📄 পঞ্চম : চুক্তিসমূহে মুদ্রাদির ব্যবহার প্রসঙ্গ
বিনিময়যোগ্য চুক্তি যেমন, বিবাহ-শাদী ও দান-অনুদান ইত্যাদিতে মুদ্রাদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে কেবল মুদ্রা নয়, বরং পণ্যসামগ্রীও মুদ্রার ন্যায় ব্যবহার করা বৈধ। এ অবস্থায় পণ্যও দাম হতে পারে। ছাড়াও কাজের পারিশ্রমিক, বিবাহের দেনমোহর অথবা দান-অনুদান বেতন-ভাতা ইত্যাদি হিসেবেও পণ্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়কে মুকায়াযা (مُقَائِضَة) এবং জমির বিনিময়ে জমির ক্রয়-বিক্রয়কে মুনাকালা (مُنَاقَلَة) বলা হয়। যদিও অধিকাংশ ক্রয়-বিক্রয় মুদ্রার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এটাই হচ্ছে মুদ্রার সর্বাধিক কার্যকারিতা ও প্রয়োগ। মুদ্রার বিনিময়কে দাম (মূল্যমান) বলা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখতে ثُمَّন দ্রষ্টব্য। পক্ষান্তরে মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা ক্রয়বিক্রয় করলে একে 'সারাফ' বলা হয়। অর্থাৎ 'সারাফ' হচ্ছে কোনো মুদ্রাকে অন্য যে কোনো মুদ্রার মাধ্যমে পরিবর্তন করা। একই ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ে ওজন ও পরিমাণে সমতা এবং ক্রয়-বিক্রয় বৈঠকেই তাৎক্ষণিক হস্তান্তর আবশ্যক। ওজন-পরিমাণে কমবেশ অথবা বাকিতে হস্তান্তর করা হলে এ ধরনের সমজাতের মুদ্রা বিনিময়ে বৃদ্ধিজনিত সুদ অথবা বাকিজনিত সুদ হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে এক ধরনের মুদ্রার সাথে অপর ধরনের মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের বৈঠকেই তাৎক্ষণিক আদান- প্রদান (হস্তান্তর) আবশ্যিক হবে। কিন্তু ওজনে সমান হওয়া আবশ্যিক হবে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত অবগতির জন্য দ্র. পরিভাষা : صرف (মুদ্রা বিনিময়)
📄 যেসব ক্রয়-বিক্রয়ে মুদ্রা প্রদান করা আবশ্যক, পণ্য প্রদান বৈধ নয়
শরীকানা চুক্তির পুঁজি:
ফকীহগণ ব্যবসায়িক শরীকানা চুক্তিতে পুঁজি হিসেবে পণ্য প্রদান করার বিধান নিয়ে মতভেদপূর্ণ অভিমত পেশ করেছেন। হানাফী, হাম্বলী ও শাফেয়ী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী, শরীকানায় প্রদত্ত পুঁজি অবশ্যই মুদ্রা হতে হবে এবং এক্ষেত্রে ওজন বা পরিমাণনির্ভর কোনো পণ্যসামগ্রী হলেও তা পুঁজি হিসেবে বৈধ হবে না। এর কারণ, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শরীকানার চাহিদা হচ্ছে, অংশীদার বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় পুঁজি বা তার তুল্য বস্তু নিয়ে যাবে। কিন্তু শরীকানার পুঁজি পণ্যসামগ্রী হলে উভয় শরীক (অংশীদার) নিশ্চিতভাবে স্ব-স্ব অংশ ফেরত নেওয়া অসম্ভব হবে। শাফেয়ী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে, ব্যবসায়িক শরীকানায় পুঁজি হিসেবে মিছলী (সদৃশ) পণ্য প্রদান বৈধ হবে। তাহলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তার তুল্য বস্তু তাকে দেওয়া যাবে। এ বিষয়ে মালেকী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে, পণ্যসামগ্রী পুঁজি হিসেবে গৃহীত হওয়া বৈধ। তবে শরীকের কারো পক্ষ থেকে খাদ্যশস্য পুঁজি হিসেবে প্রদান গৃহীত হবে না। