📄 মুদ্রার প্রকারভেদ
মুদ্রা নিম্নোক্ত বিভিন্ন ধরনের হতে পারে:
প্রথম : সৃষ্টিজাত মুদ্রা (النُّقُوْدُ الْخَلْقِيَّةُ)
ইসলামী যুগসমূহে দু ধরনের সৃষ্টিজাত মুদ্রা প্রচলিত ছিল।
ক. দীনার (الدينار) : 'দীনার' শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে আরবী ভাষায় গৃহীত একটি শব্দ। শব্দটির অর্থ স্বর্ণমুদ্রা। দীনার শব্দের পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদানে ইবনে আবিদীন রহ. বলেন, 'দীনার' হচ্ছে এক মিছকাল পরিমাণ স্বর্ণের ছাঁচে ঢালা (টুকরা)। অর্থাৎ দীনারের ওজন হচ্ছে পূর্ণ এক মিছকাল। ফকীহগণ দীনারে মিছকালের ওজন (পরিমাণ) প্রসঙ্গে মতভেদ করেছেন।
খ. দিরহাম (الدرهم) : 'দিরহাম' মৌলিকভাবে ফার্সি ভাষার একটি শব্দ। পরবর্তী সময়ে শব্দটি আরবী ভাষায় গৃহীত হয়েছে। 'দিরহাম' শব্দটির অর্থ : রৌপ্য দ্বারা নির্মিত মুদ্রা। এ শাব্দিক অর্থে এর পারিভাষিক অর্থ গৃহীত হয়েছে। দিরহামের ওজন নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন।
দ্বিতীয় : ব্যবহারিক মুদ্রাসমূহ (النُّقُوْدُ الاصْطلاحِيَّةُ)
ব্যবহারিক মুদ্রাসমূহ নিম্নরূপ:
ক. ধাতব মুদ্রা (الْفُلُوْسُ) : স্বর্ণ-রৌপ্য ব্যতীত অন্যসব ধাতব মুদ্রা। এগুলোতে নিম্নোক্ত দু'টি অবস্থার যে কোনো একটি হতে পারে:
প্রথম অবস্থা: এগুলো সমাজে ও বাজারে প্রচলিত হবে। এ ধরনের মুদ্রার বিধান সম্পর্কে ফকীহগণের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এসব মুদ্রাতে স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রার বিধানাদি কার্যকর হবে না। এজন্য এসব ধাতব মুদ্রা বৃদ্ধি করে বাকীতে ক্রয় বিক্রয়ে কোনো প্রকার সুদ সাব্যস্ত হবে না এবং এ ধরনের মুদ্রা ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত না-হলে এগুলোর ওপর যাকাতের বিধানও কার্যকর হবে না। ফকীহগণের দ্বিতীয় দলের অভিমত হচ্ছে, এ জাতীয় ধাতবমুদ্রার দামদর ধরে স্বর্ণ-রৌপ্যের দামের হারে এগুলোতে যাকাতের হুকুম প্রযোজ্য হবে।
দ্বিতীয় অবস্থা: এগুলো সমাজে ও বাজারে অপ্রচলিত হবে। এ ধরনের মুদ্রার ব্যাপারে ফকীহগণের সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে, এগুলোতে স্বর্ণ-রৌপ্যের মুদ্রার বিধান কার্যকর হবে না।
খ. অধিক খাদযুক্ত রৌপ্যমুদ্রা (الدَّرَاهِمُ الْغَالَبَةُ الْعَشِّ) : এ ধরনের রৌপ্যমুদ্রায় রৌপ্যের তুলনায় অন্য নিম্নমানের ধাতুর পরিমাণ বেশি থাকে। হানাফী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত অনুযায়ী খাদের আধিক্যের কারণে এসব মুদ্রায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের বিধান কার্যকর হবে না। হানাফী মাযহাবের বিপরীতে অন্য সব মাযহাবের অভিমত হচ্ছে, খাদযুক্ত এসব মুদ্রায় রৌপ্যের পরিমাণ নিশ্চিত করতে হবে। রৌপ্যের পরিমাণে স্বর্ণ-রুপার বিধান কার্যকর হবে।
গ. কাগজের মুদ্রা (النُّقُوْدُ الْوَرَقِيَّةُ) : বর্তমান যুগে কাগজি মুদ্রার প্রচলনই অধিক। এমনকি কাগজের মুদ্রাই দীনার ও দিরহামের স্থান দখল করে রয়েছে। ফলে বর্তমান যুগে দীনার দিরহামের স্থানে সারা বিশ্বে কাগজি মুদ্রাই বিরাজ করছে। স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার স্থলে কাগজে মুদ্রার প্রচলনের প্রতি ইঙ্গিত করে ইমাম মালেক রহ. তাঁর গ্রন্থে এমন সব বিষয় বাস্তবে রূপ লাভ করবে বলে আলোচনা করেছেন যেগুলো এখনো রূপ লাভ করেনি। তিনি তাঁর ফিকহী গ্রন্থে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় সংযুক্ত করে এ সম্পর্কিত বিধানও বর্ণনা করেছেন। তিনি অভিমত পেশ করেছেন, মানুষ চর্মকে মুদ্রা সাব্যস্ত করলে, এমনকি চামড়ার মুদ্রা তৈরিতে এবং টাকশাল নির্মাণে বৈধতা দান করলেও এ মুদ্রা দ্বারা স্বর্ণমুদ্রা রৌপ্যমুদ্রার ন্যায় পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করার বিধান প্রদানে আমাদের অপছন্দ থেকে যাবে।
