📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চুক্তিসমূহ ও অঙ্গীকারাদিতে শর্তহীন মুদ্রা বললে যা নির্দেশ করে

📄 চুক্তিসমূহ ও অঙ্গীকারাদিতে শর্তহীন মুদ্রা বললে যা নির্দেশ করে


কোনো ব্যক্তি অন্য কারো নিকট দীনার, দিরহাম ইত্যাদি নির্দিষ্ট মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয়বিক্রয় করলে নির্দিষ্ট মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে কার্যকর হবে। এমনকি নির্দিষ্ট মুদ্রাটি বিদেশী ভিন্ন অঞ্চলের অথবা দুষ্প্রাপ্য হলেও তা-ই আদান-প্রদান করতে হবে। পক্ষান্তরে ক্রয়-বিক্রয়ে মুদ্রাটি অনির্দিষ্ট থাকলে, স্থানীয় বাজারে এক ও অভিন্ন মুদ্রা চালু থাকলে, চালু মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে নির্দিষ্ট হবে। তবে কোনো অঞ্চলে (দেশে) একাধিক মুদ্রা প্রচলিত থাকলে অধিক প্রচলিত মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে ধর্তব্য হবে। এমনকি অধিক প্রচলিত মুদ্রাটি খাদযুক্ত ও পরিমাণে কম হলেও তা-ই কার্যকর হবে। কেননা, ক্রেতা-বিক্রেতা স্থানীয়ভাবে অধিক প্রচলিত মুদ্রাটিই উদ্দেশ্য করা স্বাভাবিক। স্থানীয়ভাবে একাধিক মুদ্রা প্রচলিত থাকলে এবং প্রচলিত মুদ্রাসমূহের মূল্যমান বিভিন্ন হলে কোনো পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়কালে প্রচলিত যে কোনো একটি মুদ্রা নির্দিষ্ট করতে হবে। পক্ষান্তরে সকল মুদ্রার মূল্যমান এক ও অভিন্ন হলে এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মুদ্রা নির্দিষ্টকরণ নিয়ে মতবিরোধ ঘটলে উভয়ে হলফ করে স্থির করতে হবে। অনুরূপভাবে কোনো অঞ্চলে (দেশে) দুই বা ততোধিক মুদ্রা প্রচলিত থাকলে প্রচলিত এসব মুদ্রার কোনোটিই অধিক প্রচলিত না-হয়ে বরং সবগুলো সমান প্রচলিত হলে এক্ষেত্রে ক্রয়-বিক্রয়কালে সুনির্দিষ্টভাবে (শব্দগত উচ্চারণে) যে-কোনো একটি মুদ্রাকে বিনিময়ের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগতির জন্য অত্র পরিভাষা দেখা যেতে পারে। সুস্পষ্টতা ব্যতীত মুদ্রার শুধু সংখ্যা উল্লেখ করা হলে, অর্থাৎ দীনার, দিরহাম ইত্যাদি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা না-হলে এক্ষেত্রে সমাজে ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে ধর্তব্য ও কার্যকর হবে। ইমাম মাওসিলী রহ. বলেন: যদি কেউ বলেন যে, আমি এ বাড়িটি দশটি মুদ্রায় অথবা এ কাপড়টি দশটি মুদ্রায় অথবা এ তরমুজটি দশটি মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করলাম, তাহলে এক্ষেত্রে পণ্য বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা ধর্তব্য হবে। যেমন, বাড়ির ক্ষেত্রে দীনার, বস্ত্রের ক্ষেত্রে দিরহাম, আর তরমুজের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত মুদ্রাটি নির্দিষ্ট ও কার্যকর হবে।

টিকাঃ
৪০. আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বিনিময় নির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে মুদ্রাও নির্দিষ্ট হয়ে যায়

📄 বিনিময় নির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে মুদ্রাও নির্দিষ্ট হয়ে যায়


বিখ্যাত ফকীহ ইবনু কাসিম রহ. ও আশহাব রহ. এবং অন্য সকল শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের গৃহীত অভিমত হচ্ছে, স্বর্ণমুদ্রা রৌপ্যমুদ্রাসহ সকল মুদ্রাই বিনিময় সাপেক্ষে নির্দিষ্ট হয়ে যায়; যেমনিভাবে মুদ্রা হস্তান্তরের মাধ্যমে গৃহীত পণ্যটিও শনাক্ত ও সাব্যস্ত হয়ে যায়। যেমন, কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো দীনারের বিনিময়ে একটি ছাগল ক্রয় করলে নির্ধারিত ধরনের ও মানের দীনারই বিক্রেতাকে প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি এমনটি প্রমাণিত হয় যে, প্রদত্ত দীনারটি ছিনতাইকৃত অথবা ক্রেতা ছাগলটি হস্তগত করার পূর্বেই প্রদত্ত মুদ্রাটি নষ্ট হয়ে গেলে ক্রয়-বিক্রয়টিই ফাসেদ হয়ে যাবে। কেননা, বস্তুর মূল্য হচ্ছে দু'টি বদলের একটি। তাই পণ্যের ন্যায় এর মূল্যও নির্ধারিত হবে। মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ অভিমত, ইমাম আহমদ রহ.-এর একটি অভিমত, যা হানাফী ফকীহদের মত, তা হচ্ছে, ক্রয়-বিক্রয়চুক্তিতে নির্দিষ্ট করলেও মুদ্রা নির্দিষ্ট হয় না। এর কারণ, পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ে বিনিময়মূল্যটি অনির্দিষ্ট রাখা যায়। ফলে মুদ্রার মান ও ধরন নির্দিষ্ট না-করেও কোনো পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হতে পারে। যেমন, যে কোনো পণ্যের পরিমাণ উল্লেখ ব্যতীত ক্রয়-বিক্রয় সম্ভব ও সম্পন্ন হতে পারে। তা ছাড়া, পণ্যের মূল্য এমন একটি বিষয়; যা ক্রেতার দায়িত্বে থাকে। তাই ইশারার মাধ্যমে তা নির্দিষ্ট করার সম্ভাবনা থাকে না। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ এ অভিমতটি পোষণ করেন। তবে মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় এর ব্যতিক্রম। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ক্রয়বিক্রয়ের মজলিসে উভয় পক্ষ মুদ্রা কজা করার শর্ত করার দরুন তাতে মুদ্রা নির্দিষ্ট হবে।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যাকাত ও লেনদেনে কতক মুদ্রা অন্য মুদ্রার স্থলাভিষিক্ত হওয়া

