📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা বন্ধকের বিধান

📄 মুদ্রা বন্ধকের বিধান


হানাফী ও মালেকী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী মুদ্রা বন্ধক রাখা জায়েয। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, বন্ধক রাখা জায়েয হওয়ার কারণ এই, তাহলে ঋণের টাকা পুরোপুরি ভাবে ফেরত পাওয়া যাবে। দীনার বন্ধক রেখে স্বর্ণ বা দিরহাম বন্ধক রেখে রৌপ্য গ্রহণ করলে, বন্ধক রাখা দীনার বা দিরহাম ধ্বংস হয়ে গেলে ঋণের থেকে সে পরিমাণ বিয়োগ হবে এবং এক্ষেত্রে ধরা হবে, যে পরিমাণ ধ্বংস হয়েছে সেটুকু ঋণ ফেরত পাওয়া গিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাকে ধ্বংস হওয়া বস্তুর সদৃশ প্রদানের জিম্মাদার করাতে কোন লাভ নেই, যেহেতু বন্ধক ও ঋণের দ্রব্য সদৃশ বস্তু। এটুকু কর্তনের পর বাকীটুকু তাকে আদায় করতে হবে।

মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, মুদ্রাদি বন্ধক রাখা বৈধ হবে। এগুলো ন্যায়নিষ্ঠ কোনো ব্যক্তির হাতে অথবা করযদাতার হাতেই রাখা হোক। সেই সাথে তারা শর্তারোপ করেন, বন্ধকী মুদ্রায় এমন একটি সীলমোহর লাগিয়ে দিতে হবে যে সীলমোহরটি নষ্ট হলে তা টের পাওয়া যাবে। সীলগালা করার শর্তটি এজন্যই করা হয়, যাতে করে বন্ধকী মুদ্রাগুলো যথাযথ সংরক্ষিত থাকে। হতে পারে, তারা দুজনেই সালাম বিক্রির ইচ্ছা করল। তাতে তারা নাম রাখল 'বন্ধক'। কিন্তু বন্ধক ও ঋণ একত্রে নিষিদ্ধ।

শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী মুদ্রা বন্ধক রাখা সঠিক হবে যদি বন্ধকদাতা অথবা বিচারক বন্ধকী বস্তুটিকে বিক্রয় করে। অনুরূপভাবে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাযুক্ত বন্ধকী বস্তু বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ মূল্য বন্ধক হিসেবে থাকবে।

টিকাঃ
৬৪. আল-ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার, খ. ২, পৃ. ৬৭; ইবনে আবেদীন ও আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৫, পৃ. ৩১৯ ও ৩২০; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৯; আদ-দুসুকী মা'য়াশ-শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২৩৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৩৭; আল- ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ১৪১; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৭৭

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া

📄 মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া


হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত হচ্ছে, অলঙ্কার পরা বা ওজন-পরিমাপ করা ইত্যাদি সঠিক উদ্দেশ্যে মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয। কেননা, এ সকল ক্ষেত্রে যেমনটি গ্রহণ করা হয়, বৈধ উপকার নেওয়ার পরেও হুবহু তেমনটি ফেরত দেওয়া সম্ভব। পক্ষান্তরে শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের এ সম্পর্কে অভিমত হচ্ছে, মুদ্রা দ্বারা অন্য নির্মিতব্য মুদ্রায় ছাপ দেওয়া, সাজসজ্জা করা অথবা কোনো পণ্য ওজন পরিমাপের উদ্দেশ্যে মুদ্রাদি ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয নেই। কেননা, এসব সেবা গ্রহণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুদ্রার মূল উদ্দেশ্য থাকে না। তারা এর পক্ষে দলিল দেন, লুটেরা ব্যক্তির নিকট থেকে বিগত দিনের কোন ভাড়া নেওয়া হয় না। এটি এ মাযহাবের অধিক নির্ভরযোগ্য অভিমত। তবে মুদ্রা ভাড়া নেওয়ার পর ভাড়াকৃত মুদ্রা দ্বারা কী ধরনের উপকার গ্রহণ করা হবে, তা না বলে মুদ্রা ভাড়া নেওয়া কোনোভাবেই সহীহ হবে না। তবে শর্ত সাপেক্ষে শোভাবর্ধন এবং এ জাতীয় উদ্দেশ্যে মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত হচ্ছে, সময় ও ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে সৌন্দর্যবৃদ্ধি এবং এ জাতীয় উদ্দেশ্যে মুদ্রাদি ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয হবে।

