📄 ইচ্ছাকৃত হত্যা (قتل عمد)
কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে যখন এমন কাজ করে যার দ্বারা অন্য ব্যক্তির প্রাণ নাশ হয়, তখন তার সে কাজকে ‘ইচ্ছাকৃত হত্যা’ (قتل عمد) বলা হয় এবং এর জন্য কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে।
ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর মতে ‘ইচ্ছাকৃত হত্যা’ সাব্যস্ত করার জন্য লৌহাস্ত্র বা এ জাতীয় কিছুর ব্যবহার প্রয়োজন। পক্ষান্তরে হানাফীগণের মধ্যে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ) ও মুহাম্মাদ (রহ) এবং অন্যান্য মাযহাবের ইমামগণের মতে লৌহাস্ত্র বা এ জাতীয় কিছুর ব্যবহার শর্ত নয়। তাঁদের মতে অস্ত্রের সাহায্য ছাড়াও ‘ইচ্ছাকৃত হত্যা’ সংঘটিত হতে পারে। যেমন পানিতে ডুবিয়ে, শ্বাসরুদ্ধ করে, বিষ পান করিয়ে বা উঁচু স্থান থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হলে তাও ‘ইচ্ছাকৃত হত্যা’ রূপে গণ্য হবে।”
টিকাঃ
১০. এটা ইমাম আবূ বাকর আর-রাযীর অভিমত। অধিকাংশ হানাফী ইমাম এ প্রকারভেদটিই গ্রহণ করেছেন। নাফি' গ্রন্থপ্রণেতা হত্যাকে চারভাগে বিভক্ত করেছেন। তিনি 'প্রায়ভুলবশত হত্যা'র কথা উল্লেখ করেননি। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে হত্যা তিন প্রকার। এগুলো হল- ইচ্ছাকৃত হত্যা, প্রায় ইচ্ছামূলক হত্যা ও ভুলবশত হত্যা। শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামগণও এ মত পোষণ করেন। ইমাম মালিক (রহ)-এর মতে হত্যা দু প্রকার- ইচ্ছাকৃত হত্যা ও ভুলবশত হত্যা। (আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৬, পৃ.৫৯-৬৯; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৬, পৃ.৯৮; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২০৩-২১৫)
১১. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.২৩৩; আল-বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.১০ পৃ.২১০-২১৫
📄 প্রায় ইচ্ছামূলকহত্যা (قتل شبه عمد)
যে ধরনের বস্তু দ্বারা সাধারণত হত্যা সংঘটিত হয় না- সেই ধরনের কোন বস্তু দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হলে সে হত্যাকে ‘প্রায় ইচ্ছামূলক হত্যা’ বলা হয় এবং এর জন্য দিয়াতের বিধান প্রযোজ্য হবে।
ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর মতে, দেহ কাটে না বা দেহে বিদ্ধ হয় না- এ ধরনের কোন বস্তু দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা সংঘটিত হলে তাকে 'প্রায় ইচ্ছামূলক হত্যা' বলে। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ) ও মুহাম্মদ (রহ)- এর মতে, যে সব বস্তু দ্বারা সাধারণত হত্যা করা যায় না- এ ধরনের বস্তু (যেমন- ক্ষুদ্র পাথর, ক্ষুদ্র লাঠি, চাবুক, কলম ইত্যাদি) দ্বারা হত্যা সংঘটিত হলে তাকে 'প্রায় ইচ্ছামূলক হত্যা' বলে। এ প্রকারের হত্যার ক্ষেত্রে যেহেতু হত্যাকারীর হত্যা করার ইচ্ছা ছিল কি না- এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে, তাই এ ধরনের হত্যার বেলায় কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে না; কিন্তু দিয়াতের কঠোর বিধান (دية مغلظة) প্রযোজ্য হবে। এ ক্ষেত্রে দিয়াত বাধ্যতামূলক হবার ব্যাপারে সাহাবা কিরামের ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে কাফফারা বাধ্যতামূলক হবে কি না- তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু অগ্রগণ্য মত হল- কাফফারা ওয়াজিব হবে。
