📄 দীনে ইসলামকে গালি দেয়া
কেউ দীন ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতকে গালি দিলে সে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে। তবে কেউ ব্যক্তি বিশেষের দীনকে গালি দিলে হানাফীগণের মতে সেও কাফির রূপে গণ্য হবার উপযোগী। তবে তার গালির এ রূপ ব্যাখা দেয়াও সম্ভব যে, গালিদাতার উদ্দেশ্য প্রকৃত দীন ও মিল্লাত নয়; বরং ব্যক্তি বিশেষের খারাপ চরিত্র ও মন্দ আচার-আচরণ। যদি গালিদাতার উদ্দেশ্য তা-ই হয়ে থাকে, তা হলে তাকে তার গালির জন্য কাফির বলা যাবে না। আমাদের সমাজে অনেক মূর্খই এ ভাবে গালিগালাজ করে থাকে। ইসলামী রাষ্ট্রের কোন অমুসলিম নাগরিক যদি দীন ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্য গালি দেয় অধিকাংশ ইমামের মতে যেহেতু সে নাগরিক চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাই তাকে হত্যা করা হবে। তবে হানাফীগণের মতে, তাকে হত্যা করা হবে না; তবে আদালত সুবিবেচনা অনুযায়ী তাকে যে কোন উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবে। বর্ণিত আছে যে, 'আছমা' বিনত মারওয়ান নাম্নী জনৈকা ইয়াহুদী মহিলা ইসলামের দুর্নাম করত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে কষ্ট দিত এবং লোকদেরকেও তা করার জন্য অণুপ্রেরণা যোগাত। এ কারণে 'আমর ইবন 'আদী আল-খিতমী (রা) তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এ হাদীস প্রসঙ্গে হানাফীগণ বলেন, তাকে হত্যা করার কারণ কেবল ইসলামের দুর্নাম করা নয়; বরং কয়েকটি গুরুতর অপরাধ একত্রে পাওয়া যাবার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
টিকাঃ
৭৯. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২৪, পৃ.১৩৯
৮০. আল-কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, খ.২, পৃ.৪৮
📄 সাহাবীগণকে গালি দেয়া
কোন ব্যক্তি সকল সাহাবীকে গালমন্দ করলে বা কাফির বললে সে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে। কেননা সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাহাবা কিরামের সততা ও নিষ্ঠা কুর'আন ও হাদীসের বহু অকাট্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত। তাঁরা হলেন উম্মাতের শ্রেষ্ঠতম অংশ। অতএব তাঁদের সকলকে কাফির বলা বা গালমন্দ করার মানে হল ইসলামের একটি অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার করার নামান্তর। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, الله الله في أصحابي ، لا تتخذوهم غرضا من بعدي - তোমরা আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে সতর্ক হও, আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা আমার পরে তাঁদেরকে সমালোচনার পাত্রে পরিণত কর না। "
তবে সকলকে নয়; বিশেষ একজন কিংবা কয়েকজন সাহাবীকে কেউ গালমন্দ করলে বা কাফির বললে হানাফী ও মালিকীগণের মতে, তাকে কাফির ও মুরতাদ বলা যাবে না; তবে সে শাস্তিযোগ্য হবে। তাকে এ জন্য সশ্রম বা বিনা শ্রমে কঠোর কারাদণ্ড দেয়া যাবে। তবে শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে, সে কাফির হয়ে যাবে এবং তার জন্য মুরতাদের শাস্তি প্রযোজ্য হবে। আবার অনেকেই ব্যক্তিগত কারণে গালমন্দ করা এবং সাহাবী হবার কারণে গালমন্দ করার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। যদি গালমন্দের কারণ একান্ত ব্যক্তিগত হয়, তা হলে গালমন্দকারী কাফির হবে না। যদি সাহাবী হবার কারণেই গালি দেয়া হয়, তা হলেই কাফির হবে。
