📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 হত্যার দিয়াত আদায়ের সামগ্রী

📄 হত্যার দিয়াত আদায়ের সামগ্রী


দিয়াত আদায়ের প্রধান বস্তু হল উট। যদি উট পাওয়া যায়, তা হলে উট দিয়ে দিয়াত আদায় করতে হবে। এতে কারো দ্বিমত নেই। যদি উট পাওয়া না যায় কিংবা তা সংগ্রহ করা দুরূহ হয়, তাহলে এর সমতুল্য দিয়াত বিভিন্ন বস্তুসামগ্রীর দ্বারাও পরিশোধ করা যাবে এবং নগদ অর্থেও পরিশোধ করা যাবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খুলাফা রাশিদূনের যুগে নগদ অর্থে পূর্ণ দিয়াতের পরিমাণ উটের সমসাময়িক বাজার দরের উঠা-নামার ভিত্তিতে স্বর্ণমুদ্রায় ৪০০ (চার শত) দীনার থেকে ১০০০ (এক হাজার) দীনার পর্যন্ত এবং রৌপ্য মুদ্রায় ৮০০০ (আট হাজার দিরহাম) থেকে ১২০০০ (বার হাজার দিরহাম) পর্যন্ত উন্নীত হয়। ৩৩
ইমাম আবূ হানীফা (রহ) ও মালিকীগণের মতে- দিয়াত আদায়ের মূল সামগ্রী হল তিনটি- উট, সোনা ও রূপা। ।৩৪ উট হলে একশতটি, সোনা হলে ১০০০ (এক হাজার) দীনার আর রূপা হলে ১০০০০ (দশ হাজার) বা ১২০০০ (বার হাজার) দিরহাম। ৩৫ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إن .في النفس الدية مائة من الإبل “জীবনহানিতে দিয়্যাত হল একশতটি উট।” ৩৬ বর্ণিত আছে, হযরত ‘উমার (রা) স্বর্ণের মালিকদের ওপর এক হাজার দীনার এবং রৌপ্যের মালিকদের ওপর বার হাজার দিরহাম দিয়াত নির্ধারণ করতেন। ৩৭ এ হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, দিয়াত আদায়ের জন্য উট, সোনা ও রূপা- এ তিনটির মধ্যে যে কোনটি ইখতিয়ার করা যাবে।
শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামগণ এবং হানাফীগণের মধ্যে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ) ও মুহাম্মাদ (রহ) প্রমুখের মতে- দিয়াত আদায়ের মূল উপকরণ হল পাঁচটি- উট, সোনা, রূপা, গরু ও ছাগল। ৩৮ গরুর পরিমাণ হল দুশত আর ছাগলের পরিমাণ হল দু'হাজার। ৩৯ বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাদের গরু আছে তাদের নিকট থেকে পূর্ণ দিয়াত বাবদ দুশত গরু এবং যাদের বকরী আছে তাদের নিকট থেকে দুহাজার বকরী নেবার নির্দেশ দেন। ৪০

