📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রার হুন্ডি (السَّفْتَجَةُ)

📄 মুদ্রার হুন্ডি (السَّفْتَجَةُ)


হুন্ডি (السفتجة): শব্দটির সীন অক্ষরে পেশ ও যবর উভয় হরকত দিয়ে পড়া যায়। তবে এ উভয় অবস্থায় 'তা' বর্ণে যবর হবে। শব্দটি ফার্সী থেকে আরবী করা হয়েছে। কামূসে লিপিবদ্ধ রয়েছে: السَّفْتَجَةُ (সুফতাজাহ) শব্দটি ثُلُثَة (কুরতাকাহ) ওজনে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হচ্ছে: হুন্ডি। এর রূপ হচ্ছে: এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে তার সম্পদ দিল প্রথম ব্যক্তির শহরে সে সম্পদ পৌঁছানোর জন্যে, আর ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তির সে শহরে নিজের সম্পদ রয়েছে যে শহরে প্রথম জনের সম্পদ পৌঁছাতে হবে। সে নিজের সম্পদ থেকে দাতার প্রদত্ত পরিমাণ সম্পদ দাতার আপনজনের হাতে প্রদান করে দাতার সম্পদ নিজের সম্পদের সাথে মিলিয়ে নেয়। এভাবে সে রাস্তায় সম্পদ বহন করার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকে। এটিই সাফতাযা বা হুন্ডির পারিভাষিক পরিচয়।

আল্লামা ইবনে আবেদীন হুন্ডির সংজ্ঞা দেন এভাবে : إِقْرَاضَ لِسُقُوطِ خَطَرِ الطَّرِيقِ 'রাস্তার বিপদ ও ঝুঁকি দূর করার উদ্দেশ্যে কাউকে ঋণ দেওয়া।' দুসুকীর (الدسوقي) টীকায় রয়েছে: হিয়া আল কিতাবুল্লাযি ইউরিসুলুহু আল মুকতারিযু লি ওয়াকিলিহি বিবালাদিন লি ইয়াদফায়া লিল মুকরীযি নাযিরা মা আখাযাহু মিনহু বিবালাদিহি ওয়া হিয়া আল মুসাম্মাতু বিল বালূসাহ। সুফতাযা এমন চিঠি/চেক যা ঋণগ্রহীতা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে ঋণদাতার শহরে প্রেরণ করে, যেন সে প্রতিনিধি ঋণদাতার শহরে সে ঋণের বিনিময় প্রদান করতে পারে। আঞ্চলিক ভাষায় এটাকে বালুসা বলা হয়।

হুন্ডি কি ঋণ, না হাওয়ালা?
হাওয়ালা হচ্ছে ঋণী ব্যক্তি তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব অপর কাউকে অর্পণ। হুন্ডির মধ্যেও ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার ঋণ আদায়ের দায়িত্ব তৃতীয় ব্যক্তির কাছে অর্পণ করে; এভাবে ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার ঋণকে স্বীয় দায়িত্ব থেকে অপর এক দায়িত্ব গ্রহণকারীর নিকট স্থানান্তর করে- এ হিসেবে হুন্ডি হাওয়ালার সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। আর হাওয়ালায় একজনের দায়িত্ব থেকে অন্যজনের দায়িত্বে ঋণ স্থানান্তর করার বিষয় অবশ্যই থাকে।

মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী সকল ফকীহ এবং কতক হানাফী ফকীহের বক্তব্য হচ্ছে, হুন্ডি ঋণের একটি প্রকার। আর যে ঋণ লাভ ও উপকার বয়ে আনে তা জায়েয ও নাজায়েয হওয়ার বিষয়ে কথা রয়েছে। (সে আঙ্গিকেই হুন্ডির বৈধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়)। আর হাওয়ালা হয়ে থাকে কার্যত দায়িত্বে সাব্যস্ত ঋণের ক্ষেত্রে যা জায়েয, তাতে কারো মতান্তর নেই।

