📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 হত্যা

📄 হত্যা


ইসলামী আইনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তা'যীরের আওতায় কাউকে হত্যা করা সমীচীন নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا .بالحق "তোমরা এমন কাউকে বিনা অধিকারে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ তা'আলা নিষিদ্ধ করেছেন।" ৪ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ : النَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَ الثَّيِّبُ الزَّانِي وَالْمُفَارِقُ لِدِينِهِ التَّارِكُ لِلْجَمَاعَةِ. মুসলিমের রক্ত হালাল হবে না। এ তিন ব্যক্তি হল : অন্যায়ভাবে অপরকে হত্যাকারী, বিবাহিত ব্যভিচারী এবং মুসলিম দল ও ধর্মত্যাগকারী ব্যক্তি।" ৫
তবে অধিকাংশ ইসলামী আইনতত্ত্ববিদের মতে, কেউ কোন মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত করলে কিংবা কোন বড় অপরাধ বারংবার সংঘটিত করলে জাতীয় ঐক্য, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনের তাকিদে তা'যীর স্বরূপ তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা জায়িয। ৬ যেমন কোন মুসলিম যদি ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের জন্য গোয়েন্দাগিরি করে বা কেউ যদি কুর'আন-সুন্নাহর পরিপন্থী কোন বিদ'আতের প্রতি লোকদের আহবান জানায় বা তা সমাজে প্রচলন করতে চেষ্টা করে কিংবা কেউ বারবার সমকামিতায় লিপ্ত হয়, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। অনুরূপভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীর অনিষ্টতা দমন করা যদি হত্যা ছাড়া অসম্ভব হয়, তাহলে তাকে হত্যা করাই হল তার শাস্তি। হযরত আরফাজাহ আল-আশজা'ঈ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مِنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٌ وَاحِدٌ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ “তোমরা যখন কোন এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ, তখন কেউ যদি তোমাদের ঐক্য ভঙ্গ করতে ও তোমাদের ঐক্যবদ্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে তাকে হত্যা কর।” ৭ ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহ) বলেন, المفسد كالصائل إذا لم يندفع إلا بالقتل قتل - “বিপর্যয় সৃষ্টিকারী আক্রমণকারীর মতোই। যদি الصائل আক্রমণকারী হত্যা ছাড়া অবদমিত না হয়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে।” ৮

টিকাঃ
৪. আল-কুর'আন, ৬ (সূরা আল-আন'আম): ১৫১
৫. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৬৪৮৪; মুসলিম, (কিতাবুল কাসামাহ), হা.নং : ১৬৮৬
৬. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ. ১২৩; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৬২-৩
৭. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল ইমারাত), হা.নং: ১৮৫২
৮. ইবনু তাইমিয়‍্যাহ, আল-ফাতাওয়া.., খ.২৮, পৃ. ২৪৭

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 বন্দী করা

📄 বন্দী করা


তা'যীর হিসেবে অপরাধীদেরকে প্রয়োজনে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম বা বিনা শ্রমে কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে। কখনো পরিস্থিতি এরূপ হয়ে দাঁড়াতে পারে যে, অপরাধীকে বন্দী করে রাখা না হলে তার কার্যকলাপে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠতে পারে। এ ধরনের অপরাধীকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হলে তাকে যেমন তার কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে, তেমনি সে সাথে এ আশাও করা যেতে পারে, কারাগার থেকে মুক্তির পর সে কারাজীবনের দুঃসহ কষ্টের কথা স্মরণ করে কোন অপরাধে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকবে। এ কারণে কারাগারের অভ্যন্তরীন পরিবেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে কয়েদীরা সেখানে এক অপরিচিত পরিবেশের মধ্যে পড়ে ছটফট করতে থাকবে। তা হলেই পরবর্তী জীবনে এ দুঃসহ অবস্থার কথা চিন্তা করে তারা আর যে কোন অপরাধে লিপ্ত হতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হবে না।
বর্তমানে কারাগারগুলোর অবস্থা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। এখানে বন্দীদের পরস্পরের সাথে মেলামেশা করার সুযোগ থাকার কারণে অপরাধীরা বন্দী হয়েও কারাগারের চার প্রাচীরের অভ্যন্তরে অপরিচিতির অস্বস্তি ভোগ করে না। ফলে কারাগারের শাস্তি তাদের জন্য শাস্তিরূপেই প্রতিভাত হয় না। তা হয়ে ওঠে অপরাধের উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভের মনোরম কেন্দ্র বিশেষ। প্রাথমিক পর্যায়ের কোন অপরাধী কিছুকাল কারাজীবন লাভ করতে পারলে সে একজন ঘাগু ও দুঃসাহসী অপরাধী হয়ে বের হয়ে আসে। তাই এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, বর্তমান পরিবেশে কারাগারে বন্দী করে রাখা না অপরাধীকে অপরাধবিমুখ করতে, না সমাজকে অপরাধমুক্ত বানাতে কিছুমাত্র সহায়তা করছে। তাই এ বিষয়ে গভীরভাবে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। ১৮