টিকাঃ
৬৬. গামযু উয়ুনিল বাছায়ির, খ. ৩, পৃ. ১২৩; প্রকাশনা: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, শারহুল মিনহাজি মা'য়া হাশিয়া কালয়ূবী, খ. ৩, পৃ. ৬৯ ও ১৮; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫. পৃ. ২৭০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩৫৮; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৫৬১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা ওয়াকফ করার বিধান

📄 মুদ্রা ওয়াকফ করার বিধান


মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ইবনু শাস রহ. ও ইবনুল হাযিব রহ.-এর মত, শাফেয়ী মাযহাবের অধিক নির্ভরযোগ্য অভিমত এবং হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত হচ্ছে মুদ্রা ওয়াকফ করা বৈধ নয়। যেহেতু কোনো মুদ্রা তার অস্তিত্ব বজায় রেখে কোনো সেবা বা উপকারে আসে না। বরং এগুলো দ্বারা উপকার পেতে হলে এগুলো ব্যয় করতে হয়। আর এগুলো ব্যয় (খরচ)-এর অর্থই হচ্ছে এগুলো ক্ষয় করে ফেলা, যা ওয়াকফ কর্মের বিপরীত অবস্থা। কেননা কোনো বস্তু (পণ্য) ওয়াকফ করার মূল দাবিটি হচ্ছে ওয়াকফকৃত পণ্যটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে যাকে বা যার জন্য ওয়াকফ করা হয়; তার কাছে মজুত থাকা।

ফকীহগণ কতিপয় দিক বিবেচনায় মুদ্রার ইজারা ভাড়া, মুদ্রা দ্বারা সজ্জিত হওয়ার লক্ষ্যে ইয়ারা (ধারগ্রহণ) অথবা ওজন পরিমাপের বাটখারা হিসেবে ব্যবহার করে উপকৃত হওয়া ইত্যাদি এবং ওয়াকফ করার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তারা বলেছেন, স্বর্ণ-রৌপ্যের সৃষ্টির মূল উপকার ও উদ্দেশ্য হচ্ছে এগুলো মূল্য হিসেবে বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় হবে। এর বিপরীতে ইজারাতে ও ইয়ারাতে পণ্য ব্যয় করা হবে না। এবং ইজারা (ভাড়া) ও ইয়ারা-ধার ইত্যাদি অস্থায়ী চুক্তি। পক্ষান্তরে ওয়াকফ হচ্ছে স্থায়ী চুক্তি।

হাম্বলী মাযহাবের অপর এক মত বর্ণনা করে 'আল-ফুরুউ' গ্রন্থপ্রণেতা বলেন, সৌন্দর্যবর্ধন ও ওজন পরিমাপের জন্য মুদ্রা ওয়াকফ করা জায়েয। এ বিধান শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের অধিকতর সহীহ অভিমতটির বিপরীত। মালেকী মাযহাবের বিজ্ঞ ফকীহগণ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, কোনো কাজে ব্যয় করা অথবা সৌন্দর্যবর্ধনসহ যে-কোনো কাজে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে মুদ্রা ওয়াকফ করা জায়েয হবে না। যদিও তারা এ অভিমত পোষণ করেন যে, কর্জ (ঋণ) দেওয়ার শর্তে ওয়াকফ করা হলে তা বৈধ হবে। এ বিষয়টিতে ইমাম মালেক রহ.-এর উদ্ধৃতি 'আল-মুদাউওয়ানা' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। অতএব, যে ব্যয় করে উপকৃত হবে এবং পরে কর্জ পরিশোধ করবে, ওয়াকফকৃত অর্থ তাকে কর্জ দেওয়া হবে। সে ফেরত দেওয়ার পর তা অন্যকে দেওয়া হবে। এভাবে তা কাজে লাগানো হবে। তারা আরো বলেন: এভাবে মুদ্রার বদল নেওয়ার মাধ্যমে তা বহাল ও বাকী থাকবে।