টিকাঃ
১২. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.২৩৩; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৬, পৃ.১০০
📄 ভুলবশত হত্যা (قتل خطا)
নিষিদ্ধ নয়- এমন কোন কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সতকর্তা অবলম্বন না করার কারণে ভুলবশত হত্যা সংঘটিত হলে তাকে 'ভুলবশত হত্যা' বলা হয় এবং এর জন্য দিয়াত ও কাফফারা ওয়াজিব হবে। এ ভুল কর্তার ধারণার মধ্যেও হতে পারে, কাজের মধ্যেও হতে পারে এবং ধারণা ও কাজ উভয়ের মধ্যেও হতে পারে।
১. কর্তার ধারণায় ভুল যেমন- শিকারী কোন মানুষকে শিকারের পশু মনে করে তার প্রতি তীর বা গুলি নিক্ষেপ করল, পরে দেখা গেল যে, সে মানুষ, শিকারের প্রাণি নয়। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তিকে শত্রু সৈন্য মনে করে তীর নিক্ষেপ করল, পরে দেখা গেল যে, সে শত্রু সৈন্য নয়। এ ক্ষেত্রে অপরাধীর কাজের মধ্যে ভুল হয়নি; কারণ সে যা মারতে চেয়েছে তা-ই মেরেছে; বরং ভুল হয়েছে তার ধারণা বা অনুমানের মধ্যে।
২. কর্তার কাজে ভুল যেমন এক শিকারী একটি হরিণের প্রতি গুলি ছুঁড়ল; কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তা ঝোপের মধ্যে কোন কাজে রত কোন মানুষের দেহে বিদ্ধ হল এবং এর ফলে সে মারা গেল। অনুরূপভাবে শত্রুসৈন্যকে টার্গেট করে তীর নিক্ষেপ করল বা গুলি ছুঁড়ল; কিন্তু তীর বা গুলিটি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে অপর ব্যক্তির ওপর আঘাত করল এবং এর ফলে সে মারা গেল।
৩. ধারণা ও কাজ- উভয়ে ভুল যেমন- শিকারী কোন মানুষকে শিকারের পশু মনে করে তার প্রতি তীর বা গুলি নিক্ষেপ করল; কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অপর ব্যক্তির দেহে বিদ্ধ হল এবং এর ফলে সে মারা গেল। এ ক্ষেত্রে সে মানুষকে শিকারের পশু মনে করে নিজের অনুমানে ভুল করেছে এবং যার প্রতি তীর বা গুলি নিক্ষেপ করেছে তা তার পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির শরীরে গিয়ে লাগায় সে কাজেও ভুল করেছে।
টিকাঃ
১৩. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.২৩৪; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৬, পৃ.১০০-১
📄 প্রায় ভুলবশত হত্যা (قتل شبه خطا)
কোন ব্যক্তির কোন কাজের দ্বারা হত্যা সংঘটিত হলে তাকে 'প্রায় ভুলবশত হত্যা' বলা হয়। এ ক্ষেত্রে অপরাধীর কোন ধরনের সংকল্প ছাড়াই হত্যা সংঘটিত হয় বলে একে 'প্রায় ভুলবশত হত্যা' নামে অভিহিত করা হয়। যেমন- কোন ব্যক্তি ঘুমন্ত অবস্থায় পার্শ্ব পরিবর্তন করার সময় অপর কোন ব্যক্তির ওপর উল্টে পড়ল এবং এর ফলে অপর ব্যক্তিটি মারা গেল। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি ঘটনাক্রমে কোন উচ্চ স্থান থেকে গড়িয়ে অপর কোন ব্যক্তির ওপর পড়ল এবং এর ফলে অপর ব্যক্তিটি মারা গেল। এ প্রকারের হত্যা একদিকে যেহেতু অপরাধীর অসতর্কতার কারণেই সংঘটিত হয়েছে, তাই এটা ভুলবশত হত্যার মধ্যে গণ্য হবে এবং এ জন্য দিয়াত ওয়াজিব হবে। অপরদিকে যেহেতু অপরাধীর কর্ম ও হত্যার মধ্যে সরাসরি 'কারণ'-এর সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, তাই এ জন্য কাফফারাও ওয়াজিব হবে。
টিকাঃ
১৪. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৬, পৃ.৬৬, ১০৪