📄 হাত-পায়ের কিসাস
হাতের পরিবর্তে হাতে, পায়ের পরিবর্তে পায়ে কিসাস গ্রহণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে উভয় অঙ্গের মধ্যে আকৃতি ও সামর্থ্যগত তফাৎ (যেমন ছোট-বড় হওয়া এবং সবল-দুর্বল হওয়া) কিসাসের জন্য বাধা হবে না। তবে ত্রুটিযুক্ত কিংবা অকেজো হাত-পায়ের পরিবর্তে ত্রুটিহীন কিংবা সুস্থ হাত-পায়ে কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। কিন্তু ত্রুটিহীন কিংবা সুস্থ হাত-পায়ের পরিবর্তে ত্রুটিযুক্ত কিংবা অকেজো হাত-পায়ে কিসাস গ্রহণ আহত ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হবে। সে চাইলে কিসাসও গ্রহণ করতে পারে অথবা দিয়াতও গ্রহণ করতে পারে। তবে কিসাস গ্রহণ করলে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করার ইখতিয়ার তার থাকবে না। ১২৬
টিকাঃ
১২৬. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.২৯৭-৮
📄 চোখের কিসাস
চোখের পরিবর্তে চোখে কিসাস গ্রহণ করা যাবে, যদি চোখ উৎপাটন করা হয়। কিসাসের বিধান সম্বলিত উপর্যুক্ত আয়াতে চোখের বদলায় চোখে কিসাস নেবার কথা বলা হয়েছে। তদুপরি চোখ যেহেতু কোটর থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা করে নেয়া যায়, তাই তার অনুরূপ বদলা নেয়া সম্ভব।
বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের চোখের বদলায় যুবকের চোখে, পূর্ণবয়স্ক লোকের চোখের বদলায় অপ্রাপ্ত বয়স্কের চোখে কিসাস গ্রহণ করা যাবে। তাছাড়া চোখের বৈশিষ্ট্যগত তফাত কিসাসের জন্য বাধা নয়। তবে অসুস্থ চোখের বদলে সুস্থ চোখে কিসাস গ্রহণ করা যাবে কি না- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মালিকী ও হাম্বলীগণের মতে- দুর্বল দৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন চোখের পরিবর্তে সুস্থ চোখে কিসাস গ্রহণ করা হবে। অধিকাংশ হানাফী ইমামের মতে- কেউ কারো টেরা চোখ উপড়িয়ে ফেললে তাতে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে, যদি চোখের দৃষ্টিশক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। অন্যথায় দিয়াত প্রদান বাধ্যতামূলক হবে। ছানিপড়া চোখের পরিবর্তে অনুরূপ চোখে কিসাস হবে না। তবে ছানিপড়া দুর্বল চোখের কোন ব্যক্তি কারো কোন সুস্থ চোখ উৎপাটন করলে আহত ব্যক্তির এ ইখতিয়ার থাকবে যে, সে চাইলে ছানিপড়া চোখে কিসাসও গ্রহণ করতে পারে; চাইলে দিয়াতও নিতে পারে। ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ)-এর মতে, টেরা চোখের জন্য কিসাস প্রযোজ্য হবে না।
কানা ব্যক্তি যদি কারো কোন সুস্থ চোখ উৎপাটন করে, তাহলে তার সুস্থ চোখ থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে এবং তাকে অন্ধরূপে ছেড়ে রাখা হবে। এটা হানাফী ও শাফি'ঈ ইমামগণের অভিমত। মালিকীগণের মতে- আহত ব্যক্তির এ ইখতিয়ার থাকবে যে, সে ইচ্ছে করলে কিসাসও গ্রহণ করতে পারবে, ইচ্ছে করলে চোখের দিয়াতও নিতে পারবে। হাম্বলীগণের মতে, এ ক্ষেত্রে কিসাস প্রযোজ্য হবে না; দিয়াত বাধ্যতামূলক হবে। কেননা সে তো তার পূর্ণ দৃষ্টি শক্তি নষ্ট করে নি। তাই তার পূর্ণ দৃষ্টি শক্তি নষ্ট করে কিসাস গ্রহণ করা সমীচীন হবে না।
যদি কানা ব্যক্তি কারো দুটি সুস্থ চোখই উৎপাটন করে, তাহলে তার সুস্থ চোখে কিসাস কার্যকর হবে এবং অপর চোখের জন্য চোখের অর্ধেক দিয়াত বাধ্যতামূলক হবে। তবে হাম্বলীগণের মতে- আহত ব্যক্তির এ ইখতিয়ার থাকবে যে, সে ইচ্ছে করলে শুধু কিসাসই গ্রহণ করবে অথবা চোখের পূর্ণ দিয়াত নেবে। চোখের পলক ও কিনারা উৎপাটনের ক্ষেত্রে হানাফী ও মালিকীগণের মতে কিসাস নেই। হানাফীগণের মতে- এতে দিয়াত আর মালিকীগণের মতে- ক্ষতিপূরণ দান বাধ্যতামূলক হবে। পক্ষান্তরে শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে- এতেও কিসাস কার্যকর হবে। ১২৭
টিকাঃ
১২৭. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৩০৮; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.২৬০-৩; আল-হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৮, পৃ.৪২৬
📄 নাকের কিসাস
