📄 গ. মুদ্রাতে ইসলামের কোনো নিদর্শন খোদাই করা
ইমাম আল-মাকরীযী রহ. বলেন, উমর রা. তার খেলাফতকালে রৌপ্য মুদ্রাতে হুবহু কিসরার (পারস্য মুদ্রার) ছাপ দিয়েছিলেন। সেই সাথে তিনি এগুলোর কোনোটিতে ‘আলহামদু লিল্লাহ' (الْحَمْدُ لله), কোনোটিতে ‘রাসূলুল্লাহ' (আল্লাহর রাসূল) (رَسُول الله), আবার কোনোটিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই) (لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ) আবার কোনোটিতে ‘উমর’ (عُمَرُ) ইত্যাদি শব্দ ও বাক্য বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে উসমান রা. খিলাফতে আসীন হয়ে রৌপ্য মুদ্রাসমূহে ‘আল্লাহু আকবার’ (اللهُ أَكْبَرُ) অঙ্কিত করেছিলেন। আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রা. মক্কা ও এর আশপাশের অঞ্চলসমূহে খিলাফত কায়েম করে রৌপ্য মুদ্রাগুলোকে গোলাকার রূপ দান করেন এবং এগুলোর এক পিঠে ‘মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ' (مُحَمَّدٌ رَسُولِ الله), এবং অপর পৃষ্ঠে ‘আল্লাহ ওয়াদা পূর্ণ করা ও ন্যায়ানুগ থাকার ব্যাপারে আদেশ দান করেছেন' (أمر اللهُ بِالْوَفَاءِ وَالْعَدْلِ) খোদাই করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রা. এবং তার ভাই মুসয়াব বিন যুবাইর রা.-এর শাহাদাতের পরে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে মুদ্রাব্যবস্থাতে ওজন ও পরিমাণ স্থায়ীভাবে ঠিক করে দেন। তিনি নতুন ওজন পরিমাণে (বিশেষ আদলে) হিজরী ৭৬ (ছিয়াত্তর) সালে দীনার ও 'দিরহাম' প্রচলন করেছিলেন।
চলমান মুদ্রার বিপরীত মুদ্রাব্যবস্থায় এ আধুনিকায়নের কারণ ও প্রয়োজন ছিল এই, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান রোমসম্রাটের বরাবরে প্রেরিত পত্রে (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) 'বলো, তিনিই আল্লাহ; যিনি একক' এ আয়াতটি এবং মহানবী সা.-এর নাম ও পত্র লিখনের তারিখ উল্লেখ করেছিলেন। এ পত্রটির জবাবে রোমসম্রাট আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানকে লিখল, তোমরা চিঠিপত্রে এটা-ওটা ইত্যাদির নবপ্রচলন করছ। খলীফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান 'মহান আল্লাহ' নামাঙ্কিত দীনার ও দিরহাম চালু করেন।
খলীফা আব্দুল মালিক বিন মাওয়ায়ান হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট (ইরাকে) একটি মুদ্রা-ছাঁচ প্রেরণ করেন। মুদ্রার ছাঁচটিকে হাজ্জাজ তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজের চতুর্দিকে দায়িত্বপ্রাপ্তগণের নিকট পাঠিয়ে দেন, যেন তারা 'দিরহাম'সমূহে এক ও অভিন্ন ছাপ দিয়ে এগুলোকে এক আদলে প্রস্তুত করে নিতে পারে। রৌপ্যমুদ্রার একদিকে قُلْ هُوَ اللهُ (বলো, আল্লাহ যিনি এক ও একক) এবং অপর পিঠে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ (আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই) খোদিত করে দেন। দিরহামের চাকতিতে দুটি বেষ্টনী ছিল। একটিতে ছিল, 'এ মুদ্রাটি অমুক শহরে প্রস্তুতকৃত' (ضُرِبَ هَذَا الدِّرْهَمُ بِمَدِينَةِ كَذَا) এবং অন্যটিতে অঙ্কিত ছিল,
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ أَرْسَلَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
টিকাঃ
৩০. ইগাছাতুল উম্মা বি কাশফিল গুম্মা, পৃ. ৫১-৫৫
📄 ঘ. কুরআনের আয়াত খোদাইকৃত মুদ্রা অপবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করার বিধান
কুরআনের আয়াত/অংশ খচিত মুদ্রা অজুহীন অবস্থায় ছোঁয়া ও বহন করা যাবে কিনা, তা নিয়ে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদপূর্ণ অভিমত পরিলক্ষিত হয়। অধিকাংশ ফকীহের অভিমত, এ ধরনের মুদ্রা অজুহীন অবস্থাতে ছোঁয়া ও বহন করা হারাম নয়। পক্ষান্তরে, কেউ কেউ এ জাতীয় মুদ্রা স্পর্শ ও বহন করা হারাম বলে মন্তব্য করেছেন, আবার অন্য কেউ মাকরূহ হওয়ার অভিমত পেশ করেছেন।
টিকাঃ
৩১. যুরকানী আলা খলীল, খ. ১, পৃ. ৯৪; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ২১; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ১, পৃ. ১৪৮; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ১, পৃ. ১৫০
📄 ঙ. ছবি অঙ্কিত মুদ্রা প্রস্তুত ও এগুলোর ব্যবহার
ছবিসম্বলিত মুদ্রা প্রস্তুত করা এবং এগুলোর ব্যবহারের বিধান প্রসঙ্গে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ফকীহগণের একদল মুদ্রাতে ছবি অঙ্কন, ছবি সম্বলিত মুদ্রা প্রস্তুত ও এগুলো ব্যবহার করা মুবাহ হিসেবে অভিমত পোষণ করলেও অপরদল নাজায়েয বলে মন্তব্য করেছেন। বিস্তারিত অবগতির জন্য দ্র. পরিভাষা : تَصْوِيرِ دَরাহেম
📄 চ. খাদযুক্ত মুদ্রা তৈরিকরণ ও এগুলোর মাধ্যমে লেনদেনের বিধান
যখন স্বর্ণ বা রৌপ্যে অন্য ধাতু অধিক পরিমাণে যোগ করা হয়, তাকে খাদযুক্ত বলে নামকরণ করা হয়। খাদযুক্ত মুদ্রা তৈরির বিষয়টি রাষ্ট্রপ্রধান অথবা প্রজাসাধারণের মধ্য থেকে কারো পক্ষ থেকে হতে পারে। রাষ্ট্রপ্রধান মুদ্রার দৃঢ়তা নির্ধারণে অথবা জনগণের অন্য কোনো কল্যাণে খাদযুক্ত মুদ্রা তৈরি করলে তা বৈধ হবে। এতদুদ্দেশ্য ভিন্ন তিনি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে খাদযুক্ত মুদ্রা প্রস্তুত করলে অথবা তিনি ভিন্ন অন্য কেউ তৈরি করলে এসব মুদ্রার তৈরি ও এগুলোর মাধ্যমে (আর্থিক) লেনদেন বিষয়ে ফকীহগণের মতানৈক্য রয়েছে।
টিকাঃ
৩২. জাল মুদ্রা প্রস্তুতকারী রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করে, জনগণকে ধোঁকা দিয়ে এবং আর্থিক লেনদেনে সমস্যা-সংকট সৃষ্টি করে যে অপরাধ সংঘটন করে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা একান্ত জরুরি। কেননা এ ধরনের অসৎ ও অন্যায়-কর্মের শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে রাষ্ট্রীয় জীবনে চরম অরাজকতা নেমে আসবে।