টিকাঃ
১৮. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ১৪

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 নির্বাসন বা দেশ থেকে বহিষ্কার

📄 নির্বাসন বা দেশ থেকে বহিষ্কার


বিচারক কিংবা শাসক জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে অপরাধীদেরকে তা'যীর হিসেবে নির্দিষ্ট কোন মেয়াদের জন্য দেশ থেকে বহিষ্কারের শাস্তি কিংবা নির্বাসন দণ্ড দিতে পারেন। নির্বাসন স্থলে তাকে বন্দী করে রাখার প্রয়োজন নেই। তবে সার্বক্ষণিকভাবে তাকে নজরদারী করতে হবে, যাতে সে নিজ দেশে ফিরে আসতে না পারে। ১৯

টিকাঃ
১৯. ৫৫৪৭, ৬৪৪৫) হযরত 'উমার (রা) মহিলাদেরকে ফিতনায় ফেলার কারণে নাসর ইবন হাজ্জাজকে বসরায় নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। (ইবনু হাজর, ফাতহুল বারী, খ.১২, পৃ.১৬০) তাছাড়া ব্যভিচারী অবিবাহিত পুরুষকে একবছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশও হাদীসে রয়েছে।
২০. এটা শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের অভিমত। মালিকীগণের মতে, নির্বাসনস্থলে তাকে বন্দী করে রাখতে হবে। (আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১৩, পৃ. ৪৭)

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 শূলে চড়ানো

📄 শূলে চড়ানো


অনেক ইমামের মতে, তা'যীর হিসেবে বিচারক সমীচীন মনে করলে জঘন্য কোন অপরাধের জন্য অপরাধীকে জীবিত অবস্থায় তিন দিনের জন্য শূলে চড়ানোর দণ্ড দিতে পারেন। তবে তাকে শূলে চড়ানোর সাথে কিংবা আগে হত্যা করা যাবে না। মাওয়ার্দী বলেন, কেবল তিন দিনই জীবিত অবস্থায় শূলে চড়িয়ে শাস্তি দেয়া জায়িয। এর পর তাকে জীবিত ছেড়ে দিতে হবে। বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ নাব নামক জনৈক ব্যক্তিকে পাহাড়ের ওপর শূলীতে শাস্তি দিয়েছিলেন। ২১ তিনি আরো বলেন, এ তিন দিনের মধ্যে তাকে খাবার, পানীয় ও নামাযের ওযু থেকে বারণ করা যাবে না। আর সে ইশারায় নামায পড়বে। তবে ছেড়ে দেয়ার পর পুনরায় নামাযগুলো পড়ে দেবে।” বিশিষ্ট ইসলামী আইনতত্ত্ববিদ শারবীনী বলেন, শূলী অবস্থায়ও তাকে পূর্ণ স্বস্তির সাথে নামায পড়তে দেয়া দরকার। অর্থাৎ নামাযের সময় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। নামাযের পর আবার তাকে শূলে চড়াতে হবে। হাম্বলীগণের মতে, যদি সম্ভব না হয় ইশারা করেই নামায পড়বে; তবে মুক্ত হবার পর পুনরায় নামাযগুলো পড়িয়ে দেবার প্রয়োজন নেই।
কোন কোন আইনবিদের মতে, হত্যা করার পরেও শূলে চড়ানো জায়িয। আবার কারো মতে, হত্যার পূর্বে শূলে চড়ানো যাবে এবং এ অবস্থায় হত্যা করতে অসুবিধা নেই। যদি হত্যা করার পর শূলে চড়ানো হয় কিংবা হত্যার পূর্বে শূলে চড়িয়ে এ অবস্থায় হত্যা করা হয়, তাহলে বিশুদ্ধ মতানুসারে শূলে যে সময় পর্যন্ত রাখলে প্রচার কার্য সম্পন্ন হবে, সে সময় পর্যন্ত শূলে রাখা জায়িয। হানাফীগণের মতে, দুর্গন্ধ বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত শূলে রাখা জায়িয। আর শাফি'ঈগণের মতে, তিন দিন শূলে চড়িয়ে রাখতে হবে। ২২

টিকাঃ
২১. আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২৯৬
২২. আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যাহ, পৃ. ২৯৬-৭ আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৯৫; মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কাম, খ.২, পৃ.৮৫; আল-জসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ৫৭৮; ইবনুল 'আরবী, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ১০০; আল-জুমল, ফুতুহাতুল ওয়াহহাব, খ.৫, পৃ.১৫৫; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৭২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00