টিকাঃ
৩৩. আবু দাউদ, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং ৪৫৪২; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৯৪৬, ১৫৯৪৯, ১৫৯৫০
৩৪. আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ. ২৫৩-৪; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২৭৫; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.৬৮; আল-'আদাভী, আল-হাশিয়াতু.., খ.২, পৃ. ২৯৮-৯
৩৫. হানাফীগণের দৃষ্টিতে দশ হাজার ও অন্যান্য ইমামগণের দৃষ্টিতে বার হাজার। (আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ২৫৪; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২৭৫; আল-বাজী, আল-মুস্ত কা, খ.৭, পৃ.৬৮; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.২৯০)
৩৬. আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, (কিতাবুষ যাকাত), হা.নং: ১৪৪৭; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ, হা.নং: ৬৫৫৯; বায়হাকী, আস-সুনান আল- কুবরা, হা.নং: ১৫৯৭০
৩৭. আবূ দাউদ, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৪৫৪২; মালিক, আল-মু'আত্তা, (কিতাবুল 'উকূল), হা.নং: ১৫৪৮; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৯৫০
৩৮. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.২৮৯-৯০; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭,পৃ. ২৫৩-৪; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২৭৫
৩৯. ইমাম আবু ইউসূফ (রহ) ও মুহাম্মাদ (রহ) প্রমুখের মতে- কাপড় দিয়েও দিয়াত আদায় করা যাবে। বর্ণিত আছে যে, হযরত 'উমার (রা) কাপড় ব্যবসায়ীদের ওপর দুশত জোড়া কাপড় দানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। (আবূ দাউদ, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৪৫৪২; বায়হাকী, আস- সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৯৫০)
৪০. ইবনু মাজাহ, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং ২৬৩০; আবূ দাউদ, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৪৫৪২; আল বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৯৪৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 হত্যার তা‘যীরী শাস্তি

📄 হত্যার তা‘যীরী শাস্তি


হত্যাকারী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কেবল একটি জীবনেরই ক্ষতি সাধন করে না; বরং সে সামাজিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করে। তাই যদি কোন কারণে কিসাস বা দিয়াত বা দুটিই রহিত হয়ে যায়, তবুও তার কিছু শাস্তি হওয়া উচিত। মালিকীগণের মতে- কিসাস ক্ষমা করার ক্ষেত্রে হত্যাকারীকে একশত বেত্রাঘাত ও এক বৎসরের কারাদণ্ড প্রদান করা হবে। অন্যান্য মাযহাবের ইমামগণের মতে- হত্যাকারী পেশাদার দুস্কৃতিকারী হলে সরকার তাকে তা'যীরের আওতায় যে কোন ধরনের শাস্তি দিতে পারবে। ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে সমঝোতার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড রহিত হলেও বিচারক সুবিবেচনা অনুযায়ী দিয়াতের সাথে কারাদণ্ডের শাস্তিও যোগ করতে পারে। পিতা পুত্রকে হত্যা করলে তার ওপর কিসাস কার্যকর না হলেও সে তা'যীরের আওতায় দণ্ড ভোগ করবে। ৪০

টিকাঃ
৪০. ইবনু রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ.২, পৃ. ৩৩৮; বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন (সংকলন), খ.১, পৃ.২৬৩

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 যখমের দিয়াত

📄 যখমের দিয়াত


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 এক সাথে দিয়াতযোগ্য কয়েকটি অপরাধের শাস্তি

