📄 সালাত ত্যাগ করা
যে ব্যক্তি নামাযের ফরযিয়্যাতকে অস্বীকার করে কিংবা তার ফরযিয়্যাতের প্রতি তাচ্ছল্য প্রদর্শন করে নামায ছেড়ে দিল, তার ব্যাপারে ইমামগণের সর্বসম্মত মত হলো, সে কাফির মুরতাদ হয়ে গেল। তার হদ্দ হল মৃত্যুদণ্ড। তবে তাকে এ শাস্তি কার্যকর করার আগে তিন দিন সুযোগ দেয়া হবে, যাতে সে এ সময়ের মধ্যে তাওবা করে ফিরে আসে।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অলসতা বশতঃ কিংবা হালকা মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয় প্রথমত তাকে নামায পড়ার জন্য বলা হবে। এরপরও যদি সে ফিরেই নামায তরক করতে থাকে তাহলে তার শাস্তি কি হবে - এ ব্যাপারে ইমামগণের তিনটি মত দেখা যায়। ৭৯ এগুলো হলঃ
ক. ইমাম যুহরী, আবূ হানীফা ও ইমাম মুজনী আশ-শাফি'ঈ (রহ) প্রমুখের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিকে নামায তরক করার কারণে হত্যা করা বিধেয় নয়; বরং তাকে বন্দী করে রাখা হবে, যতক্ষণ না সে নামায পড়তে অভ্যস্ত হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, لا يحل دم امرئ مسلم إلا بإحدى ثلاث : النفس بالنفس (ইসলামে নরহত্যার বদলে নরহত্যা) , الثيب الزاني والمفارق لدينه التارك للجماعة কোন মুসলিমের রক্ত হালাল হবে না। এ তিন ব্যক্তি হলঃ অন্যায়ভাবে অপরকে হত্যাকারী, বিবাহিত ব্যভিচারী এবং মুসলিম দল ও ধর্মত্যাগকারী ব্যক্তি।" ৮০ এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নামায তরককারী উপর্যুক্ত তিন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং তাকে হত্যা করা যাবে না।
খ. মালিকী ও শাফি'ঈ ইমামগণের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিকে নামায তরক করার কারণে প্রথমে বন্দী করা হবে এবং তিন দিন সুযোগ দেয়া হবে, যাতে সে এ সময়ের মধ্যে তাওবা করে নামায পড়তে শুরু করে। অন্যথায় তাকে হদ্দ হিসেবে হত্যা করা হবে। তাঁদের মতে, এ ধরনের নামায তরককারী কাফির হবে না; ফাসিক হবে।
গ. ইমাম আহমাদের বিশুদ্ধ বর্ণনানুযায়ী এ ধরনের ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। সুতরাং তাকে মুরতাদের মত প্রথমে বন্দী করা হবে এবং তিন দিন সুযোগ দেয়া হবে, যাতে সে এ সময়ের মধ্যে তাওবা করে নামায পড়তে শুরু করে। অন্যথায় তাকে মুরতাদ হিসেবে হত্যা করা হবে। হযরত 'আলী (রা), হাসান বসরী (রহ), আওযা'ঈ (রহ) ও আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ) প্রমুখও এ মত পোষণ করেন। তাঁরা বিভিন্ন হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল من ترك "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত সালাত তরক করল, সে কুফরী করল।" ৮১ "কোন ব্যক্তির ঈমান এবং তার শিরক ও কুফরীর পরিচয়ের মানদণ্ড হল সালাত তরক করা।" ৮২
টিকাঃ
৭৯. আল-মাওস্'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ.৩৩৯, খ.১৬, পৃ.৩০২-৩, খ.২২, পৃ.১৮৭, খ.২৭, পৃ.৫৩-৪; নববী, আল-মাজমূ', খ.৩, পৃ.১৮-৯; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.২, পৃ.১৫৬-৮; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৬৪; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫. পৃ.৪৯; আশ-শাওকানী, নায়লুল আওতার, খ.১, পৃ.২৪৮
৮০. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৬৪৮৪; মুসলিম, (কিতাবুল কাসামাহ), হা.নং : ১৬৮৬
৮১. আত্ তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা.নং: ৩৩৪৮
৮২. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল ঈমান), হা.নং: ৮২
📄 রোযা ছেড়ে দেয়া
