📄 মদ সেবনের শাস্তি
উপরন্তু, অধিকাংশ ইমামের মতে যে বস্তু অধিক পরিমাণ গ্রহণে নেশার উদ্রেক হয় তার সামান্য পরিমাণ গ্রহণ করাও হারাম- চাই তাতে নেশার উদ্রেক হোক বা না হোক- এবং তা সেবন করা হদ্দযোগ্য অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ما أسكر كثيره فقليله حرام - "যে জিনিস অধিক পরিমাণ পান করলে নেশা সৃষ্টি করে, তার স্বল্প পরিমাণও হারাম।” كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ و ما أسكر منه الفرق فملء “প্রত্যেক নেশা উদ্রেককারী জিনিসই হারাম। আর যে জিনিস এক পাত্র পান করলে নেশা সৃষ্টি করে তার এক অঞ্জলি পরিমাণও হারাম।”
মাদক সেবন ইসলামী আইনে একটি ফৌজদারী অপরাধরূপে গণ্য। এ জন্য শরী'আত অনুযায়ী শাস্তি দেয়া একান্তই কর্তব্য। তবে পবিত্র কুর'আনে এর কোন শাস্তির কথা উল্লেখ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা)ও সুনির্দিষ্টভাবে এর শাস্তি নির্ধারণ করে যান নি। বিভিন্ন হাদীসে মদ্যপায়ীদেরকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাস্তি দানের কথা বর্ণিত রয়েছে。
সকল ইমামই এ ব্যাপারে একমত যে, মদ্যপায়ীর শাস্তি হল বেত্রাঘাত। তবে বেত্রাঘাতের সংখ্যা নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। হানাফী ও মালিকীগণের মতে, মদ্যপানের শাস্তি হল আশিটি বেত্রাঘাত।” তাঁদের দলীল হল, সাহাবা কিরামের ইজমা'। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাদক দ্রব্য সেবনের অপরাধে খেজুরের দুটি ডালি দিয়ে চল্লিশটি আঘাত দিতেন। আবূ বাকর (রা)ও তাই করেছেন এবং উমার (রা) মদ্যপায়ীদের শাস্তি নির্ধারণের জন্য সাহাবীগণের নিকট থেকে পরামর্শ চাইলেন। তখন হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) বললেন, اجعله كأخف الحدود ثمانين - "তার শাস্তি হালকাতম হদ্দ- আশিটি বেত্রাঘাতই নির্ধারণ করুন।" তখন হযরত 'উমার (রা) এ দণ্ডই কার্যকর করতে নির্দেশ দিলেন এবং সিরিয়ায় হযরত খালিদ ও আবূ 'উবায়দাহ (রা) কে লিখে এ নির্দেশ দিলেন। ২২ অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত 'আলী (রা) পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, نرى أن نضربه ثمانين " فإنه إذا شرب أسكر - "যদি শরাব পান করে, তবে মাতাল হবে. و إذا أسكر هذى " و إذا هذى افترى و على المفترين ثمانون . মত হল, আমরা তাকে আশিটি বেত্রাঘাত করব। কেননা যখন সে মদ সেবন করে তখন মাতাল হয়ে যায়। আর যখন মাতাল হয়, তখন অপলাপ করে। আর যখন সে অপলাপ করে তখন সে অপবাদ দেয়। আর অপবাদদানকারীর শাস্তি হল আশিটি বেত্রাঘাত।” এ থেকে জানা যায় যে, আশিটি বেত্রাঘাতের ওপর সাহাবীগণের ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে, মদ্যপানের নির্ধারিত শাস্তি হল চল্লিশটি বেত্রাঘাত। তবে বিচারকের ইখতিয়ার রয়েছে, অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে ৮০টি পর্যন্ত বেত্রাঘাত করতে পারবেন। তবে চল্লিশের অতিরিক্ত বেত্রাঘাতসমূহ হদ্দ নয়; তা'যীরের আওতাভুক্ত। তদুপরি কাপড়, খেজুরের ডাল ও জুতা দ্বারাও যদি মারা হয়, তা হলে সেটাও শুদ্ধ হবে। তাঁদের দলীল হল, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন এবং হযরত আবূ বাকর (রা)ও তা-ই কার্যকর করেছেন। হযরত সা'ইব ইবন ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), হযরত আবূ বাকর ও উমার (রা)-এর খিলাফাতের শুরুতে মদ্যপায়ীকে আমরা ধরে আনতাম। আমরা তাকে আমাদের হাত দিয়ে, আমাদের জুতা দিয়ে ও আমাদের চাদর দিয়ে মারতাম। হযরত উমার (রা)-এর খিলাফাতের শেষ দিকেও চল্লিশটি বেত্রাঘাত করা হত। তবে যদি সীমালঙ্ঘন বেড়ে যেত, তাহলে আশিটি বেত্রাঘাত করা হত। এ থেকে জানা যায়, হযরত 'উমার (রা) সাধারণত চল্লিশটি বেত্রাঘাতই করতেন। তবে অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে কখনো আশিটি বেত্রাঘাতও করেছেন। হযরত 'উসমান (রা)-এর খিলাফাতের সময় জনৈক ব্যক্তি ওয়ালীদ ইবন ওকবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল যে, সে তাকে মদপান করতে দেখেছে এবং আরেক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল যে, সে তাকে বমন করতে দেখেছে। হযরত 'উসমান (রা) আলী (রা) কে নির্দেশ দিলেন, তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। তাকে চল্লিশটা বেত্রাঘাত করার পর আলী (রা) প্রহারকারীকে থামতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন, আবূ বাকর (রা)ও চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন এবং 'উমার (রা) আশিটি বেত্রাঘাত করেছেন। সবগুলোই সঠিক সুন্নাত এবং এটাই আমার পছন্দনীয়。
হযরত মু'আবিয়া (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, - إذا شربوا الخمر فاجلدوهم ثم إذا شربوا الرابعة فاقتلوهم "মদ্যপানকারীদেরক প্রথম তৃতীয়বার পর্যন্ত শুধু বেত্রাঘাতই কর। চতুর্থবার পান করলে তাদের হত্যা কর।”
আমি মনে করি, মদ্যপানের হদ্দ অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী আদালতের সুবিবেচনায় শাস্তির পরিমাণে হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে। তবে ৪০-এর কম এবং ৮০-এর অধিক বর্ধিত করা যাবে না। চতুর্থবার মাদক সেবনের অপরাধের মৃত্যুদণ্ডের যে কথা হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে তা নিরেট ভীতিপ্রদর্শন ও সতর্কীকরণের জন্য। বর্ণিত রয়েছে যে, মদ্যপানে অভ্যস্ত নয় এবং দৈহিকভাবে ক্ষীণ ব্যক্তিকে হযরত 'উমার (রা) চল্লিশটি বেত্রাঘাত করতেন। আর হযরত 'উসমান (রা) অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে কখনো ৪০, আবার কখনো ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি কার্যকর করতেন।
