📄 লড়াই
যদি বিদ্রোহীরা সরকারের শান্তি-আহবানে সাড়া না দেয়, উপরন্তু তারা দলবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে, তাহলে তাদের সাথে লড়াই করা জায়িয হবে। তবে সরকারই কি তাদের সাথে লড়াইয়ের সূত্রপাত করবে না কি সরকার তাদের প্রকাশ্যে সশস্ত্র মহড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে- তা নিয়ে দুটি মত রয়েছে।
১. সরকারের জন্য লড়াইয়ের সূত্রপাত করা জায়িয হবে। কেননা সরকার যদি তাদের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে, তা হলে তারা শক্তি সঞ্চয় ও বৃদ্ধি করার সুযোগ পেয়ে যাবে। ফলে তাদের দমন করা দুরূহ হয়ে পড়বে। তদুপরি সরকারের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাবার কারণে তারা তো অপরাধীই বনে গেছে। পবিত্র কুর'আনে তাদের লড়াইয়ের সূত্রপাত করা পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فإن بغت أحدهما على الأخرى فقاتلوا التي تبغي حتى تفئ إلى أمر الله. - "যদি একদল অন্য দলের প্রতি বিদ্রোহ করে, তাহলে তোমরা বিদ্রোহকারী দলের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যে যাবত সে আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।" হযরত 'আলী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও বলেছেন, يخرج قوم في آخر الزمان أحداث الأسنان سفهاء الأحلام يقولون من خير قول البرية يقرأون القرآن لا يجاوزون مراقيهم من الدين كما يمرق السهم من الرمية . - فأينما لقيتموهم فاقتلوهم فإن في قتلهم أجرا لمن قتلهم يوم القيامة. - যুগে এমন কিছু অল্পবয়স্ক নির্বোধ লোক বের হবে, যারা মুখে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির বাণী উচ্চারণ করবে এবং কুর'আন শরীফ পড়বে; কিন্তু তা তাদের গলদেশ পার হবে না। তারা দীন থেকে দূরে সরে যাবে যেমন তীর ধনুক থেকে ছুটে যায়। যখন তোমরা তাদের সাক্ষাৎ পাবে তাদেরকে হত্যা করবে। কেননা কিয়ামাতের দিন তাদের হত্যাকারীর জন্য পুরস্কার রয়েছে। "
তাদের লড়াইয়ের প্রস্তুতির পরও যদি তাদেরকে বন্দী করে তাদের অরাজকতা বন্ধ করা সম্ভবপর হয়, তাহলে লড়াই না করে তাদেরকে বন্দীই করতে হবে। কেননা লড়াইয়ের চাইতে সহজতর উপায়ে যেহেতু তাদেরকে দমন করা সম্ভব হচ্ছে, তাই এর চাইতে কঠোরতর পথ অবলম্বন করা সমীচীন হবে না। এটা হানাফী ও অধিকাংশ হাম্বলী ইমামের অভিমত।
২. বিদ্রোহীরা লড়াইয়ের সূচনা করার আগে সরকার তাদের সাথে লড়াই শুরু করবে না। কেননা তাদের সাথে লড়াই করার উদ্দেশ্য হল তাদের অরাজকতা বন্ধ করা। অতএব তাদের সাথে লড়াই করা জায়িয হবে না, যে যাবত তারা কোন অরাজকতা সৃষ্টি করবে না। কারণ, আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া কোন মুসলিমের সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া জায়িয নয়। এটা শাফি'ঈগণের এবং হানাফী ইমামগণের মধ্যে কুদূরীর অভিমত।
