📄 বারংবার ধর্মত্যাগের শাস্তি
বারংবার ধর্মত্যাগ করে পুনঃ পুনঃ তাওবা করলেও শাফি'ঈ ও হানাফীগণের মতে তা গ্রহণযোগ্য হবে। তাঁদের দৃষ্টিতে তাওবা পাওয়া গেলে ধর্মত্যাগের জন্য- যতবারই হোক- মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,- “কাফিরদেরকে বলুন, তারা যদি (শির্ক থেকে) বিরত থাকে, তাহলে তাদের অতীতের সকল পাপই মোচন করে দেয়া হবে।” তাঁরা এ কথাও বলেছেন, দ্বিতীয়বার ধর্মত্যাগের পর তাওবা করলে তাকে তা'যীরের আওতায় প্রহার কিংবা কারাদণ্ড দেয়া হবে, হত্যা করা হবে না। ইবনু 'আবিদীন বলেন, দ্বিতীয়বার ধর্মান্তর করার পর তাওবা করলে প্রহারের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। যদি ফিরে তৃতীয়বারও ধর্মত্যাগ করে তা হলে এবারে তাকে ভীষণ বেদনাদায়ক প্রহার করা হবে এবং বন্দী করে রাখা হবে, যে যাবত না তার খাঁটি তাওবার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এভাবে যতবারই সে ধর্মত্যাগ করবে, ততবারই এ রূপ আচরণ করা হবে。
হাম্বলীগণের মতে, বারংবার ধর্মত্যাগকারীদের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। হানাফীগণেরও এ ধরনের একটি মত রয়েছে। তাছাড়া ইমাম মালিক (রহ)-এর দিকেও এ মতের নিসবত করা হয়। ২২ তাঁদের দলীল হল : আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَمْ يَكُنْ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبِيلًا - "নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, অতঃপর কুফরী করেছে, অতঃপর ঈমান এনেছে, অতঃপর কুফরীর মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমাও করবেন না এবং তাদেরকে পথও দেখাবেন না।” তিনি আরো বলেছেন إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَنْ تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ - "নিশ্চয় যারা ঈমান আনয়নের পর কুফরী করেছে, অতঃপর কুফরী আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, তাদের তাওবা কখনোই গ্রহণ করা হবে না।”
বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা)-এর কাছে জনৈক মুরতাদকে আনার পর তিনি বললেন, তোমাকে আরো এক বার আনা হয়েছিল। আমি তো মনে করেছিলাম, তুমি সত্যি সত্যিই তাওবা করেছিলে। এখন তো দেখি, তুমি ফিরে আবারো ধর্মত্যাগ করলে। এ বলে তিনি তাকে হত্যা করলেন। তদুপরি বারংবার ধর্মত্যাগ থেকে বোঝা যায় যে, তার আকীদা নষ্ট হয়ে গেছে এবং ইসলামের প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা নেই। অতএব, তাকে হত্যাই করতে হবে।
টিকাঃ
১৯. আল-কুর'আন, ৮ (সূরা আল-আনফাল) : ৩৮
২০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১০, পৃ.৯৯-১০০; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩. পৃ. ২৭৪; আল-আনসারী, আল-গুরার.., খ.৫, পৃ.৭৮
২১. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ২২৫-৬
২২. আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৭৭; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩. পৃ. ২৭৪; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৮
২৩. আল-কুর'আন, ৪ (সূরা আন-নিসা) : ১৩৭
২৪. আল-কুর'আন, ৩ (সূরা আল-'ইমরান) : ৯০
২৫. ইবনু মুফলিহ, আল-মুবদি', খ.৯, পৃ.১৭৯; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৭৭