যে ব্যক্তি রোযার ফরযিয়্যাতকে অস্বীকার করে কিংবা তার ফরযিয়্যাতের প্রতি তাচ্ছল্য প্রদর্শন করে রোযা ছেড়ে দিল, তার ব্যাপারেও ইমামগণের সর্বসম্মত মত হলো, সে কাফির মুরতাদ হয়ে গেল। তার হদ্দ হল মৃত্যুদণ্ড। তবে তাকে এ শাস্তি কার্যকর করার আগে তিন দিন সুযোগ দেয়া হবে, যাতে সে এ সময়ের মধ্যে তাওবা করে ফিরে আসে।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অলসতা বশতঃ কিংবা হালকা মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ছেড়ে দেয় তার ব্যাপারে ইমামগণের সর্বসম্মত মত হল, সে কাফির হবে না এবং তাকে হত্যাও করা যাবে না; বরং তাকে কারাদণ্ড দেয়া হবে। কারাগারের মধ্যে তাকে দিনে পানাহার থেকে বারণ করা হবে, যাতে রোযার বাহ্যিক আকৃতিটা হলেও সে অর্জন করতে পারে। অনেক সময় দেখা যাবে, সে এমতাবস্থায় সত্যিকারভাবে রোযার নিয়াতও করে ফেলবে। মাওয়ার্দীর মতে, তাকে রোযার মাস পুরোই বন্দী করে রাখা হবে। ৮৩
রমযান মাসে যে মাদক সেবন করবে তাকে মাদক সেবনের জন্য হদ্দ হিসেবে ৮০টি বেত্রাঘাত তো করতেই হবে। এর পাশাপাশি রমযানের পবিত্রতা নষ্ট করার কারণে তাকে বন্দী করা হবে এবং অতিরিক্ত আরো ২০টি বেত্রাঘাত করা হবে। হযরত 'আলী (রা) থেকেও এধরনের মত বর্ণিত রয়েছে। ৮৪
টিকাঃ
৮৩. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১৬, পৃ.৩০৩; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ.৭২-৩; আল-জসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.৩, পৃ.১২৩; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.২, পৃ.৩১৮; ইবনু রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ.১, পৃ. ২৫০
৮৪. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ. ৩৩; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৩৪৯
📄 বিদ‘আত
যে বিদ'আতী লোকদেরকে বিদ'আতের প্রতি আমন্ত্রণ জানায়, তার ব্যাপারে হানাফী ইমামগণ সহ অধিকাংশ ইমামের অভিমত হল, প্রথমত তাকে তার এ প্রচারকর্ম থেকে বারণ করা হবে। যদি সে সহজে ফিরে না আসে, তা হলে ক্রমশ তাকে প্রহার করা হবে এবং প্রয়োজনে বন্দী করে রাখা হবে। তারপরও ফিরে না আসলে তাকে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে হত্যা করা জায়িয হবে। কেননা বিদ'আতী ব্যক্তি যে ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তা অন্য যে কোন ফিতনার চাইতে গুরুতর ও ব্যাপক। কেননা বিদ'আতের কারণে দীন বিকৃত হয়ে যায় এবং উম্মাতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। তবে ইমাম আহমাদের এক বর্ণনা মতে, তাকে বন্দী করে রাখা হবে, যতক্ষণ না সে তার অপপ্রচার থেকে বিরত থাকবে। প্রয়োজনে তাকে আমরণ কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে। তাকে হত্যা করা সমীচীন নয়। কোন কোন মালিকী ইমামও এমত পোষণ করেন।
তবে যে বিদ'আতী লোকদেরকে নিজের বিদ'আতের প্রতি আমন্ত্রণ জানায় না, তাকে বন্দী করে রাখা এবং উপদেশে কাজ না হলে প্রহার করাও জায়িয। এটাই হানাফী ও অধিকাংশ মালিকী ইমামের অভিমত। তবে অন্যান্যদের মতে, তাকে যে কোন রূপ তা'যীর করা যাবে। আবার কারো কারো মতে, সে যদি তাওবা করে ফিরে না আসে, তা হলে তাকে হত্যা করাও জায়িয। ১৮৫ বর্ণিত আছে, ছবীগ ইবনু 'আসল সাহাবা কিরামের অনুসৃত সুন্নাত ও তাঁদের কুর'আন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যার তোয়াক্কা না করে দীনের মধ্যে বিদ'আতের ভিত্তি রচনা করার উদ্দেশ্যে কুর'আনের মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর পেছনে লেগে থাকত। এ কারণে হযরত 'উমার (রা) তাকে বন্দীও করেছিলেন এবং কয়েকবার প্রহারও করেছিলেন। ১৮৬
টিকাঃ
৮৫. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১৬, পৃ.২৮৯, ৩০২-৪
৮৬. আদ-দারিমী, সুনান (বাব: মান হাবাল ফুতয়া..), হা.নং: ১৪৪, ১৪৮
📄 অযোগ্য লোকের ফতোয়াবাজি
প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষা ছাড়া কোন ব্যক্তি যদি ফাতওয়া দেয়, তাহলে মালিকী ইমামগণের মতে তাকে বন্দী করে রাখা এবং নীতি শিক্ষামূলক শাস্তি দেয়া বৈধ। ইমাম মালিক তাঁর শায়খ রবী'আ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন : بعض من يفتي ههنا أحق بالسجن من السراق এখানে এমন অনেক মুফতী আছেন, যারা বড় বড় চোরের চাইতেও অধিকতর কারাবাসের উপযোগী। "১৮৭
টিকাঃ
৮৭. 'উলায়শ, ফাতহুল 'আলী আল-মালিক, খ.১, পৃ.৮৬