📄 সমজাতীয় আর্থিক ঋণে পারস্পরিক ছাড়
কোনো দু'ব্যক্তি একে অপরের নিকট ঋণে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় এবং উভয় ঋণেই ঋণ পরিশোধের সময় এবং ঋণের ধরন ও বৈশিষ্ট্য এক ও অভিন্ন হলে, যেমন উভয় ঋণ দীনার বা দিরহাম হলে উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক ছাড় (clearing) পদ্ধতি কার্যকর হবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত ও বিন্যস্ত অবগতির জন্য দেনা সম্পর্কিত আলোচনা দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
৫২. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৬; শারহুল মিনহাজ, খ. ২, পৃ. ৩৩৬; দুসূকী 'আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২২৭
📄 বকেয়া পন্থায় মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়
মুসলিম ফকীহগণ সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, বাকীতে দিরহামের বিনিময়ে দীনার অথবা দীনারের বিনিময়ে দিরহামের ক্রয়-বিক্রয় (লেনদেন) বৈধ হবে না। এভাবে বাকীতে ক্রয়-বিক্রয় করলে বিক্রয় চুক্তিটি ফাসেদ ও বাতিল হবে। তবে সালাম বিক্রি হিসাবে দীনার অথবা দিরহামের বাকী বিনিময়ে যে-কোনো পণ্য নগদ বিক্রয় করলে এধরনের ক্রয়-বিক্রয় মালেকী শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী বৈধ হবে। এ দীনার দিরহামের বিনিময়ে অন্যসব পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতার কারণটি হচ্ছে এক্ষেত্রে মুদ্রার ওজন পরিমাণ ও গুণ বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্টকরণ সম্ভব।
📄 ফুলুস বা ধাতব অর্থকড়িতে সালাম বিক্রয়
জাহির রিওয়ায়াত অনুযায়ী হানাফী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে, সংখ্যা হিসেবে ফুলূসে (নগদ টাকায়) সালাম বিক্রি করা বৈধ। কেননা, এগুলোর মূল্য হওয়া বাধ্যতামূলক (স্থির) নয়, বরং এগুলোর দরদামে পণ্যের দরদামের ন্যায় উঠানামা ঘটে থাকে। এছাড়াও এসব অর্থকড়ির মূল্যমান প্রচলন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, আবার প্রচলন অনুযায়ী অকার্যকর হয়। মুদ্রা হিসেবে এগুলো মূল্য, তাই এগুলোতে সালাম বিক্রি ঠিক নয়, একথা জানার পরও এ ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা অগ্রসর হওয়া একথাই বোঝায়, তারা এ মুদ্রায় মূল্য হওয়ার বৈশিষ্ট্যটি বিবেচনা না করায় একমত। চুক্তি সংঘটিত হওয়ার পূর্বে মুদ্রার মূল্যমান বাতিল হবে, মুদ্রাগুলো বস্তু হিসেবে তাতে সালাম বিক্রি বৈধ হবে।
টিকাঃ
৫৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ২০৮; ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২০৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, খ. ৩, পৃ. ১৮৩
📄 মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান
মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসাকে কতিপয় ফকীহ সুস্পষ্টভাবে মাকরূহ বলেছেন। ইমাম গাযালী রহ. বলেছেন: মহান আল্লাহ দীনার-দিরহাম এ জন্যই সৃষ্টি করেছেন, যেন সম্পদের মধ্যে ন্যায়-ন্যায্যভাবে এগুলো ফয়সালা প্রদানকারী হতে পারে। এরপর তিনি আরো বলেন, দীনার-দিরহামের নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য না থাকলেও এগুলো হচ্ছে অন্যসব প্রয়োজনের মাধ্যম। এগুলো হচ্ছে আরবী শব্দ হরফ-এর অনুরূপ, তা নিজস্ব কোনো অর্থ না থাকলেও এগুলো (যুক্ত হয়ে) অন্য শব্দের মাঝে তার অর্থ প্রকাশ করে থাকে। তিনি আরো বলেন, যার নিকট শুধু পণ্যসামগ্রী রয়েছে; মুদ্রার অভাবে সে ব্যবসায় অক্ষম। তার পণ্যটি মুদ্রার (দীনার-দিরহামের) বিনিময়ে বিক্রয় করলেই কেবল প্রাপ্ত মুদ্রা দিয়ে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় যে-কোনো পণ্যসামগ্রী ক্রয় করা সম্ভব। এছাড়া যার মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা সংগ্রহই হচ্ছে আর্থিক লেনদেনের উদ্দেশ্য, তার নিকট এসব মুদ্রা দীর্ঘস্থায়ীভাবে পড়ে থাকতে পারে এবং এসব (ধাতব) মুদ্রা গুপ্ত সংরক্ষিত ধনসম্পদের ন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এ অবস্থায় কোনো মুদ্রার মাধ্যমে অন্য মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজন পড়ে শুধু মজুদদারীর উদ্দেশ্যেই। অথচ মজুদদারী অত্যাচার ও অন্যায়।
ইমাম গাযালী রহ. অন্যত্র বলেন, ফকীহগণ মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়কে মাকরূহ বলেছেন। কেননা, এ ধরনের লেনদেনে সূক্ষ্মসূক্ষ্ম সুদের আশঙ্কা রয়েছে, যেগুলো থেকে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। এ ছাড়াও এ ধরনের ক্রয় দ্বারা মূল মুদ্রা তলব করা হয় না, তলব করা হয় মুদ্রার কিছু সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য। মুদ্রার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তা চালু হওয়া। অথচ এগুলোর মজুদদারীর মাধ্যমে এর মূল উদ্দেশ্যটিই ব্যাহত-বিঘ্নিত হয়ে থাকে। এধরনের লেনদেনে মুদ্রার ব্যবসা সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা না থাকার পর ভরসা করেই মুদ্রা ব্যবসায়ীর পক্ষে লাভ অর্জন করা সম্ভব হয়। যতই সতর্কতা অবলম্বন করুক মুদ্রা ব্যবসায়ী এ থেকে বেঁচে থাকতে পারে খুব কমই।
মুদ্রা বিনিময়ের এ ব্যবসা হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ মাকরূহ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ফকীহ আল-বুহুতী রহ.-এর কারণ বর্ণনা করে বলেছেন, তা সন্দেহের অবকাশ থাকার দরুন হতে পারে। নাইলুল মাআরিব গ্রন্থে কারণ বলা হয়েছে, তা স্বর্ণকারের পেশার ন্যায় সর্বাধিক অপছন্দনীয় ব্যবসা হওয়ার কারণে হতে পারে।
টিকাঃ
৫৮. ইহয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ১২, পৃ. ২২২১
৫৯. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ৫, পৃ. ৭৯৫
৬০. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ৪১১; কাশশাফুল কিনা, খ. ৬, পৃ. ২১৪; নাইলুল মাআরিব, খ. ২, পৃ. ৪১২