📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 তা‘যীরের ক্ষেত্রে সীমালংঘনের বিধান

📄 তা‘যীরের ক্ষেত্রে সীমালংঘনের বিধান


তা'যীরের উদ্দেশ্য যেহেতু শিক্ষা প্রদান; কাউকে অনর্থক কষ্ট দেয়া বা ধ্বংস করা নয়, তাই শাস্তি কার্যকর করার সময় পূর্ণ সতর্ক থাকা একান্ত প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শাস্তি প্রদান করা কিংবা অস্বাভাবিকভাবে প্রহার করা সীমালঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। অধিকন্তু, এ রূপ শাস্তিতে কারো কোন ক্ষতি সাধন হলে শাস্তি দানকারী এর জন্য দায়ী থাকবে। তদুপরি কোন ধরনের সীমা লঙ্ঘন ছাড়াই স্বাভাবিক শাস্তি বা প্রহারেও যদি কেউ মারা যায় বা কারো কোন দৈহিক ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলেও শাস্তিদানকারী এর জন্য দায়ী থাকবে। ৫৪ যেমন অবাধ্যতার জন্য কোন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে স্বাভাবিক প্রহার করে এবং এতে সে যদি মারা যায় বা তার দৈহিক কোন ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে এর জন্য স্বামী দায়ী থাকবে। ৫৫ কেননা শিক্ষা দান করার উদ্দেশ্যে শাস্তি দেয়ার অধিকার যদিও তার রয়েছে, তবে এ অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সার্বিক নিরাপত্তার কথা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
অনুরূপভাবে কোন শিক্ষক যদি কোন ছাত্রকে শিক্ষা দান করার উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক প্রহার করে এবং এতে সে যদি মারা যায় কিংবা তার কোন দৈহিক ক্ষতি হয়, তাহলেও শিক্ষক দায়ী থাকবে। ৫৬ কেননা শিক্ষা দান করার উদ্দেশ্যে শাস্তি দেয়ার অধিকার যদিও শিক্ষকের রয়েছে, তবে এ অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছাত্রের সার্বিক নিরাপত্তার কথা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। কেননা শাস্তির উদ্দেশ্য তাকে শিক্ষা দেয়া, মেরে ফেলা নয়। মরে গেলে বোঝা যাবে যে, সে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করেছে।
তদ্রূপ কোন পিতা, দাদা বা অভিভাবক যদি তার কোন সন্তান বা পোষ্যকে শিক্ষা দান করার উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক প্রহার করে এবং এতে সে যদি মারা যায় কিংবা তার কোন দৈহিক ক্ষতি হয়, তাহলেও তারা দায়ী থাকবে। ৫৭ কেননা শিক্ষকদের মতো শিক্ষা দান করার উদ্দেশ্যে শাস্তি দেয়ার অধিকার যদিও তাদের রয়েছে, তবে এ অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সন্তানের বা পোষ্যের সার্বিক নিরাপত্তার কথা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
তবে শাসক বা তার প্রতিনিধির হাতে কোন বিধিবদ্ধ শাস্তি কার্যকর করার সময় কেউ মারা গেলে এর জন্য সে দায়ী থাকবে না। ৫৮ কেননা শরী'আতের নির্দেশ কার্যকর করাই হল শাসকের দায়িত্ব। আর শরী'আতের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে কারো কোন ক্ষতি হলে বা মারা গেলে এ জন্য সে দায়ী থাকবে না।

