📘 ইসলামের শাস্তি আইন 📄 হত্যাকারী মুকাল্লাফ ( বালিগ ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন) হওয়া

📄 হত্যাকারী মুকাল্লাফ ( বালিগ ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন) হওয়া


কিসাস বাধ্যতামূলক হবার জন্য হত্যাকারীকে বালিগ ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হতে হবে। অতএব হত্যাকারী না বালিগ হলে তার ওপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না। তবে তার মাল থেকে দিয়াত প্রদান বাধ্যতামূলক হবে। অনুরূপভাবে কোন পাগল কাউকে হত্যা করলে তার ওপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না, যদি সে পুরো পাগল হয়। যদি সে মাঝে মাঝে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তা হলে এরূপ অবস্থায় হত্যা করলে তার ওপর কিসাস কার্যকর করা হবে। হত্যা করার সময় কেউ সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন ছিল; কিন্তু হত্যা করার পর যদি সে পাগল হয়ে যায়, তাহলে হানাফী ইমামগণের মতে- যদি বিচারক হত্যার বদলা গ্রহণের জন্য নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের কাছে তাকে সুস্থ অবস্থায় সপে দেয় এবং এর পরেই সে পাগল হয়ে যায়, তাহলে তার ওপর কিসাস কার্যকর করা হবে। আর যদি তাকে সুস্থ অবস্থায় সপে দেয়ার আগেই সে পাগল হয়ে যায়, তা হলে তার ওপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না। তবে তার মাল থেকে দিয়াত প্রদান বাধ্যতামূলক হবে। অনুরূপভাবে বিচারকের মৃত্যুদণ্ডের ফায়সালার দেবার আগে কিংবা কেউ হত্যা করার পর পরই স্থায়ীভাবে পুরো পাগল হয়ে গেলে তার ওপরও কিসাস কার্যকর যাবে না। মালিকীগণের মতে- হত্যা করার পর হত্যাকারী পাগল হয়ে গেলে তার সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এরপর কিসাস গ্রহণ করা হবে। তবে শাফি'ঈগণের মতে- সুস্থাবস্থায় হত্যা করার পর হত্যাকারী পাগল হয়ে গেলে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে এবং পাগল অবস্থায় তা কার্যকর করা হবে। হাম্বলীগণের মতে- এ রূপ অবস্থায় যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা হত্যা প্রমাণিত হয়, তা হলে পাগল অবস্থায় কিসাস কার্যকর করা হবে। আর যদি হত্যাকারীর নিজের স্বীকারোক্তি দ্বারা হত্যা প্রমাণিত হয়, এমতাবস্থায় যেহেতু স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের একটি সুযোগ তার রয়েছে, তাই তার সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং এরপরেই কিসাস কার্যকর করা হবে, যদি সে স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে না নেয়。
কোন মাতাল ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে যে কোন মাদক দ্রব্য গ্রহণ করে মাতাল অবস্থায় কাউকে হত্যা করলে তার ওপর কিসাস কার্যকর করা হবে। কারণ সে নিজেই তার মতি বা বোধশক্তি নষ্ট করেছে এবং তা এমন জিনিস দ্বারা করেছে যা গ্রহণ করা স্বয়ং একটি দণ্ডযোগ্য অপরাধ。

টিকাঃ
১৯. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.২৩৪; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২০৪
২০. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৩২; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৫, পৃ.৫২১; আর- রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.১৬; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৩; আল- মাওয়াক, আত-তাজ.., খ.৮, পৃ.২৮৯
২১. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৮৭; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১২০

📘 ইসলামের শাস্তি আইন 📄 হত্যাকারী মুসলিম বা ইসলামী রাষ্ট্রের স্থায়ী অমুসলিম নাগরিক হওয়া

📄 হত্যাকারী মুসলিম বা ইসলামী রাষ্ট্রের স্থায়ী অমুসলিম নাগরিক হওয়া


হত্যাকারীকে ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলিম কিংবা স্থায়ী অমুসলিম নাগরিক হতে হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের কোন মুসলিম অমুসলিমকে এবং কোন অমুসলিম মুসলিমকে হত্যা করলে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জীবন নিরাপদ। বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক অমুসলিমকে হত্যার অপরাধে হত্যাকারী মুসলিমকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন。
অনুরূপভাবে কোন অমুসলিম অপর অমুসলিমকে হত্যা করলেও হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে。
তবে ইসলামী রাষ্ট্রে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী কোন অমুসলিমকে (হারাবী) কেউ হত্যা করলে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। অনুরূপভাবে সেও যদি ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলিম বা অমুসলিম-কাউকে হত্যা করে, তাহলে তার ওপরও কিসাস কার্যকর করা যাবে না, এমন কি সে যদি পরে মুসলিমও হয়ে যায়। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খুলাফা রাশিদূনের কেউ কোন হারাবী (যেমন-হামযা (রা)-এর হত্যাকারী ওয়াহশী) থেকে ইসলাম গ্রহণ করার পর হত্যার কিসাস গ্রহণ করেছেন বলে প্রমাণ নেই। তদুপরি সে যেহেতু ইসলামের বিধি-নিষেধের অনুসরণ নিজের জন্য আবশ্যক করে নেয় নি, তাই তার জন্য কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে না। তবে অবৈধভাবে ইসলামী রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ এবং হত্যাকাণ্ডের কারণে সে নিজেই নিজের রক্তের নিরাপত্তা নষ্ট করেছে, তাই তাকে হত্যা করা যাবে। এ কারণে কোন হারাবী কোন মুসলিমকে হত্যা করলে তাকে হয়ত কিসাসের আওতায় হত্যা করা যাবে না; তবে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং হত্যাকাণ্ডের কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে। যদি সে মুসলিম হয়ে যায়, তাহলে তার ওপর কিসাস কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না。

