📄 খ. মুদ্রা তৈরির বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ
মুদ্রা তৈরিতে পারিশ্রমিক প্রদান করা বৈধ। ইমাম বুহুতী তাঁর গ্রন্থে ইবনু তাইমিয়া রহ.-এর এ অভিমত সংকলন করেছেন যে, রাষ্ট্রপ্রধান মুদ্রা তৈরির সাথে জড়িত কর্মীদেরকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বাইতুল মাল) থেকে পারিশ্রমিক প্রদান করবেন। রাষ্ট্রপ্রধানের নিকট সংরক্ষিত স্বর্ণ-রৌপ্যের দ্বারা তৈরি করা হলেও রাষ্ট্রপ্রধান এসব মুদ্রা তৈরির পারিশ্রমিক রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রদান করতে পারেন।
অতীতে এমন একটি সময় ছিল; যখন মুদ্রা নির্মাণকারীর (টাকশালে কর্মরত ব্যক্তির) নিকট স্বর্ণ-রৌপ্যের মালিকগণ মুদ্রা তৈরির জন্য গমন করতেন এবং তাদের নিজ থেকে মুদ্রা প্রস্তুত করে তাদেরকে পারিশ্রমিক প্রদান করতেন। এভাবে ব্যক্তিগত প্রয়াসে মুদ্রা তৈরি করার শরীয়তে বৈধতা রয়েছে। যদি যার স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা মুদ্রা প্রস্তুত করে, টাকশালকর্মী তাকেই সরাসরি মুদ্রাটি অর্পণ করে। পক্ষান্তরে যদি হাতবদল করা হয়, তা হলে তা বৈধতা পাবে না। ইমাম গাযালী রহ. এ রদবদলের ব্যাপারে কড়া সতর্কতা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, ধাতু দিয়ে মুদ্রা তৈরির ক্ষেত্রে একজনের ধাতব নিয়ে অন্যজনকে মুদ্রা প্রদান, এধরনের বিনিময় বৈধ হবে না। বরং এ ধরনের হাতবদল থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা, এতে 'রিবাল ফযল' (বৃদ্ধিজনিত সুদ) এমনকি 'রিবা নাসিয়া'তে (বিলম্বে প্রদান জনিত সুদ) পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর অভিমত অনুযায়ী স্বর্ণ-রৌপ্যের গহনাদি নির্মাণে খরচের বিবেচনা করে সমধাতুর বিনিময়ে বাড়িয়ে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয হলেও সমধাতুর মুদ্রাকে সমধাতুর বিনিময়ে মুদ্রা প্রস্তুতির পারিশ্রমিকের বিবেচনা করে বাড়িয়ে ক্রয়-বিক্রয় করাকে তিনি বৈধ বলে অভিমত প্রদান করেননি। সমধাতুর মুদ্রা ও সমধাতুর গহনার ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যকার বিধানগত ভিন্নতার কারণ এই যে, মুদ্রা নির্মাণের ছাঁচটি রাষ্ট্রপ্রধান জনসাধারণের কল্যাণ বিবেচনায় তৈরি করে থাকেন। এ অবস্থায় মুদ্রা প্রস্তুতকারী ব্যক্তি যদিও মুদ্রা বানিয়ে এর পারিশ্রমিক গ্রহণ করে, কিন্তু তাতে উদ্দেশ্য থাকে তা নিয়ে কেউ যেন ব্যবসা না করে।
এ ব্যাপারে মালেকী মাযহাবের অভিমতটি একটু ব্যতিক্রম। তারা একান্ত প্রয়োজনে বিশেষ অবস্থায় মুদ্রাকে বাড়িয়ে-কমিয়ে ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ বলে অভিমত প্রদান করেছেন। এ ব্যাপারে মালেকী মাযহাবের অন্যতম ফকীহ ইমাম নাফরাবী রহ. বলেন, কোনো পথিকের নিকট ছাপ দেওয়া মুদ্রা আকারে না থেকে বরং অন্যভাবে স্বর্ণ-রৌপ্য (সঞ্চিত) থাকলে এবং যেখানে সে যাচ্ছে সেখানে এগুলোর প্রচলন না থাকলে সে ব্যক্তির জন্য এমনটি করা জায়েয হবে যে, তার সাথে থাকা স্বর্ণ-রৌপ্যগুলো টাকশালে অর্পণ করে সে এগুলোর পরিবর্তে মুদ্রা গ্রহণ করতে পারবে এবং এক্ষেত্রে তার দেওয়া ধাতু দ্বারা মুদ্রা তৈরির পারিশ্রমিক প্রদান করা বৈধ হবে। যদিও এক্ষেত্রে পারিশ্রমিকসহ হিসেব করলে মুদ্রার মূল্য বেড়ে যাবে। এটি জায়েয হবে, কেননা এক্ষেত্রে কমিয়ে-বাড়িয়ে ক্রয়-বিক্রয় হয়নি। বরং মুদ্রা প্রস্তুতকারীকে পারিশ্রমিক হিসেবে তার দেওয়া মুদ্রার অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছে মাত্র।
টিকাঃ
২৬. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ৪, পৃ. ৭৬৭
২৭. ইলামুল মুয়াক্কি'য়ীন, খ. ২, পৃ. ১৬৩
২৮. আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১১১
২৯. আশ-শারহুল কাবীর ও হাশিয়া দুসুকী; খ. ৩, পৃ. ৩৪
📄 গ. মুদ্রাতে ইসলামের কোনো নিদর্শন খোদাই করা
