📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ফুলুস বা ধাতব অর্থকড়িতে সালাম বিক্রয়

📄 ফুলুস বা ধাতব অর্থকড়িতে সালাম বিক্রয়


জাহির রিওয়ায়াত অনুযায়ী হানাফী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে, সংখ্যা হিসেবে ফুলূসে (নগদ টাকায়) সালাম বিক্রি করা বৈধ। কেননা, এগুলোর মূল্য হওয়া বাধ্যতামূলক (স্থির) নয়, বরং এগুলোর দরদামে পণ্যের দরদামের ন্যায় উঠানামা ঘটে থাকে। এছাড়াও এসব অর্থকড়ির মূল্যমান প্রচলন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, আবার প্রচলন অনুযায়ী অকার্যকর হয়। মুদ্রা হিসেবে এগুলো মূল্য, তাই এগুলোতে সালাম বিক্রি ঠিক নয়, একথা জানার পরও এ ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা অগ্রসর হওয়া একথাই বোঝায়, তারা এ মুদ্রায় মূল্য হওয়ার বৈশিষ্ট্যটি বিবেচনা না করায় একমত। চুক্তি সংঘটিত হওয়ার পূর্বে মুদ্রার মূল্যমান বাতিল হবে, মুদ্রাগুলো বস্তু হিসেবে তাতে সালাম বিক্রি বৈধ হবে।

টিকাঃ
৫৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ২০৮; ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২০৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, খ. ৩, পৃ. ১৮৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান

📄 মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান


মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসাকে কতিপয় ফকীহ সুস্পষ্টভাবে মাকরূহ বলেছেন। ইমাম গাযালী রহ. বলেছেন: মহান আল্লাহ দীনার-দিরহাম এ জন্যই সৃষ্টি করেছেন, যেন সম্পদের মধ্যে ন্যায়-ন্যায্যভাবে এগুলো ফয়সালা প্রদানকারী হতে পারে। এরপর তিনি আরো বলেন, দীনার-দিরহামের নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য না থাকলেও এগুলো হচ্ছে অন্যসব প্রয়োজনের মাধ্যম। এগুলো হচ্ছে আরবী শব্দ হরফ-এর অনুরূপ, তা নিজস্ব কোনো অর্থ না থাকলেও এগুলো (যুক্ত হয়ে) অন্য শব্দের মাঝে তার অর্থ প্রকাশ করে থাকে। তিনি আরো বলেন, যার নিকট শুধু পণ্যসামগ্রী রয়েছে; মুদ্রার অভাবে সে ব্যবসায় অক্ষম। তার পণ্যটি মুদ্রার (দীনার-দিরহামের) বিনিময়ে বিক্রয় করলেই কেবল প্রাপ্ত মুদ্রা দিয়ে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় যে-কোনো পণ্যসামগ্রী ক্রয় করা সম্ভব। এছাড়া যার মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা সংগ্রহই হচ্ছে আর্থিক লেনদেনের উদ্দেশ্য, তার নিকট এসব মুদ্রা দীর্ঘস্থায়ীভাবে পড়ে থাকতে পারে এবং এসব (ধাতব) মুদ্রা গুপ্ত সংরক্ষিত ধনসম্পদের ন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এ অবস্থায় কোনো মুদ্রার মাধ্যমে অন্য মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজন পড়ে শুধু মজুদদারীর উদ্দেশ্যেই। অথচ মজুদদারী অত্যাচার ও অন্যায়।

ইমাম গাযালী রহ. অন্যত্র বলেন, ফকীহগণ মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়কে মাকরূহ বলেছেন। কেননা, এ ধরনের লেনদেনে সূক্ষ্মসূক্ষ্ম সুদের আশঙ্কা রয়েছে, যেগুলো থেকে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। এ ছাড়াও এ ধরনের ক্রয় দ্বারা মূল মুদ্রা তলব করা হয় না, তলব করা হয় মুদ্রার কিছু সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য। মুদ্রার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তা চালু হওয়া। অথচ এগুলোর মজুদদারীর মাধ্যমে এর মূল উদ্দেশ্যটিই ব্যাহত-বিঘ্নিত হয়ে থাকে। এধরনের লেনদেনে মুদ্রার ব্যবসা সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা না থাকার পর ভরসা করেই মুদ্রা ব্যবসায়ীর পক্ষে লাভ অর্জন করা সম্ভব হয়। যতই সতর্কতা অবলম্বন করুক মুদ্রা ব্যবসায়ী এ থেকে বেঁচে থাকতে পারে খুব কমই।

মুদ্রা বিনিময়ের এ ব্যবসা হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ মাকরূহ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ফকীহ আল-বুহুতী রহ.-এর কারণ বর্ণনা করে বলেছেন, তা সন্দেহের অবকাশ থাকার দরুন হতে পারে। নাইলুল মাআরিব গ্রন্থে কারণ বলা হয়েছে, তা স্বর্ণকারের পেশার ন্যায় সর্বাধিক অপছন্দনীয় ব্যবসা হওয়ার কারণে হতে পারে।

টিকাঃ
৫৮. ইহয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ১২, পৃ. ২২২১
৫৯. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ৫, পৃ. ৭৯৫
৬০. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ৪১১; কাশশাফুল কিনা, খ. ৬, পৃ. ২১৪; নাইলুল মাআরিব, খ. ২, পৃ. ৪১২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা ধার দেওয়া