এ সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের বিস্তারিত বর্ণনামতে ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর বক্তব্যের চাহিদা হচ্ছে, মুদ্রা ওয়াকফ করা জায়েয নেই। যেহেতু এ দু ইমামের মতে, অস্থাবর সম্পদ ওয়াকফ করা জায়েয নয়। আনসারীর বর্ণনা মতে, ফকীহ যুফার রহ.-এর অভিমত হচ্ছে, মুদ্রা (দীনার-দিরহাম) ওয়াকফ করা জায়েয হবে। ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর অভিমত অনুযায়ী অস্থাবর সম্পত্তি ওয়াকফ করা জায়েয নেই। তবে কোনো সমাজে অস্থাবর সম্পদ ওয়াকফ করার ব্যাপক প্রচলন থাকলে তা জায়েয হবে। আল-ইখতিয়ার গ্রন্থে বলা হয়েছে: ইমাম মুহাম্মদের অভিমত অনুযায়ী ফতোয়া; মানুষের একান্ত প্রয়োজন ও প্রচলন থাকায় মুদ্রাদি ওয়াকফ করা জায়েয। যেমন জায়েয রয়েছে কুরআনের কপি, সাধারণ ধর্মীয় গ্রন্থ ও অস্ত্র ওয়াকফ করা। ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর এ অভিমতের ভিত্তিতে জানা যায়, কোনো সমাজে মুদ্রাদি ওয়াকফ করার রেওয়াজ থাকলে তা বৈধ বলে গণ্য হবে। আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বলা হয়েছে, আবু সাঈদ রহ. প্রণীত মা'রুযাত গ্রন্থে বলা হয়েছে, সমাজের প্রচলনের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচারকগণ মুদ্রা ওয়াকফ করার বিষয়টির বিধান প্রদান করবেন। ওয়াকফকৃত মুদ্রা দ্বারা উপকার (সেবা) গ্রহণ করা সম্ভব হবে কর্জ দেওয়ার দ্বারা। ঋণ পরিশোধ করলে তা আবার ঋণ দেওয়া হবে। এটি হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি। এ প্রসঙ্গে ইবনে আবেদীন রহ. বলেন, দীনার-দিরহাম নির্দিষ্ট করলেও যেহেতু নির্দিষ্ট হয় না, তাই তার বদল তার স্থলবর্তী হবে। ইমাম যুফার রহ. আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মুদ্রাদি মুদারাবা ব্যবসায় পুঁজি (মূলধন) হিসেবে বিনিয়োগ করে পরবর্তী সময়ে এর লাভ সদকা করা হবে ওয়াকফ।

টিকাঃ
৬৭. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৭৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩৫৮; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ৩১৫; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৪৫৮
৬৮. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২০৫; হাশিয়াতুদ দুসুকী, খ. ৪, পৃ. ৭৬ ও ৭৭; ইবনে কুদামা-এর আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৮৪; ইবনে মুফলিহ কৃত আল-ফুরু, খ. ৪, পৃ. ৫৮৩
৬৯. আল-ইখতিয়ারু লি তা'লিলিল মুখতার, খ. ৩, পৃ. ৪২; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৭৪৭; ইবনে আবেদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রার হুন্ডি (السَّفْتَجَةُ)

📄 মুদ্রার হুন্ডি (السَّفْتَجَةُ)


হুন্ডি (السفتجة): শব্দটির সীন অক্ষরে পেশ ও যবর উভয় হরকত দিয়ে পড়া যায়। তবে এ উভয় অবস্থায় 'তা' বর্ণে যবর হবে। শব্দটি ফার্সী থেকে আরবী করা হয়েছে। কামূসে লিপিবদ্ধ রয়েছে: السَّفْتَجَةُ (সুফতাজাহ) শব্দটি ثُلُثَة (কুরতাকাহ) ওজনে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হচ্ছে: হুন্ডি। এর রূপ হচ্ছে: এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে তার সম্পদ দিল প্রথম ব্যক্তির শহরে সে সম্পদ পৌঁছানোর জন্যে, আর ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তির সে শহরে নিজের সম্পদ রয়েছে যে শহরে প্রথম জনের সম্পদ পৌঁছাতে হবে। সে নিজের সম্পদ থেকে দাতার প্রদত্ত পরিমাণ সম্পদ দাতার আপনজনের হাতে প্রদান করে দাতার সম্পদ নিজের সম্পদের সাথে মিলিয়ে নেয়। এভাবে সে রাস্তায় সম্পদ বহন করার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকে। এটিই সাফতাযা বা হুন্ডির পারিভাষিক পরিচয়।

