📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অপরাধ সীমালংঘন মূলক হওয়া

📄 অপরাধ সীমালংঘন মূলক হওয়া


মানবদেহের বিরুদ্ধে অন্যায় বা সীমালঙ্ঘন মূলক অপরাধের জন্য কিসাস বাধ্যতামূলক হবে। যদি কেউ আইনসিদ্ধ পন্থায় কিংবা কাউকে তার অনুমতিক্রমে আঘাত করে এবং এর ফলে তার কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে অপরাধীর ওপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না।
অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি নিজের জান, ধন-সম্পদ বা নিজের স্ত্রী-কন্যার সতীত্ব রক্ষার প্রয়োজনে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে গিয়ে তার শরীরের কোন রূপ ক্ষতি সাধন করলেও তার ওপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না।
শিক্ষক, পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের শিক্ষাদানমূলক শাস্তিতে কোন ছাত্র বা সন্তানের শরীরের কোন রূপ ক্ষতি সাধিত হলে তার জন্যও কিসাস কার্যকর করা যাবে না।
উল্লেখ‍্য যে, অপরাধী মুকাল্লাফ (প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন) না হলে তাকে তার অপরাধের জন্য সীমালঙ্ঘনকারীরূপে বিবেচনা করা যাবে না। এ কারণে মানবদেহের বিরুদ্ধে তার যে কোন অপরাধ কিসাসযোগ্য হবে না। তবে তা'যীরের আওতায় তার অপরাধের জন্য যে কোন উপযুক্ত শাস্তি দেয়া যাবে। ১০৬

টিকাঃ
১০৬. আদ-দাসূকী, আল-হাশিয়াতু 'আলাশ শারহিল কাবীর, খ.৪, পৃ.২৫২

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 ধর্মগত মিল থাকা

📄 ধর্মগত মিল থাকা


মানবদেহের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য কিসাস বাধ্যতামূলক হবার জন্য অপরাধী ও আহত ব্যক্তির মধ্যে ধর্মগত মিল থাকা শর্ত কি না - তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। হানাফীগণের দৃষ্টিতে- মুসলিম ও অমুসলিমের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের ক্ষতিপূরণ দানের পরিমাণের মধ্যে যেহেতু কোন ধরনের তারতম্য করা হয় না, তাই মানবদেহের বিরুদ্ধে অপরাধের কিসাস গ্রহণের ক্ষেত্রেও কোনরূপ তারতম্য বিধেয় নয়। অতএব, মুসলিম ও অমুসলিম পরস্পরের মধ্যে কিসাসের বিধান কার্যকর হবে। মালিকীগণের প্রসিদ্ধ অভিমত অনুযায়ী মুসলিমের জন্য অমুসলিম থেকে তার কোন অপরাধের কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। শাফি'ঈ ইমামগণের মতে- কোন মুসলিমের হাত-পা কর্তনের অপরাধে অমুসলিম থেকে কিসাস গ্রহণ করা যাবে। তবে কোন অমুসলিমের হাত-পা কর্তনের অপরাধে মুসলিম থেকে কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। হাম্বলী ইমামগণও এ মত পোষণ করেন। ১০৭

টিকাঃ
১০৭. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৬, পৃ.১১২; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২৩৫; আল- মাওস্'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১৬, পৃ.৬৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.২৫২