হাসকাফী ও মারগিনানী-এর ন্যায় কতক হানাফী ফকীহ হাওয়ালা অধ্যায়ের শেষে হুন্ডির আলোচনা করেছেন; আবার ঋণের অধ্যায়েও হুন্ডি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। আল্লামা ইবনুল হুমাম ও বাবারতী (بَابَرْتِیّ) বলেন: ইমাম কুদুরী এই মাসআলাটি এখানেই (ঋণের অধ্যায়ে) আলোচনা করেছেন; কারণ তা ঋণেরই একটি লেনদেন; যেমন কাফালা ও হাওয়ালা। আল্লামা কিরমানী বলেন: হুন্ডির মধ্যে হাওয়ালার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কারণ, ঋণদাতা সম্ভাব্য ক্ষতি ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে চাপিয়ে দিয়েছে। আল্লামা হাসকাফী এ কথাটিই বলেছেন। তিনি বলেন: হুন্ডি হচ্ছে রাস্তার ঝুঁকি দূর করার জন্যে ঋণ প্রদান করা। এভাবে ঋণদাতা রাস্তায় সম্পদ বহন করার সম্ভাব্য ঝুঁকি ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে স্থানান্তর করে দিয়েছে। সুতরাং এ হিসেবে হুন্ডিতে হাওয়ালার বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। আল্লামা ইবনে আবেদীন বলেন, ইবনুল কাসিমের নামুল কিতাবের মধ্যে রয়েছে: 'ওয়া কুরিয়াহাত সাফাইজুত্তরিকি ওয়া হিয়া ইহাতুন আলাত তাহকিকি' অর্থাৎ “হুন্ডি মাকরূহ। এর কারণ সূক্ষ্মদৃষ্টিতে এটি হচ্ছে সম্পদ পৌঁছানোর দায়িত্ব কারো হাতে ন্যস্ত করা।” ওই কিতাবের ব্যাখ্যাকার মাকদিসী বলেন: কারণ, সে তার বন্ধুকে অথবা যার সাথে হুন্ডি-চুক্তি করছে তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

শরীয়তের বিধান
ঋণপ্রদান একটি সওয়াবের কাজ। এটি দান-অনুদান ও অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। ঋণদাতা অভাবী ঋণগ্রহীতার প্রয়োজন মিটানোর জন্যে ঋণ দিয়ে থাকে; ফলে মানুষের সাহায্য করা হয় এবং অভাবী মানুষের বিপদ ও সমস্যা দূর হয়। এ কারণেই ঋণের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ঋণদাতা ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ হতে সওয়াবপ্রাপ্তি ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর ইচ্ছা করে না। কিন্তু ঋণদাতা যদি ঋণ প্রদানের অন্তরালে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে বিশেষ কোনো উপকার হাসিল করতে চায়, তাহলে তা ঋণপ্রদানের উদ্দেশ্যকে চরমভাবে ব্যাহত করে। কারণ, ঋণপ্রদান হচ্ছে অনুগ্রহ ও সওয়াব অর্জনের একটি চুক্তি। তাই ঋণদাতা প্রদত্ত ঋণের বিনিময়ে কোনো উপকার হাসিল করলে তা হবে হারাম। বিশেষত যখন ঋণচুক্তির মধ্যে এই ফায়েদা গ্রহণের শর্তারোপ করা হয়। যেমন ঋণদাতা প্রদত্ত ঋণের অতিরিক্ত কিংবা ঋণের চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের জিনিস দাবি করল। তখন তা সুস্পষ্ট সুদে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ মূলনীতি রয়েছে: আন কাল্লা কারযিন জারা মানফায়াতান ফাহুওয়া হারামুন অর্থাৎ 'প্রত্যেক ঐ ঋণ যা কোনো উপকার বয়ে আনে তা-ই হারাম।' বিষয়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যা উবাই ইবনে কা'ব, ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত। ইবনে আবী শায়বা রহ. স্বীয় মুসান্নাফে সাহাবা ও পূর্বসূরিদের পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে খালেদ আল-আহমার হাজ্জাজের সূত্রে আতা-এর নিকট থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তীগণ যে ঋণ লাভ টেনে আনে তাকে অপছন্দ করতেন।

যেসব পদ্ধতি ও পন্থা ঋণদাতার লাভ ও উপকারিতা বয়ে আনে সেগুলোর একটি হচ্ছে হুন্ডি। হুন্ডির পদ্ধতি হলো, এক ব্যক্তি অন্যকে ঋণ দেবে- সে ব্যবসায়ী হতে পারে, সাধারণ লোকও হতে পারে- কোনো শহরে; অতঃপর ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে লিখিত কোনো ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে। এরপর ঋণদাতার কোনো প্রতিনিধি অন্য কোনো শহরে যায় এবং সেখানে ঋণগ্রহীতার কোনো পার্টনার বা উকীলের কাছ থেকে ঋণের বিনিময় গ্রহণ করে।

এখানে ঋণদাতার কাঙ্ক্ষিত উপকারিতা হচ্ছে, ওই শহরে নিজের সম্পদ নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকা। কারণ, সে সম্পদ নিয়ে সফর করলে চোর-ডাকাতদের কবলে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। তাই সে রাস্তার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকার উপকারিতা লাভ করার জন্যে ঋণ প্রদানের এই বাহানার আশ্রয় নিচ্ছে।