আল্লামা ইবনে আবেদীন হুন্ডির সংজ্ঞা দেন এভাবে : إِقْرَاضَ لِسُقُوطِ خَطَرِ الطَّرِيقِ 'রাস্তার বিপদ ও ঝুঁকি দূর করার উদ্দেশ্যে কাউকে ঋণ দেওয়া।' দুসুকীর (الدسوقي) টীকায় রয়েছে: হিয়া আল কিতাবুল্লাযি ইউরিসুলুহু আল মুকতারিযু লি ওয়াকিলিহি বিবালাদিন লি ইয়াদফায়া লিল মুকরীযি নাযিরা মা আখাযাহু মিনহু বিবালাদিহি ওয়া হিয়া আল মুসাম্মাতু বিল বালূসাহ। সুফতাযা এমন চিঠি/চেক যা ঋণগ্রহীতা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে ঋণদাতার শহরে প্রেরণ করে, যেন সে প্রতিনিধি ঋণদাতার শহরে সে ঋণের বিনিময় প্রদান করতে পারে। আঞ্চলিক ভাষায় এটাকে বালুসা বলা হয়।

হুন্ডি কি ঋণ, না হাওয়ালা?
হাওয়ালা হচ্ছে ঋণী ব্যক্তি তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব অপর কাউকে অর্পণ। হুন্ডির মধ্যেও ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার ঋণ আদায়ের দায়িত্ব তৃতীয় ব্যক্তির কাছে অর্পণ করে; এভাবে ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার ঋণকে স্বীয় দায়িত্ব থেকে অপর এক দায়িত্ব গ্রহণকারীর নিকট স্থানান্তর করে- এ হিসেবে হুন্ডি হাওয়ালার সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। আর হাওয়ালায় একজনের দায়িত্ব থেকে অন্যজনের দায়িত্বে ঋণ স্থানান্তর করার বিষয় অবশ্যই থাকে।

মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী সকল ফকীহ এবং কতক হানাফী ফকীহের বক্তব্য হচ্ছে, হুন্ডি ঋণের একটি প্রকার। আর যে ঋণ লাভ ও উপকার বয়ে আনে তা জায়েয ও নাজায়েয হওয়ার বিষয়ে কথা রয়েছে। (সে আঙ্গিকেই হুন্ডির বৈধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়)। আর হাওয়ালা হয়ে থাকে কার্যত দায়িত্বে সাব্যস্ত ঋণের ক্ষেত্রে যা জায়েয, তাতে কারো মতান্তর নেই।

হাসকাফী ও মারগিনানী-এর ন্যায় কতক হানাফী ফকীহ হাওয়ালা অধ্যায়ের শেষে হুন্ডির আলোচনা করেছেন; আবার ঋণের অধ্যায়েও হুন্ডি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। আল্লামা ইবনুল হুমাম ও বাবারতী (بَابَرْتِیّ) বলেন: ইমাম কুদুরী এই মাসআলাটি এখানেই (ঋণের অধ্যায়ে) আলোচনা করেছেন; কারণ তা ঋণেরই একটি লেনদেন; যেমন কাফালা ও হাওয়ালা। আল্লামা কিরমানী বলেন: হুন্ডির মধ্যে হাওয়ালার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কারণ, ঋণদাতা সম্ভাব্য ক্ষতি ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে চাপিয়ে দিয়েছে। আল্লামা হাসকাফী এ কথাটিই বলেছেন। তিনি বলেন: হুন্ডি হচ্ছে রাস্তার ঝুঁকি দূর করার জন্যে ঋণ প্রদান করা। এভাবে ঋণদাতা রাস্তায় সম্পদ বহন করার সম্ভাব্য ঝুঁকি ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে স্থানান্তর করে দিয়েছে। সুতরাং এ হিসেবে হুন্ডিতে হাওয়ালার বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। আল্লামা ইবনে আবেদীন বলেন, ইবনুল কাসিমের নামুল কিতাবের মধ্যে রয়েছে: 'ওয়া কুরিয়াহাত সাফাইজুত্তরিকি ওয়া হিয়া ইহাতুন আলাত তাহকিকি' অর্থাৎ “হুন্ডি মাকরূহ। এর কারণ সূক্ষ্মদৃষ্টিতে এটি হচ্ছে সম্পদ পৌঁছানোর দায়িত্ব কারো হাতে ন্যস্ত করা।” ওই কিতাবের ব্যাখ্যাকার মাকদিসী বলেন: কারণ, সে তার বন্ধুকে অথবা যার সাথে হুন্ডি-চুক্তি করছে তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

