📄 ধর্মত্যাগ
যদি প্রমাণিত হয় যে, কোন মুসলিম ধর্মত্যাগ করেছে, তাহলে তাকে বন্দী করে রাখতে হবে যতক্ষণ না তার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূরিভূত হয় এবং তাকে তাওবার জন্য সুযোগ দিতে হবে। তবে তাকে বন্দী করা ওয়াজিব কি না -এ বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মালিকী, শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামগণের মতে, তাকে কতল করার আগে তাওবার সুযোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে বন্দী করা ওয়াজিব। আর হানাফীগণের মতে, ওয়াজিব নয়; মুস্তাহাব। ৭৫
টিকাঃ
৭৫. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১০, পৃ.৯৮-৯; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.১৩৪-৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৭১-৮; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৬, পৃ.৬৮-৯; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৫, পৃ.২৮২-৩
📄 ধর্মদ্রোহিতা
যিন্দীককেও ৭৬ মুরতাদের মতো তাওবার সুযোগ দিতে হবে। এ উদ্দেশ্যে তাকে বন্দী করে রাখা যাবে। এটা কতিপয় হানাফী, শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামের অভিমত। তাদের বক্তব্য হলো, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুনাফিকদের সম্পর্কে অবগত থাকার পরও তাদেরকে হত্যা করেননি। তা থেকে জানা যায় যে, যিন্দীকদেরকেও তাওবার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদেরকে হত্যা করা যাবে না। তবে মালিকী ইমামগণের মতে, যিন্দীককে হত্যা করা হবে। তাকে তাওবার সুযোগ দেয়া যাবে না। অধিকন্তু, সে তাওবার দাবী করলেও তার কথা গ্রহণযোগ্য হবে না; তবে সে যদি ধরা পড়ার আগেই তাওবা করে, তাহলেই তার কথা আমলে নেয়া হবে। এর কারণ হলো, তার নিকট এমন কোন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যা থেকে জানা যাবে যে, সে সত্যি সত্যিই তাওবা করে ইসলামে ফিরে এসেছে। কেননা সে তো এমনিতে ইসলামের ঘোষণা দান করে, ভাল মুসলিমের মতো জীবন যাপন করে। ভেতরে ভেতরেই কুফরী লুকিয়ে রাখে। তাই তার ফিরে আসার মধ্যে নতুন কিছুই নেই। ৭৭
টিকাঃ
৭৬. যিন্দীক হল মূলত কাফির, অন্তরে কুফরী ধারণাকে লালন করে; তবে বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করে। তবে হঠাৎ কোন সময় তার অন্তরের এ কপটতা প্রকাশ পেয়ে যায়।
৭৭. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১৮-৯; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৬, পৃ.৯৮; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ. ১৬৯-৭০; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৫, পৃ. ২৮২; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১৬৬
📄 নবী পরিবার ও সাহাবীগণের প্রতি অশোভনীয় আচরণ
যে ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিবারের কাউকে গালি দেবে, শাস্তিস্বরূপ তাকে প্রহার করতে হবে, তার নাম জনসমাজে প্রচার করতে হবে এবং দীর্ঘ দিন তাকে কারাবন্দী করে রাখতে হবে। কেননা নবী (স সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিবারকে গালি দেয়া প্রকারান্তরে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অসম্মান করা। অনুরূপভাবে যে আরবদেরকে কিংবা বনু হাশিমকে গালি দেবে, লা'নত করবে, তাকেও প্রহার করতে হবে এবং কারাদণ্ড দিতে হবে। তাছাড়া যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি কোন মিথ্যারোপ করবে, তাকেও প্রহার করতে হবে, তার নাম জনসমাজে প্রচার করতে হবে এবং তাকে কারাবন্দী করে রাখতে হবে। কেননা তাঁর প্রতি মিথ্যারোপ করার মানে হল তাকে হেয় করা। তাই তাকে ছেড়ে দেয়া যাবে না, যতক্ষণ না বোঝা যাবে যে, সে সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করেছে। আর যে ব্যক্তি হযরত 'আয়িশা (রা)-এর পবিত্র চরিত্রের প্রতি কলঙ্ক লেপন করবে, তাকে তাওবার সুযোগ দিতে হবে। এ উদ্দেশ্যে তাকে বন্দী করা হবে। যদি সে তাওবা না করে, তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যাবে এবং এ কারণে তাকে হত্যা করতে হবে। আর যে ব্যক্তি কোন সাহাবী (রা)-কে গালি দেবে কিংবা তাঁদের কারো শানে কোন অশোভনীয় বাক্য উচ্চারণ করবে, তাকেও কঠোর কারাদণ্ড দিতে হবে। ৭৮