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 লিঙ্গের মিল থাকা

📄 লিঙ্গের মিল থাকা


অধিকাংশ ইমামের দৃষ্টিতে মানবদেহের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য কিসাস বাধ্যতামূলক হবার জন্য অপরাধী ও আহত ব্যক্তির মধ্যে লিঙ্গের মিল থাকা শর্ত নয়। অতএব নারী ও পুরুষ পরস্পরের মধ্যে কিসাস জারি হবে।
তবে হানাফীগণের প্রসিদ্ধ অভিমত অনুযায়ী মানবদেহের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য কিসাস বাধ্যতামূলক হবার জন্য অপরাধী ও আহত ব্যক্তির মধ্যে লিঙ্গের মিল থাকা শর্ত। যদি দুজনেই পুরুষ কিংবা নারী হয়, তা হলে কিসাস ওয়াজিব হবে। যদি এক জন পুরুষ, অপর জন নারী হয়, তা হল কিসাস বাধ্যতামূলক হবে না। তাঁদের বক্তব্য হল- কিসাসের জন্য শর্ত হল দুজনের সংশ্লিষ্ট অঙ্গের মধ্যে পূর্ণ সমতা বিদ্যমান থাকা দরকার। নারী ও পুরুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে যেহেতু তারতম্য রয়েছে, তাই একজনের অঙ্গের পরিবর্তে অন্যজনের সংশ্লিষ্ট অঙ্গ বদলারূপে নেয়া যাবে না। তবে কোন মহিলা যদি কোন পুরুষের হাত বা অন্য কোন অঙ্গ কেটে ফেলে, তা হলে ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে কিসাস গ্রহণের অধিকার পুরুষের রয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ) বলেন, " শিজাজ (মুখমণ্ডলে আঘাত বা মাথা ফাটানো)-এর যে সব অবস্থায় কিসাস জারি হয়, সে সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ পরস্পরের মধ্যেও কিসাস কার্যকর হবে। তাঁর কথা হল, শিজাজের শাস্তির উদ্দেশ্য কোন অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করা নয়; কেবল সামাজিকভাবে অপদস্থ করাই উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে নারী- পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। পক্ষান্তরে হাত-পা কর্তনের কিসাসের মধ্যে অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করা হয়। আর উভয়ের হাত-পায়ের কার্যক্ষমতার মধ্যে যেহেতু তারতম্য রয়েছে, তাই উভয়ের এ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতিপূরণের পরিমাণের মধ্যেও পার্থক্য হবে। " ১০৮

টিকাঃ
১০৮. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৬, পৃ.১১২; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২৩৫-৬; আল- মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১৬, পৃ.৬৬

