📄 ইজবার (الإِجْبَارُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
ইজারা (الإِজَارَة) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ: পারিশ্রমিক, মজুরি। অর্থাৎ শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিককে প্রদত্ত অর্থকড়ি। এ শব্দটি আরো ব্যাপকার্থে ভাড়া, সম্মানী, মজুরি ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইজারা শব্দ থেকে অন্যান্য শব্দ এভাবে পঠিত হয়: أَجْرَ وَآজَرَ إِجَارًا وَإِجَارَةً। পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইজারা এমন এক বিনিময়চুক্তি যে চুক্তির মাধ্যমে মূল্যের বিপরীতে কোনো জিনিসের উপকার লাভের অধিকার দেওয়া হয়।
মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ ইজারা শব্দটিকে সাধারণত মানুষের পক্ষ থেকে উপকার লাভের চুক্তি এবং নৌকা এবং জীবজন্তু ছাড়া অন্যান্য অস্থাবর জিনিসের উপকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। তারা ভূমি, ঘরবাড়ি, নৌকা ও জীবজন্তুর উপকারিতা লাভের চুক্তিকে কেরায়া (كِرَاءُ) বলে অভিহিত করেন। ইজারা বিনিময়চুক্তি হওয়ার কারণে ভাড়ায় গ্রহণকারী ভাড়া নেওয়া জিনিস দ্বারা উপকৃত হওয়ার আগেই ইজারাদাতা চুক্তিতে নির্ধারিত টাকা গ্রহণ করতে পারবে।
📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
সংশ্লিষ্ট পরিভাষা:
الْبَيْعُ (আল বায়): বিক্রয়, কেনাবেচা। ইজারা ক্রয়বিক্রয়ের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ক্রয়বিক্রয় ও ইজারার মধ্যে পার্থক্য হলো, ইজারায় মূল জিনিসটি বিক্রি করা হয় না, বরং জিনিসের উপকারিতা বিক্রয় করা হয়; আর ক্রয়বিক্রয়ে মূল জিনিসটিই বিক্রি করা হয়। ইজারা তাৎক্ষণিক কার্যকর হয় এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরও ইজারা কার্যকর হয়।
الإِعَارَةُ (আল ইআরা): হাওলাত, ধার। ইজারা ও হাওলাতের মধ্যে গুণগত পার্থক্য বিদ্যমান। ইজারায় অন্যকে উপকারিতার মালিকানা প্রদান করা হয়, যার বিপরীতে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু হাওলাতে বিনা মূল্যেই উপকারিতার মালিকানা দেওয়া হয়।
الْجَمَالَةُ (আল জিআলা): নির্দিষ্ট কাজের বিনিময়ে কমিশন বা পুরস্কার। ইজারা আর জিআলা'র মধ্যে পার্থক্য হলো, জিআলা এমন উপকার লাভের জন্য শ্রমিকের সাথে চুক্তি করা যা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জিআলা এমন একটি চুক্তি যা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুক্তি পালনকে অপরিহার্য করে না।
الاستصناع (আল ইসতিসনা'): কোনো কিছু বানানোর চুক্তি, অর্ডার। ইজারা ও ইসতিসনা'র মধ্যে পার্থক্য হলো, ইজারার ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ করে ভাড়াগ্রহণকারী আর ইসতিসনা এমন বিক্রয়চুক্তি যেখানে ক্রেতা একটি জিনিস ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে জিনিসটি কাঁচামালসহ বানিয়ে দেওয়ার শর্ত করে।
📄 ইজবার-এর শরয়ী বিধান
ইসলামী শরীয়তে ইজারা বৈধ। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা এর বৈধতা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন: “যদি তারা তোমাদের (শিশুদের) দুধপান করায় তবে তোমরা তাদের পারিশ্রমিক দিয়ে দিও।” হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কেউ যদি কাউকে শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত করে তবে সে যেন কাজে লাগানোর আগেই তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে নেয়।”
রাসূলুল্লাহ আরো বলেন: “আমি কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো। তিনজনের একজন হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে একজন শ্রমিক ভাড়ায় নিয়ে পূর্ণ শ্রম আদায় করেছে কিন্তু তার পারিশ্রমিক দেয়নি।” এ ছাড়াও সাহাবায়ে কিরামের সময় থেকে এ পর্যন্ত ইজারা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে। এ সম্পর্কে বিবেক ও বুদ্ধিজাত দলিল হলো, যে জিনিসে মানুষের কোনো কর্তৃত্ব বা মালিকানা থাকে না, মানুষ এমন জিনিস দ্বারাও উপকৃত হতে চায়, ইজারার দ্বারা মানুষ সেই উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে।
📄 শরীয়তের নির্দেশে ইজবার
ইজারার মূল বিষয়: ইজারাচুক্তির রুকন বা মূল ভিত্তি কয়টি, এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে, ইজারার ভিত্তি হলো, ইজারার শব্দ অর্থাৎ প্রস্তাব ও গ্রহণ, ইজারাচুক্তির দুপক্ষ, এক পক্ষের উপকার লাভ এবং অন্য পক্ষের মূল্য বা পারিশ্রমিক প্রাপ্তি। হানাফীদের মতে, ইজারার মূল ভিত্তি শুধুই প্রস্তাব ও গ্রহণ। ইজারাচুক্তির দুটি পক্ষ এবং উপকারভোগ ও পারিশ্রমিক হলো ইজারাচুক্তির উপাদানমাত্র। হানাফী ও অধিকাংশ ফকীহের মধ্যকার এই মতপার্থক্য মূলত শাব্দিক, বিধানের ক্ষেত্রে এই মতপার্থক্যের কোনো প্রভাব নেই।