টিকাঃ
৭৮. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইק, খ.৫, পৃ.১৩৬; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ২৩৬-৭; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.২০৬; আর-রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৭, পৃ.৪১৬; আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.২৮৭
📄 সালাত ত্যাগ করা
যে ব্যক্তি নামাযের ফরযিয়্যাতকে অস্বীকার করে কিংবা তার ফরযিয়্যাতের প্রতি তাচ্ছল্য প্রদর্শন করে নামায ছেড়ে দিল, তার ব্যাপারে ইমামগণের সর্বসম্মত মত হলো, সে কাফির মুরতাদ হয়ে গেল। তার হদ্দ হল মৃত্যুদণ্ড। তবে তাকে এ শাস্তি কার্যকর করার আগে তিন দিন সুযোগ দেয়া হবে, যাতে সে এ সময়ের মধ্যে তাওবা করে ফিরে আসে।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অলসতা বশতঃ কিংবা হালকা মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয় প্রথমত তাকে নামায পড়ার জন্য বলা হবে। এরপরও যদি সে ফিরেই নামায তরক করতে থাকে তাহলে তার শাস্তি কি হবে - এ ব্যাপারে ইমামগণের তিনটি মত দেখা যায়। ৭৯ এগুলো হলঃ
ক. ইমাম যুহরী, আবূ হানীফা ও ইমাম মুজনী আশ-শাফি'ঈ (রহ) প্রমুখের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিকে নামায তরক করার কারণে হত্যা করা বিধেয় নয়; বরং তাকে বন্দী করে রাখা হবে, যতক্ষণ না সে নামায পড়তে অভ্যস্ত হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, لا يحل دم امرئ مسلم إلا بإحدى ثلاث : النفس بالنفس (ইসলামে নরহত্যার বদলে নরহত্যা) , الثيب الزاني والمفارق لدينه التارك للجماعة কোন মুসলিমের রক্ত হালাল হবে না। এ তিন ব্যক্তি হলঃ অন্যায়ভাবে অপরকে হত্যাকারী, বিবাহিত ব্যভিচারী এবং মুসলিম দল ও ধর্মত্যাগকারী ব্যক্তি।" ৮০ এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নামায তরককারী উপর্যুক্ত তিন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং তাকে হত্যা করা যাবে না।
খ. মালিকী ও শাফি'ঈ ইমামগণের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিকে নামায তরক করার কারণে প্রথমে বন্দী করা হবে এবং তিন দিন সুযোগ দেয়া হবে, যাতে সে এ সময়ের মধ্যে তাওবা করে নামায পড়তে শুরু করে। অন্যথায় তাকে হদ্দ হিসেবে হত্যা করা হবে। তাঁদের মতে, এ ধরনের নামায তরককারী কাফির হবে না; ফাসিক হবে।
গ. ইমাম আহমাদের বিশুদ্ধ বর্ণনানুযায়ী এ ধরনের ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। সুতরাং তাকে মুরতাদের মত প্রথমে বন্দী করা হবে এবং তিন দিন সুযোগ দেয়া হবে, যাতে সে এ সময়ের মধ্যে তাওবা করে নামায পড়তে শুরু করে। অন্যথায় তাকে মুরতাদ হিসেবে হত্যা করা হবে। হযরত 'আলী (রা), হাসান বসরী (রহ), আওযা'ঈ (রহ) ও আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ) প্রমুখও এ মত পোষণ করেন। তাঁরা বিভিন্ন হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল من ترك "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত সালাত তরক করল, সে কুফরী করল।" ৮১ "কোন ব্যক্তির ঈমান এবং তার শিরক ও কুফরীর পরিচয়ের মানদণ্ড হল সালাত তরক করা।" ৮২
টিকাঃ
৭৯. আল-মাওস্'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ.৩৩৯, খ.১৬, পৃ.৩০২-৩, খ.২২, পৃ.১৮৭, খ.২৭, পৃ.৫৩-৪; নববী, আল-মাজমূ', খ.৩, পৃ.১৮-৯; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.২, পৃ.১৫৬-৮; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৬৪; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫. পৃ.৪৯; আশ-শাওকানী, নায়লুল আওতার, খ.১, পৃ.২৪৮
৮০. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৬৪৮৪; মুসলিম, (কিতাবুল কাসামাহ), হা.নং : ১৬৮৬
৮১. আত্ তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, হা.নং: ৩৩৪৮
৮২. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল ঈমান), হা.নং: ৮২