এখন কথা হচ্ছে, ঋণদাতা নিজের প্রতিনিধির কাছে যে ডকুমেন্ট (অর্থাৎ হুন্ডি) লিখে দিচ্ছে, ঋণপ্রদানের চুক্তির মধ্যে এই শর্ত করা ও না করার কারণে এর বিধানে পার্থক্য দেখা দিবে। যদি ঋণের চুক্তির মধ্যে ডকুমেন্ট লিখে দেওয়ার শর্ত করা হয়, তাহলে তা হারাম হবে আর চুক্তি ফাসেদ বলে গণ্য হবে। কারণ, এখানে ঋণের বিনিময়ে উপকারিতা লাভ করা হচ্ছে, যা সুদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কেননা, এই উপকারিতা এমন অতিরিক্ত, যার বিপরীতে কোনো বিনিময় নেই। এই অভিমত অধিকাংশ ফকীহ, হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহবৃন্দ এবং মালেকীদের কতক ফকীহ এবং ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা। ইবনে আবদিল বার উল্লেখ করেন, ইমাম মালেক রহ. দীনার ও দিরহামের বিনিময়ে হুন্ডিকে মাকরূহ বলেছেন; তবে হারাম ঘোষণা করেননি। তবে ইমাম মালেকের ছাত্রদের একটি দল এবং আলেমদের একটি জামাত হুন্ডির অনুমতি দিয়েছেন। ইমাম মালেকের আরেকটি বর্ণনামতে, হুন্ডি লেনদেন করাতে কোনো দোষ নেই। তবে ইমাম মালেকের প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে, হুন্ডির এ লেনদেন মাকরূহ। ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা মোতাবেক হুন্ডি জায়েয। কারণ, এতে উভয় পক্ষের উপকার রয়েছে।

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আতা রহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. মক্কায় বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে দিরহাম গ্রহণ করতেন; এর বিপরীতে তিনি তাদেরকে একটি চিঠি বা চেক লিখে ইরাকে অবস্থানরত মুসআব ইবনে যুবায়েরের কাছে পাঠাতেন। তারা সেখানে গিয়ে চিঠি দেখিয়ে নিজেদের পাওনা উসুল করে নিত। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। যারা এ পদ্ধতিকে নাজায়েয মনে করেননি তারা হলেন: ইবনে সীরীন ও নাখায়ী। সাঈদ ইবনে মানসুর এসব বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

হাম্বলী মাযহাবের কাজী উল্লেখ করেছেন: অসী যদি ইয়াতীমের সম্পদ অন্য শহর থেকে আনার জন্যে হুন্ডির এ পদ্ধতি অবলম্বন করে তাহলে তা নাজায়েয হবে না। বিশুদ্ধ মতে তা জায়েয। কারণ, এতে কারো কোনো ক্ষতি ছাড়াই উভয়ের লাভ ও কল্যাণ নিহিত। আর শরীয়ত যে কাজে ক্ষতি ব্যতীত উপকারিতা রয়েছে সে কাজকে অবৈধ সাব্যস্ত করে না; বরং বৈধ বলে অভিহিত করে। তাছাড়া এ পদ্ধতিটি হারাম হওয়ার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট কোনো বিধান বা এমন অর্থবহনকারী কোনো দলিল নেই। সুতরাং এর বৈধতা বহাল রাখা আবশ্যক। তবে মালেকীগণ এথেকে একটি অবস্থাকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছেন। তা হচ্ছে, ঋণদাতা যে রাস্তা দিয়ে তার সম্পদ নিয়ে যাতায়াত করবে ওই পুরো রাস্তায় যদি বিপদের আশঙ্কা থাকে; তার জীবনের ভয় কিংবা সম্পদের ভয়- তাহলে এ ক্ষেত্রে হুন্ডি করাতে কোনো সমস্যা নেই। বরং হুন্ডি করা তখন মুস্তাহাব। কারণ, তাতে ঋণপ্রদানের উপকারিতার বিনিময়ে নিজের জীবন কিংবা সম্পদ রক্ষা করার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। যেমন তাদের মতে হুন্ডি জায়েয যখন ঋণগ্রহীতার তাতে কোনো উপকার নিহিত থাকে; কিংবা দরিদ্র ব্যক্তি নিজেই তা করার আবেদন জানায়।