টিকাঃ
৫৪. মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কাম, খ.২, পৃ.৭৭; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৫৪; গানিম, মাজমা'..., পৃ.২০১; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬২-৩; আল-হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ.১৯২; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.১৬; আল-মাওয়াক, আত-তাজ, খ.৮, পৃ.৪৩৭; 'উলায়শ, মিনহুল জলীল, খ.৯, পৃ. ৩৫৮-৯
৫৫. এটা হানাফী ও শাফি'ঈগণের অভিমত। মালিকী ও হাম্বলীগণের মতে, এর জন্য স্বামী দায়ী থাকবে না।
৫৬. এটা শাফি'ঈগণের অভিমত। মালিকী ও হাম্বলীগণের মতে, স্বাভাবিক প্রহারে ছাত্র মারা গেলে শিক্ষক দায়ী থাকবে না। হানাফীগণের মতে, প্রহারের ক্ষেত্রে পিতা কিংবা অভিভাবকের অনুমতি থাকলে শিক্ষক দায়ী থাকবে না। তবে তাদের অনুমতি ছাড়াই স্বাভাবিক প্রহারে মারা গেলে শিক্ষক দায়ী থাকবে।
৫৭. এটাই ইমাম আবু হানীফা (রহ)-এর অভিমত। তবে সাহেবাইনের মতে, তারা দায়ী থাকবে না।
৫৮. এটা হানাফী ও হাম্বলীগণের অভিমত। শাফি'ঈগণের মতে, সে দায়ী থাকবে। কেননা শাস্তি দেয়ার অধিকার যদিও তার রয়েছে, তবে এ অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সার্বিক নিরাপত্তার কথা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। কোন কোন মালিকীর মতে, যদি শাসক নিরাপত্তা ও সুস্থ থাকার বিষয়টি মাথায় প্রবলভাবে রেখেই শাস্তি প্রদান করে থাকে তা হলে সে কোন রূপ দায়ী থাকবে না। অন্যথায় দায়ী থাকবে।

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তা‘যীরের বিধান

📄 অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তা‘যীরের বিধান


নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে, যদি তা প্রমাণিত না হয়, তা হলে হদ্দ কায়িম করা যাবে না। এটাই সর্বসম্মত অভিমত। তবে হানাফী ও মালিকী ইমামগণের মতে, বিচারক কিংবা শাসক অবস্থার দাবী অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তা'যীরী শাস্তি দিতে পারবে, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধে লিপ্ত হয়েছে তার কোন লক্ষণ দেখা যায়, যদিও তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয় অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি জনগণের মধ্যে বিপর্যয় ও হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী হিসেবে কুখ্যাত হয়।
যদি অভিযোগ আরোপিত ব্যক্তি সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে জনসমাজে সুখ্যাত হয়, তা হলে তাকে কোনভাবে নিছক অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন রূপ শাস্তি দেয়া যাবে না; বরং অভিযোগকারী যদি অভিযোগ প্রমাণিত করতে না পারে, তাকেই শাস্তি দেয়া হবে। যাতে কোন অসৎ ব্যক্তি পবিত্র চরিত্রের লোকদের মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। ৫৯ যদি অভিযোগ আরোপিত ব্যক্তি সৎ কি অসৎ জানা না যায়, তা হলে তাকে বন্দী করে রাখা যাবে, যতক্ষণ না তার অবস্থা স্পষ্ট হবে। ৬০ যদি অভিযোগ আরোপিত ব্যক্তি কুখ্যাত অপরাধী বা সন্ত্রাসী হয়, তাহলে যে সব অপরাধ সচরাচর প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য (যেমন চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ প্রভৃতি) সে সবের জন্য তাকে নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে স্বীকারোক্তি লাভের উদ্দেশ্যে প্রহার করাও যেতে পারে, ৬১ বন্দী করেও রাখা যেতে পারে। ৬২ বর্তমান সমাজে এ অবস্থাই সমধিক প্রচলিত রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, যে ব্যক্তি সৎ কি না জানা নাই, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করানোর জন্য দুজন সাধারণ লোক কিংবা একজন ন্যায়বান লোকের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তবে কুখ্যাত অপরাধী ও সন্ত্রাসীর ক্ষেত্রে বিচারক কিংবা শাসকের অবগতিই যথেষ্ট। ৬৩