শরীয়তের বিধান
ঋণপ্রদান একটি সওয়াবের কাজ। এটি দান-অনুদান ও অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। ঋণদাতা অভাবী ঋণগ্রহীতার প্রয়োজন মিটানোর জন্যে ঋণ দিয়ে থাকে; ফলে মানুষের সাহায্য করা হয় এবং অভাবী মানুষের বিপদ ও সমস্যা দূর হয়। এ কারণেই ঋণের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ঋণদাতা ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ হতে সওয়াবপ্রাপ্তি ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর ইচ্ছা করে না। কিন্তু ঋণদাতা যদি ঋণ প্রদানের অন্তরালে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে বিশেষ কোনো উপকার হাসিল করতে চায়, তাহলে তা ঋণপ্রদানের উদ্দেশ্যকে চরমভাবে ব্যাহত করে। কারণ, ঋণপ্রদান হচ্ছে অনুগ্রহ ও সওয়াব অর্জনের একটি চুক্তি। তাই ঋণদাতা প্রদত্ত ঋণের বিনিময়ে কোনো উপকার হাসিল করলে তা হবে হারাম। বিশেষত যখন ঋণচুক্তির মধ্যে এই ফায়েদা গ্রহণের শর্তারোপ করা হয়। যেমন ঋণদাতা প্রদত্ত ঋণের অতিরিক্ত কিংবা ঋণের চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের জিনিস দাবি করল। তখন তা সুস্পষ্ট সুদে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ মূলনীতি রয়েছে: আন কাল্লা কারযিন জারা মানফায়াতান ফাহুওয়া হারামুন অর্থাৎ 'প্রত্যেক ঐ ঋণ যা কোনো উপকার বয়ে আনে তা-ই হারাম।' বিষয়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যা উবাই ইবনে কা'ব, ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত। ইবনে আবী শায়বা রহ. স্বীয় মুসান্নাফে সাহাবা ও পূর্বসূরিদের পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে খালেদ আল-আহমার হাজ্জাজের সূত্রে আতা-এর নিকট থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তীগণ যে ঋণ লাভ টেনে আনে তাকে অপছন্দ করতেন।

যেসব পদ্ধতি ও পন্থা ঋণদাতার লাভ ও উপকারিতা বয়ে আনে সেগুলোর একটি হচ্ছে হুন্ডি। হুন্ডির পদ্ধতি হলো, এক ব্যক্তি অন্যকে ঋণ দেবে- সে ব্যবসায়ী হতে পারে, সাধারণ লোকও হতে পারে- কোনো শহরে; অতঃপর ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে লিখিত কোনো ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে। এরপর ঋণদাতার কোনো প্রতিনিধি অন্য কোনো শহরে যায় এবং সেখানে ঋণগ্রহীতার কোনো পার্টনার বা উকীলের কাছ থেকে ঋণের বিনিময় গ্রহণ করে।

এখানে ঋণদাতার কাঙ্ক্ষিত উপকারিতা হচ্ছে, ওই শহরে নিজের সম্পদ নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকা। কারণ, সে সম্পদ নিয়ে সফর করলে চোর-ডাকাতদের কবলে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। তাই সে রাস্তার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকার উপকারিতা লাভ করার জন্যে ঋণ প্রদানের এই বাহানার আশ্রয় নিচ্ছে।

এখন কথা হচ্ছে, ঋণদাতা নিজের প্রতিনিধির কাছে যে ডকুমেন্ট (অর্থাৎ হুন্ডি) লিখে দিচ্ছে, ঋণপ্রদানের চুক্তির মধ্যে এই শর্ত করা ও না করার কারণে এর বিধানে পার্থক্য দেখা দিবে। যদি ঋণের চুক্তির মধ্যে ডকুমেন্ট লিখে দেওয়ার শর্ত করা হয়, তাহলে তা হারাম হবে আর চুক্তি ফাসেদ বলে গণ্য হবে। কারণ, এখানে ঋণের বিনিময়ে উপকারিতা লাভ করা হচ্ছে, যা সুদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কেননা, এই উপকারিতা এমন অতিরিক্ত, যার বিপরীতে কোনো বিনিময় নেই। এই অভিমত অধিকাংশ ফকীহ, হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহবৃন্দ এবং মালেকীদের কতক ফকীহ এবং ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা। ইবনে আবদিল বার উল্লেখ করেন, ইমাম মালেক রহ. দীনার ও দিরহামের বিনিময়ে হুন্ডিকে মাকরূহ বলেছেন; তবে হারাম ঘোষণা করেননি। তবে ইমাম মালেকের ছাত্রদের একটি দল এবং আলেমদের একটি জামাত হুন্ডির অনুমতি দিয়েছেন। ইমাম মালেকের আরেকটি বর্ণনামতে, হুন্ডি লেনদেন করাতে কোনো দোষ নেই। তবে ইমাম মালেকের প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে, হুন্ডির এ লেনদেন মাকরূহ। ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা মোতাবেক হুন্ডি জায়েয। কারণ, এতে উভয় পক্ষের উপকার রয়েছে।

