📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয় : মুদ্রা ভেঙ্গে ফেলা ও ভেঙ্গে পড়া প্রসঙ্গ

📄 তৃতীয় : মুদ্রা ভেঙ্গে ফেলা ও ভেঙ্গে পড়া প্রসঙ্গ


ভাঙ্গা বা কর্তিত মুদ্রার বিপরীত অবস্থাটি হচ্ছে অক্ষত মুদ্রা। কর্তিত মুদ্রা বলতে বুঝায়: যে মুদ্রাটি কাঁচি-জাতীয় বস্তুর মাধ্যমে কর্তন করা হয়েছে। মুদ্রা ভেঙ্গে ফেলা অথবা ভেঙ্গে যাওয়া মুদ্রার বিধান সম্পর্কে ফকীহগণ পরস্পর বিপরীত অভিমত পোষণ করেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত অবগতির জন্য دَرَاهم পরিভাষা দেখা যেতে পারে।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চতুর্থ : মুদ্রার মাধ্যমে অলংকৃত হওয়া

📄 চতুর্থ : মুদ্রার মাধ্যমে অলংকৃত হওয়া


স্বর্ণের অলংকার পরিধান করে দৈহিক সাজ-সজ্জা করা নারীদের জন্য হালাল হলেও পুরুষের জন্য স্বর্ণালঙ্কার পরা বৈধ নয়, বরং পুরুষের জন্য তা সুস্পষ্ট হারাম। পক্ষান্তরে নারীদের জন্য রৌপ্য অলংকার বৈধ হওয়ার সাথে-সাথে পুরুষের জন্যও স্বল্প মাত্রার রৌপ্যের অলঙ্কার পরিধান করা বৈধ। এ বিষয়ে সবিস্তারে জানতে দেখুন ذَهَب ، فضَّة পরিভাষা। উপরিউক্ত বিধানের আলোকে মুসলিম ফকীহগণ অভিমত পোষণ করেছেন যে, ইসলামী রীতি-নীতি মেনে দীনার অথবা দিরহামের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হওয়াতে কোনো দোষ নেই; যদি দিরহাম দীনার কাটার বা ভাঙ্গার প্রয়োজন না হয়। শাফেয়ীদের নির্ভরযোগ্য অভিমত ও হাম্বলী মাযহাবের মত হচ্ছে, কর্তিত দীনার- দিরহামের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হওয়া বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে ইমাম রামলী রহ. বলেন, নারীরা অলঙ্কার হিসেবে এগুলো একত্র করে হার পরিধান করলে তা বৈধ হবে। তবে দীনার-দিরহাম ছিদ্র করে এগুলো দিয়ে মালা (হার) তৈরি করলে শাফেয়ী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য অভিমত অনুযায়ী তা জায়েয হবে না, যেমন রওযা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং তা হবে হারাম (অবৈধ)। ইমাম আহমদ রহ.-এর অভিমত অনুযায়ী দিরহাম-দীনার কেটে-ভেঙ্গে অলংকার তৈরি করা সঙ্গত নয়। মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ইবনুল কাসিম ও ইবনু ওয়াহাব রহ. প্রমুখের অভিমত অনুযায়ী দীনার-'দিরহাম' ভেঙ্গে-কেটে অলংকার প্রস্তুত করাতে অসুবিধা নেই।

টিকাঃ
৩৩. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৯৩
৩৪. আবুল ইয়া'লা কৃত আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১৮২; ফাতহুল আলী আল-মালেক, খ. ১, পৃ. ২১৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 পঞ্চম : চুক্তিসমূহে মুদ্রাদির ব্যবহার প্রসঙ্গ

📄 পঞ্চম : চুক্তিসমূহে মুদ্রাদির ব্যবহার প্রসঙ্গ


বিনিময়যোগ্য চুক্তি যেমন, বিবাহ-শাদী ও দান-অনুদান ইত্যাদিতে মুদ্রাদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে কেবল মুদ্রা নয়, বরং পণ্যসামগ্রীও মুদ্রার ন্যায় ব্যবহার করা বৈধ। এ অবস্থায় পণ্যও দাম হতে পারে। ছাড়াও কাজের পারিশ্রমিক, বিবাহের দেনমোহর অথবা দান-অনুদান বেতন-ভাতা ইত্যাদি হিসেবেও পণ্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়কে মুকায়াযা (مُقَائِضَة) এবং জমির বিনিময়ে জমির ক্রয়-বিক্রয়কে মুনাকালা (مُنَاقَلَة) বলা হয়। যদিও অধিকাংশ ক্রয়-বিক্রয় মুদ্রার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এটাই হচ্ছে মুদ্রার সর্বাধিক কার্যকারিতা ও প্রয়োগ। মুদ্রার বিনিময়কে দাম (মূল্যমান) বলা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখতে ثُمَّন দ্রষ্টব্য। পক্ষান্তরে মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা ক্রয়বিক্রয় করলে একে 'সারাফ' বলা হয়। অর্থাৎ 'সারাফ' হচ্ছে কোনো মুদ্রাকে অন্য যে কোনো মুদ্রার মাধ্যমে পরিবর্তন করা। একই ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ে ওজন ও পরিমাণে সমতা এবং ক্রয়-বিক্রয় বৈঠকেই তাৎক্ষণিক হস্তান্তর আবশ্যক। ওজন-পরিমাণে কমবেশ অথবা বাকিতে হস্তান্তর করা হলে এ ধরনের সমজাতের মুদ্রা বিনিময়ে বৃদ্ধিজনিত সুদ অথবা বাকিজনিত সুদ হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে এক ধরনের মুদ্রার সাথে অপর ধরনের মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের বৈঠকেই তাৎক্ষণিক আদান- প্রদান (হস্তান্তর) আবশ্যিক হবে। কিন্তু ওজনে সমান হওয়া আবশ্যিক হবে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত অবগতির জন্য দ্র. পরিভাষা : صرف (মুদ্রা বিনিময়)

