📄 সরকারদ্রোহিতার সংজ্ঞা
সরকারদ্রোহিতাকে আরবীতে بغي বলা হয়। এর আভিধানিক অর্থ অন্যায় করা, সীমা লঙ্ঘন করা। ইসলামী শরী'আতের পরিভাষায় সাধারণত بغي বলতে সরকারের আনুগত্য থেকে অন্যায়ভাবে বেরিয়ে পড়াকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে কতিপয় মুসলিম দলবদ্ধভাবে কোন একটি খোঁড়া অজুহাত তৈরি করে সরকারের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং সরকার উৎখাতের জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাকে بغي বলা হয়। আর যে মুসলিম এভাবে সরকারের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাকে باغي (সরকারদ্রোহী) বলা হয়।
উপর্যুক্ত সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায়, সরকারদ্রোহিতার জন্য নিম্নের ছয়টি শর্ত পাওয়া গেলেই সরকারের বিরোধিতাকে সরকারদ্রোহিতা রূপে গণ্য করা হবে।
১. বিদ্রোহকারীদের মুসলিম হওয়া
২. সরকারের আনুগত্য অস্বীকার করা
৩. অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হওয়া
৪. সরকারের বিরোধিতার পক্ষে কোন যুক্তি থাকা, যদিও তা সঠিক নয়
৫. সরকারের বিরুদ্ধে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলা
৬. সরকার পতনের জন্য প্রকাশ্যে হত্যা ও বিভিন্ন অপরাধ সৃষ্টি করা
অতএব, অমুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের আনুগত্য অস্বীকার করে বিদ্রোহ করলে তারা সরকারদ্রোহী হবে না; তারা হবে হারাবী (রাষ্ট্রদ্রোহী)। তাদের জন্য হারাবীদের শাস্তি প্রযোজ্য হবে। অনুরূপভাবে মুসলিমদের কোন দল যদি কোন যৌক্তিক কারণ প্রদর্শন করা ছাড়া এবং সরকারের ক্ষমতা দখল করার অভিপ্রায় ব্যতীত সরকারের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে পড়ে তারাও সরকারদ্রোহী হবে না। তারা হবে সন্ত্রাসী। তাদের জন্য মুহারিব (সন্ত্রাসী)দের শাস্তি প্রযোজ্য হবে। অনুরূপভাবে কেউ কোন অজুহাতে নিয়মানুগ সরকারের আনুগত্য অস্বীকার করলে কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলে (যেমন - সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো) সে সরকারদ্রোহী রূপে গণ্য হবে না; যে যাবত না সে সরকার উৎখাতের জন্য দলীয় প্রচেষ্টায় কোন রূপ অপরাধ সংঘটিত করবে বা লড়াই করবে। কেননা ব্যক্তিগত কিংবা দলীয়ভাবে নিছক সরকারের বিরোধিতার কারণে কেউ বা কোন দল শাস্তিযোগ্য হতে পারে না।
'আল্লামা সান'আনী বলেন, "কেউ যদি জমা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়; কিন্তু সমাজে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে এবং লড়াইয়ে অবতীর্ণ না হয়, তা হলে তার পথকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। কেননা নিছক সরকারের বিরোধিতার কারণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা সমীচীন নয়।" শাফি'ঈগণের মতে, সরকারের বিরোধিতা করা অন্যায় কিছু নয়; কেননা বিরোধিতাকারীরা তাদের ধারণা অনুযায়ী কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নিয়েই বিরুদ্ধাচরণ করে থাকে, যদিও তারা তাদের ব্যাখ্যায় হয় তো সঠিক নয়। তাই তাদেরকে এ ক্ষেত্রে সমস্যাগ্রস্ত মনে করতে হবে।"
উপরন্তু, ইসলামের দৃষ্টিতে সরকারের অন্যায় কাজের সমালোচনা করা শুধু জায়িযই নয়; বরং সর্বোত্তম জিহাদ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "أفضل الجهاد كلمة حق / عدل عند سلطان جائر ."
অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য/ন্যায় কথা বলাই সর্বোত্তম জিহাদ।” উপরন্তু, যে সমাজে ইসলামী শরী'আত প্রতিষ্ঠিত নেই এবং অত্যাচারী শাসকের স্বৈরশাসনে যেখানে জনজীবন বিপন্ন, সেখানে সুশৃঙ্খল উপায়ে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করা এবং আল্লাহদ্রোহী যালিমদের আনুগত্য অস্বীকার করে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলা সরকারদ্রোহিতা তো নয়; বরং ইসলামের দৃষ্টিতে জিহাদ, যা মুসলিমের জন্য একটি বড় ফরয। সকল মুসলিমের কর্তব্য হল, তাদেরকে জান-মাল দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করা। যদি তারা তাদের সাহায্য করা ছেড়ে দিয়ে যালিম ও আল্লাহদ্রোহী সরকারের আনুগত্য করে- তাহলে এটা হবে হারাম। কেননা আল্লাহর নাফরমানী করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা হারাম। তবে জিহাদের নামে যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করা, নিরীহ লোকদের হত্যা করা, পথে-ঘাটে লোকদের ভয়প্রদর্শন করা এবং জাতীয় ও মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ ধ্বংস ও লুটপাট করা কেবল হারামই নয়; বরং ইসলামকে কলঙ্কিত করার শামিল।
টিকাঃ
১. যেমন বলা হয়-بغى عليه - "সে অমুকের প্রতি অন্যায় করল কিংবা সীমালঙ্ঘন করল।" (আর-রাযী, মুখতারুস সিহাহ, খ.১, পৃ.২৪; ইবনু মানযুর বলেন, এর মূল অর্থ হল: হিংসা। তবে এটি অন্যায়-অবিচার অর্থেই বহুল ব্যবহৃত। কেননা হিংসুটে ব্যক্তি প্রায়শ হিংসাকৃত ব্যক্তির সাথে অন্যায় আচরণ করে থাকে। তাছাড়া শব্দটি খোঁজ করা, অনুসন্ধান করা অর্থেও ব্যবহার করা হয়। (ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব, খ.১৪, পৃ.৭৯)
২. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ. ১৫১; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.২৯৪; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১১১-২
৩. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ. ১৫১; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.২৯৪; আল-জুমাল, ফুতুহাত.., খ.৫, পৃ.১১৭-৮; আল-বুজায়রমী, তুহফাতুল হাবীব, খ.৪, পৃ. ২৩৩
৪. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.৮, পৃ.১৩১
৫. হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ.৬৬; আর-রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ,খ. ৭, পৃ.৪০৬
৬. আবু দাউদ, (বাব: আল-আমর ওয়ান নাহ্ই), হা.নং: ৪৩৪৪; তিরমিযী, (কিতাবুল ফিতান), হা.নং: ২১৭৪; তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, হা.নং: ৮০৮১
📄 লড়াই করার শর্তাবলী
যদি বিদ্রোহীরা সমঝোতায় না আসে তাহলে তাদের সাথে লড়াই করা জায়িয হবে, যদি তারা
১. নিরীহ ও নিরাপরাধ লোকদের অধিকারসমূহ নষ্ট করে
২. তাদের কারণে অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধে ব্যাঘাত ঘটে।
৩. রাষ্ট্রীয় সম্পদ অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেয়
৪. আবশ্যকীয় পাওনা (যেমন- যাকাত, উশর ও রাজস্ব প্রভৃতি) পরিশোধ করা থেকে বিরত থাকে,
৫. প্রকাশ্যে ইমামের আনুগত্য ত্যাগ করে বিরোধিতার ঘোষণা দেয়।
৫. লড়াই ছাড়া অন্য কোন সহজ উপায়ে তাদেরকে দমন করা সম্ভব না হয় এবং
৬. তাওবা করে সরকারের আনুগত্যে ফিরে না আসে।
তবে বিশিষ্ট ইসলামী আইনতত্ত্ববিদ রামালীর মতে, বিদ্রোহীরা সমঝোতায় না আসলে যে কোন অবস্থায় তাদের সাথে লড়াই করা ওয়াজিব হবে। কেননা সশস্ত্র অবস্থায় বিদ্রোহকে জিইয়ে রাখা হলে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে এবং নিত্যনতুন এমন বিপর্যয় সৃষ্টি হতে থাকবে, যা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে。
টিকাঃ
২১. এটা 'আল্লামা মাওয়ার্দীর অভিমত। (আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ.৭৪)
২২. আল-বুজায়রমী, তুহফাতুল হাবীব, খ.৪, পৃ.২২৮; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ.৭৪; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.৮, পৃ.১৪০
২৩. আর-রামালী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ. ৭১