৯. হাদীসটির তাখরীজ (সূত্র) পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৮০. ই'লামুল মুওয়াক্বিয়ীন, খ. ২, পৃ. ১৫৬
৮১. ইগাছাতুল উম্মা বি কাশফিল গুম্মা, পৃ. ৭৯
📄 ঋণের ওপর মুদ্রার মূল্যমান পরিবর্তনের প্রভাব
নির্দিষ্ট মুদ্রায় পরিশোধ্য ঋণের ক্ষেত্রে মুদ্রার দাম বৃদ্ধি ঘটলে ঋণদাতা ঋণগৃহীতার ওপর আনুপাতিক হারে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এতে ঋণীব্যক্তির ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধে কষ্ট বাড়ে এবং এ দ্বারা ঋণীব্যক্তিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে নির্দিষ্ট মুদ্রায় নির্দিষ্ট ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি থাকা অবস্থায় মুদ্রার মূল্যমান কমে গেলে ঋণদাতা ব্যক্তি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিপরীতমুখী অবস্থা ও পরিস্থিতির কারণে উভয় দিকের কোনো এক দিকে কোনো ব্যক্তি বড় ধরনের ক্ষতিতে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এভাবে নির্দিষ্ট মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের বিষয়টিতে একটি নিশ্চিত সমস্যার সৃষ্টি হয়। যদি ঐ মুদ্রা আর চালু না থাকে তাহলে তো ঋণ পরিশোধ অসম্ভব হয়ে যায়। এ দ্বিমুখী সংকট নিরসনে মুসলিম ফকীহগণ দীনার-দিরহাম ও অন্যান্য মুদ্রার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের সমাধান নির্দেশ করেছেন。
ক. সৃষ্টিগত মুদ্রা তথা দীনার দিরহাম অথবা স্বল্পমাত্রার খাদযুক্ত দীনার দিরহামের ক্ষেত্রে বিধান হচ্ছে, এ ঋণী ব্যক্তি ঋণদাতাকে ঠিক সে পরিমাণ দীনার-দিরহাম পরিশোধ করবে; দীনার-দিরহামের দাম এখন যা হয়েছে। তাতে পরিমাণ কম হোক না কেন। পক্ষান্তরে এসব মুদ্রা বাতিল হলে বা দুষ্প্রাপ্য হলে ঋণগৃহীতা ঋণদাতাকে এগুলোর মূল্য হিসাব করে সে পরিমাণ দীনার দিরহাম পরিশোধ করবে; তখন এগুলোর মূল্য ঋণ গ্রহণের ক্ষণে বা তলব করার মুহূর্তে থাকা মূল্য বিবেচনা করা হবে。
খ. দীনার-দিরহাম ব্যতীত অন্যসব ধাতব/অধাতব মুদ্রা এবং দীনার-দিরহামে অধিকমাত্রার খাদযুক্ত মুদ্রার বিধান তা অপ্রচলিত হওয়া, বাজারে না থাকা, মূল্য হ্রাস বা স্ফীতি হওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন অবস্থায় কী করণীয়, কী বিধান তা নিয়ে ফকীহগণের মধ্যে মতবিরোধপূর্ণ অভিমত রয়েছে।
টিকাঃ
৮২. ইবনে আবেদীন প্রণীত 'তামবীহুর রুকূদ 'আলা আহকামিন নূকুদ'; সুযুতী রহ. প্রণীত 'কাতউল মুজাদালা ইনদা তাগায়ূরিল মুয়ামালা, যা তার 'আল-হাবী ফীল ফাতাওয়া', খ. ১, পৃ. ১৫১ গ্রন্থে গ্রন্থিত রয়েছে; আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২২৫; তাকমিলাতু ফাতহিল কাদীর, খ. ৭, পৃ. ১৫৫ ও ১৫৬; আল মুদাওয়ানাতুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৪৪৪; হাশিয়াতুর রাহুনী, খ. ৫, পৃ. ১২০; নিহায়াতুল মুহতাজ 'আলা শারহিল মিনহাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৯৯; ইমাম নবভী রহ. প্রণীত আল-মাজমু', খ. ৯, পৃ. ২৮২; মিরদাবী রহ. প্রণীত আল-ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ১২৭; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩১৪; শারহুল মুফরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩৯০