📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা ধার দেওয়া

📄 মুদ্রা ধার দেওয়া


মুদ্রা যে ধরনেরই হোক না কেন, দীনার-দিরহাম অথবা অন্য যে-কোনো মুদ্রা, সব ধরনের মুদ্রাই ধার দেয়া জায়েয আছে। এক্ষেত্রে ঋণগৃহীতা ও দেনাদার ব্যক্তির ওপর ঋণদাতা প্রদেয় ঋণের চেয়ে অধিক পরিমাণ মুদ্রা পরিশোধের শর্তারোপ করতে পারবে না। এমনটিও হতে পারবে না যে, যে মানের মুদ্রা দিয়েছে; সেগুলোর চেয়ে উত্তম মুদ্রা প্রদান করবে অথবা খুচরা মুদ্রার বদলে পূর্ণ মুদ্রা পরিশোধ করবে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদীসটি দলিল হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ স. বলেন: خَيْرُكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءُ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হচ্ছেন তিনিই; যে ব্যক্তি উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করেন।"

কালয়ূবী রহ. বলেন, মুদ্রা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণদাতা ব্যক্তি শর্ত ব্যতীত উপরিউক্ত বিষয়গুলোর ইচ্ছা করলেও তা হবে মাকরূহ। যদি এমন ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া হয় যে অধিক ফেরত প্রদানে পরিচিত তবু এই বিধানই থাকবে, অধিকাংশ আলেম মাকরূহ না বলে তা হারাম বলেছেন।

ইমাম সুয়ূতী রহ. 'আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ের' গ্রন্থে বলেন, কারো টাকা পয়সা ধার নিয়ে ঋণের পরিমাণের চেয়ে অধিক পরিমাণে পরিশোধ করার অভ্যাস রয়েছে, এ মর্মে ঋণদাতা জ্ঞাত থাকলেও এ ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া হারাম হবে না। এটি শাফেয়ীদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত, হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ সুস্পষ্টভাবে এ ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগতির জন্য দ্র. পরিভাষা قرض

টিকাঃ
৬১. হাদীসখানি ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর হাদীস সংকলনে সংকলিত করেছেন। খ. ৩, পৃ. ১২২৫
৬২. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৭; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭২, ১৭৩; হাশিয়া কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৬০
৬৩. ইমাম সুয়ূতী-এর আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৯৬; ইবনে নুজাইম-এর আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ১০৮; আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা বন্ধকের বিধান

📄 মুদ্রা বন্ধকের বিধান


হানাফী ও মালেকী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী মুদ্রা বন্ধক রাখা জায়েয। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, বন্ধক রাখা জায়েয হওয়ার কারণ এই, তাহলে ঋণের টাকা পুরোপুরি ভাবে ফেরত পাওয়া যাবে। দীনার বন্ধক রেখে স্বর্ণ বা দিরহাম বন্ধক রেখে রৌপ্য গ্রহণ করলে, বন্ধক রাখা দীনার বা দিরহাম ধ্বংস হয়ে গেলে ঋণের থেকে সে পরিমাণ বিয়োগ হবে এবং এক্ষেত্রে ধরা হবে, যে পরিমাণ ধ্বংস হয়েছে সেটুকু ঋণ ফেরত পাওয়া গিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাকে ধ্বংস হওয়া বস্তুর সদৃশ প্রদানের জিম্মাদার করাতে কোন লাভ নেই, যেহেতু বন্ধক ও ঋণের দ্রব্য সদৃশ বস্তু। এটুকু কর্তনের পর বাকীটুকু তাকে আদায় করতে হবে।

মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, মুদ্রাদি বন্ধক রাখা বৈধ হবে। এগুলো ন্যায়নিষ্ঠ কোনো ব্যক্তির হাতে অথবা করযদাতার হাতেই রাখা হোক। সেই সাথে তারা শর্তারোপ করেন, বন্ধকী মুদ্রায় এমন একটি সীলমোহর লাগিয়ে দিতে হবে যে সীলমোহরটি নষ্ট হলে তা টের পাওয়া যাবে। সীলগালা করার শর্তটি এজন্যই করা হয়, যাতে করে বন্ধকী মুদ্রাগুলো যথাযথ সংরক্ষিত থাকে। হতে পারে, তারা দুজনেই সালাম বিক্রির ইচ্ছা করল। তাতে তারা নাম রাখল 'বন্ধক'। কিন্তু বন্ধক ও ঋণ একত্রে নিষিদ্ধ।

শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী মুদ্রা বন্ধক রাখা সঠিক হবে যদি বন্ধকদাতা অথবা বিচারক বন্ধকী বস্তুটিকে বিক্রয় করে। অনুরূপভাবে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাযুক্ত বন্ধকী বস্তু বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ মূল্য বন্ধক হিসেবে থাকবে।

টিকাঃ
৬৪. আল-ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার, খ. ২, পৃ. ৬৭; ইবনে আবেদীন ও আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৫, পৃ. ৩১৯ ও ৩২০; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৯; আদ-দুসুকী মা'য়াশ-শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২৩৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৩৭; আল- ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ১৪১; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৭৭

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া

📄 মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া


হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত হচ্ছে, অলঙ্কার পরা বা ওজন-পরিমাপ করা ইত্যাদি সঠিক উদ্দেশ্যে মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয। কেননা, এ সকল ক্ষেত্রে যেমনটি গ্রহণ করা হয়, বৈধ উপকার নেওয়ার পরেও হুবহু তেমনটি ফেরত দেওয়া সম্ভব। পক্ষান্তরে শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের এ সম্পর্কে অভিমত হচ্ছে, মুদ্রা দ্বারা অন্য নির্মিতব্য মুদ্রায় ছাপ দেওয়া, সাজসজ্জা করা অথবা কোনো পণ্য ওজন পরিমাপের উদ্দেশ্যে মুদ্রাদি ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয নেই। কেননা, এসব সেবা গ্রহণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুদ্রার মূল উদ্দেশ্য থাকে না। তারা এর পক্ষে দলিল দেন, লুটেরা ব্যক্তির নিকট থেকে বিগত দিনের কোন ভাড়া নেওয়া হয় না। এটি এ মাযহাবের অধিক নির্ভরযোগ্য অভিমত। তবে মুদ্রা ভাড়া নেওয়ার পর ভাড়াকৃত মুদ্রা দ্বারা কী ধরনের উপকার গ্রহণ করা হবে, তা না বলে মুদ্রা ভাড়া নেওয়া কোনোভাবেই সহীহ হবে না। তবে শর্ত সাপেক্ষে শোভাবর্ধন এবং এ জাতীয় উদ্দেশ্যে মুদ্রা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত হচ্ছে, সময় ও ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে সৌন্দর্যবৃদ্ধি এবং এ জাতীয় উদ্দেশ্যে মুদ্রাদি ভাড়া দেওয়া-নেওয়া জায়েয হবে।

টিকাঃ
৬৬. গামযু উয়ুনিল বাছায়ির, খ. ৩, পৃ. ১২৩; প্রকাশনা: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, শারহুল মিনহাজি মা'য়া হাশিয়া কালয়ূবী, খ. ৩, পৃ. ৬৯ ও ১৮; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫. পৃ. ২৭০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩৫৮; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৫৬১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা ওয়াকফ করার বিধান

📄 মুদ্রা ওয়াকফ করার বিধান


মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ইবনু শাস রহ. ও ইবনুল হাযিব রহ.-এর মত, শাফেয়ী মাযহাবের অধিক নির্ভরযোগ্য অভিমত এবং হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত হচ্ছে মুদ্রা ওয়াকফ করা বৈধ নয়। যেহেতু কোনো মুদ্রা তার অস্তিত্ব বজায় রেখে কোনো সেবা বা উপকারে আসে না। বরং এগুলো দ্বারা উপকার পেতে হলে এগুলো ব্যয় করতে হয়। আর এগুলো ব্যয় (খরচ)-এর অর্থই হচ্ছে এগুলো ক্ষয় করে ফেলা, যা ওয়াকফ কর্মের বিপরীত অবস্থা। কেননা কোনো বস্তু (পণ্য) ওয়াকফ করার মূল দাবিটি হচ্ছে ওয়াকফকৃত পণ্যটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে যাকে বা যার জন্য ওয়াকফ করা হয়; তার কাছে মজুত থাকা।

ফকীহগণ কতিপয় দিক বিবেচনায় মুদ্রার ইজারা ভাড়া, মুদ্রা দ্বারা সজ্জিত হওয়ার লক্ষ্যে ইয়ারা (ধারগ্রহণ) অথবা ওজন পরিমাপের বাটখারা হিসেবে ব্যবহার করে উপকৃত হওয়া ইত্যাদি এবং ওয়াকফ করার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তারা বলেছেন, স্বর্ণ-রৌপ্যের সৃষ্টির মূল উপকার ও উদ্দেশ্য হচ্ছে এগুলো মূল্য হিসেবে বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় হবে। এর বিপরীতে ইজারাতে ও ইয়ারাতে পণ্য ব্যয় করা হবে না। এবং ইজারা (ভাড়া) ও ইয়ারা-ধার ইত্যাদি অস্থায়ী চুক্তি। পক্ষান্তরে ওয়াকফ হচ্ছে স্থায়ী চুক্তি।