📄 স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ ধর্মান্তর করলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَا هُنَّ حِلٌّ لَهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ - “তারা (কাফির মহিলারা) তাদের (মুসলিম পুরুষদের) জন্য হালাল নয় এবং তারা (মুসলিম পুরুষরা) তাদের (কাফির মহিলাদের) জন্য হালাল নয়।” হানাফী ও মালিকীগণের মতে, এ সম্পর্ক তাৎক্ষণিক ছিন্ন হয়ে যাবে। কেননা মুসলিম বিবাহ আইনে ধর্মান্তর বিয়ে-আকদের পরিপন্থী। তাই ধর্মত্যাগের সাথে সাথে বিয়ে ভেঙ্গে যাবে। যদি মুরতাদ স্ত্রীর 'ইদ্দত পালন অবস্থায় তাওবা করে ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে তাদের বৈবাহিক জীবন শুরু করতে হলে নতুন করে আকদ সম্পন্ন করা ও মাহর নির্ধারণ করা জরুরী。
পক্ষান্তরে শাফি'ঈ ও হাম্বলীমতাবলম্বী ইমামগণের মতে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক তাৎক্ষণিক ছিন্ন হবে না; বরং স্ত্রীর 'ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক বহাল থাকবে। অতএব, তাঁদের দৃষ্টিতে যদি মুরতাদ তাওবা করে স্ত্রীর 'ইদ্দত পালন অবস্থায় ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে তাদের পূর্বের বৈবাহিক জীবনই বহাল থাকবে। যদি তাওবা করে ইসলামে ফিরে না আসে, তা হলেই বৈবাহিক সম্পর্ক 'ইদ্দত শেষ হওয়ার পর থেকে ছিন্ন হয়ে যাবে। 'ইদ্দত গণনা ধর্মান্তরের পর থেকে শুরু হবে।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্ত্রী ধর্মত্যাগ করলে তাকে নতুনভাবে ইসলাম গ্রহণ এবং আকদ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে, যদি স্বামী তা চায়। যদি সে তাওবা করে ফিরে আসে তা হলে স্বামীকে বাদ দিয়ে অন্যকে বিয়ে করা তার জন্য জায়িয হবে না এবং কাযী যৎসামান্য মাহর নির্ধারণ করে নতুনভাবে আকদ করিয়ে দেবেন।
টিকাঃ
২৬. আল-কুর'আন, ৬০ (সূরা আল-মুমতাহিনা): ১০
২৭. এর জন্য না তালাকের প্রয়োজন হবে, না কাযীর ফায়সালার। এটা হানাফীগণের অভিমত। কতিপয় মালিকী ইমাম ধর্মান্তরের কারণে সংঘটিত বিচ্ছেদকে এক তালিকে বা'ইন রূপে গণ্য করেন। হানাফীগণের মধ্যে ইমাম মুহাম্মাদও এ মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, 'ইদ্দত অবস্থায় তাওবা করে ইসলামে ফিরে আসলে নতুন করে আকদ করার প্রয়োজন নেই। (মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.২, পৃ. ২২৬-৭; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.২. পৃ. ৩৩৭-৮; খ.৭, পৃ. ১৩৬)
২৮. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৫, পৃ.৪৮-৫১; আল-কাসানী, বদাই, খ.২.পৃ. ৩৩৭-৮; খ.৭, পৃ.১৩৬
২৯. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.১৭৩; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.৮, পৃ.২১৫-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৬, পৃ.৪২৯, খ.৭, পৃ.১৩৩
৩০. ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৩, পৃ.৪২৮-৩০
📄 উত্তরাধিকার স্বত্ব থেকে বঞ্চিতকরণ
ইসলামী উত্তরাধিকারের নিয়ম মতে, মৃত ব্যক্তি ও তার আত্মীয়-স্বজনরা একই ধর্মাবলম্বী হলে তারা তার ওয়ারিছ হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) "لا يرث الكافر المسلم ' و لا يرث المسلم الكافر " কাফির মুসলিমের ওয়ারিছ হবে না এবং মুসলিমও কাফিরের ওয়ারিছ হবে না।" অতএব ধর্মত্যাগী যেহেতু মুসলিম নয়, তাই সে তার মুসলিম নিকটাত্মীয়ের ওয়ারিছ হতে পারবে না। অনুরূপভাবে তার নতুন ধর্মের কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী কোন আত্মীয়েরও সে ওয়ারিছ হবে না। কারণ মুরতাদের কোন ধর্ম নেই।
টিকাঃ
৩১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা.নং : ২১৮১৪; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং : ১২০০৪, ১২০০৫