অতীত যুগ থেকেই কাগজি মুদ্রার মাধ্যমে পণ্যসামগ্রীর আদান-প্রদানের প্রচলন ছিল। ইমাম মাকরীযী রহ. বর্ণনা করেন, তিনি যখন বাগদাদে ভ্রমণ করেন; তখন জনৈক ব্যবসায়ী তাকে এমন একটি কাগজ বের করে দেখান; যে কাগজটিতে মুঘল আমলের বিশেষ হরফে কিছু একটা লিখিত ছিল। ব্যবসায়ী লোকটি বর্ণনা করল, এসব কাগজ তুত পাতা থেকে তৈরি। এগুলো খুবই নরম ও কোমল। এসব কাগজ চীন দেশের খান বালেক অঞ্চলে পাঁচ দিরহামের বদলে অর্পণ করা হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১৭. ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ২৯
১৮. লিসানুল আরব; মিসবাহুল মুনীর
১৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২৩৬
২০. আল-মুদাওয়ানা, খ. ৩, পৃ. ৩৯৬
২১. মাকরীযী, ইগাছাতুল উম্মা, পৃ. ৬৮
📄 মুদ্রাব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত বিধানাবলি
মুদ্রাব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত শরীয়ত নির্ধারিত বিভিন্ন বিধানাবলি রয়েছে যা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
📄 প্রথম : মুদ্রাব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত শরীয়ত নির্ধারিত বিধানসমূহ
যাকাতের নিসাব :
স্বর্ণমুদ্রায় যাকাতের নিসাব হচ্ছে ২০ দীনার এবং রৌপ্যমুদ্রায় যাকাতের নিসাব ২০০ দিরহাম। কোনো ব্যক্তি ২০ দীনার অথবা ২০০ দিরহামের মালিক হলে তার ওপর যাকাতের বিধান প্রযোজ্য হবে। এ পরিমাণ দীনার দিরহাম কারো নিকট না-থাকলে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে না। এ-অভিমতটি হচ্ছে সর্বসম্মত অভিমত। পক্ষান্তরে এসব মুদ্রায় খাদের কোনো অংশ থাকলে বা উক্ত পরিমাণ খাদযুক্ত স্বর্ণ-রৌপ্য থাকলে এসব দীনার দিরহামে যাকাত প্রযোজ্য হবে কি-না? এ-ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
যাকাত ও লেনদেনে কতক মুদ্রা অন্য মুদ্রার স্থলাভিষিক্ত হওয়া :
যাদের অভিমত অনুযায়ী নগদ অর্থকড়ি এবং কাগজি মুদ্রায় যাকাত ফরজ হয়; তাদের নিকট এসব অর্থ-কড়ি ও কাগজি মুদ্রা দীনার দিরহামের সাথে যুক্ত করে এগুলোর যাকাতের নিসাব নির্ধারণ করতে হবে।
এ আলোচনায় মহর ও দিয়াত ইত্যাদি বিষয় রয়েছে, যথাস্থানে সেগুলো দেখা যেতে পারে।
টিকাঃ
২২. আল-মাউসূআহ আল-ফিকহিয়্যা কমিটির অভিমত হচ্ছে, কাগজি মুদ্রার পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্যের নিসাব পরিমাণে পৌছুলে এগুলোর উপর যাকাত ফরজ হবে। কাগজি মুদ্রার টাকা পয়সা ব্যবসায়িক কাজে বিনিয়োগ করা হোক বা না হোক।
📄 দ্বিতীয় : মুদ্রার তৈরি ও প্রকাশ
মুদ্রা তৈরিকরণ বলতে বোঝায়, মুদ্রাকে টাকশালের মাধ্যমে ব্যবহারের উপযুক্ত করে প্রস্তুত করা। একটি লোহার ছাপে বা নকশায় (প্লেটে) ফেলে এভাবে মুদ্রাকে প্রস্তুত করা হয় যে, মুদ্রাতে নির্দিষ্ট কিছু নকশা, মনোগ্রাম ও মুদ্রার পরিমাণ লিখিত ও অঙ্কিত থাকে। (কাগজি মুদ্রার ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়াকে মুদ্রা ছাপানো বা মুদ্রণ বলা হয়।)