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আতা রহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. মক্কায় বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে দিরহাম গ্রহণ করতেন; এর বিপরীতে তিনি তাদেরকে একটি চিঠি বা চেক লিখে ইরাকে অবস্থানরত মুসআব ইবনে যুবায়েরের কাছে পাঠাতেন। তারা সেখানে গিয়ে চিঠি দেখিয়ে নিজেদের পাওনা উসুল করে নিত। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। যারা এ পদ্ধতিকে নাজায়েয মনে করেননি তারা হলেন: ইবনে সীরীন ও নাখায়ী। সাঈদ ইবনে মানসুর এসব বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

হাম্বলী মাযহাবের কাজী উল্লেখ করেছেন: অসী যদি ইয়াতীমের সম্পদ অন্য শহর থেকে আনার জন্যে হুন্ডির এ পদ্ধতি অবলম্বন করে তাহলে তা নাজায়েয হবে না। বিশুদ্ধ মতে তা জায়েয। কারণ, এতে কারো কোনো ক্ষতি ছাড়াই উভয়ের লাভ ও কল্যাণ নিহিত। আর শরীয়ত যে কাজে ক্ষতি ব্যতীত উপকারিতা রয়েছে সে কাজকে অবৈধ সাব্যস্ত করে না; বরং বৈধ বলে অভিহিত করে। তাছাড়া এ পদ্ধতিটি হারাম হওয়ার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট কোনো বিধান বা এমন অর্থবহনকারী কোনো দলিল নেই। সুতরাং এর বৈধতা বহাল রাখা আবশ্যক। তবে মালেকীগণ এথেকে একটি অবস্থাকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছেন। তা হচ্ছে, ঋণদাতা যে রাস্তা দিয়ে তার সম্পদ নিয়ে যাতায়াত করবে ওই পুরো রাস্তায় যদি বিপদের আশঙ্কা থাকে; তার জীবনের ভয় কিংবা সম্পদের ভয়- তাহলে এ ক্ষেত্রে হুন্ডি করাতে কোনো সমস্যা নেই। বরং হুন্ডি করা তখন মুস্তাহাব। কারণ, তাতে ঋণপ্রদানের উপকারিতার বিনিময়ে নিজের জীবন কিংবা সম্পদ রক্ষা করার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। যেমন তাদের মতে হুন্ডি জায়েয যখন ঋণগ্রহীতার তাতে কোনো উপকার নিহিত থাকে; কিংবা দরিদ্র ব্যক্তি নিজেই তা করার আবেদন জানায়।

পক্ষান্তরে ঋণগ্রহীতা যদি ঋণদাতার পক্ষ হতে কোনো শর্ত ব্যতীত নিজ উদ্যোগে স্বীয় উকীলের কাছে ঋণ পরিশোধের ডকুমেন্ট লিখে দেয় অর্থাৎ শর্ত ছাড়াই হুন্ডির লেনদেন করে, তাহলে সকলের ঐকমত্যে তা জায়েয। কারণ, তা উত্তম পদ্ধতিতে ঋণ পরিশোধের একটি পন্থা। বর্ণিত আছে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একব্যক্তির কাছ থেকে একটি ছোট উট ঋণ নিলেন। পরে রাসূলের কাছে যাকাতের উট আসে। তখন রাসূলুল্লাহ স. আবু রাফেকে ওই ব্যক্তির উট পরিশোধ করার নির্দেশ দিলেন। আবু রাফে এসে জানালেন, সেখানে বড় ও উৎকৃষ্ট উট ছাড়া ওই লোকের উটের মতো কোনো উট নেই। তখন রাসূল সা. বললেন, তাকে সেটাই দিয়ে দাও। কারণ হলো : إِنَّ خِيَارَ النَّاسِ أَحْسَنُهُمْ قَضَاءً "যারা উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করে তারাই উত্তম মানুষ।"

হুন্ডির বৈধতার বিষয়ে ছাড় দিয়েছেন ইবনে উমর, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, হাসান, ইবরাহ্মী নাখায়ী, শা'বী, যুহরী, মাকহুল, কাতাদা ও ইসহাক রহ।

টিকাঃ
৭০. রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ১৭৪, ২৯৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২২৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00