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত অবগতির জন্য দেখুন দ্র. পরিভাষা : شركة العقد এ ব্যাপারে ইমাম আওযায়ী রহ. ও ইমাম হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান প্রমুখের অভিমত হচ্ছে পণ্যের মাধ্যমে শরীকানা (শিরকাত) ও মুদারাবা জায়েয হবে। অধিকাংশ ফকীহের অভিমত হচ্ছে মুদারাবা ও শরীকানা ব্যবসায়ে বিনিয়োগকৃত পুঁজি অবশ্যই প্রস্তুতকৃত মুদ্রা হতে হবে। এক্ষেত্রে স্বর্ণ-রৌপ্যের পিণ্ড হলে তা পুঁজি হিসেবে যোগান দেওয়া বৈধ হবে না। যেহেতু, এসব ধাতবপিণ্ডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা এবং কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। 'আল-মুনতাকা' গ্রন্থে আল-বাজী রহ. এ অভিমত পেশ করেন যে, দীনার-দিরহাম ব্যতীত অন্য কোনো মুদ্রা ও পণ্যের মাধ্যমে মুদারাবা জায়েয হবে না। এর কারণ, দীনার ও দিরহাম হচ্ছে মূল্যের মানদণ্ড এবং যে কোনো বস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার মূল্যনির্ধারক। দীনার ও দিরহামের বাজারদর তেমন পরিবর্তিত হয় না বললেই চলে। অনুরূপভাবে যেসব পণ্যের দামে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে সেসব পণ্যের দ্বারা মুদারাবা বৈধ নয়। যেহেতু বাজারে দাম উঠা-নামা করে, একই স্থানে স্থায়ী-স্থির থাকে না, তাই পণ্যসামগ্রী দ্বারা অংশীদারী ব্যবসায় ও মুদারাবাতে পুঁজি যোগান শরীয়তসম্মত নয়।
টিকাঃ
৩৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১৬৮; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৬; হাশিয়া দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৩৪৯-৩৫১; মুহাল্লা শারহুল মিনহাজ, খ. ২, পৃ. ৩৩৪; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩২২; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩-১৫
📄 চুক্তিসমূহ ও অঙ্গীকারাদিতে শর্তহীন মুদ্রা বললে যা নির্দেশ করে
কোনো ব্যক্তি অন্য কারো নিকট দীনার, দিরহাম ইত্যাদি নির্দিষ্ট মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয়বিক্রয় করলে নির্দিষ্ট মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে কার্যকর হবে। এমনকি নির্দিষ্ট মুদ্রাটি বিদেশী ভিন্ন অঞ্চলের অথবা দুষ্প্রাপ্য হলেও তা-ই আদান-প্রদান করতে হবে। পক্ষান্তরে ক্রয়-বিক্রয়ে মুদ্রাটি অনির্দিষ্ট থাকলে, স্থানীয় বাজারে এক ও অভিন্ন মুদ্রা চালু থাকলে, চালু মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে নির্দিষ্ট হবে। তবে কোনো অঞ্চলে (দেশে) একাধিক মুদ্রা প্রচলিত থাকলে অধিক প্রচলিত মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে ধর্তব্য হবে। এমনকি অধিক প্রচলিত মুদ্রাটি খাদযুক্ত ও পরিমাণে কম হলেও তা-ই কার্যকর হবে। কেননা, ক্রেতা-বিক্রেতা স্থানীয়ভাবে অধিক প্রচলিত মুদ্রাটিই উদ্দেশ্য করা স্বাভাবিক। স্থানীয়ভাবে একাধিক মুদ্রা প্রচলিত থাকলে এবং প্রচলিত মুদ্রাসমূহের মূল্যমান বিভিন্ন হলে কোনো পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়কালে প্রচলিত যে কোনো একটি মুদ্রা নির্দিষ্ট করতে হবে। পক্ষান্তরে সকল মুদ্রার মূল্যমান এক ও অভিন্ন হলে এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মুদ্রা নির্দিষ্টকরণ নিয়ে মতবিরোধ ঘটলে উভয়ে হলফ করে স্থির করতে হবে। অনুরূপভাবে কোনো অঞ্চলে (দেশে) দুই বা ততোধিক মুদ্রা প্রচলিত থাকলে প্রচলিত এসব