📄 মুদ্রা ধার দেওয়া


মুদ্রা যে ধরনেরই হোক না কেন, দীনার-দিরহাম অথবা অন্য যে-কোনো মুদ্রা, সব ধরনের মুদ্রাই ধার দেয়া জায়েয আছে। এক্ষেত্রে ঋণগৃহীতা ও দেনাদার ব্যক্তির ওপর ঋণদাতা প্রদেয় ঋণের চেয়ে অধিক পরিমাণ মুদ্রা পরিশোধের শর্তারোপ করতে পারবে না। এমনটিও হতে পারবে না যে, যে মানের মুদ্রা দিয়েছে; সেগুলোর চেয়ে উত্তম মুদ্রা প্রদান করবে অথবা খুচরা মুদ্রার বদলে পূর্ণ মুদ্রা পরিশোধ করবে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদীসটি দলিল হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ স. বলেন: خَيْرُكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءُ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হচ্ছেন তিনিই; যে ব্যক্তি উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করেন।"

কালয়ূবী রহ. বলেন, মুদ্রা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণদাতা ব্যক্তি শর্ত ব্যতীত উপরিউক্ত বিষয়গুলোর ইচ্ছা করলেও তা হবে মাকরূহ। যদি এমন ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া হয় যে অধিক ফেরত প্রদানে পরিচিত তবু এই বিধানই থাকবে, অধিকাংশ আলেম মাকরূহ না বলে তা হারাম বলেছেন।

ইমাম সুয়ূতী রহ. 'আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ের' গ্রন্থে বলেন, কারো টাকা পয়সা ধার নিয়ে ঋণের পরিমাণের চেয়ে অধিক পরিমাণে পরিশোধ করার অভ্যাস রয়েছে, এ মর্মে ঋণদাতা জ্ঞাত থাকলেও এ ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া হারাম হবে না। এটি শাফেয়ীদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত, হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ সুস্পষ্টভাবে এ ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগতির জন্য দ্র. পরিভাষা قرض

টিকাঃ
৬১. হাদীসখানি ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর হাদীস সংকলনে সংকলিত করেছেন। খ. ৩, পৃ. ১২২৫
৬২. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৭; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭২, ১৭৩; হাশিয়া কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২৬০
৬৩. ইমাম সুয়ূতী-এর আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৯৬; ইবনে নুজাইম-এর আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ১০৮; আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা বন্ধকের বিধান

📄 মুদ্রা বন্ধকের বিধান


হানাফী ও মালেকী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী মুদ্রা বন্ধক রাখা জায়েয। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, বন্ধক রাখা জায়েয হওয়ার কারণ এই, তাহলে ঋণের টাকা পুরোপুরি ভাবে ফেরত পাওয়া যাবে। দীনার বন্ধক রেখে স্বর্ণ বা দিরহাম বন্ধক রেখে রৌপ্য গ্রহণ করলে, বন্ধক রাখা দীনার বা দিরহাম ধ্বংস হয়ে গেলে ঋণের থেকে সে পরিমাণ বিয়োগ হবে এবং এক্ষেত্রে ধরা হবে, যে পরিমাণ ধ্বংস হয়েছে সেটুকু ঋণ ফেরত পাওয়া গিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাকে ধ্বংস হওয়া বস্তুর সদৃশ প্রদানের জিম্মাদার করাতে কোন লাভ নেই, যেহেতু বন্ধক ও ঋণের দ্রব্য সদৃশ বস্তু। এটুকু কর্তনের পর বাকীটুকু তাকে আদায় করতে হবে।

মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, মুদ্রাদি বন্ধক রাখা বৈধ হবে। এগুলো ন্যায়নিষ্ঠ কোনো ব্যক্তির হাতে অথবা করযদাতার হাতেই রাখা হোক। সেই সাথে তারা শর্তারোপ করেন, বন্ধকী মুদ্রায় এমন একটি সীলমোহর লাগিয়ে দিতে হবে যে সীলমোহরটি নষ্ট হলে তা টের পাওয়া যাবে। সীলগালা করার শর্তটি এজন্যই করা হয়, যাতে করে বন্ধকী মুদ্রাগুলো যথাযথ সংরক্ষিত থাকে। হতে পারে, তারা দুজনেই সালাম বিক্রির ইচ্ছা করল। তাতে তারা নাম রাখল 'বন্ধক'। কিন্তু বন্ধক ও ঋণ একত্রে নিষিদ্ধ।

শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী মুদ্রা বন্ধক রাখা সঠিক হবে যদি বন্ধকদাতা অথবা বিচারক বন্ধকী বস্তুটিকে বিক্রয় করে। অনুরূপভাবে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাযুক্ত বন্ধকী বস্তু বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ মূল্য বন্ধক হিসেবে থাকবে।

টিকাঃ
৬৪. আল-ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার, খ. ২, পৃ. ৬৭; ইবনে আবেদীন ও আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৫, পৃ. ৩১৯ ও ৩২০; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৯; আদ-দুসুকী মা'য়াশ-শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২৩৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৩৭; আল- ইনসাফ, খ. ৫, পৃ. ১৪১; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৭৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00