📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 কিসাসের সংজ্ঞা

📄 কিসাসের সংজ্ঞা


কিসাস শব্দটি আরবী। এর আভিধানিক অর্থ হল পদাঙ্ক অনুকরণ করা, সমান বদলা গ্রহণ করা ও সাদৃশ্য বজায় রাখা। তবে শব্দটি হত্যার বদলায় হত্যাকারীকে হত্যা করার, যখমের বদলায় যখমকারীকে যখম করার এবং অঙ্গকর্তনের বদলায় অঙ্গকর্তনকারীর অঙ্গকর্তন করার অর্থে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ইসলামী শরী'আতের পরিভাষায় অপরাধীকে তার অপরাধ সদৃশ শাস্তি প্রদানকে কিসাস বলা হয়। যেমন হত্যার বদলায় হত্যা করা এবং যখমের বদলায় যখম করা।

টিকাঃ
১. ইবনু মানর, লিসানুল আরব, খ.৮, পৃ. ৩৪১; আর-রুকবান, আল-কিসাস ফিন নাফস, পৃ.১৩; আল-জাযীরী, কিতাবুল ফিকহ 'আলাল মাযাহিবিল 'আরবা'আহ, খ.৫, পৃ. ২৪৪

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 কিসাসের হুকুম

📄 কিসাসের হুকুম


কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে, তা যদি যথাযথরূপে প্রমাণিত হয়, তা হলে সরকারের দায়িত্ব হল হত্যাকারীকেও হত্যার বদলায় হত্যা করা, যদি নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা তা-ই দাবী করে। তবে অভিভাবকদের এ ইখতিয়ারও রয়েছে যে, তারা ইচ্ছে করলে হত্যাকারীকে ক্ষমাও করে দিতে পারে, ইচ্ছে করলে দিয়াতের বিনিময়ে সমঝোতাও করতে পারে। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তিকে যখম করলে কিংবা দেহের কোন অঙ্গ বা তার অংশবিশেষ বিচ্ছিন্ন করে ফেললে উপর্যুক্ত বিধান প্রযোজ্য হবে। এটাই সর্বসম্মত অভিমত।
يا أيها الذين آمنوا كتب عليكم القصاص في القتلى الحر بالحر والعبد بالعبد و الأنثى بالأنثى. فمن عفي له من أخيه شيئ فاتباع بالمعروف وأداء إليه بإحسن ذلك تخفيف من ربكم و رحمة - "হে মু'মিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস এবং নারীর বদলে নারী। তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কিছু ক্ষমা করে দেয়া হলে ন্যায়নীতির অনুসরণ করা ও সততার সাথে তার দেয় আদায় করা বিধেয়। এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সহজীকরণ ও রহমত বিশেষ।" তিনি আরো বলেন, و كتبنا عليهم فيها أن النفس بالنفس و العين بالعين والأنف بالأنف والأذن بالأذن و السن بالسن و الجروح .قصاص فمن تصدق به فهو كفارة له - "তাদের জন্য আমরা তাতে বিধান নির্ধারণ করেছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমসমূহের বদলে অনুরূপ যখম। আর যে ক্ষমা করে দেয়, তা তার পাপের জন্য কাফফারা হবে।"
কুর'আনের অন্য জায়গায় রয়েছে, و من قتل مظلوما فقد جعلنا لوليه سلطانا فلا يسرف في القتل إنه كان منصورا. - “কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি তার প্রতিকারের অধিকার দিয়েছি। কিন্তু হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে। সে তো সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছে।"
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, من قتل له قتيل فهو بخير النظرين : إما أن يودى " و إما أن يقاد - "যার কোন ব্যক্তি নিহত হবে, তার দুটি ইখতিয়ার রয়েছে। সে ইচ্ছে করলে রক্তমূল্যও নিতে পারবে, ইচ্ছে করলে কিসাসও গ্রহণ করতে পারবে।"
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত রয়েছে, হযরত রুবাই'ই বিন্ত নাদর ইব্‌ন আনাস (রা) জনৈকা দাসীর সামনের একটি দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। সাহাবীগণ এর জন্য রক্তমূল্য দিতে চাইলেন; কিন্তু দাসীর অভিভাবকরা তা অস্বীকার করে কিসাস দাবী করল। এরপর সকলেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসলেন। তিনিও কিসাস গ্রহণের নিদের্শ দিলেন। ইত্যবসরে রুবাই'ইর ভাই আনাস ইবন নাদর (রা) এসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বললেন, আপনি কি রুবাই'ইর দাঁত ভেঙ্গে ফেলবেন? সে যাতের শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন, আপনি তার দাঁত ভেঙ্গে ফেলবেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হে আনাস! আল্লাহর কিতাবে কিসাসের বিধান রয়েছে। রাবী বলেন, এতদশ্রবণে দাসীর অভিভাবকরা ক্ষমা করে দিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা'আলার এমন কিছু বান্দাহ রয়েছে, যারা আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ তা'আলা তাদের শপথকে পূর্ণ করে দেন।"