ইমাম আল-মাকরীযী রহ. বলেন, উমর রা. তার খেলাফতকালে রৌপ্য মুদ্রাতে হুবহু কিসরার (পারস্য মুদ্রার) ছাপ দিয়েছিলেন। সেই সাথে তিনি এগুলোর কোনোটিতে ‘আলহামদু লিল্লাহ' (الْحَمْدُ لله), কোনোটিতে ‘রাসূলুল্লাহ' (আল্লাহর রাসূল) (رَسُول الله), আবার কোনোটিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই) (لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ) আবার কোনোটিতে ‘উমর’ (عُمَرُ) ইত্যাদি শব্দ ও বাক্য বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে উসমান রা. খিলাফতে আসীন হয়ে রৌপ্য মুদ্রাসমূহে ‘আল্লাহু আকবার’ (اللهُ أَكْبَرُ) অঙ্কিত করেছিলেন। আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রা. মক্কা ও এর আশপাশের অঞ্চলসমূহে খিলাফত কায়েম করে রৌপ্য মুদ্রাগুলোকে গোলাকার রূপ দান করেন এবং এগুলোর এক পিঠে ‘মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ' (مُحَمَّدٌ رَسُولِ الله), এবং অপর পৃষ্ঠে ‘আল্লাহ ওয়াদা পূর্ণ করা ও ন্যায়ানুগ থাকার ব্যাপারে আদেশ দান করেছেন' (أمر اللهُ بِالْوَفَاءِ وَالْعَدْلِ) খোদাই করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রা. এবং তার ভাই মুসয়াব বিন যুবাইর রা.-এর শাহাদাতের পরে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে মুদ্রাব্যবস্থাতে ওজন ও পরিমাণ স্থায়ীভাবে ঠিক করে দেন। তিনি নতুন ওজন পরিমাণে (বিশেষ আদলে) হিজরী ৭৬ (ছিয়াত্তর) সালে দীনার ও 'দিরহাম' প্রচলন করেছিলেন।
চলমান মুদ্রার বিপরীত মুদ্রাব্যবস্থায় এ আধুনিকায়নের কারণ ও প্রয়োজন ছিল এই, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান রোমসম্রাটের বরাবরে প্রেরিত পত্রে (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) 'বলো, তিনিই আল্লাহ; যিনি একক' এ আয়াতটি এবং মহানবী সা.-এর নাম ও পত্র লিখনের তারিখ উল্লেখ করেছিলেন। এ পত্রটির জবাবে রোমসম্রাট আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানকে লিখল, তোমরা চিঠিপত্রে এটা-ওটা ইত্যাদির নবপ্রচলন করছ। খলীফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান 'মহান আল্লাহ' নামাঙ্কিত দীনার ও দিরহাম চালু করেন।
খলীফা আব্দুল মালিক বিন মাওয়ায়ান হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট (ইরাকে) একটি মুদ্রা-ছাঁচ প্রেরণ করেন। মুদ্রার ছাঁচটিকে হাজ্জাজ তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজের চতুর্দিকে দায়িত্বপ্রাপ্তগণের নিকট পাঠিয়ে দেন, যেন তারা 'দিরহাম'সমূহে এক ও অভিন্ন ছাপ দিয়ে এগুলোকে এক আদলে প্রস্তুত করে নিতে পারে। রৌপ্যমুদ্রার একদিকে قُلْ هُوَ اللهُ (বলো, আল্লাহ যিনি এক ও একক) এবং অপর পিঠে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ (আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই) খোদিত করে দেন। দিরহামের চাকতিতে দুটি বেষ্টনী ছিল। একটিতে ছিল, 'এ মুদ্রাটি অমুক শহরে প্রস্তুতকৃত' (ضُرِبَ هَذَا الدِّرْهَمُ بِمَدِينَةِ كَذَا) এবং অন্যটিতে অঙ্কিত ছিল,
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ أَرْسَلَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
টিকাঃ
৩০. ইগাছাতুল উম্মা বি কাশফিল গুম্মা, পৃ. ৫১-৫৫
📄 ঘ. কুরআনের আয়াত খোদাইকৃত মুদ্রা অপবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করার বিধান
কুরআনের আয়াত/অংশ খচিত মুদ্রা অজুহীন অবস্থায় ছোঁয়া ও বহন করা যাবে কিনা, তা নিয়ে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদপূর্ণ অভিমত পরিলক্ষিত হয়। অধিকাংশ ফকীহের অভিমত, এ ধরনের মুদ্রা অজুহীন অবস্থাতে ছোঁয়া ও বহন করা হারাম নয়। পক্ষান্তরে, কেউ কেউ এ জাতীয় মুদ্রা স্পর্শ ও বহন করা হারাম বলে মন্তব্য করেছেন, আবার অন্য কেউ মাকরূহ হওয়ার অভিমত পেশ করেছেন।
টিকাঃ
৩১. যুরকানী আলা খলীল, খ. ১, পৃ. ৯৪; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ২১; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ১, পৃ. ১৪৮; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ১, পৃ. ১৫০
📄 ঙ. ছবি অঙ্কিত মুদ্রা প্রস্তুত ও এগুলোর ব্যবহার
ছবিসম্বলিত মুদ্রা প্রস্তুত করা এবং এগুলোর ব্যবহারের বিধান প্রসঙ্গে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ফকীহগণের একদল মুদ্রাতে ছবি অঙ্কন, ছবি সম্বলিত মুদ্রা প্রস্তুত ও এগুলো ব্যবহার করা মুবাহ হিসেবে অভিমত পোষণ করলেও অপরদল নাজায়েয বলে মন্তব্য করেছেন। বিস্তারিত অবগতির জন্য দ্র. পরিভাষা : تَصْوِيرِ دَরাহেম