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যেসব ক্রয়-বিক্রয়ে মুদ্রা প্রদান করা আবশ্যক, পণ্য প্রদান বৈধ নয়

📄 যেসব ক্রয়-বিক্রয়ে মুদ্রা প্রদান করা আবশ্যক, পণ্য প্রদান বৈধ নয়


শরীকানা চুক্তির পুঁজি:
ফকীহগণ ব্যবসায়িক শরীকানা চুক্তিতে পুঁজি হিসেবে পণ্য প্রদান করার বিধান নিয়ে মতভেদপূর্ণ অভিমত পেশ করেছেন। হানাফী, হাম্বলী ও শাফেয়ী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহগণের অভিমত অনুযায়ী, শরীকানায় প্রদত্ত পুঁজি অবশ্যই মুদ্রা হতে হবে এবং এক্ষেত্রে ওজন বা পরিমাণনির্ভর কোনো পণ্যসামগ্রী হলেও তা পুঁজি হিসেবে বৈধ হবে না। এর কারণ, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শরীকানার চাহিদা হচ্ছে, অংশীদার বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় পুঁজি বা তার তুল্য বস্তু নিয়ে যাবে। কিন্তু শরীকানার পুঁজি পণ্যসামগ্রী হলে উভয় শরীক (অংশীদার) নিশ্চিতভাবে স্ব-স্ব অংশ ফেরত নেওয়া অসম্ভব হবে। শাফেয়ী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে, ব্যবসায়িক শরীকানায় পুঁজি হিসেবে মিছলী (সদৃশ) পণ্য প্রদান বৈধ হবে। তাহলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তার তুল্য বস্তু তাকে দেওয়া যাবে। এ বিষয়ে মালেকী মাযহাবের অভিমত হচ্ছে, পণ্যসামগ্রী পুঁজি হিসেবে গৃহীত হওয়া বৈধ। তবে শরীকের কারো পক্ষ থেকে খাদ্যশস্য পুঁজি হিসেবে প্রদান গৃহীত হবে না। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত অবগতির জন্য দেখুন দ্র. পরিভাষা : شركة العقد এ ব্যাপারে ইমাম আওযায়ী রহ. ও ইমাম হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান প্রমুখের অভিমত হচ্ছে পণ্যের মাধ্যমে শরীকানা (শিরকাত) ও মুদারাবা জায়েয হবে। অধিকাংশ ফকীহের অভিমত হচ্ছে মুদারাবা ও শরীকানা ব্যবসায়ে বিনিয়োগকৃত পুঁজি অবশ্যই প্রস্তুতকৃত মুদ্রা হতে হবে। এক্ষেত্রে স্বর্ণ-রৌপ্যের পিণ্ড হলে তা পুঁজি হিসেবে যোগান দেওয়া বৈধ হবে না। যেহেতু, এসব ধাতবপিণ্ডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা এবং কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। 'আল-মুনতাকা' গ্রন্থে আল-বাজী রহ. এ অভিমত পেশ করেন যে, দীনার-দিরহাম ব্যতীত অন্য কোনো মুদ্রা ও পণ্যের মাধ্যমে মুদারাবা জায়েয হবে না। এর কারণ, দীনার ও দিরহাম হচ্ছে মূল্যের মানদণ্ড এবং যে কোনো বস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার মূল্যনির্ধারক। দীনার ও দিরহামের বাজারদর তেমন পরিবর্তিত হয় না বললেই চলে। অনুরূপভাবে যেসব পণ্যের দামে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে সেসব পণ্যের দ্বারা মুদারাবা বৈধ নয়। যেহেতু বাজারে দাম উঠা-নামা করে, একই স্থানে স্থায়ী-স্থির থাকে না, তাই পণ্যসামগ্রী দ্বারা অংশীদারী ব্যবসায় ও মুদারাবাতে পুঁজি যোগান শরীয়তসম্মত নয়।

টিকাঃ
৩৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ১৬৮; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৬; হাশিয়া দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৩৪৯-৩৫১; মুহাল্লা শারহুল মিনহাজ, খ. ২, পৃ. ৩৩৪; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩২২; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩-১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00