পক্ষান্তরে ঋণগ্রহীতা যদি ঋণদাতার পক্ষ হতে কোনো শর্ত ব্যতীত নিজ উদ্যোগে স্বীয় উকীলের কাছে ঋণ পরিশোধের ডকুমেন্ট লিখে দেয় অর্থাৎ শর্ত ছাড়াই হুন্ডির লেনদেন করে, তাহলে সকলের ঐকমত্যে তা জায়েয। কারণ, তা উত্তম পদ্ধতিতে ঋণ পরিশোধের একটি পন্থা। বর্ণিত আছে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একব্যক্তির কাছ থেকে একটি ছোট উট ঋণ নিলেন। পরে রাসূলের কাছে যাকাতের উট আসে। তখন রাসূলুল্লাহ স. আবু রাফেকে ওই ব্যক্তির উট পরিশোধ করার নির্দেশ দিলেন। আবু রাফে এসে জানালেন, সেখানে বড় ও উৎকৃষ্ট উট ছাড়া ওই লোকের উটের মতো কোনো উট নেই। তখন রাসূল সা. বললেন, তাকে সেটাই দিয়ে দাও। কারণ হলো : إِنَّ خِيَارَ النَّاسِ أَحْسَنُهُمْ قَضَاءً "যারা উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করে তারাই উত্তম মানুষ।"

হুন্ডির বৈধতার বিষয়ে ছাড় দিয়েছেন ইবনে উমর, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, হাসান, ইবরাহ্মী নাখায়ী, শা'বী, যুহরী, মাকহুল, কাতাদা ও ইসহাক রহ।

টিকাঃ
৭০. রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৪, ২৯৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২২৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 হুন্ডির পদ্ধতি

📄 হুন্ডির পদ্ধতি


হুন্ডির পদ্ধতি হচ্ছে কোনো প্রবাসী ব্যক্তি তার প্রবাসের মুদ্রা নিজ দেশে প্রেরণের ইচ্ছা করলে সে ঐ দেশের কোনো ব্যবসায়ীকে এ মুদ্রাগুলো হস্তান্তর করবে। এ ব্যবসায়ী ব্যক্তি প্রবাসীর নিকট থেকে মুদ্রাগুলো সংগ্রহ করে সে দেশ থেকে মালামাল ক্রয় করে এ দেশে নিয়ে আসবে এবং সমমূল্যমানের টাকা স্থানীয় মুদ্রায় প্রবাসীর মনোনীত প্রতিনিধিকে দেবে। অথবা ব্যবসায়ী প্রবাসে থাকাকালেই তার প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রবাসী ব্যক্তিকে স্থানীয় মুদ্রায় তার পাওনা পরিশোধ করবে। এ পদ্ধতিটি ঋণ অথবা বিনিময় হিসেবে গণ্য হয়। কোনো কোনো ফকীহ এ ধরনের কর্জ, কর্জ প্রদানকারীর জন্য লাভজনক থাকায় তা নাজায়েয হিসেবে ফাতওয়া দিয়েছেন। এ ধরনের লেনদেনে আর্থিক উপকার হচ্ছে পথের ঝুঁকিমুক্ত হওয়া। পক্ষান্তরে কোনো কোনো ফকীহ এ ধরনের আর্থিক লেনদেনকে কোনো পক্ষের কোনো ক্ষতির সম্ভবনা না থাকায় বরং উভয়ের উপকারের দিকটি বিবেচনায় বৈধ বলেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগতির জন্য সুফতাজাহ (সফ্টাজাহ) অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

টিকাঃ
৭০. রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৪, ২৯৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২২৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ষষ্ঠ : মুদ্রার মূল্যমানে যেসব পরিবর্তন আসে

📄 ষষ্ঠ : মুদ্রার মূল্যমানে যেসব পরিবর্তন আসে


স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এসব মুদ্রার মূল্যমান অন্যসব মুদ্রার তুলনায় অনেকটা স্থায়ী হয়ে থাকে। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে অবস্থা ও পরিস্থিতি পরিবর্তনের কারণে এসব মুদ্রাতেও মূল্যমানের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে থাকে। পক্ষান্তরে দীনার-দিরহাম ব্যতীত অন্যসব মুদ্রার মূল্যমানে দ্রুততম সময়ে কঠিনতম পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে এবং ঘটে থাকে। যার দরুন রাষ্ট্রের সঞ্চিত অর্থে যেমন প্রভাব পড়ে জনগণের সঞ্চিত অর্থেও তেমনি তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, ঋণের মূল্যমানেও তা প্রভাব ফেলে।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রার মূল্যমানে পরিবর্তন

