📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 মুরতাদের শাস্তি

📄 মুরতাদের শাস্তি


ধর্মান্তর প্রমাণিত হবার পর যদি ধর্মান্তরকারী- পুরুষ হোক বা নারী- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাওবাহ করে ঈমানের পথে ফিরে না আসে, তাহলে তার শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, من بدل “যে তার ধর্মকে পরিবর্তন করল, তাকে তোমরা হত্যা কর।” তবে হানাফীগণের মতে, কোন মহিলাকে ধর্মত্যাগ করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না; বরং কারাগারে বন্দী করে রাখা হবে, যে যাবত না সে তাওবা করে ঈমানের পথে ফিরে আসে।
মুরতাদকে হত্যা করার পর তাকে গোসল দেয়া যাবে না, তার নামাযে জানাযাও পড়া হবে না এবং মুসলিমদের কবরস্থানে দাফনও করা যাবে না。

টিকাঃ
১৫. বর্তমানে অনেক অমুসলিম পণ্ডিত ও তাদের ভাবশিষ্য মুসলিম বুদ্ধিজীবীরাও ধর্মান্তরের এ শাস্তিকে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি মনে করে। তাদের মতে, বর্তমান সভ্য, সংস্কৃতিমনস্ক ও রুচিশীল সমাজে এ আইন চালু হতে পারে না। তাদের কথার উত্তরে সংক্ষেপে এতটুকু বলতে চাই যে, বর্তমানে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, বৃটেন, আমেরিকা ও ফ্রান্স প্রভৃতি উন্নত দেশেই তাদের নিজ নিজ ধর্মের সুরক্ষার জন্য সংবিধানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থা রয়েছে। যদি ধর্মান্তরের কিংবা ধর্মকে কটাক্ষ করার শাস্তি সভ্যতা বিরোধী হত, তা হলে তারা কেনই বা তাদের সংবিধানে এ আইন রচনা করেছে। বর্তমান সভ্য জগতে তারাই হল সভ্যতার ধ্বজাধারী। অধিকন্তু, এ শাস্তি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বিরোধী নয়; বরং সভ্যতাকে মহিমান্বিত করণ, মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ পূরণ এবং সুস্থ ও পবিত্র সমাজ বিনির্মাণের জন্য এর প্রয়োজন অপরিসীম।
১৬. সহীহ বুখারী, (কিতাবুল জিহাদ), হা.নং: ২৮৫৪, (কিতাবু ইস্তিতাবাতিল মুরতাদ্দীন), হা.নং : ৬৫২৪
১৭. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১০, পৃ.১০৯; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ১৩৪-৫; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.১, পৃ. ২৯৪; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৬
১৮. আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ, খ.২, পৃ.২৭৬; আল-বুজায়রমী, তুহফাতুল হাবীব, খ.৪, পৃ.২৪২; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ. ২২, পৃ. ১৯৫

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 বারংবার ধর্মত্যাগের শাস্তি

📄 বারংবার ধর্মত্যাগের শাস্তি


বারংবার ধর্মত্যাগ করে পুনঃ পুনঃ তাওবা করলেও শাফি'ঈ ও হানাফীগণের মতে তা গ্রহণযোগ্য হবে। তাঁদের দৃষ্টিতে তাওবা পাওয়া গেলে ধর্মত্যাগের জন্য- যতবারই হোক- মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,- “কাফিরদেরকে বলুন, তারা যদি (শির্ক থেকে) বিরত থাকে, তাহলে তাদের অতীতের সকল পাপই মোচন করে দেয়া হবে।” তাঁরা এ কথাও বলেছেন, দ্বিতীয়বার ধর্মত্যাগের পর তাওবা করলে তাকে তা'যীরের আওতায় প্রহার কিংবা কারাদণ্ড দেয়া হবে, হত্যা করা হবে না। ইবনু 'আবিদীন বলেন, দ্বিতীয়বার ধর্মান্তর করার পর তাওবা করলে প্রহারের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। যদি ফিরে তৃতীয়বারও ধর্মত্যাগ করে তা হলে এবারে তাকে ভীষণ বেদনাদায়ক প্রহার করা হবে এবং বন্দী করে রাখা হবে, যে যাবত না তার খাঁটি তাওবার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এভাবে যতবারই সে ধর্মত্যাগ করবে, ততবারই এ রূপ আচরণ করা হবে。
হাম্বলীগণের মতে, বারংবার ধর্মত্যাগকারীদের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। হানাফীগণেরও এ ধরনের একটি মত রয়েছে। তাছাড়া ইমাম মালিক (রহ)-এর দিকেও এ মতের নিসবত করা হয়। ২২ তাঁদের দলীল হল : আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَمْ يَكُنْ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبِيلًا - "নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, অতঃপর কুফরী করেছে, অতঃপর ঈমান এনেছে, অতঃপর কুফরীর মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমাও করবেন না এবং তাদেরকে পথও দেখাবেন না।” তিনি আরো বলেছেন إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَنْ تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ - "নিশ্চয় যারা ঈমান আনয়নের পর কুফরী করেছে, অতঃপর কুফরী আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, তাদের তাওবা কখনোই গ্রহণ করা হবে না।”
বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রা)-এর কাছে জনৈক মুরতাদকে আনার পর তিনি বললেন, তোমাকে আরো এক বার আনা হয়েছিল। আমি তো মনে করেছিলাম, তুমি সত্যি সত্যিই তাওবা করেছিলে। এখন তো দেখি, তুমি ফিরে আবারো ধর্মত্যাগ করলে। এ বলে তিনি তাকে হত্যা করলেন। তদুপরি বারংবার ধর্মত্যাগ থেকে বোঝা যায় যে, তার আকীদা নষ্ট হয়ে গেছে এবং ইসলামের প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা নেই। অতএব, তাকে হত্যাই করতে হবে।

