📄 চ. খাদযুক্ত মুদ্রা তৈরিকরণ ও এগুলোর মাধ্যমে লেনদেনের বিধান
যখন স্বর্ণ বা রৌপ্যে অন্য ধাতু অধিক পরিমাণে যোগ করা হয়, তাকে খাদযুক্ত বলে নামকরণ করা হয়। খাদযুক্ত মুদ্রা তৈরির বিষয়টি রাষ্ট্রপ্রধান অথবা প্রজাসাধারণের মধ্য থেকে কারো পক্ষ থেকে হতে পারে। রাষ্ট্রপ্রধান মুদ্রার দৃঢ়তা নির্ধারণে অথবা জনগণের অন্য কোনো কল্যাণে খাদযুক্ত মুদ্রা তৈরি করলে তা বৈধ হবে। এতদুদ্দেশ্য ভিন্ন তিনি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে খাদযুক্ত মুদ্রা প্রস্তুত করলে অথবা তিনি ভিন্ন অন্য কেউ তৈরি করলে এসব মুদ্রার তৈরি ও এগুলোর মাধ্যমে (আর্থিক) লেনদেন বিষয়ে ফকীহগণের মতানৈক্য রয়েছে।
টিকাঃ
৩২. জাল মুদ্রা প্রস্তুতকারী রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করে, জনগণকে ধোঁকা দিয়ে এবং আর্থিক লেনদেনে সমস্যা-সংকট সৃষ্টি করে যে অপরাধ সংঘটন করে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা একান্ত জরুরি। কেননা এ ধরনের অসৎ ও অন্যায়-কর্মের শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে রাষ্ট্রীয় জীবনে চরম অরাজকতা নেমে আসবে।
📄 তৃতীয় : মুদ্রা ভেঙ্গে ফেলা ও ভেঙ্গে পড়া প্রসঙ্গ
ভাঙ্গা বা কর্তিত মুদ্রার বিপরীত অবস্থাটি হচ্ছে অক্ষত মুদ্রা। কর্তিত মুদ্রা বলতে বুঝায়: যে মুদ্রাটি কাঁচি-জাতীয় বস্তুর মাধ্যমে কর্তন করা হয়েছে। মুদ্রা ভেঙ্গে ফেলা অথবা ভেঙ্গে যাওয়া মুদ্রার বিধান সম্পর্কে ফকীহগণ পরস্পর বিপরীত অভিমত পোষণ করেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত অবগতির জন্য دَرَاهم পরিভাষা দেখা যেতে পারে।
📄 চতুর্থ : মুদ্রার মাধ্যমে অলংকৃত হওয়া
স্বর্ণের অলংকার পরিধান করে দৈহিক সাজ-সজ্জা করা নারীদের জন্য হালাল হলেও পুরুষের জন্য স্বর্ণালঙ্কার পরা বৈধ নয়, বরং পুরুষের জন্য তা সুস্পষ্ট হারাম। পক্ষান্তরে নারীদের জন্য রৌপ্য অলংকার বৈধ হওয়ার সাথে-সাথে পুরুষের জন্যও স্বল্প মাত্রার রৌপ্যের অলঙ্কার পরিধান করা বৈধ। এ বিষয়ে সবিস্তারে জানতে দেখুন ذَهَب ، فضَّة পরিভাষা। উপরিউক্ত বিধানের আলোকে মুসলিম ফকীহগণ অভিমত পোষণ করেছেন যে, ইসলামী রীতি-নীতি মেনে দীনার অথবা দিরহামের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হওয়াতে কোনো দোষ নেই; যদি দিরহাম দীনার কাটার বা ভাঙ্গার প্রয়োজন না হয়। শাফেয়ীদের নির্ভরযোগ্য অভিমত ও হাম্বলী মাযহাবের মত হচ্ছে, কর্তিত দীনার- দিরহামের মাধ্যমে অলঙ্কৃত হওয়া বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে ইমাম রামলী রহ. বলেন, নারীরা অলঙ্কার হিসেবে এগুলো একত্র করে হার পরিধান করলে তা বৈধ হবে। তবে দীনার-দিরহাম ছিদ্র করে এগুলো দিয়ে মালা (হার) তৈরি করলে শাফেয়ী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য অভিমত অনুযায়ী তা জায়েয হবে না, যেমন রওযা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং তা হবে হারাম (অবৈধ)। ইমাম আহমদ রহ.-এর অভিমত অনুযায়ী দিরহাম-দীনার কেটে-ভেঙ্গে অলংকার তৈরি করা সঙ্গত নয়। মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ইবনুল কাসিম ও ইবনু ওয়াহাব রহ. প্রমুখের অভিমত অনুযায়ী দীনার-'দিরহাম' ভেঙ্গে-কেটে অলংকার প্রস্তুত করাতে অসুবিধা নেই।
টিকাঃ
৩৩. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৯৩
৩৪. আবুল ইয়া'লা কৃত আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১৮২; ফাতহুল আলী আল-মালেক, খ. ১, পৃ. ২১৯
📄 পঞ্চম : চুক্তিসমূহে মুদ্রাদির ব্যবহার প্রসঙ্গ
বিনিময়যোগ্য চুক্তি যেমন, বিবাহ-শাদী ও দান-অনুদান ইত্যাদিতে মুদ্রাদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে কেবল মুদ্রা নয়, বরং পণ্যসামগ্রীও মুদ্রার ন্যায় ব্যবহার করা বৈধ। এ অবস্থায় পণ্যও দাম হতে পারে। ছাড়াও কাজের পারিশ্রমিক, বিবাহের দেনমোহর অথবা দান-অনুদান বেতন-ভাতা ইত্যাদি হিসেবেও পণ্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়কে মুকায়াযা (مُقَائِضَة) এবং জমির বিনিময়ে জমির ক্রয়-বিক্রয়কে মুনাকালা (مُنَاقَلَة) বলা হয়। যদিও অধিকাংশ ক্রয়-বিক্রয় মুদ্রার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এটাই হচ্ছে মুদ্রার সর্বাধিক কার্যকারিতা ও প্রয়োগ। মুদ্রার বিনিময়কে দাম (মূল্যমান) বলা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখতে ثُمَّন দ্রষ্টব্য। পক্ষান্তরে মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা ক্রয়বিক্রয় করলে একে 'সারাফ' বলা হয়। অর্থাৎ 'সারাফ' হচ্ছে কোনো মুদ্রাকে অন্য যে কোনো মুদ্রার মাধ্যমে পরিবর্তন করা। একই ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ে ওজন ও পরিমাণে সমতা এবং ক্রয়-বিক্রয় বৈঠকেই তাৎক্ষণিক হস্তান্তর আবশ্যক। ওজন-পরিমাণে কমবেশ অথবা বাকিতে হস্তান্তর করা হলে এ ধরনের সমজাতের মুদ্রা বিনিময়ে বৃদ্ধিজনিত সুদ অথবা বাকিজনিত সুদ হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে এক ধরনের মুদ্রার সাথে অপর ধরনের মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের বৈঠকেই তাৎক্ষণিক আদান- প্রদান (হস্তান্তর) আবশ্যিক হবে। কিন্তু ওজনে সমান হওয়া আবশ্যিক হবে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত অবগতির জন্য দ্র. পরিভাষা : صرف (মুদ্রা বিনিময়)