📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সহধর্মিণীগণকে গালি দেয়া
হযরত 'আয়িশা (রা)-এর পবিত্রতা যেহেতু পবিত্র কুর'আন দ্বারা প্রমাণিত, তাই তাঁর প্রতি কেউ ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করলে বা এ কারণে কেউ তাঁকে গালমন্দ করলে সে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে। এতে কারো দ্বিমত নেই। ইমাম মালিক (রহ) বলেছেন, "যে আবূ বাকর (রা)-কে গালি দেবে তাকে বেত্রাঘাত করা হবে। আর যে হযরত 'আয়িশা (রা) কে গালি দেবে তাকে হত্যা করা হবে।" এ কথা বলার পর তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দিলেনঃ " তাঁকে যে অপবাদ দেবে বস্তুত সে কুর'আনের বক্তব্যকেই অস্বীকার করল।" তদুপরি তাঁকে কেউ অন্য কোন কারণে গালি দিলে কিংবা তাঁকে ছোট বা হেয় করে কথা বললে তাকে দীর্ঘ কারাবাস দণ্ড দিতে হবে এবং কঠোরভাবে প্রহার করতে হবে。
তবে অন্য নবী পত্নীদেরকে অপবাদ কিংবা গালি দেয়ার বেলায়ও হযরত 'আয়িশা (রা)-এর অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য হবে কি না- তা নিয়ে ইমামগণের দুটি মত পাওয়া যায়। ক. তাঁদের কাউকে গালি দেয়ার জন্য অন্য সাধারণ সাহাবীকে গালি দেয়ার অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য হবে। এটা হানাফী ও শাফি'ঈগণের অভিমত। ইমাম আহমাদ (রহ) থেকেও এ ধরনের একটি মত বর্ণিত রয়েছে। খ. যে কোন নবী পত্নীকে অপবাদ বা গালি দেয়ার জন্য হযরত 'আয়িশা (রা)-এর অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য হবে। কারণ, যে কোন নবীপত্নীকে অপবাদ দেয়া কিংবা গালি দেয়া প্রকারান্তরে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শান ও ব্যক্তিত্বের প্রতি কলঙ্ক লেপনেরই নামান্তর। অধিকাংশ হাম্বলী ইমাম দ্বিতীয় মতটিই গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إن الذين يرمون المحصنت الغفلت المؤمنت لعنوا في الدنيا و الآخرة و لهم عذاب .عظیم - "যারা সতী ও গাফিল ঈমানদার মহিলাদেরকে অপবাদ দেবে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে বিরাট শান্তি।" হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, "উপর্যুক্ত আয়াতটি বিশেষভাবে হযরত 'আয়িশা ও অন্যান্য নবীপত্নিদের জন্য প্রযোজ্য। যে কেউ তাদেরকে অপবাদ দিলে তাদের তাওবাও কবুল হবে না।" অধিকাংশ ইমামের মতে, নবী পত্নীদের প্রতি অপবাদ আরোপকারীকে বন্দী করে তাওবা করার সুযোগ দেয়া হবে। যদি সে তাওবা করে ফিরে না আসে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে。
কেউ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিবারের অন্য কাউকে গালি দিলে সে কাফির হবে না; তবে তাকে তা'যীরের আওতায় প্রকাশ্যে জোরে প্রহার করা হবে এবং কারাদণ্ড দিতে হবে। কেননা নবী পরিবারের কাউকে গালি দেয়া নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শান ও মর্যাদায় আঘাত করার শামিল。
টিকাঃ
৭১. আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৬, পৃ.২০৬
৭২. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৪৪; আর-রু'আয়নী, মাওয়াহিবুল জলীল, খ.৬, পৃ.২৮৬; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.৯৪-৫
৭১. এটা হাম্বলীগণের অভিমত। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহও এমতটি গ্রহণ করেছেন। (ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৪৪; আল-বহুতী, কশশাফ, খ.৬, পৃ.১৭২; আর-রু'আয়নী, মাওয়াহিবুল জলীল, খ.৬, পৃ.২৮৬; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, খ.৩, পৃ,১৫২)