টিকাঃ
২২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৬, পৃ.১৩১-২; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রাইক, খ.৮, পৃ.৩৩৭
২৩. আল বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৫৬৯৮, ১৫৬৯৯; দারুকুতনী, আস-সুনান, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ১৬৬, ১৬৭
২৪. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যাহ, খ.৬, পৃ.৩; আল-মারগীনানী, আল-হিদায়াহ, খ.৪, পৃ.৫৪৬
২৫. আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১২; আদ-দাসুকী, আল-হাশিয়াতু.., খ.৪, পৃ.২৩৮

📘 ইসলামের শাস্তি আইন 📄 হত্যাকারীর সন্দেহমুক্ত হত্যার অভিপ্রায় থাকা

📄 হত্যাকারীর সন্দেহমুক্ত হত্যার অভিপ্রায় থাকা


কিসাস বাধ্যতামূলক হবার জন্য হত্যার সন্দেহমুক্ত অভিপ্রায় সহকারে হত্যা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, . العمد قود - "ইচ্ছাকৃত হত্যাতেই কেবল মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য হবে।” অতএব ভুলবশত কিংবা অসতর্কতাবশত অথবা কারণবশত হত্যার জন্য কিসাসের বিধান কার্যকর করা যাবে না। তাই দু'একটি কিল-ঘুষি মারার কারণে কেউ মারা গেলে তাতে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে না। কেননা সচরাচর দু'একটি কিল-ঘুষি মারার উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা হয় না; বরং শিক্ষা দান করা এবং সংশোধন করাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। তবে লাগাতার কিল-ঘুষি মারার কারণে কেউ মারা গেলে অধিকাংশ ইমামের দৃষ্টিতে কিসাস বাধ্যতামূলক হবে। কেননা অনবরত কিল-ঘুষি মারতে থাকা অপরাধীর মধ্যে হত্যার উদ্দেশ্য থাকার প্রমাণ বহন করে। তবে হানাফীগণের দৃষ্টিতে- এরূপ অবস্থা যেহেতু বেশি জোর ইচ্ছাকৃত হত্যার সন্দেহ জন্ম দেয়, পূর্ণ সন্দেহমুক্ত ইচ্ছাকৃত হত্যা নয়, তাই এ ধরনের হত্যাকারীর ওপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না。

টিকাঃ
২৬. দারাকুতনী, আস-সুনান, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৪৫
২৭. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.২৩৪
২৮. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৬, পৃ.১৩৪; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.২৩৪

📘 ইসলামের শাস্তি আইন 📄 স্বেচ্ছায় ও বিনা চাপে হত্যা করা

📄 স্বেচ্ছায় ও বিনা চাপে হত্যা করা


কিসাস বাধ্যতামূলক হবার জন্য হত্যাকারীকে স্বেচ্ছায় ও বিনা চাপে হত্যা করতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি কারো প্রবল চাপের মুখে একান্ত বাধ্য হয়েই কাউকে হত্যা করে, তাহলে তার ওপর কিসাস কার্যকর হবে না; হত্যাকারীকে তা'যীরের আওতায় শাস্তি দেয়া হবে। তবে চাপ প্রয়োগকারীর মৃত্যুদণ্ড হবে। এটা ইমাম আবূ হানীফা (রহ) ও মুহাম্মাদ (রহ) প্রমুখের অভিমত। পক্ষান্তরে হানাফী স্কুলের ইমাম যুফার (রহ) ও অন্যান্য মাযহাবের ইমামগণের মতে- চাপ ও বল প্রয়োগের কারণে কিসাসের বিধান রহিত হবে না। অতএব চাপের মুখে একান্ত বাধ্য হয়েও কোন ব্যক্তি অপরকে হত্যা করলে হত্যাকারী ও বল প্রয়োগকারী দুজনেরই মৃত্যুদণ্ড হবে。
অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি অপরকে বলল, তুমি আমাকে অথবা অমুককে হত্যা কর এবং তার ওপর ঐ আদেশ পালন বাধ্যতামূলক নয় জেনেও সে আদেশদাতাকে বা অপর ব্যক্তিকে হত্যা করল। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ হানাফী ইমামের মতে হত্যাকারীর ওপর দিয়াত বাধ্যতামূলক হবে। পক্ষান্তরে হানাফী স্কুলের ইমাম যুফার (রহ) ও অন্যান্য মাযহাবের ইমামগণের মতে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হবে এবং আদেশদাতা তা'যীরের আওতায় দণ্ড প্রাপ্ত হবে。

টিকাঃ
৪৮. এ হুকম প্রযোজ্য হবে যদি বলপ্রয়োগকারী হত্যাকারীকে তার প্রাণ নাশ কিংবা তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেয়ার ধমক দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে। অতএব, বন্দী করে রাখবে কিংবা প্রহার করবে- এ জাতীয় ধমকের মুখে কাউকে হত্যা করলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হবে। এতে কারো দ্বিমত নেই।
৪৯. হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে ইমাম শাফি'ঈ (রহ) থেকে দুটি মত বর্ণিত রয়েছে। এক. হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হবে। দুই, হত্যাকারীর ওপর অর্ধেক দিয়াত ও কাফফারা বাধ্যতামূলক হবে। (শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.৪৪)
৫০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.৭২-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.২১৩; আল-মাওয়াক, আত-তাজ.., খ.৮, পৃ.৩০৭
৫১. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ১৮০; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ. ২৮৮; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.৯, পৃ.৪৫৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px