হযরত আবূ বাকর (রা)-এর সুহবত যেহেতু কুর'আন দ্বারা প্রমাণিত, তাই কেউ তা অস্বীকার করলে কিংবা তাকে কেউ গালি দিলে বা কাফির বললে সে কাফির হয়ে যাবে। হানাফীগণের মতে, হযরত আবূ বাকর ও উমার (রা) দুজনকেই বা তাঁদের কোন একজনকেও কেউ গালি দিলে কাফির হয়ে যাবে। আবার কারো মতে, খুলাফা রাশিদূনের কাউকেও কাফির বললে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে ইমাম মালিক ও অন্য কতিপয় ইমামের মতানুযায়ী তাদেরকে গালি দিলে কাফির হবে না; তবে তা'যীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হবে। ইমাম আহমাদ (রহ) থেকে এ রূপ ব্যক্তির কাফির হবার ব্যাপার সুস্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে তিনি এ রূপ ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত করার এবং আজীবন কারাদণ্ড দেয়ার কথা বলেছেন, যদি সে তাওবা করে ফিরে না আসে。
আরবদেরকে কিংবা বনু হাশিমকে কেউ গালি দিলে কিংবা লা'নত করলে তাকেও কারাদণ্ড দেয়া হবে এবং প্রহার করা হবে。
টিকাঃ
৮১. আত্ তিরমিযী, (আবওয়াবুল মানাকিব), হা.নং ৩৮৬২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা.নং: ২০৫৬৭, ২০৫৬৮, ২০৫৯৭
৮২. এটা ইমাম আহমাদ (রহ)-এরও একটি অভিমত।
৮৩. আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.২১১; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১১৯; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১ ৭০-৭১; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.৩২৩
৮৪. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.১৩৬; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ২৩৬-৭; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.২০৬; আর-রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৭, পৃ.৪১৬; আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.২৮৭
৮৫. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১৬, পৃ.৩০২
📄 নবুওয়াতের দাবী করা
হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তাঁর পরে আর কোন নবী বা রাসূল আসবেন না। তাই কেউ যদি তা বিশ্বাস না করে নিজেকে নবী বলে দাবী করে কিংবা তাঁর পরে অন্য কাউকে কেউ নবী বলে বিশ্বাস করে, সে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে。
টিকাঃ
৮৬. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৩৩; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১১৮
📄 কোন মুসলিমকে কাফির বলে সম্বোধন করা
কোন মুসলিমকে কেউ কাফির বলে সম্বোধন করলে হানাফীগণের মতে সে ফাসিক হবে, যদি সে বাস্তবিকই কাফির না হয়। এ জন্য বিচারক তাকে উপযুক্ত তা'যীরী শাস্তি দেবেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুলল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : إنما امرئ قال لأخيه - يا كافر فقد باء بها أحدهما إن كان كما قال " و إلا رجعت عليه. তার ভাইকে 'হে কাফির' বলে ডাকল, তাহলে তাদের যে কোন একজন তার উপযোগিতা অর্জন করবে। যাকে কাফির ডাকা হল যে যদি বাস্তবিকই কাফির হয়, তাহলে তো অসুবিধা নেই। যদি সে বাস্তবিকই কাফির না হয়, তা হলে কাফির সম্বোধনকারীর ওপর এর পরিণাম বর্তাবে।" শাফি'ঈগণের মতে, যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে কাফির বলে অভিহিত করবে- চাই তা কোন পাপের কারণেও যদি হয়-সে নিজেই কাফির হয়ে যাবে, যদি সে নি'মতের কুফরী বা ইত্যাকার কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই তা বলে থাকে। তবে এ ধরনের কোন ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে এ জন্য তাকে কাফির বলা যাবে না। তাঁদের দলীল হল, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'من دعا رجلا بالكفر 'من دعا رجلا بالكفر (মুসলিম) অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বলে ডাকল, সে যদি বাস্তবিকই তা না হয়, তা হলে তার এ কথা উল্টো তার দিকে ফিরে আসবে।"
টিকাঃ
৮৭. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৬৯-৭০
৮৮. সহীহ আল বুখারী, হা. নং: ৫৭৫৩; মুসলিম, (কিতাবুল ঈমান), হা.নং: ৬০
৮৯. আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪,পৃ.১১৮
৯০. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল ঈমান), হা.নং: ৬০