📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তা‘যীরের বিধান

📄 অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তা‘যীরের বিধান


নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে, যদি তা প্রমাণিত না হয়, তা হলে হদ্দ কায়িম করা যাবে না। এটাই সর্বসম্মত অভিমত। তবে হানাফী ও মালিকী ইমামগণের মতে, বিচারক কিংবা শাসক অবস্থার দাবী অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তা'যীরী শাস্তি দিতে পারবে, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধে লিপ্ত হয়েছে তার কোন লক্ষণ দেখা যায়, যদিও তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয় অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি জনগণের মধ্যে বিপর্যয় ও হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী হিসেবে কুখ্যাত হয়।
যদি অভিযোগ আরোপিত ব্যক্তি সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে জনসমাজে সুখ্যাত হয়, তা হলে তাকে কোনভাবে নিছক অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন রূপ শাস্তি দেয়া যাবে না; বরং অভিযোগকারী যদি অভিযোগ প্রমাণিত করতে না পারে, তাকেই শাস্তি দেয়া হবে। যাতে কোন অসৎ ব্যক্তি পবিত্র চরিত্রের লোকদের মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। ৫৯ যদি অভিযোগ আরোপিত ব্যক্তি সৎ কি অসৎ জানা না যায়, তা হলে তাকে বন্দী করে রাখা যাবে, যতক্ষণ না তার অবস্থা স্পষ্ট হবে। ৬০ যদি অভিযোগ আরোপিত ব্যক্তি কুখ্যাত অপরাধী বা সন্ত্রাসী হয়, তাহলে যে সব অপরাধ সচরাচর প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য (যেমন চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ প্রভৃতি) সে সবের জন্য তাকে নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে স্বীকারোক্তি লাভের উদ্দেশ্যে প্রহার করাও যেতে পারে, ৬১ বন্দী করেও রাখা যেতে পারে। ৬২ বর্তমান সমাজে এ অবস্থাই সমধিক প্রচলিত রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, যে ব্যক্তি সৎ কি না জানা নাই, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করানোর জন্য দুজন সাধারণ লোক কিংবা একজন ন্যায়বান লোকের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তবে কুখ্যাত অপরাধী ও সন্ত্রাসীর ক্ষেত্রে বিচারক কিংবা শাসকের অবগতিই যথেষ্ট। ৬৩

টিকাঃ
৫৯. এটাই অধিকাংশ ইমামগণের অভিমত। তবে ইমাম মালিক ও আশহাবের মতে, অভিযোগকারীকে শাস্তি দেয়া সমীচীন নয়; তবে যদি প্রমাণিত হয় যে, সে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিছক সমাজে কলঙ্কিত করার বা কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যেই অভিযোগ আরোপ করেছে, তা হলেই তাকে শাস্তি দেয়া যাবে।
৬০. কারো কারো মতে, তার কারাভোগের মেয়াদ এক মাসের চাইতে বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে মাওয়ার্দী বলেন, এর জন্য মেয়াদ নির্ধারিত করে দেয়া সমীচীন নয়; বরং বিচারক বা শাসক ব্যক্তির অবস্থা ও অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনা করে কম-বেশি যে কোন মেয়াদের জন্য তাকে বন্দী করে রাখতে পারবে।
৬১. এটাই মালিকী ও হাম্বলী ইমামগণের অভিমত। ইবনুল কাইয়িম বলেন, বিচারক কিংবা শাসকের জন্য এ ধরনের অভিযুক্ত ব্যক্তিকে স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে মারধর করতে কোন অসুবিধা নেই। ইবনু আবিল হাকীকের ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণিত রয়েছে, জনৈক ব্যক্তি তার ধন-সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীকারোক্তি আদায় করার উদ্দেশ্যে তাকে প্রহার করার জন্য হযরত যুবায়র (রা) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত যুবায়র (রা) স্বীকৃতি আদায় করা পর্যন্ত তাকে প্রহার করতে থাকেন। তবে বিভিন্ন মাযহাবের অধিকাংশ ইমামের মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধর করা সমীচীন নয়; তবে বন্দী করে রাখা যেতে পারে। (আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১৬, পৃ.২৯২)
৬২. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৩৫২; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৬৭; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১২৪; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যাহ, পৃ. ২৭৩-৬; আল-মাওসৃ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১৩, পৃ.১৪৪, খ.১৪, পৃ.৯৪-৫, খ.১৬, পৃ.২৯২-৩
৬৩. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১৪, পৃ.৯৫