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 সংখ্যাগত মিল থাকা

📄 সংখ্যাগত মিল থাকা


মানবদেহের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে কিসাস বাধ্যতামূলক হবার জন্য অপরাধী ও আহত ব্যক্তির মধ্যে সংখ্যাগত মিল থাকাও শর্ত। একটি অঙ্গের পরিবর্তে কয়েকটি অঙ্গ কিসাসস্বরূপ কর্তন করা যাবে না। এ রূপ অবস্থায় দিয়াত বাধ্যতামূলক হবে। অতএব, যদি দুই বা ততোধিক লোক একত্রিত হয়ে কারো হাত বা পা কেটে ফেলে কিংবা কারো চোখ বা কোন দাঁত উপড়িয়ে ফেলে, তা হলে কোন অপরারীর ওপরই কিসাস বাধ্যতামূলক হবে না; বরং প্রত্যেকর ওপর তাদের সংখ্যানুপাতে দিয়াতের অংশ প্রদান বাধ্যতামূলক হবে। কেননা মানব দেহের বিরুদ্ধে অপরাধে কিসাস ওয়াজিব হবার জন্য অপরাধী ও আহত ব্যক্তির মধ্যে পূর্ণ সমতা থাকা দরকার। বলাই বাহুল্য যে, একটি মাত্র হাত বা পায়ের সাথে একাধিক হাত বা পায়ের মধ্যে কোন রূপ সমতা নেই। তাই এ ক্ষেত্রে কিসাস ওয়াজিব হবে না। এটা হানাফীগণের অভিমত। ১০৯
তবে অন্যান্য মাযহাবের ইমামগণের মতে পৃথকভাবে একজনে করলে কিসাস বাধ্যতামূলক হয়- এ ধরনের এক বা একাধিক যখম যদি এক দল লোক একত্রিত হয়ে করে এবং দলের মধ্যে কার কি ভূমিকা রয়েছে- তা যদি সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব না হয়, তা হলে সকলের ওপর কিসাস বাধ্যতামূলক হবে। বর্ণিত রয়েছে, একবার হযরত 'আলী (রা)-এর নিকট দুজন লোক জনৈক ব্যক্তি সম্পর্কে চুরির সাক্ষ্য দেয়। হযরত 'আলী (রা) তাঁদের সাক্ষ্যের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিটির হাত কেটে দেন। পরে তারা অন্য একজন ব্যক্তিকে নিয়ে এসে বলল, এই হল মূল চোর। আমরা ভুলক্রমে আগের ব্যক্তি সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছি। হযরত 'আলী (রা) দ্বিতীয় ব্যক্তি সম্পর্কে তাদের সাক্ষ্য তো গ্রহণ করলেনই না; বরং প্রথমে অভিযুক্ত ব্যক্তির হাতের বদলায় তাদের উভয়ের ওপর দিয়াত প্রদান বাধ্যতামূলক করলেন আর বললেন, لو علمت أنكما تعمدتما .لقطعتكما - "যদি আমি জানতে পারতাম যে, তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে এ কাজ করেছ, তা হলে তো আমি তোমারদের দুজনেরই হাত কেটে দিতাম। "১১০ তাঁর এ কথা থেকে জানা যায় যে, দলের প্রত্যেকের ওপর কিসাস বাধ্যতামূলক হবে, যদি সকলেই ইচ্ছাকৃতভাবে মানবদেহের বিরুদ্ধে কোন অপরাধে লিপ্ত হয়।
তদুপরি এটা যেহেতু কিসাসের অন্যতম প্রকার, তাই হত্যার ক্ষেত্রে যেমন একজন ব্যক্তির বদলায় হত্যাকারী গোটা দলের ওপর কিসাস কার্যকর হয়, তেমনি যখমের ক্ষেত্রেও একজনের বদলায় গোটা দলের ওপর কিসাস বাধ্যতামূলক হবে।
যদি দলের মধ্যে কার কি ভূমিকা ছিল তা নিরূপণ করা সম্ভব হয় যেমন- একজন হাতের কিছু অংশ কাটল এবং অপরজন এসে হাতটি বিচ্ছিন্ন করে ফেলল, তাহলে শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামগণের মতে- কারো ওপর কিসাস ওয়াজিব হবে না; বরং প্রত্যেকের ওপর তার অপরাধ অনুপাতে দিয়াতের অংশবিশেষ বাধ্যতামূলক হবে। আর মালিকীগণের মতে- প্রত্যেকের ওপর তার অপরাধ অনুপাতে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে। তাঁদের মত অনুযায়ী যদি অপরাধীদের একজন হাত কাটল, অপরজন পা কাটল, তৃতীয়জন চোখ উপড়িয়ে ফেলল, তাহলে যে হাত কেটেছে কিসাসস্বরূপ তার হাত আর যে ব্যক্তি পা কেটেছে কিসাসস্বরূপ তার পা কাটতে হবে এবং তৃতীয়জনের চোখ উপড়িয়ে ফেলতে হবে। আর যদি তাদের ভূমিকা সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রত্যেকের হাত-পা কাটতে হবে এবং চোখ উপড়িয়ে ফেলতে হবে। ১১১
পক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি একাধিক ব্যক্তির একই অঙ্গ কর্তন বা অকেজো করে দিলে আহত এক ব্যক্তির অঙ্গের পরিবর্তে অপরাধীর ঐ নির্দিষ্ট অঙ্গের ওপরই কিসাস কার্যকর হবে এবং অপর ব্যক্তির অঙ্গের বদলে দিয়াত ওয়াজিব হবে। আর এ দিয়াত আহত দুব্যক্তির মধ্যে সমভাবে বন্টিত হবে। অপর অঙ্গের জন্য কিসাস কার্যকর করা সম্ভব না হওয়ায় দিয়াত বাধ্যতামূলক হয়েছে। আহত দু ব্যক্তির একজন উপস্থিত এবং অপরজন অনুপস্থিত থাকলেও উপস্থিত ব্যক্তির দাবি অনুযায়ী কিসাস কার্যকর হবে এবং অনুপস্থিত ব্যক্তি তার হাতের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ দিয়াত লাভ করবে। যদি সে একজনের একটি অঙ্গ (যেমন ডান হাত) এবং অপরজনের অন্য একটি অঙ্গ (যেমন বাম হাত) কর্তন করে, তবে কিসাসস্বরূপ তার উভয় হাত কর্তন করা হবে। ১১২

টিকাঃ
১০৯. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৮, পৃ.৩৫৫
১১০. সহীহ আল-বুখারী, (কিতাবুদ দিয়াত) তারজামাতুল বাব: ইযা আসাবা কাওমূন মিন রাজুলিন..; আল-বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৭৫৫, ২০৯৮১
১১১. আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১৪; আদ-দাসূকী, আল-হাশিয়াতু 'আলাশ শারহিল কাবীর, খ.৪, পৃ.২৫২; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১৬, পৃ.৬৭
১১২. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ২৯৯-৩০০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00