বিদ্রোহীদেরকে দমনের জন্য সরকার যদি জনগণের সহযোগিতা কামনা করে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রত্যেক সামর্থ্যবান লোকের ওপর সরকারকে সাহায্য-সহযোগিতা করা ওয়াজিব হয়ে দাঁড়াবে, যদি সরকার অত্যাচারী ও আল্লাহদ্রোহী না হয়। কেননা অন্যায় নয়- এমন সকল কাজে সরকারের আনুগত্য করা সকলের জন্য ফরয। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, من بايع إماما فأعطاه صفقة يده و ثمرة فؤاده فليطعه ما استطاع فإن جاء آخر ينازعه .فاضربوا عنق الآخر - "যে ব্যক্তি কোন ইমামের (সরকার প্রধান) হাতে বায়'আত করল এবং তাকে সমর্থন জানাল, তার উচিত যথাসাধ্য তার আনুগত্য করা। যদি অপর কোন ব্যক্তি তার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে তোমরা তার গর্দান উড়িয়ে দাও।" ইবনু কুদামাহ বলেন, মুসলিম উম্মাহ যে ব্যক্তির নেতৃত্ব ও বায়'আতের ওপর ঐকমত্য পোষণ করবে, তার নেতৃত্ব কার্যকর হবে এবং তাকে সহযোগিতা করা সকলের জন্য ওয়াজিব। উপরন্ত তার আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া হারাম। কেননা তার আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রকারান্তরে গোটা উম্মাতের প্রতি বিরুদ্ধাচরণ করার নামান্তর। এ রূপ ব্যক্তিকে হত্যা করা জায়িয হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) من خرج على أمتي و هم جميع فاضربوا عنقه بالسيف كائنا من .كان - "যে ব্যক্তি আমার সুসংহত উম্মাতের আনুগত্য ত্যাগ করে বেরিয়ে যাবে, তোমরা তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দাও, সে যে কেউ হোক না কেন।"
প্রায় সকল ইমামের মতে, বিদ্রোহী মহিলা হলে তাকে আটক করে রাখা হবে, যদি সে লড়াই করে। তাকে লড়াইরত অবস্থা ছাড়া অন্য সময় হত্যা করা যাবে না। তাকে বন্দী করে রাখা হবে তার অপরাধের কারণে এবং বিপর্যয় ও ফিতনার সৃষ্টির পাঁয়তারা করার কারণে।” মালিকীগণের মতে, তাদের লড়াইয়ের প্রকৃতি যদি কেবল উৎসাহ যোগানো কিংবা পাথর ও ঢিল নিক্ষেপ হয়ে থাকে, তা হলে যুদ্ধাবস্থায়ও তাদেরকে হত্যা করা যাবে না。
টিকাঃ
১২. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.২৯৪; ইবুন নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.১৫২; আল- বহুতী, কাশশাফ, খ.১৬১; আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ. ২৭৩
১৩. আল-কুর'আন, ৪৯ (আল-হুজরাত): ৯
১৪. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবু ইসতিতাবাতুল মুরতাদ্দীন), হা.নং: ৬৫৩১; মুসলিম, (বাব: ১৫. আত-তাহরীদ 'আলা কাতলিল খাওয়ারিজ), হা.নং: ১০৬৬
১৬. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.২৯৪; আল-হাদ্দাদী, জাওহারাহ, খ.২, পৃ.২৭৯-২৮০; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ.৬৬; আল-জুমাল, ফুতুহাত.., খ.৫, পৃ.১১৪
১৭. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল ইমারত), হা.নং: ১৮৪৪; আবূ দাউদ, (কিতাবুল ফিতান..), হা.নং : ৪২৪৮
১৮. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৩-৫
১৮. আত্ তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, হা.নং : ৩৫৪; 'আবদুর রযযাক, আল-মুসান্নাফ, হা.নং : ২০৭১৪; আবূ 'আওয়ানাহ, আল-মুসনাদ, হা.নং: ৭১৪৫
১৯. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৭, পৃ. ১৩০; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৬, পৃ. ১০৪
২০. আল-খারাশী, শারহু মুখতাহারি খলীল, খ.৮, পৃ.৬১-২; দাসূকী, হাশিয়াতু 'আলাশ শারহিল কাবীর, খ.৪, পৃ.৩০০