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 আজীবন কারাদণ্ড

📄 আজীবন কারাদণ্ড


বিচারক কিংবা শাসক যদি প্রয়োজন মনে করেন, বিপজ্জনক দুরাচারী এবং দাগী সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে আজীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন। ১১৯ হযরত উ'সমান (রা) বনী তামীম গোত্রের ডাকাত দাবী' ইবন হারিছকে কারারুদ্ধ করে রেখেছিলেন এবং এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেছিল। ১২০ হযরত 'আলী (রা) এমন এক ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন, যে অপর ব্যক্তিকে এই জন্য ধরে রেখেছিল যে, অন্য জন এসে তাকে হত্যা করবে। ১২১ এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, (اقتلوا القاتل واصبروا الصابر)
"তোমরা হত্যাকারীকে বধ করো আর আটককারীকে আমৃত্যু বন্দী করে রাখ।"১২২ তাছাড়া পুরুষ সমকামী, বিদ'আতের প্রতি আহ্বানকারী, জালমুদ্রা প্রচলনকারী, দাগী অপরাধী ও জঘন্য সন্ত্রাসী প্রমুখকেও আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে।

টিকাঃ
১১৯. ইবনু ফারহুন, তাবছিরাতুল হক্কাম, খ.২, পৃ. ১৫২, ১৮৩; আল-মাওয়াক, আত-তাজ.., খ.৬, পৃ. ৬১৫; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.১৬, পৃ.২৮৯
১২০. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.১৬, পৃ.২৮৯
১২১. আল-কুরতুবী, আকদিয়াতুর রাসূল, পৃ.৫-৬
১২২. আল-বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৮০৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অনির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড

📄 অনির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড


নিয়ম হল, বিচারের সময় কারাবাসের মেয়াদ সুনির্দিষ্ট করে দেয়া। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়াদ অনির্দিষ্ট রেখে এবং তাওবা করে স্বাভাবিক ও পবিত্রভাবে জীবন যাপনের ফিরে আসার শর্ত জুড়ে দিয়ে সাজা দেয়াও জায়িয। যেমন মুসলিম মদবিক্রেতা, শত্রু পক্ষের মুসলিম গোয়েন্দা এবং দেশদ্রোহীদেরকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড দেয়া জায়িয। যতক্ষণ না শাসকগণ তাদের বিশুদ্ধ তাওবা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হবেন, ততদিন তাদেরকে কারাগারে বন্দী করে রাখতে পারবেন। অনুরূপভাবে চরম নেশাখোর ব্যক্তিকেও যে হদ্দের শাস্তি লাভ করার পর আর আবারও নেশা করে, তাকেও তাওবা করে নেশামুক্ত জীবনে ফিরে আসা পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড দেয়া জায়িয। ১২৩

টিকাঃ
১২৩. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৪৬

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 কারাদণ্ড ও অন্য দণ্ডের সমাবেশ

📄 কারাদণ্ড ও অন্য দণ্ডের সমাবেশ


বিচারক কিংবা শাসক যদি ব্যক্তির অবস্থা, অপরাধের মাত্রা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে অন্য যে কোন দণ্ডের সাথে কারাদণ্ড কার্যকর করা কল্যাণকর মনে করেন, তাহলে যে কোন ধরনের শাস্তির সাথে কারাদণ্ড দেয়াতে কোন অসুবিধা নেই। ১২৪ যেমন অবিবাহিত ব্যভিচারী পুরুষকে হদ্দ হিসেবে একশটি বেত্রাঘাত করার পর জনস্বার্থ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে এক বছরের জন্য কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে। যে আঘাতের কিসাস নেয়া সম্ভব নয়; বিনিময় নেয়ার বিধান রয়েছে, তাতে বিনিময় নেয়ার পাশাপাশি কারাদণ্ডও দেয়া যেতে পারে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর সাথে যিহার করল, তাকেও কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত বন্দী করে রাখা যেতে পারে। তাছাড়া হাঙ্গামা ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে কারাগারে শিকল পরিয়ে রাখা, দায়গ্রস্ত আটক ব্যক্তিকে প্রহার করা, মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রদানকারীকে মাথা মুণ্ডন করিয়ে দেয়া ও বন্দী করা, হত্যাকারীকে যদি নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা ক্ষমা করে দেয়, তাকে একশটি বেত্রাঘাত সহ কারাদণ্ড দেয়া প্রভৃতি বৈধ রয়েছে।

টিকাঃ
১২৪. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ২১০; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৩৫০; ইবনু ফারহুন, তাবছিরাতুল হুক্কাম, খ.২, পৃ. ২৯০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00