টিকাঃ
২. আল-কুর'আন, ২ (সূরা আল-বাকারাহ): ১৭৮
৩. আল-কুর'আন, ৫ (আল-মা'ইদা): ৪৫
৪. আল-কুর'আন, ১৭ (বনী ইসরাইল): ৩৩
৫. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৬৪৮৬; আবূ দাউদ (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং : ৪৫০৫
৬. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুস সুল্লহ), হা.নং: ২৫৫৫; মুসলিম (কিতাবুল কাসামাহ..), হা.নং: ১৬৭৫

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 হত্যার অপরাধ

📄 হত্যার অপরাধ


হত্যা ( القتل ) বলতে কোন কিছুর আঘাতে, অস্ত্রের সাহায্যে, পাথর নিক্ষেপে, বিষ প্রয়োগে বা অন্য কোন উপায়ে মানুষের প্রাণনাশ করাকে বোঝানো হয়। মানব হত্যা একটি মানবতা বিধ্বংসী জঘন্যতম অপরাধ। যখন কেউ তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে এ অপরাধ করে, তখন সে গোটা মানবতার সাথে শত্রুতা করে। একজন মানুষের জীবন বাঁচানো যেমন গোটা মানব জাতির জীবন বাঁচানোর সমতুল্য, তেমনি একজন মানুষের জীবন সংহার গোটা মানব জাতির জীবন সংহারের সমতুল্য। ইসলামের দৃষ্টিতে শিরকের অমার্জনীয় অপরাধের পর মানব হত্যাই সবচাইতে বড় ও মারাত্মক অপরাধ। এ কারণেই ইসলামী শরী'আতে এ অপরাধের বীভৎসতা প্রকট করে তোলা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মানব মনে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ জাগাতে চেষ্টা করা হয়েছে আর সেই সাথে ইসলামী আইনে এর জন্য ন্যায়-বিচারভিত্তিক কঠিন শাস্তির বিধান দেয়া হয়েছে।
و من يقتل مؤمنا فجزاؤه جهنم خالدا فيها و غضب الله عليه و لعنه و أعد له عذابا عظيما - “যে কোন লোক কোন মু'মিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার প্রতিফল হচ্ছে জাহান্নাম। সে চিরকালই সেখানে থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন এবং তার প্রতি অভিশাপ করেন। উপরন্তু তিনি তার জন্য কঠিন আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।" রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لزوال الدنيا أهون على الله من قتل مؤمن بغير حق - "কোন মু'মিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চাইতে দুনিয়াটা ধ্বংস হয়ে যাওয়াই আল্লাহর নিকট অধিকতর সহজ।"

টিকাঃ
৭. আল-কুর'আন, ৫ (সূরা আল-মা'ইদা) : ৩২
৮. আল-কুর'আন, ৪ (সূরা আন-নিসা) : ৯৩
৯. আত্ তিরমিযী, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ১৩৯৫; ইবনু মাজাহ, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ২৬১৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি

📄 ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি


'ইচ্ছাকৃত হত্যা'র শাস্তিস্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড হবে। - يا أيها الذين آمنوا كتب عليكم القصاص في القتلى "হে, মু'মিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তেমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে।" তিনি আরো বলেন, وكتبنا عليهم فيها أن النفس بالنفس - "তাদের জন্য আমরা তাতে বিধান নির্ধারণ করেছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ...।" রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, من قتل عمدا فهو قود - "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।"

টিকাঃ
১৬. আল-কুর'আন, ২ (সূরা আল-বাকারাহ): ১৭৮
১৭. আল-কুর'আন, ৫ (সূরা আল-মা'ইদা): ৩৪
১৮. আবূ দাউদ, (কিতাবুদ দিয়াত), হা.নং: ৪৫৩৯; নাসাঈ, আস-সুনান আল-কুবরা, (কিতাবুল কাসামাহ), হা.নং: ৬৯৯৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00