নাকের নরম অংশের জন্য কিসাস ওয়াজিব হবে। কিসাসের বিধান সম্বলিত উপর্যুক্ত আয়াতে নাকের বদলায় নাকে কিসাস নেবার কথা বলা হয়েছে। তদুপরি নাকের এ অংশটি সুনির্দিষ্ট হবার কারণে তার অনুরূপ বদলা নিতে যেহেতু কোন রূপ অসুবিধা হয় না, তাই এ অংশে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে। যদি কেউ নাকের হাঁড় সহ পুরো নরম অংশটি কেটে ফেলে, তাহলে নরম অংশের জন্য কিসাস ওয়াজিব হবে আর হাঁড়ে যেহেতু কিসাসের বিধান প্রযোজ্য নয়, তাই তার জন্য ক্ষতিপূরণ দান বাধ্যতামূলক হবে। নাকের নরমাংশের আংশিক কর্তনের জন্য কিসাস ওয়াজিব হবে না। এর কারণ এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সমতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে শাফি'ঈ ইমামগণের দৃষ্টিতে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে।
ছোট নাকের পরিবর্তে বড় নাকে, খাঁদা নাকের (snub nose) পরিবর্তে বাঁকা নাকে, ঘ্রাণ নিতে অসমর্থ নাকের পরিবর্তে ঘ্রাণ নিতে সক্ষম নাকে কিসাস গ্রহণ করা হবে। তবে হানাফীগণের মতে- অপরাধীর নাক যদি অতিশয় ছোট হয় আর আহত ব্যক্তির নাক বড় হয়, তাহলে আহত ব্যক্তির এ ইখতিয়ার থাকবে যে, সে ইচ্ছে করলে কিসাসও গ্রহণ করতে পারবে, ইচ্ছে করলে দিয়াতও নিতে পারবে। অনুরূপভাবে যে কোন ত্রুটিযুক্ত নাকের বেলায়ও এ বিধান প্রযোজ্য হবে।
ডান নাসারন্ধ্রের পরিবর্তে ডান নাসারন্ধ্রে, বাম নাসারন্ধ্রের পরিবর্তে বাম নাসারন্ধ্রে কিসাস গ্রহণ করা যাবে। তবে বিপরীত নাসারন্ধ্রে কিসাস নেয়া যাবে না। দু নাসারন্ধ্রের মধ্যবর্তী পর্দার জন্যও কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে। ১২৮
টিকাঃ
১২৮. আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ.৩০৮; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.২৫৮; আল- হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৮, পৃ.৪২৫
📄 কানের কিসাস
কানের বদলায় কানে কিসাস নেয়া হবে। কিসাসের বিধান সম্বলিত উপর্যুক্ত আয়াতে কানের বদলায় কানে কিসাস নেবার কথা বলা হয়েছে। তদুপরি কানের আয়তন সুনির্দিষ্ট হবার কারণে তার অনুরূপ বদলা নিতে যেহেতু কোন রূপ অসুবিধা হয় না, তাই হাত-পায়ের মত কানের পরিবর্তে কানে কিসাস গ্রহণ বাধ্যতামূলক হবে। ছোট ও বড় কানের তফাত কিসাসের জন্য বিবেচ্য নয়। তদুপরি শ্রবণশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির কান ও বধিরের কান দুটিই যেহেতু সমতুল্য, শ্রবণশক্তির বিলুপ্তির কারণ কানের ত্রুটির কারণে নয়; বরং মাথার কোন ত্রুটিই এর জন্য দায়ী, তাই একটার পরিবর্তে অন্যটিতে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে। অনুরূপভাবে সুস্থ কানের বদলায় অকেজো কানেও কিসাস গ্রহণ করা যাবে। কারণ, কান অকেজো হলেও তার শ্রবণ শক্তি সম্পূর্ণ বহাল রয়েছে।
কানের অংশবিশেষ কর্তনের বেলায়ও কিসাস বাধ্যতামূলক হবে। এটা শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামগণের অভিমত। হানাফীগণের মতে- কর্তিত অংশ সুনির্দিষ্ট এবং তার অনুরূপ বদলা নেয়া সম্ভব হলেই কেবল কিসাস নেয়া যাবে।
ছিদ্রযুক্ত কানের পরিবর্তে সুস্থ কানে কিসাস নেয়া হবে। কারণ ছিদ্রযুক্ত হওয়া কানের দোষ নয়। অনেক সময় কানে দুল পরার জন্য এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেও কান ছিদ্র করা হয়। যদি কানের ছিদ্র যথাযথ স্থানে না হয় কিংবা কর্তনকারীর কান ফাটা এবং আহত ব্যক্তির কান সম্পূর্ণ হয়, তাহলে হানাফীগণের দৃষ্টিতে আহত ব্যক্তির এ ইখতিয়ার থাকবে যে, সে ইচ্ছে করলে কিসাসও গ্রহণ করতে পারে, ইচ্ছে করলে কানের অর্ধেক দিয়াতও নিতে পারে। যদি কর্তিত কানটি অপূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে তার ক্ষতিপূরণ দান বাধ্যতামূলক হবে। শাফি'ঈগণের দৃষ্টিতে সুস্থ কানের বদলায় ফাটা কানে কিসাস নেয়া যাবে; তবে ফাটা হবার কারণে যে পরিমাণ কান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সম পরিমাণ দিয়াত দানও বাধ্যতামূলক হবে। হাম্বলীগণের মতে- সুস্থ কানের পরিবর্তে ফাটা কানে বদলা নেয়া হবে। তবে ফাটা কানের পরিবর্তে সুস্থ কানে বদলা নেয়া যাবে না। কারণ কানের ছিদ্র যখন ফাটা রূপে দেখা যায়, তা ত্রুটিরূপে গণ্য হয়। আর ত্রুটিযুক্ত অঙ্গের পরিবর্তে ত্রুটিহীন অঙ্গে কিসাস কার্যকর হয় না। ১২৯
টিকাঃ
১২৯. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৩০৮; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.২৫৭; আল- হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৮, পৃ.৪২৬