📄 এক সাথে দিয়াতযোগ্য কয়েকটি অপরাধের শাস্তি


মূলনীতি হল- এক সাথে মানবদেহের বিরুদ্ধে দিয়াতযোগ্য যে ক'টি অপরাধ সংঘটিত হবে, প্রত্যেকটির জন্য পৃথক পৃথক দিয়াত ওয়াজিব হবে, যদি আহত ব্যক্তি মারা না যায়। ১২১ আর যদি আহত ব্যক্তি মারা যায়, তাহলে সব ক'টি অপরাধের দিয়াত প্রাণহানির দিয়াতের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে এবং এর জন্য একটি মাত্র দিয়াত ওয়াজিব হবে।
উপর্যুক্ত মূলনীতির ভিত্তিতে ইসলামী আইনতত্ত্ববিদদের অভিমত হল- মানবদেহের যে কোন অঙ্গের যখম ভাল ও সুস্থ হয়ে না ওঠলে মৃত্যু পর্যন্ত দেহের ঐ অঙ্গে যে ক'টি অপরাধ হবে, তা সবই প্রাণের দিয়াতের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে, যদি অপরাধী একজনই হয়। অতএব, কেউ ভুলবশত কারো দুটি হাত কেটে ফেলল এবং আহত ব্যক্তি এ যখম থেকে ভাল হবার আগেই যদি অপরাধী পুনরায় ভুলবশত তাকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে একটি মাত্র দিয়াত বাধ্যতামূলক হবে। অনুরূপভাবে কেউ ভুলবশত কারো সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলল, অতঃপর ভুলবশত তাকে হত্যা করল অথবা আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় মারা গেল, তাহলেও একটি মাত্র দিয়াত বাধ্যতামূলক হবে।
পক্ষান্তরে মানবদেহের যে কোনের অঙ্গের যখম ভাল ও সুস্থ হয়ে ওঠার পর ঐ অঙ্গে অন্য যখম করা হলে প্রত্যেকটি যখমের জন্য পৃথক পৃথক দিয়াত বাধ্যতামূলক হবে। অতএব কেউ যদি কারো নাক কেটে ফেলে এবং এর ক্ষত শুকিয়ে যাবার পর আবার যদি সে নাকের ঘ্রাণশক্তি নষ্ট করে, তাহলে তার ওপর দুটি পূর্ণ দিয়াত প্রদান বাধ্যতামূলক হবে। অনুরূপভাবে কেউ কারো দুটি হাত ও দুটি পা কর্তন করে ফেলল; কিন্তু আহত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠল; এর প্রতিক্রিয়ায় মারা গেল না, তাহলে অপরাধীর ওপর দুটি দিয়াতই বাধ্যতামূলক হবে।
তবে অপরাধের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন হলে (যেমন- একটি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অন্যটি ভুলবশত সংঘটিত হলে) অথবা অপরাধের ক্ষেত্র আলাদা আলাদা হলে (যেমন- হাত ও পা) যদি মাঝখানে সুস্থও না হয় কিংবা যখম সংক্রমিত হয়ে অন্য অঙ্গ আক্রান্ত হলে বা দেহের কোন রূপ ক্ষতি হলে প্রত্যেকটি অপরাধের জন্য পৃথক পৃথক সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোজ্য হবে। অতএব কোন ব্যক্তি ভুলবশত কারো হাত কেটে ফেলল, অতঃপর আহত ব্যক্তি যখম থেকে সেরে ওঠার আগেই সে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে হত্যা করল অথবা প্রথমে ইচ্ছাকৃতভাবে হাত কাটল, অতঃপর ভুলবশত তাকে হত্যা করল অথবা ভুলবশত প্রথমে হাত কেটে ফেলল, ক্ষত শুকিয়ে ওঠার পর আবার ভুলবশত তাকে হত্যা করল অথবা প্রথমে ইচ্ছাকৃতভাবে হাত কেটে ফেলল, ক্ষত শুকিয়ে ওঠার পর আবার ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে হত্যা করল, তা হলে এ সকল অবস্থায় সংশ্লিষ্ট দুটি বিধানই কার্যকর করা বাধ্যতামূলক হবে। ১২২

টিকাঃ
১২১. যেমন- কারো দুটি পা ও দুটি হাত কর্তন করা হলে এবং সে মারা না গেলে অপরাধীর ওপর দুটি পূর্ণ দিয়াত প্রদান বাধ্যতামূলক হবে। অনুরূপভাবে কাউকে আঘাত করে তার দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও বোধশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট করা হলে তিনটি পূর্ণ দিয়াত ওয়াজিব হবে। বর্ণিত রয়েছে যে, হযরত 'উমার (রা)-এর আমলে জনৈক ব্যক্তি অন্য একজনের দিকে পাথর ছুড়ে মেরেছিল। এর ফলে তার দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি ও বোধশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয় যায়। হযরত 'উমার (রা) এ চারটি শক্তি নষ্ট করার কারণে একত্রে চারটি দিয়াত প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। (আল বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৬১০৫; ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুহান্নাফ, হা.নং: ২৭৩৫০)
১২২. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৩০২-৩; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৬, পৃ.১১৭-৮, ১৩৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00