📄 মুদ্রার মূল্যমানে পরিবর্তন


ক. মুদ্রার মূল্যবৃদ্ধি (اغلاء): মুদ্রার অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে, একদিক থেকে ক্রয়-বিক্রয় ও অন্য সকল আর্থিক লেনদেনে অধিক ব্যবহার, মুদ্রার অধিক মজুতদায়ী ইত্যাদি; অপর দিকে মুদ্রার ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের অন্য কারণ হচ্ছে ধাতবমুদ্রা তৈরিতে সংশ্লিষ্ট ধাতবের স্বল্পতা, অথবা রাষ্ট্রযন্ত্র জনসংখ্যার চাহিদা অনুপাতে মুদ্রা তৈরিতে অক্ষমতা ইত্যাদি। মুকরীযী বলেন, বর্তমানে দীনার ও দিরহাম ব্যতীত অন্য ধাতব মুদ্রার ব্যবহার এতোটাই বেড়েছে যে, সকল পণ্যে তা দিয়েই মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে, এমনকি দীনারের দামও তার মাধ্যমে স্থিরীকৃত হচ্ছে。

খ. মুদ্রার মূল্যহ্রাস (الرخص): মুদ্রার মূল্যমান বিভিন্ন কারণে নিম্নমুখী হয়ে থাকে। এসব কারণের মধ্যে : এগুলো সঞ্চয়ে সংগ্রহে অনাগ্রহ, মজুদদারী চাহিদা না থাকা, যে ধাতু দ্বারা মুদ্রা তৈরি হয় সে ধাতুর পর্যাপ্ততা ও কাঁচামালের আধিক্য ইত্যাদি। মুদ্রার অধোগতির অর্থ হচ্ছে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। মুদ্রার মূল্যমান কমে যাওয়া এবং এর ক্রয়ক্ষমতার নিম্নমুখিতার ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, পূর্বে মুদ্রার মাধ্যমে যে পরিমাণ পণ্যসামগ্রী ক্রয় করা যেত; বর্তমানে সে মুদ্রা দিয়ে তা থেকে স্বল্প পরিমাণ পণ্য ক্রয় করতে পারা। মুদ্রার মূল্যমানের হ্রাস-বৃদ্ধির প্রমাণ ও প্রকাশটি দুটি নির্দিষ্ট সময়ের মূল্যমানে তুলনার মাধ্যমে অনুধাবন করা যায়。

গ. মুদ্রা অপ্রচলিত হয়ে যাওয়া: আল্লামা ইবনে আবেদীন রহ. বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, কোনো অঞ্চলে প্রচলিত মুদ্রা সম্পূর্ণভাবে অপ্রচলিত হয়ে যাওয়া। এর বিপরীত হচ্ছে, মুদ্রাটির ব্যবহার চালু থাকা。

ঘ. মুদ্রার অবসান/মুদ্রা না থাকা: মুদ্রার অবসান, যা প্রভাব সৃষ্টি করে তা হচ্ছে কোনো মুদ্রা বাজারে ব্যবসায়ীদের নিকট না থাকা; যদিও তা মুদ্রাব্যবসায়ী কিংবা মানুষের ঘরে মজুদ থাকে。

ঙ. রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশে মুদ্রার লেনদেন নিষিদ্ধ (বাতিল) করে দেওয়া: এর অর্থ হচ্ছে জনসাধারণের প্রয়োজন ও কল্যাণে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান তার রাষ্ট্রে চলমান মুদ্রাকে বাতিল করে নতুন মুদ্রা চালু করা। ইবনুল হায়েম রহ. বলেন: রাষ্ট্রপ্রধান কোনো মুদ্রার প্রচলন বাতিল করলে তা ধর্তব্য হবে। জনসাধারণের জন্য তা মেনে নেওয়াটা একান্ত জরুরি হবে। মহান আল্লাহ বলেন: “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ্র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা রাষ্ট্রের কর্ণধার তাদের।”

চ. সরকার কর্তৃক কোনো মুদ্রার মূল্যমান কমিয়ে দেওয়া: ইবনু আবেদীন তার পুস্তিকাতে উল্লেখ করেছেন, আমাদের সময় বহুবার এরূপ ঘটনা ঘটেছে, রাষ্ট্রপ্রধান তার নির্বাহী আদেশে প্রচলিত মুদ্রার মূল্যমান কমিয়ে দিয়েছেন।

টিকাঃ
৭১. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৪; ইবনে আবেদীন-এর তামবীহুর রুকূদ ইলা আহকামিন নুকুদ, পৃ. ১৭,১৮ প্রকাশক: মুহাম্মদ সালামত জাবর
৭২. ইবনুল হায়েম কৃত নুযহাতুন নুফুস ফী আহকামিত তাআমুল বিল ফুলুস, পৃ. ৬৩
৭৩. সূরা নিসা, আয়াত ৫৯
৭৪. রিসালা তামবীহুর রুকূদ, পৃ. ৩৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00