📄 নির্বাসন বা দেশ থেকে বহিষ্কার
বিচারক কিংবা শাসক জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে অপরাধীদেরকে তা'যীর হিসেবে নির্দিষ্ট কোন মেয়াদের জন্য দেশ থেকে বহিষ্কারের শাস্তি কিংবা নির্বাসন দণ্ড দিতে পারেন। নির্বাসন স্থলে তাকে বন্দী করে রাখার প্রয়োজন নেই। তবে সার্বক্ষণিকভাবে তাকে নজরদারী করতে হবে, যাতে সে নিজ দেশে ফিরে আসতে না পারে। ১৯
টিকাঃ
১৯. ৫৫৪৭, ৬৪৪৫) হযরত 'উমার (রা) মহিলাদেরকে ফিতনায় ফেলার কারণে নাসর ইবন হাজ্জাজকে বসরায় নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। (ইবনু হাজর, ফাতহুল বারী, খ.১২, পৃ.১৬০) তাছাড়া ব্যভিচারী অবিবাহিত পুরুষকে একবছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশও হাদীসে রয়েছে।
২০. এটা শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের অভিমত। মালিকীগণের মতে, নির্বাসনস্থলে তাকে বন্দী করে রাখতে হবে। (আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১৩, পৃ. ৪৭)
📄 শূলে চড়ানো
অনেক ইমামের মতে, তা'যীর হিসেবে বিচারক সমীচীন মনে করলে জঘন্য কোন অপরাধের জন্য অপরাধীকে জীবিত অবস্থায় তিন দিনের জন্য শূলে চড়ানোর দণ্ড দিতে পারেন। তবে তাকে শূলে চড়ানোর সাথে কিংবা আগে হত্যা করা যাবে না। মাওয়ার্দী বলেন, কেবল তিন দিনই জীবিত অবস্থায় শূলে চড়িয়ে শাস্তি দেয়া জায়িয। এর পর তাকে জীবিত ছেড়ে দিতে হবে। বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ নাব নামক জনৈক ব্যক্তিকে পাহাড়ের ওপর শূলীতে শাস্তি দিয়েছিলেন। ২১ তিনি আরো বলেন, এ তিন দিনের মধ্যে তাকে খাবার, পানীয় ও নামাযের ওযু থেকে বারণ করা যাবে না। আর সে ইশারায় নামায পড়বে। তবে ছেড়ে দেয়ার পর পুনরায় নামাযগুলো পড়ে দেবে।” বিশিষ্ট ইসলামী আইনতত্ত্ববিদ শারবীনী বলেন, শূলী অবস্থায়ও তাকে পূর্ণ স্বস্তির সাথে নামায পড়তে দেয়া দরকার। অর্থাৎ নামাযের সময় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। নামাযের পর আবার তাকে শূলে চড়াতে হবে। হাম্বলীগণের মতে, যদি সম্ভব না হয় ইশারা করেই নামায পড়বে; তবে মুক্ত হবার পর পুনরায় নামাযগুলো পড়িয়ে দেবার প্রয়োজন নেই।
কোন কোন আইনবিদের মতে, হত্যা করার পরেও শূলে চড়ানো জায়িয। আবার কারো মতে, হত্যার পূর্বে শূলে চড়ানো যাবে এবং এ অবস্থায় হত্যা করতে অসুবিধা নেই। যদি হত্যা করার পর শূলে চড়ানো হয় কিংবা হত্যার পূর্বে শূলে চড়িয়ে এ অবস্থায় হত্যা করা হয়, তাহলে বিশুদ্ধ মতানুসারে শূলে যে সময় পর্যন্ত রাখলে প্রচার কার্য সম্পন্ন হবে, সে সময় পর্যন্ত শূলে রাখা জায়িয। হানাফীগণের মতে, দুর্গন্ধ বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত শূলে রাখা জায়িয। আর শাফি'ঈগণের মতে, তিন দিন শূলে চড়িয়ে রাখতে হবে। ২২
টিকাঃ
২১. আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২৯৬