টিকাঃ
১৭. আত্ তিরমিযী, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ১৮৬৫; ইবনু মাজাহ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৩৩৯১
১৮. আবূ দাউদ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৩৬৮৭; তিরমিযী, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং : ১৮৬৬
১৯. এ কারণে ইমাম শাওকানী, ইবনু মুনযির ও আত্ তাবারী প্রমুখ ইমামগণ মনে করেন, মদ্যপানের শাস্তি হদ্দের পর্যায়ভুক্ত নয়; বরং তা'যীরী শাস্তির আওতাভুক্ত। আদালত সুবিবেচনা অনুযায়ী যে কোন শাস্তি দিতে পারবে। ইমাম যুরকানীর মতে, চল্লিশ বেত্রাঘাত সুনির্ধারিত শাস্তি অর্থাৎ হদ্দ। আর এর অতিরিক্ত আশিটি বেত্রাঘাত হল তা'যীরের আওতাভুক্ত, যা বিচারকের রায়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চার মাযহাবের ইমামগণের মতে, মদ্যপানের শাস্তি হদ্দের পর্যায়ভুক্ত। কেননা বহু বর্ণনায় বড় বড় অনেক সাহাবীকেই মদ্যপায়িতার শাস্তির জন্য হদ্দ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "একসময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এক মদ্যপায়ীকে উপস্থিত করা হল, তখন তিনি লোকদেরকে তাকে মারপিট করতে নির্দেশ দিলেন। আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, তখন আমাদের কেউ তাকে হাত দ্বারা আবার কেউ জুতা দ্বারা আবার কেউ পাকানো কাপড় দ্বারা তাকে প্রহার করেছিল। (আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং: ৪৪৭৭) কাতাদাহ বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লাঠি ও জুতা দ্বারা চল্লিশবার প্রহার করেছেন।" (আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা,নং ৪৪৮৯) আনাস (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুটি লাঠি একত্র করে চল্লিশবার প্রহার করেছেন।" (সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং: ১৭০৬) হযরত আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "রাসূলুলাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদ্যপায়িতায় একজোড়া জুতা দ্বারা চল্লিশবার মারেন।"
২০. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৩৭
২১. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৩৭; আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.৩০; আল-কাসানী, বদা'ই খ.৫, পৃ.১১৩; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৩, পৃ. ১৪২-৪
২২. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং ১৭০৬; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৭৩১০
২৩. আল-কাসানী, বদা'ই খ.৭, পৃ.১১৩; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৩, পৃ. ১৪৩
২৪. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৩৭; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৮, পৃ. ৩৭৩; আল- আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬০; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১০১; আল- মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.২২৯-২৩০
২৫. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং: ৬৩৯৩, ৬৩৯৭
২৬. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদুদ), হা, নং: ১৭০৭
২৭. আবূ দাউদ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৪৪৮২; ইবনু মাজাহ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ২৫৮৩; তিরমিযী, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৪৪৪। ইমাম আত্ তিরমিযী বলেন, এ আইনটি প্রথম দিকে কার্যকর ছিল। পরে তা রহিত হয়ে যায়।)
📄 শাস্তি কার্যকর করার সময়
রুগ্ন ও মাতাল অবস্থায় হদ্দ কার্যকর করা বিধেয় নয়। মাদকের নেশা কেটে যাওয়ার পর এবং মাদক সেবনকারীর সুস্থ হবার পর হদ্দ কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় শাস্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তদুপরি মাতাল অবস্থায় বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলার কারণে শাস্তির ব্যথাও তার কাছে কম অনুভূত হবে। অধিকাংশ ইমামের মতে, জ্ঞান ফিরে আসার আগে হদ্দ প্রয়োগ করা হলে জ্ঞান ফিরে আসার পর পুনরায় হদ্দ কার্যকর করতে হবে। তবে কারো কারো মতে, পুনরায় হদ্দ প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। তবে বিশুদ্ধতম অভিমত হল, যদি মনে করা হয় যে, বেত্রাঘাতের ফলে সে যথার্থ শিক্ষাই পেয়েছে, তাহলে পুনরায় হদ্দ প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। অন্যথায় পুনরায় হদ্দ প্রয়োগ করতে হবে。
টিকাঃ
৪৮. এটা ইমাম শাফি'ঈ ও আহমাদ (রহ) প্রমুখের এক একটি মত হিসেবে বর্ণিত।
৪৯. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.১৩; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৪০; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৬০; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১০, পৃ.১৭