৭২. আল-কুর'আন, ২৪ (সূরা আন-নূর): ২৩
৭৩. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.২৩৬
৭৪. আল-মওয়াক, আত-তাজ.., খ.৮, পৃ.৩৮৫
📄 কুর’আনকে গালি দেয়া
কেউ কুর'আনকে তুচ্ছ করে কথা বললে বা তাকে নিয়ে উপহাস করলে কাফির হয়ে যাবে。
টিকাঃ
৭৭. শায়খী যাদাহ, মাজমা'.., খ.১, পৃ.৬৯৩
📄 ফেরেশতাগণকে গালমন্দ করা
ফেরেশতাগণ হলেন আল্লাহ তা'আলার অতি সম্মানিত ও নিষ্পাপ একটি সৃষ্টি। তাই অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত যে কোন ফেরেশতাকে (যেমন হযরত জিব্রাইল, মালাকুল মাওত ও জাহান্নামের রক্ষী মালিক (আ) প্রমুখ) কিংবা সামগ্রিকভাবে সকলকে কেউ লা'নত করলে, গালি দিলে কিংবা উপহাস করলে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে। তবে যাঁদের ফেরেশতা হবার ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে (যেমন হারূত ও মারূত), তাঁদেরকে কেউ গালি দিলে কাফির হবে না; তবে তাও শাস্তিযোগ্য। বিচারক সুবিবেচনা অনুযায়ী তাকে যে কোন রূপ শাস্তি দিতে পারবেন। তবে ইমাম কারাফীর মতে, সেও কাফির হবে এবং তাকে এজন্য হত্যা করা হবে。
টিকাঃ
৭৮. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.১৩১; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৪, পৃ.৩৫, খ.৮, পৃ.৭০; আদ-দাসুকী, আল-হাশিয়াতু.., খ.৪, পৃ.৩০৯; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২৪, পৃ.১৩৮
📄 দীনে ইসলামকে গালি দেয়া
কেউ দীন ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতকে গালি দিলে সে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে। তবে কেউ ব্যক্তি বিশেষের দীনকে গালি দিলে হানাফীগণের মতে সেও কাফির রূপে গণ্য হবার উপযোগী। তবে তার গালির এ রূপ ব্যাখা দেয়াও সম্ভব যে, গালিদাতার উদ্দেশ্য প্রকৃত দীন ও মিল্লাত নয়; বরং ব্যক্তি বিশেষের খারাপ চরিত্র ও মন্দ আচার-আচরণ। যদি গালিদাতার উদ্দেশ্য তা-ই হয়ে থাকে, তা হলে তাকে তার গালির জন্য কাফির বলা যাবে না। আমাদের সমাজে অনেক মূর্খই এ ভাবে গালিগালাজ করে থাকে। ইসলামী রাষ্ট্রের কোন অমুসলিম নাগরিক যদি দীন ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্য গালি দেয় অধিকাংশ ইমামের মতে যেহেতু সে নাগরিক চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাই তাকে হত্যা করা হবে। তবে হানাফীগণের মতে, তাকে হত্যা করা হবে না; তবে আদালত সুবিবেচনা অনুযায়ী তাকে যে কোন উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবে। বর্ণিত আছে যে, 'আছমা' বিনত মারওয়ান নাম্নী জনৈকা ইয়াহুদী মহিলা ইসলামের দুর্নাম করত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে কষ্ট দিত এবং লোকদেরকেও তা করার জন্য অণুপ্রেরণা যোগাত। এ কারণে 'আমর ইবন 'আদী আল-খিতমী (রা) তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এ হাদীস প্রসঙ্গে হানাফীগণ বলেন, তাকে হত্যা করার কারণ কেবল ইসলামের দুর্নাম করা নয়; বরং কয়েকটি গুরুতর অপরাধ একত্রে পাওয়া যাবার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
টিকাঃ
৭৯. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২৪, পৃ.১৩৯
৮০. আল-কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, খ.২, পৃ.৪৮