মুদ্রার কোনোটিই অধিক প্রচলিত না-হয়ে বরং সবগুলো সমান প্রচলিত হলে এক্ষেত্রে ক্রয়-বিক্রয়কালে সুনির্দিষ্টভাবে (শব্দগত উচ্চারণে) যে-কোনো একটি মুদ্রাকে বিনিময়ের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগতির জন্য অত্র পরিভাষা দেখা যেতে পারে। সুস্পষ্টতা ব্যতীত মুদ্রার শুধু সংখ্যা উল্লেখ করা হলে, অর্থাৎ দীনার, দিরহাম ইত্যাদি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা না-হলে এক্ষেত্রে সমাজে ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত মুদ্রাটিই বিনিময়মূল্য হিসেবে ধর্তব্য ও কার্যকর হবে। ইমাম মাওসিলী রহ. বলেন: যদি কেউ বলেন যে, আমি এ বাড়িটি দশটি মুদ্রায় অথবা এ কাপড়টি দশটি মুদ্রায় অথবা এ তরমুজটি দশটি মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করলাম, তাহলে এক্ষেত্রে পণ্য বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা ধর্তব্য হবে। যেমন, বাড়ির ক্ষেত্রে দীনার, বস্ত্রের ক্ষেত্রে দিরহাম, আর তরমুজের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত মুদ্রাটি নির্দিষ্ট ও কার্যকর হবে।
টিকাঃ
৪০. আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৫
📄 বিনিময় নির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে মুদ্রাও নির্দিষ্ট হয়ে যায়
বিখ্যাত ফকীহ ইবনু কাসিম রহ. ও আশহাব রহ. এবং অন্য সকল শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের গৃহীত অভিমত হচ্ছে, স্বর্ণমুদ্রা রৌপ্যমুদ্রাসহ সকল মুদ্রাই বিনিময় সাপেক্ষে নির্দিষ্ট হয়ে যায়; যেমনিভাবে মুদ্রা হস্তান্তরের মাধ্যমে গৃহীত পণ্যটিও শনাক্ত ও সাব্যস্ত হয়ে যায়। যেমন, কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো দীনারের বিনিময়ে একটি ছাগল ক্রয় করলে নির্ধারিত ধরনের ও মানের দীনারই বিক্রেতাকে প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি এমনটি প্রমাণিত হয় যে, প্রদত্ত দীনারটি ছিনতাইকৃত অথবা ক্রেতা ছাগলটি হস্তগত করার পূর্বেই প্রদত্ত মুদ্রাটি নষ্ট হয়ে গেলে ক্রয়-বিক্রয়টিই ফাসেদ হয়ে যাবে। কেননা, বস্তুর মূল্য হচ্ছে দু'টি বদলের একটি। তাই পণ্যের ন্যায় এর মূল্যও নির্ধারিত হবে। মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ অভিমত, ইমাম আহমদ রহ.-এর একটি অভিমত, যা হানাফী ফকীহদের মত, তা হচ্ছে, ক্রয়-বিক্রয়চুক্তিতে নির্দিষ্ট করলেও মুদ্রা নির্দিষ্ট হয় না। এর কারণ, পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ে বিনিময়মূল্যটি অনির্দিষ্ট রাখা যায়। ফলে মুদ্রার মান ও ধরন নির্দিষ্ট না-করেও কোনো পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হতে পারে। যেমন, যে কোনো পণ্যের পরিমাণ উল্লেখ ব্যতীত ক্রয়-বিক্রয় সম্ভব ও সম্পন্ন হতে পারে। তা ছাড়া, পণ্যের মূল্য এমন একটি বিষয়; যা ক্রেতার দায়িত্বে থাকে। তাই ইশারার মাধ্যমে তা নির্দিষ্ট করার সম্ভাবনা থাকে না। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ এ অভিমতটি পোষণ করেন। তবে মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় এর ব্যতিক্রম। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ক্রয়বিক্রয়ের মজলিসে উভয় পক্ষ মুদ্রা কজা করার শর্ত করার দরুন তাতে মুদ্রা নির্দিষ্ট হবে।