৩২. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৬, পৃ.২৪৮; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.৩, পৃ.২৫
📄 সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ
অধিকাংশ ইমামের মতে, ধর্মত্যাগের ফলে ধন-সম্পদের ওপর মুরতাদের মালিকানা স্বত্ব নষ্ট হবে না বটে; তবে যেহেতু সে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হয়েছে, তাই তার কোন অর্থনৈতিক চুক্তি ও লেনদেন বিশুদ্ধ হবে না। রাষ্ট্র তার যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে। যদি সে তাওবাহ করে ইসলামে ফিরে আসে, তা হলে তার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে। যদি সে মুরতাদ অবস্থায় কোন অর্থনৈতিক লেনদেন করে, তা হলে তা মুলতবী হয়ে থাকবে। যদি সে ইসলামে ফিরে আসে তাহলে তার কৃত লেনদেন কার্যকর করা হবে আর যদি হত্যা করা হয় কিংবা মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার কৃত লেনদেন বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে হানাফীগণের মতে, মহিলার ধর্মান্তরের শাস্তি যেহেতু মৃত্যুদণ্ড নয়; তাই সম্পদের ওপর তার মালিকানা স্বত্বও অটুট থাকবে এবং তার যে কোন অর্থনৈতিক লেনদেনও বিশুদ্ধ হবে。
মুরতাদের হত্যা বা মারা যাওয়ার পর তার পরিত্যক্ত ধন-সম্পদের স্বত্বাধিকারী কে হবে- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে তিন ধরনের মত পরিলক্ষিত হয়।
১. তার পরিত্যক্ত সমস্ত ধন-সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে শত্রুসম্পদ হিসেবে জমা হবে। এটি মালিকী, শাফিঈ ও হাম্বলীগণের অভিমত।
২. তার যাবতীয় পরিত্যক্ত সম্পদ তার মুসলিম ওয়ারিছদেরদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে। এটি ইমাম আবূ ইউসূফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ) প্রমুখের অভিমত। কেননা মীরাছের আইনে ধর্মত্যাগ করার পর থেকে তাকে মৃত ব্যক্তির ন্যায় গণ্য করা হয়।
৩. মুসলিম থাকাকালে তার উপার্জিত যাবতীয় সম্পদ তার মুসলিম ওয়ারিছদের মধ্যে বন্টন করা হবে এবং মুরতাদ অবস্থায় উপার্জিত যাবতীয় সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হবে। এটা ইমাম আবু হানীফা (রহ)-এর অভিমত。
টিকাঃ
৩৩. ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ)-এর মতে, ধর্মত্যাগের ফলে যেহেতু ধন-সম্পদের ওপর মুরতাদের মালিকানা স্বত্ব নষ্ট হয় না, তাই মুরতাদ অবস্থায় তার অর্থনৈতিক লেনদেন বিশুদ্ধ হবে। আবূ বাকর আল-হাম্বলীর মতে, ধর্মত্যাগের ফলে ধন-সম্পদের ওপর মুরতাদের মালিকানা স্বত্ব নষ্ট হয়ে যায়। অতএব তার ধন-সম্পদের ওপর যেহেতু তার কোন মালিকানা স্বত্ব নেই, তাই তার সম্পদের ওপর তার কোন অধিকার চর্চা বৈধ হবে না। (আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ.১৩৬- ৭; আল-বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.৬, পৃ.৭৪; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৯- ২০;আর-রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৭, পৃ.৪২০-১)
৩৪. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.১৩৭
৩৫. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৬, পৃ.২৫০, খ.৯, পৃ.১৯; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, ৩৬. পৃ.৩৩৯; আল-বাজী, আল-মুন্তকা, খ.৬, পৃ.২৫০
৩৭. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৩০, পৃ.৩৭; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ.১৩৬-৭; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৬, পৃ.৭৫-৬