টিকাঃ
৫৯. এটাই অধিকাংশ ইমামগণের অভিমত। তবে ইমাম মালিক ও আশহাবের মতে, অভিযোগকারীকে শাস্তি দেয়া সমীচীন নয়; তবে যদি প্রমাণিত হয় যে, সে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিছক সমাজে কলঙ্কিত করার বা কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যেই অভিযোগ আরোপ করেছে, তা হলেই তাকে শাস্তি দেয়া যাবে।
৬০. কারো কারো মতে, তার কারাভোগের মেয়াদ এক মাসের চাইতে বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে মাওয়ার্দী বলেন, এর জন্য মেয়াদ নির্ধারিত করে দেয়া সমীচীন নয়; বরং বিচারক বা শাসক ব্যক্তির অবস্থা ও অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনা করে কম-বেশি যে কোন মেয়াদের জন্য তাকে বন্দী করে রাখতে পারবে।
৬১. এটাই মালিকী ও হাম্বলী ইমামগণের অভিমত। ইবনুল কাইয়িম বলেন, বিচারক কিংবা শাসকের জন্য এ ধরনের অভিযুক্ত ব্যক্তিকে স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে মারধর করতে কোন অসুবিধা নেই। ইবনু আবিল হাকীকের ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণিত রয়েছে, জনৈক ব্যক্তি তার ধন-সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীকারোক্তি আদায় করার উদ্দেশ্যে তাকে প্রহার করার জন্য হযরত যুবায়র (রা) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত যুবায়র (রা) স্বীকৃতি আদায় করা পর্যন্ত তাকে প্রহার করতে থাকেন। তবে বিভিন্ন মাযহাবের অধিকাংশ ইমামের মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধর করা সমীচীন নয়; তবে বন্দী করে রাখা যেতে পারে। (আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১৬, পৃ.২৯২)
৬২. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৩৫২; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৬৭; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১২৪; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যাহ, পৃ. ২৭৩-৬; আল-মাওসৃ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১৩, পৃ.১৪৪, খ.১৪, পৃ.৯৪-৫, খ.১৬, পৃ.২৯২-৩
৬৩. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১৪, পৃ.৯৫

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 আজীবন কারাদণ্ড

📄 আজীবন কারাদণ্ড


বিচারক কিংবা শাসক যদি প্রয়োজন মনে করেন, বিপজ্জনক দুরাচারী এবং দাগী সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে আজীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন। ১১৯ হযরত উ'সমান (রা) বনী তামীম গোত্রের ডাকাত দাবী' ইবন হারিছকে কারারুদ্ধ করে রেখেছিলেন এবং এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেছিল। ১২০ হযরত 'আলী (রা) এমন এক ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন, যে অপর ব্যক্তিকে এই জন্য ধরে রেখেছিল যে, অন্য জন এসে তাকে হত্যা করবে। ১২১ এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, (اقتلوا القاتل واصبروا الصابر)
"তোমরা হত্যাকারীকে বধ করো আর আটককারীকে আমৃত্যু বন্দী করে রাখ।"১২২ তাছাড়া পুরুষ সমকামী, বিদ'আতের প্রতি আহ্বানকারী, জালমুদ্রা প্রচলনকারী, দাগী অপরাধী ও জঘন্য সন্ত্রাসী প্রমুখকেও আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে।

টিকাঃ
১১৯. ইবনু ফারহুন, তাবছিরাতুল হক্কাম, খ.২, পৃ. ১৫২, ১৮৩; আল-মাওয়াক, আত-তাজ.., খ.৬, পৃ. ৬১৫; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.১৬, পৃ.২৮৯
১২০. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.১৬, পৃ.২৮৯
১২১. আল-কুরতুবী, আকদিয়াতুর রাসূল, পৃ.৫-৬
১২২. আল-বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৮০৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অনির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড

📄 অনির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড


নিয়ম হল, বিচারের সময় কারাবাসের মেয়াদ সুনির্দিষ্ট করে দেয়া। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়াদ অনির্দিষ্ট রেখে এবং তাওবা করে স্বাভাবিক ও পবিত্রভাবে জীবন যাপনের ফিরে আসার শর্ত জুড়ে দিয়ে সাজা দেয়াও জায়িয। যেমন মুসলিম মদবিক্রেতা, শত্রু পক্ষের মুসলিম গোয়েন্দা এবং দেশদ্রোহীদেরকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড দেয়া জায়িয। যতক্ষণ না শাসকগণ তাদের বিশুদ্ধ তাওবা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হবেন, ততদিন তাদেরকে কারাগারে বন্দী করে রাখতে পারবেন। অনুরূপভাবে চরম নেশাখোর ব্যক্তিকেও যে হদ্দের শাস্তি লাভ করার পর আর আবারও নেশা করে, তাকেও তাওবা করে নেশামুক্ত জীবনে ফিরে আসা পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড দেয়া জায়িয। ১২৩

টিকাঃ
১২৩. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৪৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00