হাম্বলী মাযহাবের অপর এক মত বর্ণনা করে 'আল-ফুরুউ' গ্রন্থপ্রণেতা বলেন, সৌন্দর্যবর্ধন ও ওজন পরিমাপের জন্য মুদ্রা ওয়াকফ করা জায়েয। এ বিধান শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের অধিকতর সহীহ অভিমতটির বিপরীত। মালেকী মাযহাবের বিজ্ঞ ফকীহগণ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, কোনো কাজে ব্যয় করা অথবা সৌন্দর্যবর্ধনসহ যে-কোনো কাজে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে মুদ্রা ওয়াকফ করা জায়েয হবে না। যদিও তারা এ অভিমত পোষণ করেন যে, কর্জ (ঋণ) দেওয়ার শর্তে ওয়াকফ করা হলে তা বৈধ হবে। এ বিষয়টিতে ইমাম মালেক রহ.-এর উদ্ধৃতি 'আল-মুদাউওয়ানা' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। অতএব, যে ব্যয় করে উপকৃত হবে এবং পরে কর্জ পরিশোধ করবে, ওয়াকফকৃত অর্থ তাকে কর্জ দেওয়া হবে। সে ফেরত দেওয়ার পর তা অন্যকে দেওয়া হবে। এভাবে তা কাজে লাগানো হবে। তারা আরো বলেন: এভাবে মুদ্রার বদল নেওয়ার মাধ্যমে তা বহাল ও বাকী থাকবে।

এ সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের বিস্তারিত বর্ণনামতে ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর বক্তব্যের চাহিদা হচ্ছে, মুদ্রা ওয়াকফ করা জায়েয নেই। যেহেতু এ দু ইমামের মতে, অস্থাবর সম্পদ ওয়াকফ করা জায়েয নয়। আনসারীর বর্ণনা মতে, ফকীহ যুফার রহ.-এর অভিমত হচ্ছে, মুদ্রা (দীনার-দিরহাম) ওয়াকফ করা জায়েয হবে। ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর অভিমত অনুযায়ী অস্থাবর সম্পত্তি ওয়াকফ করা জায়েয নেই। তবে কোনো সমাজে অস্থাবর সম্পদ ওয়াকফ করার ব্যাপক প্রচলন থাকলে তা জায়েয হবে। আল-ইখতিয়ার গ্রন্থে বলা হয়েছে: ইমাম মুহাম্মদের অভিমত অনুযায়ী ফতোয়া; মানুষের একান্ত প্রয়োজন ও প্রচলন থাকায় মুদ্রাদি ওয়াকফ করা জায়েয। যেমন জায়েয রয়েছে কুরআনের কপি, সাধারণ ধর্মীয় গ্রন্থ ও অস্ত্র ওয়াকফ করা। ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর এ অভিমতের ভিত্তিতে জানা যায়, কোনো সমাজে মুদ্রাদি ওয়াকফ করার রেওয়াজ থাকলে তা বৈধ বলে গণ্য হবে। আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বলা হয়েছে, আবু সাঈদ রহ. প্রণীত মা'রুযাত গ্রন্থে বলা হয়েছে, সমাজের প্রচলনের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচারকগণ মুদ্রা ওয়াকফ করার বিষয়টির বিধান প্রদান করবেন। ওয়াকফকৃত মুদ্রা দ্বারা উপকার (সেবা) গ্রহণ করা সম্ভব হবে কর্জ দেওয়ার দ্বারা। ঋণ পরিশোধ করলে তা আবার ঋণ দেওয়া হবে। এটি হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি। এ প্রসঙ্গে ইবনে আবেদীন রহ. বলেন, দীনার-দিরহাম নির্দিষ্ট করলেও যেহেতু নির্দিষ্ট হয় না, তাই তার বদল তার স্থলবর্তী হবে। ইমাম যুফার রহ. আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মুদ্রাদি মুদারাবা ব্যবসায় পুঁজি (মূলধন) হিসেবে বিনিয়োগ করে পরবর্তী সময়ে এর লাভ সদকা করা হবে ওয়াকফ।

টিকাঃ
৬৭. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৭৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩৫৮; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ৩১৫; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৪৫৮
৬৮. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২০৫; হাশিয়াতুদ দুসুকী, খ. ৪, পৃ. ৭৬ ও ৭৭; ইবনে কুদামা-এর আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৮৪; ইবনে মুফলিহ কৃত আল-ফুরু, খ. ৪, পৃ. ৫৮৩
৬৯. আল-ইখতিয়ারু লি তা'লিলিল মুখতার, খ. ৩, পৃ. ৪২; মাজমাউল আনহুর, খ. ২, পৃ. ৭৪৭; ইবনে আবেদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00