টিকাঃ
১৯. আল-কুর'আন, ৮ (সূরা আল-আনফাল) : ৩৮
২০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১০, পৃ.৯৯-১০০; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩. পৃ. ২৭৪; আল-আনসারী, আল-গুরার.., খ.৫, পৃ.৭৮
২১. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ২২৫-৬
২২. আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৭৭; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩. পৃ. ২৭৪; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৮
২৩. আল-কুর'আন, ৪ (সূরা আন-নিসা) : ১৩৭
২৪. আল-কুর'আন, ৩ (সূরা আল-'ইমরান) : ৯০
২৫. ইবনু মুফলিহ, আল-মুবদি', খ.৯, পৃ.১৭৯; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৭৭

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ

📄 স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ


স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ ধর্মান্তর করলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَا هُنَّ حِلٌّ لَهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ - “তারা (কাফির মহিলারা) তাদের (মুসলিম পুরুষদের) জন্য হালাল নয় এবং তারা (মুসলিম পুরুষরা) তাদের (কাফির মহিলাদের) জন্য হালাল নয়।” হানাফী ও মালিকীগণের মতে, এ সম্পর্ক তাৎক্ষণিক ছিন্ন হয়ে যাবে। কেননা মুসলিম বিবাহ আইনে ধর্মান্তর বিয়ে-আকদের পরিপন্থী। তাই ধর্মত্যাগের সাথে সাথে বিয়ে ভেঙ্গে যাবে। যদি মুরতাদ স্ত্রীর 'ইদ্দত পালন অবস্থায় তাওবা করে ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে তাদের বৈবাহিক জীবন শুরু করতে হলে নতুন করে আকদ সম্পন্ন করা ও মাহর নির্ধারণ করা জরুরী。
পক্ষান্তরে শাফি'ঈ ও হাম্বলীমতাবলম্বী ইমামগণের মতে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক তাৎক্ষণিক ছিন্ন হবে না; বরং স্ত্রীর 'ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক বহাল থাকবে। অতএব, তাঁদের দৃষ্টিতে যদি মুরতাদ তাওবা করে স্ত্রীর 'ইদ্দত পালন অবস্থায় ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে তাদের পূর্বের বৈবাহিক জীবনই বহাল থাকবে। যদি তাওবা করে ইসলামে ফিরে না আসে, তা হলেই বৈবাহিক সম্পর্ক 'ইদ্দত শেষ হওয়ার পর থেকে ছিন্ন হয়ে যাবে। 'ইদ্দত গণনা ধর্মান্তরের পর থেকে শুরু হবে।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্ত্রী ধর্মত্যাগ করলে তাকে নতুনভাবে ইসলাম গ্রহণ এবং আকদ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে, যদি স্বামী তা চায়। যদি সে তাওবা করে ফিরে আসে তা হলে স্বামীকে বাদ দিয়ে অন্যকে বিয়ে করা তার জন্য জায়িয হবে না এবং কাযী যৎসামান্য মাহর নির্ধারণ করে নতুনভাবে আকদ করিয়ে দেবেন।

টিকাঃ
২৬. আল-কুর'আন, ৬০ (সূরা আল-মুমতাহিনা): ১০
২৭. এর জন্য না তালাকের প্রয়োজন হবে, না কাযীর ফায়সালার। এটা হানাফীগণের অভিমত। কতিপয় মালিকী ইমাম ধর্মান্তরের কারণে সংঘটিত বিচ্ছেদকে এক তালিকে বা'ইন রূপে গণ্য করেন। হানাফীগণের মধ্যে ইমাম মুহাম্মাদও এ মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, 'ইদ্দত অবস্থায় তাওবা করে ইসলামে ফিরে আসলে নতুন করে আকদ করার প্রয়োজন নেই। (মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.২, পৃ. ২২৬-৭; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.২. পৃ. ৩৩৭-৮; খ.৭, পৃ. ১৩৬)
২৮. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৫, পৃ.৪৮-৫১; আল-কাসানী, বদাই, খ.২.পৃ. ৩৩৭-৮; খ.৭, পৃ.১৩৬
২৯. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.১৭৩; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.৮, পৃ.২১৫-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৬, পৃ.৪২৯, খ.৭, পৃ.১৩৩
৩০. ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৩, পৃ.৪২৮-৩০

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 উত্তরাধিকার স্বত্ব থেকে বঞ্চিতকরণ

📄 উত্তরাধিকার স্বত্ব থেকে বঞ্চিতকরণ


ইসলামী উত্তরাধিকারের নিয়ম মতে, মৃত ব্যক্তি ও তার আত্মীয়-স্বজনরা একই ধর্মাবলম্বী হলে তারা তার ওয়ারিছ হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) "لا يرث الكافر المسلم ' و لا يرث المسلم الكافر " কাফির মুসলিমের ওয়ারিছ হবে না এবং মুসলিমও কাফিরের ওয়ারিছ হবে না।" অতএব ধর্মত্যাগী যেহেতু মুসলিম নয়, তাই সে তার মুসলিম নিকটাত্মীয়ের ওয়ারিছ হতে পারবে না। অনুরূপভাবে তার নতুন ধর্মের কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী কোন আত্মীয়েরও সে ওয়ারিছ হবে না। কারণ মুরতাদের কোন ধর্ম নেই।

টিকাঃ
৩১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা.নং : ২১৮১৪; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং : ১২০০৪, ১২০০৫
৩২. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৬, পৃ.২৪৮; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.৩, পৃ.২৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00