📄 অনির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড
নিয়ম হল, বিচারের সময় কারাবাসের মেয়াদ সুনির্দিষ্ট করে দেয়া। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়াদ অনির্দিষ্ট রেখে এবং তাওবা করে স্বাভাবিক ও পবিত্রভাবে জীবন যাপনের ফিরে আসার শর্ত জুড়ে দিয়ে সাজা দেয়াও জায়িয। যেমন মুসলিম মদবিক্রেতা, শত্রু পক্ষের মুসলিম গোয়েন্দা এবং দেশদ্রোহীদেরকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড দেয়া জায়িয। যতক্ষণ না শাসকগণ তাদের বিশুদ্ধ তাওবা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হবেন, ততদিন তাদেরকে কারাগারে বন্দী করে রাখতে পারবেন। অনুরূপভাবে চরম নেশাখোর ব্যক্তিকেও যে হদ্দের শাস্তি লাভ করার পর আর আবারও নেশা করে, তাকেও তাওবা করে নেশামুক্ত জীবনে ফিরে আসা পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড দেয়া জায়িয। ১২৩
টিকাঃ
১২৩. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৪৬
📄 কারাদণ্ড ও অন্য দণ্ডের সমাবেশ
বিচারক কিংবা শাসক যদি ব্যক্তির অবস্থা, অপরাধের মাত্রা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে অন্য যে কোন দণ্ডের সাথে কারাদণ্ড কার্যকর করা কল্যাণকর মনে করেন, তাহলে যে কোন ধরনের শাস্তির সাথে কারাদণ্ড দেয়াতে কোন অসুবিধা নেই। ১২৪ যেমন অবিবাহিত ব্যভিচারী পুরুষকে হদ্দ হিসেবে একশটি বেত্রাঘাত করার পর জনস্বার্থ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে এক বছরের জন্য কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে। যে আঘাতের কিসাস নেয়া সম্ভব নয়; বিনিময় নেয়ার বিধান রয়েছে, তাতে বিনিময় নেয়ার পাশাপাশি কারাদণ্ডও দেয়া যেতে পারে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর সাথে যিহার করল, তাকেও কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত বন্দী করে রাখা যেতে পারে। তাছাড়া হাঙ্গামা ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে কারাগারে শিকল পরিয়ে রাখা, দায়গ্রস্ত আটক ব্যক্তিকে প্রহার করা, মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রদানকারীকে মাথা মুণ্ডন করিয়ে দেয়া ও বন্দী করা, হত্যাকারীকে যদি নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা ক্ষমা করে দেয়, তাকে একশটি বেত্রাঘাত সহ কারাদণ্ড দেয়া প্রভৃতি বৈধ রয়েছে।
টিকাঃ
১২৪. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ২১০; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৩৫০; ইবনু ফারহুন, তাবছিরাতুল হুক্কাম, খ.২, পৃ. ২৯০
📄 কারাগার নির্মাণ
বন্দীদের রাখার জন্য পৃথক কারাগার নির্মাণ করা জায়িয; বরং মুস্তাহাব। কারাগার প্রশস্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া বাঞ্ছনীয়। হযরত 'উমার (রা)-এর নির্দেশে তাঁর মক্কার গভর্ণর নাফি' ইবন 'আবদুল হারিছ সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা থেকে কারাগার হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি ঘর চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করেছিলেন। ১২৫ হযরত 'আলী (রা) ইসলামে সর্বপ্রথম কুফায় কারাগার তৈরি করেছিলেন। ১২৬
টিকাঃ
১২৫. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল লুকতাহ) বাব নং ৭; ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুছান্নাফ, হা.নং: ২৩২০১
১২৬. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.১৬, পৃ.৩১৬
📄 উপসংহার
ইসলামী শাস্তি আইন ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ আইনের মৌলিকত্ব ও সারবত্তা পরিবর্তনযোগ্য নয়। তবে সময় ও অবস্থার তাকিদে এবং নতুন পরিবেশে উদ্ভূত সমস্যাদির সমাধান কল্পে ইজতিহাদের মাধ্যমে ক্ষেত্রবিশেষে এর যুগোপযোগী কার্যকর রূপ দান করা যাবে এবং তা শাখা-শাখায় বিভক্ত করা যাবে।