২২. আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২৯৬-৭ আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৯৫; মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কাম, খ.২, পৃ.৮৫; আল-জসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ৫৭৮; ইবনুল 'আরবী, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ১০০; আল-জুমল, ফুতুহাতুল ওয়াহহাব, খ.৫, পৃ.১৫৫; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৭২
📄 উপদেশ বা তিরস্কার কিংবা ধমক দান
তা'যীর হিসেবে বিচারক অপরাধীকে তার দরবারে ডেকে এনে উপদেশ, তিরস্কার ও ধমক দিতে পারেন। যেমন কেউ যদি সাধারণ কোন ব্যক্তিকে এমন কোন নামে ডাকে যা সে অপছন্দ করে, (যেমন কুত্তা, গাধা, শালা, মিথ্যুক, ফাসিক, কাফির, জারজ সন্তান, মুনাফিক প্রভৃতি) তাহলে বিচারক তাকে ডেকে এনে উপদেশ দিতে পারেন কিংবা (অত্যাচারী, অভদ্র, জাহিল বা সামীলঙ্ঘনকারী প্রভৃতি শব্দ বলে) তিরস্কার করতে পারেন বা ধমকও দিতে পারেন। তাকে এজন্য বড় ধরনের অপমানিত করা কিংবা কারাদণ্ড দেয়া সমীচীন নয়। ২৩
টিকাঃ
২৩. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৬৪; আর-রুহায়বানী, মাতালিব..., খ.৬, পৃ.২২৩ বর্ণিত রয়েছে, একদা হযরত আবূ যার (রা) জনৈক ব্যক্তিকে তার মায়ের নাম ধরে গালি দিচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা শুনে তাকে বললেন, "يا أبا ذر ! عيرته بأمه ! إنك امرؤ فيك جاهلية "আবূ যার, তুমি তাকে মায়ের নাম ধরে অপমান করছো! তোমার মধ্যে তো দেখছি, জাহিলিয়্যাত (অর্থাৎ অভদ্রতা) রয়েই গেছে!” (সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল ঈমান), হা.নং: ৩০, (কিতাবুল আদাব), হা.নং: ৫৭০৩) এ হাদীস থেকে জানা যায়, অপরাধীকে শাস্তি হিসেবে তিরস্কার করতে কিংবা উপদেশ দিতে কোন অসুবিধা নেই। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকেও বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে এক মদ্যপায়ীকে হাজির করা হল। এ সময় তাকে বকাঝকা করার জন্য তিনি উপস্থিত লোকজনকে নির্দেশ দিলেন। তখন লোকেরা তাকে বলতে লাগলঃ ما اتقيت الله ! ما خشيت الله ! ما استحييت من رسول الله !"-তোমার কি আল্লাহর ভয় নেই! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি কি তোমার লাজ-শরম নেই!" এ হাদীস থেকে জানা যায়, অপরাধীকে তার কাজের জন্য তিরস্কার ও বকাঝকা করা যাবে। -আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪৭৮
📄 অপমান করা
তা'যীর হিসেবে বিচারক প্রয়োজন মনে করলে অপরাধীকে ছোট-খাট অপমানকর শাস্তিও দিতে পারেন। ২৪ যেমন কেউ যদি কোন পদস্থ ও সম্মানিত ব্যক্তিকে খারাপ নামে ডাকে, তাহলে বিচারক প্রয়োজন মনে করলে তাকে ছোট-খাট অপমানকর শাস্তি দিতে পারেন। যেমন কানধরে উঠাবসা করা, এক পায়ের ওপর অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থাকা প্রভৃতি। এ ধরনের অপরাধের জন্য কারাদণ্ড দেয়া সমীচীন নয়।
টিকাঃ
২৪. আল-বাবরতী, আল-'ইনায়াহ, খ.৫, পৃ.৩৪৪; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১১০