📄 যাকাত ও লেনদেনে কতক মুদ্রা অন্য মুদ্রার স্থলাভিষিক্ত হওয়া


দীনার-দিরহাম দুটি পারস্পরিক ভিন্ন ধরনের মুদ্রা। একারণে একটির বিনিময়ে অন্যটি বাড়িয়ে কমিয়ে ক্রয়বিক্রয় করার বৈধতা রয়েছে। যদিও পণ্যের মূল্য প্রকাশক হিসেবে মুদ্রা দুটির মধ্যে সামঞ্জস্যও রয়েছে। এবং এ দুটি মুদ্রার মূল উদ্দেশ্যও এটিই। এ বিশেষ দিকটি বিবেচনায় উভয় ধরনের মুদ্রা এক জাতের মুদ্রা গণ্য হয়ে আসছে। কিছু নির্দিষ্ট বিধানে এর প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়। হানাফী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে: কতক মাসআলাতে দিরহাম দীনারের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং উভয় ধরনের মুদ্রাতে অভিন্ন নিয়মনীতি প্রযোজ্য হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে অন্য মাযহাবের ফকীহগণ কতক ব্যাপারে হানাফী ফকীহগণের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এধরনের কতিপয় মাসআলা (প্রসঙ্গ) ইবনু আবিদীন রহ. নিম্নোক্তভাবে বিন্যস্ত করেছেন:

ক. যাকাত: যাকাতের নিসাব পরিপূর্ণ করতে দিরহাম দীনারের একটি অপরটির সাথে মিলিত হয়। ফলে এ দুটো মুদ্রার যে কোনো ১টি মুদ্রার হিসেবে যাকাতের নিসাব নির্ণীত হয়ে থাকে।

খ. ঋণ পরিশোধ: কোনো ব্যক্তির দায়িত্বে অন্য কোনো ব্যক্তির দিরহাম প্রাপ্য ছিল, সে তা পরিশোধ করছে না। এ অবস্থায় বিচারক দীনারকে দিরহামে পরিবর্তন করার মাধ্যমে দিরহামের ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন।

গ. শুফআ (الشفعة): অগ্রক্রয়

ঘ. ইকরাহ্ (الإكْرَهُ): জবরদস্তিমূলক ক্রয়-বিক্রয়

৫. মুদারাবা (الْمُضَارَبَةُ)

চ. মুরাবাহা হতে বিরত থাকা

ছ. অংশীদারিমূলক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড

ছ. অংশীদারিমূলক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড

জ. ধ্বংসের শিকার দ্রব্যাদির মূল্য/ক্ষতিপূরণ

ঝ. অন্যায় অপরাধের ক্ষতিপূরণ

টিকাঃ
৪৪. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ১৩; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ১২৮ ও ১৬৬; ইবনে নুজাইম কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাষায়ের, পৃ. ৩৭৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৩-৫০; আশ-শারহুল কাবীর মা'য়া হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ১৫৫ ও ৪৪৫; আল-ফুরুক, খ. ৩. পৃ. ২৫৫; আল-মুনতাকা, খ. ৪, পৃ. ২৬৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দীনার-দিরহামের একটির স্থলে অন্যটি গ্রহণ

📄 দীনার-দিরহামের একটির স্থলে অন্যটি গ্রহণ


যে ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট থেকে ঋণ নিয়েছে দীনার, পাওনাদার এখন দেনাদার ব্যক্তির নিকট থেকে দিরহাম নিচ্ছে, অথবা দিরহামের পরিবর্তে দীনার নিচ্ছে, তাহলে সে তা নিতে পারবে। এমনটিই অভিমত দিয়েছেন হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের বিশেষজ্ঞ ফকীহগণ, যা শাফেয়ী মাযহাবের নতুন (সর্বশেষ) অভিমত। তবে এ ব্যাপারে হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের স্বতন্ত্র অভিমত রয়েছে। তা হচ্ছে, যেদিন মুদ্রা প্রদান করবে সেদিনের বাজারদরের হিসেবে একের বদলে অপরটি দেওয়া নেওয়া করতে হবে। তারা তাদের এ অভিমতের পক্ষে ইবনে উমর রা.-এর সনদে বর্ণিত নিম্নোক্ত মারফু হাদীসটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। মহানবী স. বলেছেন: لَا بَأْسَ أَنْ تَأْخُذَهَا بِسِعْرٍ يَوْمِهَا “যে দিন তুমি নেবে সে দিনের দাম হিসাবে নিলে কোনো অসুবিধা নেই।

টিকাঃ
৪৮. ইবনু নুজাইম কৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৭৫; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ১১৫ এবং খ. ৩, পৃ. ২০০; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২৫৭; রওযাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৪১৬-৪১৭; আদ-দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৮৯
৪৯. সুনান আবু দাউদ, খ. ৩, পৃ. ৫৬১। ইমাম বায়হাকী রহ. হাদীসটিকে ইবনে উমর রা.-এর ‘মাউকূফ’ হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00