ইসলামী শাস্তি আইনের প্রধান লক্ষ্য মানব জাতির কল্যাণ সাধন ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। এ আইন নাযিল হয়েছে আল্লাহর বান্দাহদের সর্বপ্রকারের অপরাধ মনোবৃত্তি দমনের একমাত্র চিকিৎসারূপে। এ চিকিৎসা প্রয়োগের পর অপরাধ নামক কোন রোগের নাম চিহ্নও থাকতে পারে না, যদি তা যথাযথভাবে প্রয়োগ ও কার্যকর করা হয়। এ আইন দ্বারা মুসলিম উম্মাহ শতাব্দীর পর শতাব্দী কাল ধরে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। ইতিহাস অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, একমাত্র ইসলামী আইনই সবধরনের পাপাচার ও অপরাধ নির্মূল করতে সক্ষম। সমাজ যখনই তা কার্যকর করেছে, তখন মানুষ পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তার সহকারে নিশ্চিন্ত জীবন-যাপনের সুযোগ পেয়েছে। অপরদিকে মানব রচিত শান্তি আইন সকল অপরাধ দমনে ব্যর্থ ও অকেজো প্রমাণিত হয়েছে। এ আইন দ্বারা শাসিত গোটা সমাজকে ব্যাপক বিপর্যয়, অশান্তি ও চরম দুর্যোগ গ্রাস করেছে এবং করছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের প্রাক্কালে তাবৎ দুনিয়ার রাষ্ট্রনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নৈরাজ্যের প্রান্তসীমায় উপনীত হয়েছিল। ধর্ম, নীতিবোধ ও বিচার বলতে কিছুই ছিল না। 'খুনের বদলে খুন' ও 'জোর যার মুলুক তার' প্রভৃতিই ছিল তখনকার সমাজের প্রচলিত নীতি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পারস্পরিক বিবদমান ও অপরাধপ্রবণ গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সুসংহত জাতিতে পরিণত করেন। ইসলামী আইনের কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি মদীনায় মাত্র দশটি বছরে সর্বপ্রকারের অপরাধ মূলোৎপাটন করে শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সুনীতি ও পবিত্রতার এক অতুলনীয় সমাজ গড়ে তোলেন। সে ছিল এক বিস্ময়কর বিপ্লব। এই বিপ্লবে প্রথমে আরব ভূমি কেঁপে ওঠলেও ক্রমে তার প্রতিকম্পন ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ জুড়ে। টমাস কার্লাইলের ভাষায়- The revolution brought by prophet Mohammad (sm) was a great spark of fire which within a twinkle of an eye, burnt out all rubbishes of inhumanity and untruths that erected their heads from Delhi to Granada and from earth to sky. - "হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক সংঘটিত বিপ্লব ছিল প্রচণ্ড এক অগ্নি স্ফুলিঙ্গ, যা দিল্লী থেকে গ্রানাডা এবং মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত যে অসত্য ও অমানবিকতার আবর্জনা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল তা চোখের পলকে পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলল।"
আমাদের বর্তমান কালে মুসলিম উম্মাহ ইসলামের এ শাস্তি আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন না করার কারণে প্রতিনিয়ত সামাজিক অস্থিরতা, দুরবস্থা ও বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হচ্ছে। আল্লাহর দীনের একাংশের প্রতি ঈমান ও অপরাংশের প্রতি কুফরী- এ নীতি দ্বারা মুসলিম জাতির বর্তমান দুরবস্থার পরিবর্তন কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এর ফলে অপরাধ দমন ও মূলোৎপাটন তো সম্ভবই নয়; বরং প্রতিনিয়ত এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে এবং এর পরিণাম হবে অবর্ণনীয় ক্ষতি ও বিপর্যয়। আল্লাহ তা'আলা এ ধরনের মনোবৃত্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, أفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاء مَن يفعل ذلك منكم إلا خزي في الحيوة الدنيا. "তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশের প্রতি ঈমান আর কিছু অংশের প্রতি কুফরী করবে? (জেনে রেখো) দুনিয়ায় এ নীতি অবলম্বনকারীদের লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছুই পরিণতি হতে পারে না।" ১৪৯
অতএব, সমাজের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে ইসলামের শাস্তি আইন সম্পর্কে আমাদের সম্যক অবগত হওয়া, অতঃপর তা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে এ কাজের তাওফীক দান করুন! আমীন !!
টিকাঃ
১৪৯. আল কুরআন, ২ (সূরা আল-বাকারাহ): ৮৫